Published : 09 Apr 2026, 10:23 PM
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আদালতের রায়কে ‘অবৈধ’ বলা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সব সিদ্ধান্তও অবৈধ ঘোষণা করতে হবে বলে জাতীয় সংসদে দাবি করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
বৃহস্পতিবার সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যকে ঘিরে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের আপত্তির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে এ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
ইশরাক হোসেন বলেন, তিনি অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ দাবিদার হয়ে থাকলে বিগত সরকারের সবকিছু অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।
কারণ আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির বেঞ্চ তার রায়টি বহাল রেখেছিল।
২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি-ডিএসসিসির সবশেষ নির্বাচন হয়। তাতে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেনকে পৌনে ২ লাখ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে মেয়র হন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর গত বছরের ২৭ মার্চ ঢাকার নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল সেই ফল বাতিল করে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে।
এরপর ২৭ এপ্রিল ইশরাককে ডিএসসিসির মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তাকে যেন শপথ পড়ানো না হয় সেজন্য ১৪ মে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মামুনুর রশিদ।
অন্যদিকে ইশরাককে শপথ পড়ানোর দাবিতে ওইদিনই আন্দোলন শুরু করেন তার সমর্থকরা। তাদের আন্দোলনে কার্যত অচল হয়ে পড়ে নগর ভবন। তবে আইনি জটিলতার কথা বলে তার শপথের আয়োজন থেকে বিরত থাকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এক ফেইসবুক পোস্টে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়ার পদত্যাগ দাবি করেন ইশরাক। তার সমর্থকরাও একই দাবি তোলেন।
অন্যদিকে অভ্যুত্থানের নেতাদের গঠিত নতুন দল এনসিপি অভিযোগ তোলে ইশরাককে মেয়র ঘোষণার গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্ব করেছে।
সে কারণে নির্বাচন ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে অবিলম্বে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানায় দলটি।
হাই কোর্টের রিট আবেদন খারিজ করে দিলে সে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যান রিটকারী আইনজীবী মামুনুর রশিদ। আবেদনে হাই কোর্টের আদেশ স্থগিত চাওয়া হয়।
তবে লিভ টু আপিলের শুনানি করে আপিল বিভাগ বৃহস্পতিবার বিষয়টি পর্যবেক্ষণসহ নিষ্পত্তি করে দেয়।
এই জটিলতায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেনি।
সে পুরোনো বিষয়টি সংসদে ওঠে দিনের কার্যসূচিতে স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন সংশোধন বিল, ২০২৬ নিয়ে আলোচনার সময়।
কী বলেছিলেন মীর শাহে আলম
সিটি করপোরেশন বিলের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দিতে হয়।
তিনি ঢাকা দক্ষিণে বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কথাও তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইশরাক হোসেন মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে গেজেট হয়েছিল। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে শপথ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননা করে তা হতে দেয়নি।
“আমাদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ সে সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন। কী বিশেষ পরিস্থিতিতে তাকে শপথ পড়ানো হয়নি?”
প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
নাহিদের আপত্তি
এনসিপির সদস্য নাহিদ ইসলাম বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী তার আগের বক্তব্যে একটি ‘অসত্য’ তথ্য দিয়েছেন, সেটি রেকর্ড থেকে সংশোধন করা দরকার।
তার ভাষায়, “উনি বক্তব্যে বলেছেন, আমাদের একজন সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন একটি দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে। উনি শেখ হাসিনার সময়কার অবৈধ নির্বাচনের বৈধ মেয়র হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছিলেন।”
নাহিদ বলেন, ইশরাকের ওই আন্দোলন হয়েছিল ২০২৫ সালের মে মাসে। কিন্তু তিনি নিজে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহেই পদত্যাগ করেন। ফলে ওই সময়ের ঘটনার সঙ্গে তাকে যুক্ত করা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, “ওনার অসত্য তথ্যটি সংশোধন করার অনুরোধ রইল।”
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ বলেন, ঘটনাটি খুব বেশি পুরনো নয়।
তার ভাষায়, “ওই আন্দোলনের পরে ওনার মনে থাকার কথা, কারণ উনি যে ট্রফির কথা বলেছিলেন, ওই আন্দোলনের পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডনে গিয়ে সংসদ নেতার কাছে ট্রফিটি দিয়ে এসেছিলেন।”
ইশরাকের প্রতিবাদ
পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির অনুরোধে ডেপুটি স্পিকার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন।
ইশরাক বলেন, যদি তাকে অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ দাবিদার বলা হয়, তাহলে সেই সময়ের আপিল বিভাগের রায়ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
তার ভাষায়, “যে আদালতের রেফারেন্সের ভিত্তিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল, সে সরকারে আমাদের সংসদ সদস্যও শপথ নিয়েছিলেন। তাহলে বিগত সরকারের সবকিছু অবৈধ ঘোষণা করতে হবে।”
তিনি বলেন, “কারণ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির বেঞ্চে আমার রায়টি বহাল রাখা হয়েছিল। আমি এটার তীব্র প্রতিবাদ জানাই।”
পুরনো খবর: