Published : 24 Mar 2026, 08:48 PM
মানবপাচার মামলার রিমান্ড শুনানিতে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ‘জিয়া পরিবারকে শেষ করে দেওয়া’ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘হত্যা চেষ্টার’ অভিযোগ তুলে ধরে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
ঢাকার একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রিমান্ডের পক্ষে শুনানির যুক্তি দিতে গিয়ে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী সেনা সমর্থিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে এসব অভিযোগের কথা বলেন।
তার ভাষ্য, “তথাকথিত এক-এগারো সরকারের সময় এই আসামিসহ (জেনারেল মাসুদ) অন্যরা মিলে ট্রুথ কমিশন গঠন করে ব্যবসায়ীদের ধরে এনে নির্যাতন করতো এবং তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতো।
“বিশেষ করে মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস। যাকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।”
মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদের আদালতে উপস্থাপন করা হয় সেনা নিয়ন্ত্রিত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার আলোচিত সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ও এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদকে। শুনানি শেষে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
শুনানির পর পুলিশ প্রহরায় সাবেক জেনারেলকে আদালত থেকে লিফটে করে নিচে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়া হয়।

এসময় আদালত প্রাঙ্গণে জড়ো হওয়া আইনজীবী ও বিক্ষুব্ধ কিছু ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারেন। এতে তার বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ভিজে যায়। এসময় বিক্ষুব্ধদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়।
এর আগে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে ‘সিন্ডিকেট করে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মানবপাচারের’ অভিযোগে পল্টন মডেল থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের এসআই রায়হানুর রহমান আদালতে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, এ মামলার ১০১ আসামির মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নাম রয়েছে তিন নম্বরে।
“গ্রেপ্তারের পর মামলার ঘটনার বিষয়ে তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সুচতুর চালাক প্রকৃতির লোক হওয়ায় জিজ্ঞাসাবাদে নিজেকে আড়াল করে মামলার বিষয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। এমতাবস্থায় মামলার মূল রহস্য উদঘাটন, পলাতক আসামি গ্রেপ্তার, আত্মসাৎ করা ও চাঁদার টাকা উদ্ধার, মূল অপরাধী চক্র শনাক্তসহ অন্যান্য আসামি গ্রেপ্তার করার জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। এজন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।”
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। বলেন, “বিদেশে লোক পাঠানোর নামে ২৪ হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন আজকের এই আসামি।”
টাকার ভাগ কারা কারা পেয়েছে, কোথায় কোথায় তারা টাকা পাচার করেছে তা জানতে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন, শুনানিতে বলেন তিনি।

আসামির আইনজীবী মো. শাহীন রিমান্ড না দিয়ে জামিনের আবেদন করেন।
শুনানি শেষে আদালত তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচ দিনের হেফাজতে দিয়েছে বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই রুকনুজ্জামান।
২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পার্টির টিকেটে ফেনী-৩ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন।
ওই কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে চব্বিশের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় এ মামলা দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান।
আওয়ামী লীগ আমলের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ, সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন, আহমেদ ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর ও সাবেক এমপি বেনজীর আহমেদ এবং ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের প্রোপাইটর মো. রুহুল আমীন স্বপনসহ ১০৩ জন এ মামলার আসামি।
মামলার এজাহারে বাদী আলতাব খান অভিযোগ করেছেন, “জনশক্তি রপ্তানিতে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্ট থাকলেও মামলার আসামিরা সিন্ডিকেট করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করেছেন। মামলার আসামি সচিব আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন সরকারি চাকরিরত অবস্থায় নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীনে তার ছেলেকে সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমেদ তার স্ত্রীর বড় ভাইয়ের ছেলেকে বিধিবর্হিভূতভাবে ‘প্রবাসী’ নামে একটি অ্যাপ চালু করার অনুমোদন দিয়ে ওই চক্রকে সহযোগিতা করেছেন।”
বাদীর অভিযোগ, মামলার আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ‘তার সরলতার সুযোগ নিয়ে’ ভয়ভীতি ও বলপ্রয়োগ করে মানবপাচারের উদ্দেশ্যে তার কাছ থেকে জোর করে অতিরিক্ত চাঁদা হিসেবে মাথাপিছু দেড় লাখ টাকা হারে ৮৪১ জনের কাছ থেকে ১২ কোটি ৫৬ লাখ এক হাজার টাকা আদায় করেছে।
এ চক্র অন্যান্য ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে ‘আত্মসা’ৎ করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রাজনীতিকদের নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্তে পেলে ব্যবস্থা: ‘এক-এগারোর’ মাসুদ প্রসঙ্গে পুলিশ
মানব পাচার মামলায় রিমান্ডে সাবেক জেনারেল মাসুদ
'এক-এগারোর' আলোচিত জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ গ্রেপ্তার মানব পাচার আইনে, রিমান্ডে চায় পুলিশ