Published : 16 Dec 2025, 01:09 AM
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর বন্ধ ছিল ঢাকা বেতার, সেখানে পরদিন সকালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল ভারতীয় মিত্র বাহিনী। তাদের আগেই সেই ঘোষণা দিয়ে বসেন গেরিলা যোদ্ধাদের কয়েকজন, যা হতচকিত করেছিল ঢাকায় আসা ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের।
বিজয়ের পর মিত্র বাহিনীর বেতারে ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা আগেই জেনে কয়েকজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ভাবলেন, বাঙালির স্বাধীন দেশ পাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিজেরাই দেবেন।
যেই ভাবা সেই কাজ, ওই রাতেই নিজেরা পরিকল্পনা করে ১৭ ডিসেম্বর সকালের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করলেন। সেই ঘোষণার উদ্যোক্তাদের একজন, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক শোনালেন সেই উদ্যোগের কথা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আলোচনা অনুষ্ঠান ইনসাইড আউটে যোগ দিয়ে তিনি বলেন, এরপর ভারতীয় বাহিনীর কিছুটা প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। এরপরও ‘পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়, ওই উদ্যোগের প্রভাব ছিল বেশ’।
এ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে সেই সময়ে ঢাকায় চালানো বেশ কয়েকটি অপারেশনের কথা।
কেবল মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস নয়, জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা এবং বাংলাদেশের গতিপথ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।

বিজয়ের দিনে ঢাকায় ফেরার স্মৃতি তুলে ধরে বেতারে মুক্তির বার্তা প্রচারে কী কী করেছিলেন সেই সন্ধ্যা ও রাতের মধ্যেই সেই গল্প করলেন এই গেরিলা যোদ্ধা।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরে সারা দেশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আসতে শুরু করেন ঢাকার দিকে, সেই সারিতে ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের তরুণ গেরিলা যোদ্ধা হাবিবুল আলমরা।
বিজয়ের দিন ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টার দিকে মেরাদিয়া দিয়ে ঢাকায় ঢুকতে শুরু করেন তারা। হেঁটে কমলাপুর আসতে আসতে বিকাল ৪টা-৫টা বেজে গিয়েছিল তাদের।
জনতার উল্লাসের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার কেন্দ্রস্থলের দিকে আসতে থাকেন; এরই মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সারা হয়ে গেছে আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা।
বিজয়োল্লাসের এই ঘনঘটার মধ্যে হাবিবুল আলমরা শুনতে পান, পুরান ঢাকা ও মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রধারী সৈনিকদের মোতায়েন করা হয়েছে বাঙালিদের হত্যার জন্য।
সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, “আমি, আমরা সবাই এসে খুশির চোটে বললাম যে, যাই বাসায় যাই। তো, বাসায় পৌঁছে তখন জিয়া না কেউ একটা খবর দিল যে, স্নাইপারতো গুলি করছে নারিন্দাতে। তখন সাড়ে ৭টা বাজে, সন্ধ্যা মাগরিব শেষ, এশার নামাজ শেষ।
“বললাম, চল যাই। ওই যাওয়া। চাইনিজ বন্দুক নিয়ে যাওয়া। নারিন্দার দিকে যখন গেলাম আমরা, আমি, মায়া, জিয়া, অনেকেই। যেটা দেখলাম, সেটা হচ্ছে দুইটা স্নাইপার।”
এর মধ্যে তারা একজন স্নাইপারকে ঘায়েল করতে পারলেও আরেকজনকে ধরতে না পারার কথা বলেন হাবিবুল আলম।
বীরপ্রতীক খেতাব পাওয়া এই গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বলেন, নারিন্দায় ওই অপারেশনের মধ্যে তারা খবর পেলেন, পরদিন ১৭ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার ঢাকা রেডিও থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘোষণা করবে, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে তারা’।
এটা শুনে ‘মেজাজ খারাপ’ হয়ে যাওয়ায় কিছু একটা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন হাবিবুল আলম। এরপর তিনি চায়নিজ বন্দুক অন্য সহযোদ্ধাদের কাছে রেখে হাটখোলায় শাহাদাত চৌধুরীর (পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন) বাসার উদ্দেশে রওনা করেন।
“আমাদের শাহাদাত চৌধুরীকে দরকার ছিল। কেননা, আমরা জানি ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দারও (মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার এবং পরে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, স্বাধীনতার পর বীর উত্তম খেতাব পান) আছে, শাহাদাত চৌধুরীও আছে আর ফতেহও (ফতেহ আলী চৌধুরী) আছে,” এভাবে ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি।
হাবিবুল আলম বলেন, “হাটখোলায় গিয়ে শুনি যে, শাহাদাত চৌধুরী বাসায় নেই, বাইরে। আর হায়দার ভাই ডা. জাফরুল্লাহর বোনের বাসায় ওল্ডটাউনে।
“শাহাদাত ভাইকে একটা ইনফরমেশন দিয়ে, আমি আর ফতেহ বেরিয়ে এলাম। ফতেহকে বললাম যে, ‘তুমি চলে আসো, আমরা রেডিওতে যাচ্ছি। তখনও জানি না কী করব। ১৬ তারিখের আমেজ কিন্তু গেছে ওরা শোনার পরে।”
শাহবাগে ঢাকা রেডিওর উদ্দেশে রওনা করার সময় পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডে একটি টয়োটা গাড়ি পান তারা। এরপর রাত দেড়টায় দোলাইখালে রঙ-তুলি জোগাড় করে ওই গাড়িতে লেখেন, ‘সেক্টর-২, মুক্তিযোদ্ধা’।
হাবিবুল আলম বলেন, বন্ধু ফতেহ আলীকে সঙ্গী করে ওই গাড়ি নিয়ে শাহবাগে ঢাকা রেডিওর সামনে পৌঁছানোর পর তারা দেখতে পান, সড়কের পাশের এক অংশ বন্ধ, আর আরেক অংশ খোলা। ভেতরে ঢুকে একজন বয়স্ক পিয়নকে পান তারা।
“তো, ধরে বসলাম যে, ‘বল কে কী করতে পারবে, আমার রেডিও দরকার, রেডিও ওপেন আপ করব। তখন ওই পিয়ন বললেন, ‘স্যার, আমি অনেকদিন ধরে চাকরি করতেছি, আমি আপনাদেরকে বলতে পারি, আপনারা যদি সত্যি চালাইতে চান, তাহলে শামসুল হুদা চৌধুরীকে ধরে নিয়ে আসেন’।”

ওই পিয়নের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে রেডিও পাকিস্তানের তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক শামসুল হুদা চৌধুরীর ইস্কাটনের বাসায় যান হাবিবুল আলমরা।
তিনি বলেন, “আমরা চলে গেলাম, বোধহয় সাড়ে ৬টার আগে। যখন আমরা নক করি, তখন ভদ্রমহিলা শামসুল হুদা সাহেবের স্ত্রী (লায়লা আর্জুমান্দ বানু) হবেন, খুব ফেমাস, গান করেন। উনি দরজা খুললেন।
“তো, আমাদেরকে দেখে বললেন, ‘কি চাই?’ বললাম যে, ‘আমরা শামসুল হুদা চৌধুরী সাহেবকে চাই। একটু কথা বলতে চাই’। হাতে পিস্তল, উগ্র চেহারা। বললেন যে, ‘কেন?’ ‘আমার কাজ আছে, রেডিওর জন্য কাজ আছে।”
