Published : 08 Dec 2025, 02:53 PM
বিএনপি নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফজলুর রহমানের উদ্দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বলেছেন, “আপনাদের কথা মানুষ শুনবে, আপনারা মানুষকে দিক নির্দেশনা দেবেন, জুডিশিয়ারিকে গাইড করবেন।’
ট্রাইব্যুনাল নিয়ে মন্তব্য করে অবমাননার অভিযোগে পড়া ফজলুর নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে গেলে সোমবার ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান গোলাম মর্তূজা মজুমদার এ মন্তব্য করেন।
একইসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল ভবিষ্যতের জন্য তাকে সতর্ক করে দিয়ে আদালত অবমাননা প্রশ্নে জারি করা কারণ দর্শাও নোটিসটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছে।
তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালের অপর দুই বিচারক হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরুতে বিএনপিপন্থি সুপ্রিম কোর্টর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল ট্রাইব্যুনালে ফজলুর রহমানের নিঃশর্ত ক্ষমার আবেদন উপস্থাপন করেন।
এ সময় ট্রাইব্যুনাল ফজলুর রহমানের বক্তব্য শুনতে চাইলে আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি বলেন।
কাজল বলেন, তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং মুক্তিযোদ্ধা। ট্রাইব্যুনালকে অবমাননা করার কোনো ইচ্ছা নিয়ে তিনি কথা বলেননি। অসতর্কভাবে যা-ই বলেছেন, তার জন্য তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি ‘জেনুইন রিমোর্স’ প্রকাশ করেছেন। এই আদালতকে অবমাননা করার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না।
তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “আমি তো উনাকে চিনি, উনি একজন স্বনামধন্য আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ। উনার মতো মানুষ এমন কথা বললে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। ইতোমধ্যে এই বক্তব্য মিডিয়ার মাধ্যমে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।
“সাধারণ মানুষ বলা এক কথা, আপনারা রয়েছেন শীর্ষে। বিচার বিভাগ নিয়ে, দেশ নিয়ে আপনারা কিছু বললে দেশ চলবে কী করে! আপনাদের কথা মানুষ শুনবে, আপনারা মানুষকে দিক-নির্দেশনা দেবেন, জুডিশিয়ারিকে গাইড করবেন।”
এরপর আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল ইশারায় ফজলুর রহমানকে ডায়াসে ডাকেন। তখন তিনি এসে বলেন, “আমার বয়স ৭৮ বছর। আমি মিডিয়ায় কোনো কথা বলতে চাই না। উপরে আল্লাহ, নিচে আপনারা - আমার সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে। আমি নিঃশর্ত ক্ষমা চাই।”
তখন ট্রাইব্যুনাল তাকে ক্ষমা করার কথা জানিয়ে তার দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের ঘরেও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আছে। আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। আমরা ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের থাকতে দিয়েছি, তাদের খাবার দিয়েছি। তাদের পথ দেখিয়ে দিয়েছি - কোন দিকে গিয়ে কোন সেতু উড়িয় দিতে হবে, দেখিয়ে দিয়েছি। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কেউ খারাপ মন্তব্য করবে না।”
এ সময় ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে তিনি বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হবে। সেটা ১৯৭৩ সালের আগে কিংবা পরে হতে পারে। এ আইনে শুধু যুদ্ধাপরাধীর বিচার হবে- এমন কথা নেই। দেশে যেকোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য এখানে বিচার করা যাবে।
ফজলুর রহমানের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, রুহুল কুদ্দুস কাজল, কায়সার কামাল, কামরুল ইসলাম সজলসহ ১৫/২০ জন আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষে আদালত অবমানার অভিযোগ নিয়ে শুনানি করেন কৌঁসুলি গাজী এমএইচ তামিম।
গত ৩০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল এক আদেশে ফজলুর রহমানকে অ্যাকাডেমিক সনদ ও বার কাউন্সিলের সনদসহ সশরীরে উপস্থিত হয়ে আদালত অবমাননার অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে বলেছিল। সেই অনুযায়ী এদিন ফজলুর ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান।
গত ২৬ নভেম্বর ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর আগে ২৩ নভেম্বর একটি বেসরকারি টেলিভিশনের টকশোতে গিয়ে শেখ হাসিনার রায় প্রসঙ্গে তিনি কথা বলেন। পেনড্রাইভে আনা তার এই বক্তব্যের কিছু অংশ বাজিয়ে ট্রাইব্যুনালে শোনানো হয় অভিযোগ উত্থাপনের সময়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যের জেরে এর আগে ২৬ অগাস্ট ফজলুর রহমানের প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করে বিএনপি।
তবে ৩ নভেম্বর বিএনপি ঘোষিত মনোনয়নের তালিকায় কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আসনে রয়েছে ফজলুরের নাম।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ফজলুর রহমান আওয়ামী লীগ ছেড়ে ২০০৭ সালের দিকে বিএনপিতে যোগদান করেন এবং প্রায় আট বছর কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগেও কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম) আসন থেকে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে দুবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে অব্যাহতি পেলেন বিএনপির ফজলুর রহমান