Published : 10 Mar 2026, 09:38 PM
‘কাগুজে কোম্পানির নামে ভুয়া বাণিজ্যিক লেনদেন দেখিয়ে’ ব্যাংক ঋণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকরের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে আরো তিনটি মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাতে দুদক বলছে, আরামিট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আরামিট সিমেন্ট পিএলসির নামে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ ‘ভুয়া’ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার তথ্য দেখিয়ে মোট ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ওই ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী জাবেদ, তার স্ত্রী রুকমীলা জামানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করার সুপারিশ এসেছে দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে।
দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে নতুন নতুন তথ্য আসছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে আরও মামলা করা হবে।”
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত তদন্তে দেখা যায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী প্রায় ১৮টি ব্যাংক ও চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ নিয়েছেন।
অনুসন্ধানে ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রাম জুবলি রোড শাখায় আরামিট গ্রুপের পাঁচটি কোম্পানির ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কোম্পানির নামে মোট ৪৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকার অনুমোদিত ঋণের বিপরীতে বর্তমানে স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৫৮৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে আরামিট সিমেন্ট লিমিটেডের একক ঋণ স্থিতি ৫০৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা শ্রেণিকৃত ঋণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ঋণের মধ্যে রয়েছে বাই মুরাবাহা, বাই মুরাবাহা টিআর, এমপিআই ও এমআইবি সুবিধা।
দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবর আরামিট সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকমীলা জামান ইসলামী ব্যাংকের জুবলি রোড শাখায় ৫০০ কোটি টাকার ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণের আবেদন করেন। শাখা থেকে ৪৫০ কোটি টাকার ঋণ প্রস্তাব আঞ্চলিক অফিসে পাঠানো হয়।
পরে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির সভায় ৩৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়, যা ব্যাংকের নির্বাহী কমিটি অনুমোদন করে। এরপর গ্রাহকের আবেদনের ভিত্তিতে ৫৪টি বাই মুরাবাহা ডিলের মাধ্যমে ঋণের অর্থ বিতরণ করা হয়।
কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে ‘ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং’
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, আরামিট গ্রুপের এজিএম মো. আব্দুল আজিজকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে ‘ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং’ নামে একটি কাগুজে কোম্পানি খোলা হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে নেওয়া ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা হলেও দুদকের অনুসন্ধানে ওই কোম্পানির কোনো অফিস, গুদাম বা ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তারপরও ওই কোম্পানিকে কাঁচামাল সরবরাহকারী দেখিয়ে একাধিক ভুয়া ডিল অনুমোদন করা হয়।
দুদকের অনুসন্ধানে তিন ধাপে মোট ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য এসেছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে একটি ডিলের মাধ্যমে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাত করা হয়। ওই ঘটনায় মোট ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, কামাল বাজার শাখা থেকে ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের নামে ১৭টি ভুয়া বাই মুরাবাহা ডিলের মাধ্যমে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সদরঘাট শাখা থেকে একই কোম্পানির নামে ৯টি ডিলের মাধ্যমে আরও ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের ভাষ্য। এ ঘটনায় ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা করেছে দুদক। এসব মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া কোম্পানি দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ নিয়ে সেই অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর ও বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে তার বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ ওঠে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার পরিবারের সদস্য এবং কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে রাষ্ট্রের তিনটি সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুদকের উপপরিচালক মশিউর রহমানকে।
তার নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে।