Published : 24 Mar 2026, 05:11 PM
সাবেক সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় শীর্ষ রাজনীতিকদের নির্যাতনের সঙ্গে তখনকার সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে পুলিশ।
তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানাতে মঙ্গলবার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান, ডিআইজি শফিকুল ইসলাম এ কথা বলেন।
‘এক-এগারোর’ পট পরিবর্তনের পর জরুরি অবস্থার মধ্যে জেনারেল মাসুদই রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন বলে যে ধারণা চালু আছেম সে বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করবে কি-না, তা জানতে চেয়েছিলেন সাংবাদিকরা।
জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা যদি এটা পাই তদন্তে, আমরা তো অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেব।”
অন্যায়কারী যেই হোক, ‘পার পাবে না’ বলে হুঁশিয়ার করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “এরকম যদি কোনো বিষয় আসে, বা এরকম যদি কেউ থাকে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত যে কারো অধিকার আছে আইনের আশ্রয় নেওয়ার। এখনো যদি নেয়, আমরা তাকে ওয়েলকাম জানাব।”
ঢাকার ডিবি প্রধান বলেন, যে মামলার তদন্তভার তাদের হাতে থাকে, সে মামলার বিষয়ই তারা বিবেচনায় নিয়ে থাকেন। তবে একইসঙ্গে দেশের ‘গণতান্ত্রিক ধরা অব্যত রাখতে এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে’ সকল অন্যায় ও অবিচারের ‘বিচার নিশ্চিতের’ চেষ্টা তারা করেন।
সোমবার গভীর রাতে বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার ২ নম্বর লেনের ১৫৩ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি।
ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।
সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত।
বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল হন) মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি (গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি) পরিচালনা করতেন, যাদের নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৮ সালের জুনে লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে সেই দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা। ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির এমডি তিনি।
২০১৮ সালে তিনি এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। দলটির মনোনয়নে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদের বিরুদ্ধে ফেনী ও ঢাকায় ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার পল্টন থানার একটি মানবপাচারের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ওই মামলায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করার কথাও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
পুরনো খবর
সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ গ্রেপ্তার মানব পাচার আইনে, রিমান্ডে চায় পুলিশ