Published : 01 Aug 2025, 08:52 PM
‘আসল জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা এক দল তরুণের সঙ্গে হাতাহাতি আর পুলিশের লাঠিপেটার পর শাহবাগ ছাড়লেন জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্রের দাবিতে অবরোধ চালিয়ে আসা আন্দোলনকারীরা।
দুদিন ধরে আন্দোলনকারীদের টানা অবস্থানের মধ্যে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শাহবাগ থানার ওসি মো. খালিদ মনসুর।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা আসল আহতরা এসে শাহবাগে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দিয়েছে। এরপর শাহবাগ হয়ে চারপাশের সড়কে যান চলাচল শুরু হয়েছে।”
বর্তমানে শাহবাগ এলাকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানান তিনি।
জুলাই সনদ ও ঘোষণাপত্রের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান চালিয়ে আসছিলেন ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধার’ ব্যানারে একদল মানুষ। শাহবাগ মোড়ের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে সড়ক আটকে দিলে ওই এলাকায় যানবাহন চলাচল থেমে যায়।
আন্দোলনকারীরা জুলাই সনদের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। শুক্রবার বৃষ্টি মাথায় অবস্থান অব্যাহত রাখেন তারা। শাহবাগ মোড়েই ত্রিপল পেতে জুমার নামাজ পড়েন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান ‘চালিয়ে যাওয়ার’ ঘোষণা দেন তারা।
এর মধ্যে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ‘প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা একদল তরুণ এসে শাহবাগ থেকে অবরোধকারীদের সরে যেতে বলেন। ওই তরুণরা ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলেন। অবরোধকারীদের উদ্দেশ্যে তারা ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন। তারা অবস্থানকারীদের মাইক বন্ধ করতে বলেন। সড়কে বিছানো ত্রিপল সরিয়ে ফেলতে দেখা যায় সেসময়।
একপর্যায়ে অবরোধকারীরাও তরুণদের দলটিকে ‘ভুয়া’ আখ্যা দেন। উভয় পক্ষ একে অপরের ‘জুলাই যোদ্ধার’ পরিচয়পত্র দেখতে চায়। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে কয়েকদফা হাতাহাতি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে এবং অবরোধকারীদের কয়েকদফা লাঠিচার্জ করে। এরপর শাহবাগ অবরোধকারীদের বানানো মঞ্চটি ভেঙে ফেলা হয়।
শাহবাগকে অবরোধমুক্ত করতে আসা এক যুবকের ভাষ্য, “তারা (অবরোধকারীরা) একটা মব সৃষ্টি করার জন্য এখানে অবস্থান নিচ্ছিল, এটা শেখ হাসিনার প্ল্যান। আমরা আসল জুলাই যোদ্ধা। আমরা জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের।”
তিনি বলেন, “কেন শাহবাগের মত একটা জায়গা বন্ধ করে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলতে হবে? আমরা এসে তাদেরকে ব্লকেডটা ছেড়ে দিতে বলেছিলাম, কিন্তু তারা ছাড়তে রাজি হচ্ছিল না। পরে আমরা পুলিশের সহায়তায় তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছি।”
অপরদিকে অবস্থান চালিয়ে যাওয়া কয়েকজন বলছিলেন, তারা দাবি আদায়ে দুইদিন ধরে শান্তিপূর্ণ অবস্থান চালাচ্ছেন। কিন্তু একটি গ্রুপ এসে তাদের উপর হামলা করেছে। তাদেরকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দেন অবস্থানকারীরা।
‘আসল জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা তরুণ দল ও পুলিশের তৎপরতায় শাহবাগে অবস্থানকারীরা সরে গেলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে আসছিল কারা, তারা ভুয়া কিনা? এ প্রশ্নে ওসি খালিদ মনসুর বলেন, “এ বিষয়ে আমি বলতে পারব না। যারা অবস্থান নিয়েছে আর যারা সরিয়ে দিতে এসেছে তারাই বলতে পারবে।”

শাহবাগ অবরোধকারীদের একজন মো. ইয়াছিন বলেন, “আমার পিঠে পুলিশ পিটিয়েছে। পিজি হাসপাতাল থেকে একদল এসে আমাদের উপর হামলা করে আমাদের মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আহত থাকলেও অধিকাংশ বাইরের, যারা আমাদের আন্দোলনকে সফল হতে দিতে চায় না।”
আব্দুর রহমান নামে আরেকজন বলেন, “আমরা ফুটপাত ছেড়ে দিয়েছি। সন্ধ্যার পর রাস্তা ছেড়ে দিয়ে শুধু অবস্থান কার্যক্রম চালিয়ে যেতাম। কিন্তু কিছু না বলে তারা হামলা করে আমাদের উপর। আমাদের জুলাই আহত এক বোনের হাত ভেঙে গেছে লাঠির আঘাতে।”
শাহবাগে আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক মাসুদ রানা সৌরভ বলেন, “আমাদের উপর পুলিশ আর আহতদের আরেকটি দল একসাথে হামলা করেছে। আমাদের দুইজন এখন হাসপাতালে ভর্তি। অনেকে আহত। আমরা রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হচ্ছি এখন। পরবর্তীতে আমাদের কর্মসূচি জানিয়ে দেওয়া হবে।”
সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে চলমান সংলাপের শেষ দিকে এসে জুলাই সনদ নিয়েও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠক শেষে রাষ্ট্র সংস্কারের ১৯টি মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর খবর এলেও জুলাই সনদে শেষমেশ কতগুলো রাজনৈতিক দল সই করবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
আলোচনা শেষে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, “দীর্ঘ আলোচনা, মতপার্থক্য ও আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন মোট ১৯টি মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তবে চারটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে, যা পরে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।”
দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চালিয়ে আসার পর জামায়াত ও এনসিপি বলছে, জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি না দিলে তাতে তারা সই করবে কি না, সেটা ভেবে দেখবে।
আবার শেষ দিনের বৈঠকে সিপিবি ও বাসদসহ চার বামপন্থি দল জাতীয় চার নীতি বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বৈঠক বর্জন করে বলেছে, কমিশনে প্রস্তাবে পরিবর্তন না এলে জুলাই সনদে তাদের সই করার সম্ভাবনা নেই।

আর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জাতীয় সনদের এখনই আইনি ভিত্তি প্রয়োজন নেই।
এমন পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ চেয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে দাবি জানাচ্ছিলেন ‘জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা ব্যক্তিরা। সেই অবস্থান-অবরোধের দ্বিতীয় দিনে তাদের সরিয়ে দিল ‘আসল জুলাই যোদ্ধা’ দাবি করা আরেকদল তরুণ।