Published : 25 Aug 2026, 07:38 PM
কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিসহ চার জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাত আসামিকে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুনানি শেষে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এ আদেশ দেন।
আগামী ৭ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন রাখা হয়েছে।
কারাগারে পাঠানো অপর তিন আসামি হলেন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম ও র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান।
এ চার আসামিকেই এদিন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর মইনুল করিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ খান ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম অন্য মামলায় আগে থেকেই গ্রেপ্তার ছিলেন। পরে ‘প্রোডাকশন ওয়ারেন্টের’ মাধ্যমে তাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
“আর অপর আসামি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে এই মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
পলাতক ৭ আসামি
এ মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্য ছয় আসামি হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, সাবেক ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ অলি মিয়া। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা।
শুনানিতে প্রসিকিউটর অলি মিয়া বলেন, এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। পলাতক সাত আসামির বিরুদ্ধে আগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের সবার ক্ষেত্রেই পরোয়ানা কার্যকর না হওয়া সংক্রান্ত প্রতিবেদন (নন-এক্সিকিউশন’ রিপোর্ট) এসেছে।
এ কারণে তাদের আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আবেদন জানান প্রসিকিউটর।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করে।
অভিযোগে যা বলা হয়েছে
গেল ২৬ জুলাই টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল-২ এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ওই দিনই অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের হাজিরের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
এ ১১ জন ছাড়াও র্যাব-৭-এর কর্মকর্তা ও সদস্য, র্যাবের সিভিল টিম এবং ডিজিএফআই সদস্যদের বিরুদ্ধে একরামুল হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাকে ‘নিরঙ্কুশ করার উদ্দেশ্যে’ বিরোধী রাজনৈতিক দল, ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচকদের নিশ্চিহ্ন করার ‘নীল নকশা’ করেন। এর অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে সারাদেশে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে আটক, জোরপূর্বক অপহরণ, কথিত ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা, অপরাধ সংঘটনে সংশ্লিষ্টতা, সুযোগ তৈরি, সহায়তা এবং হত্যার নির্দেশ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
যেভাবে হত্যা করা হয় একরামকে
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের কিরণতলীর হোটেল নেটংয়ের সামনের রাস্তা থেকে একরামুল হককে অপহরণ করা হয়।
পরে রাত আনুমানিক ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়া পাড়ায় মেরিন ড্রাইভের সাগরতীরে র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৪৬ বছর বয়সি এই পৌর কাউন্সিলর নিহত হন।
একরামুল নিহত হওয়ার পর র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তার বাবার নাম ও ঠিকানা ভুল লেখা হয়। তাকে ‘তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী’ ও ‘ইয়াবার শীর্ষ গডফাদার’ আখ্যায়িত করে বলা হয়, তার বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মাদক আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
তবে একরামের ভাই এহসানুল হক বাহাদুর অভিযোগ করেছিলেন, ডিজিএফআইয়ের পরিচয় দিয়ে সাধারণ পোশাকের কয়েকজন লোক ঘটনার দিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে তার ভাইকে ডেকে নিয়ে যায়। জমি বিক্রির বিষয়ে কথা বলার কথা জানিয়ে তাকে নেওয়া হলেও পরে গভীর রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তার নিহত হওয়ার খবর পান তারা।
পরে একরামের মৃত্যুর সময়কার একটি অডিও ফাঁস হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। র্যাব পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেছে বলেও অভিযোগ ওঠে। সে সময় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বিচারিক তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন।
একরামকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।
ঘটনার সময় র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন বেনজীর আহমেদ এবং কক্সবাজারে র্যাব-৭-এর অধিনায়ক ছিলেন মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ। যুক্তরাষ্ট্রের ওই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তাদের নামও ছিল।
আরও পড়ুন:
বদির 'মেটিকুলাস ডিজাইনেই' কাউন্সিলর একরাম হত্যা: প্রধান কৌঁসুলি
কাউন্সিলর একরাম হত্যা: হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
বিদায় বেলায় একরাম খুন নিয়ে প্রশ্নে যা বললেন বেনজীর
র্যাব ও সাবেক-বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
একরামের অডিও রেকর্ড জোগাড় হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
‘বন্দুকযুদ্ধে’ একরামের মৃত্যু খতিয়ে দেখা হবে: কাদের
একরামের মৃত্যু: ভয়ঙ্কর অডিওতে ‘অশনি সংকেত’
মাদকবিরোধী অভিযানে ‘সতর্ক হওয়ার’ পরামর্শ সংসদীয় কমিটির
‘বন্দুকযুদ্ধে’ কাউন্সিলর একরাম নিহতের তদন্ত চান আ. লীগ নেতারা