এরপর শামসুল হুদা চৌধুরী ড্রয়িং রুমে এলে তার সঙ্গে হওয়া আলাপের বর্ণনা দিয়ে গেরিলা যোদ্ধা হাবিবুল আলম বলেন, “বললাম যে, ‘এসব বাদ দেন, আপনাকে দরকার। হয় আপনি রেডিওটাকে অন করবেন সাড়ে ৭টার মধ্যে, আর না হয় আপনারে মাইরা ফেলে দিব। এর মধ্যে কোনো ধন্দ নাই’।
“পিস্তলটা বাইর করে ঘুরাইয়া কথা বলতেছি, আস্তে আস্তে কথা বলতেছি। উনি কিন্তু দিব্বি হাসতেছেন, আরাম করতেছেন। আচ্ছা, এই সেই। তারপর আর্জুমান্দ বানু বলল, ‘যাও, ওদের জন্য মিষ্টি নিয়ে আসো’। প্রথমবার অনেকদিন পর একটা ভদ্র মিষ্টি পোড়াবাড়ির চমচম খেলাম।”
মিষ্টিতে রসনা বিলাসের পর শামসুল হুদা চৌধুরীর কাছে আসল বিষয় তুলে ধরেন তারা। ওই সময়ের বর্ণনায় তিনি বলেন, “বললাম, ‘স্যার, এইটা ঘটনা। আপনার কাছে আসছি, এই জন্য। আর আপনি ছাড়া উপায় নাই। আপনি রেডিওটাকে অন করবেন আর ইন্ডিয়ান আর্মি আসবে, মাঝখানে ওদেরকে ঠেকাতে হবে’।
“‘এর আগে আমরা ৮টার মধ্যে অ্যানাউন্সমেন্টটা করে বেরিয়ে আসব আমরা’। কিছু মানুষ ডাকলাম, ডেকে গার্ড দিতে বললাম গেটে, অন্য কেউ যাতে না ঢোকে।”

শামসুল হুদা চৌধুরীর সঙ্গে পরিকল্পনা পাকা করার পর খবর পাঠানো হল সাংবাদিক শাহাদাত চৌধুরীর কাছে, যেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে দুই নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এটিএম হায়দারকে সঙ্গে নিয়ে শাহবাগের ঢাকা বেতারে চলে আসেন।
এরপর তৈরি করা হলো এটিএম হায়দারের ভাষণের খসড়া। বেতারে পৌঁছার পর ভাষণে হাত লাগালেন শাহাদাত চৌধুরীও।
হাবিবুল আলম বলেন, “ভাষণের মধ্যে আট কি নয়টা নির্দেশনা ছিল মূলত। মুক্তিযোদ্ধাদের কী কী করণীয়। বাংলাদেশ সরকার আসেনি, কেউ নাই বাংলাদেশ সরকারের। শামসুল হুদা চৌধুরী চলে এসেছে, এসে নানা কিছু ব্যবস্থা করেছেন।
“তাকে বললাম যে, ‘আর্মি এলে আপনাকে কিন্তু হ্যান্ডেল করতে হবে। ইন্ডিয়ান আর্মি আসবে। আর দারোয়ানদেরকে বললাম, ‘এগুলো টাইট রাখতে’। তো মোটামুটি যেটা হলো যে, যখন লেখা হয়ে গেল, সবকিছু হয়ে গেল, ফতেহকে দিয়ে অ্যানাউন্স করা হল যে, ‘এখন মেজর এটিএম হায়দার অ্যানাউন্স করবেন।”
এরপর এটিএম হায়দারের ঘোষণা দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটিএম হায়দার সাহেব অ্যানাউন্স করলেন এবং বললেন, দিক নির্দেশনা দিলেন যে, এই কয়দিন কার কী করণীয়। অস্ত্র যাতে ভুল ব্যবহার না হয়, অস্ত্রগুলো সাবধান। কোথাও যাতে গোলাগুলি না হয়, অনেক কিছু।”
ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরপর আরেক গেরিলা যোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার দলও ঢাকা রেডিও এলাকায় পৌঁছার কথা জানান হাবিবুল আলম।
এরপর ভারতীয় বাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাও সেখানে আসেন তার দল নিয়ে। তার সঙ্গে আলাপের ভার শামসুল হুদা চৌধুরীর কাছে দিয়ে দেওয়ার কথা বলেন হাবিবুল আলম।
তিনি বলেন, “আঞ্চলিক পরিচালকের রুমে ছিলেন তিনি। তারপরে তাকে জিজ্ঞাসা করছি, কী করলেন? (তিনি বলেন), ‘বলছি, ক্রিস্টাল দরকার। ক্রিস্টাল সাভারে আছে, সাভার থেকে ক্রিস্টাল আসলে অন করে দিব, তারপর তোমরা নিয়ে নিও’। এইসব বুঝায় দিছে। তার যা বোঝানোর।
“‘আর বলছি, তোমাদের কাছে কোনো গাড়ি আছে কি না। আমাকে দুইটা গাড়ি দাও,’ উল্টা চেয়ে বসছে’। তো, তারা খুশির চোটে চলে গেছে, চা খাওয়ায় দিছে- চলে গেছে। তিনি তাদেরকে খুব ভালোভাবে বোঝাতে পেরেছেন।”
ওই ঘোষণা দেওয়ার পর দিন ১৮ তারিখ বিকালে কলকাতায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের দেশে আসার কথা তুলে ধরেন হাবিবুল আলম।
রেডিও ঘোষণা নিয়ে ১৮ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রথমবার বাদানুবাদ হওয়ার ঘটনার বর্ণনা করে তিনি বলেন, ক্যাপ্টেন এটিএম হায়দার লেডিস ক্লাবে আড্ডা দেওয়ার মধ্যে তারা জানতে পারেন, ক্যান্টনমেন্টে তাদেরকে ডেকেছেন কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগাত সিং।
“হায়দার সাহেবকে এবং আমাদের দুই-একজনকে ডেকেছেন। বললাম, ‘হায়দার ভাই চলেন যাই। আর্মি হেডকোয়ার্টার, তখন চতুর্দশ ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার। তো ওখানটায় হায়দার ভাইকে বলছে যে, ‘তুমি এটা কী করছ’ এবং ‘তোমরা এত যদি বাড়াবাড়ি করো, উইল প্যাক ইউ অ্যান্ড সেন্ড ইউ টু ক্যালকাটা ব্যাক’।
“তো, আমাদের মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে, স্যার ইউ আর ইন ঢাকা। দিস ইজ আওয়ার কান্ট্রি আওয়ার সিটি, ইউ টেল আস নট টু কাম ইনসাইড ক্যান্টনমেন্ট দ্যাটস অলরাইট, বাট ডোন্ট টেল আস…। ইউ ওয়ান্ট টু টেক ক্যাপ্টেন হায়দার, দ্যাটস ইউর প্রবলেম, নট মাইন। বাট ইউ কাম আউটসাইড, সিটি, ইউ আর গোয়িং টু হ্যাভ ইট। সো দিজ ইজ দ্য ফার্স্ট কনফ্রন্টেশন।”
তিনি বলেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের তৎকালীন প্রধান জেনারেল স্যাম মাকেনশ যখন ঢাকায় আসেন, তখনও লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাগাত সিং বিষয়টি তুলেছিলেন। তিনি বলেছেন, মানেকশকে (মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান শ্যাম মানেকশ) পরিচয় করে দিচ্ছে, “স্যার দিস ইয়াং চ্যাপ হু সিজড অন রেডিও।”

ক্র্যাক প্লাটুন তৈরি হল যেভাবে
ঢাকায় তরুণদের গেরিলা দল গঠনের শুরুর গল্প শুনিয়ে হাবিবুল আলম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তখনও সেভাবে যুদ্ধে যায়নি। প্রথমে যান আলী আহমদ জিয়াউদ্দিন এবং তার সঙ্গে আশফাকুস সামাদও ছিলেন। আশফাকুস সামাদ বীরউত্তম পরে সাত নম্বর সেক্টরে শহীদ হন।
“এরা এসেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদেরকে নেওয়ার জন্য। সম্ভবত, আমরাই প্রথম দল। আমি, ভাষণ (আহমেদ মুনির ভাষণ), কাইয়ুম খান, হেলাল (আব্দুল্লাহ আল হেলাল), মনির মিলে আমরা ছয়জন গিয়েছিলাম এপ্রিল মাসে।”
তিনি বলেন, এরপর আশফাকুস সামাদ এসে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী মায়াসহ একটি দলকে নিয়ে যান প্রশিক্ষণের জন্য। গাজী গোলাম দস্তগীরও ছিলেন সেই দলে।
“আমরা যখন পৌঁছাই মতিনগরে, তখন কেবল শুরু। এক নম্বর প্লাটুন কমপ্লিট হয় নাই, আমাদেরকে দিয়ে দুই নম্বর প্লাটুনটা তৈরি করা হল। সো উই বিল্ড প্লাটুন টু। আমরা যখন শেষ করলাম তার পাঁচ-ছয় দিন পরে মায়ারা এসেছে। ওটা তিন নম্বর প্লাটুন।”
ক্র্যাক প্লাটুন নামে এখন পরিচিতি পেলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন কোনো পরিচয় না থাকার কথা তুলে ধরে হাবিবুল আলম বলেন, “আসলে ক্র্যাক প্লাটুনটা যুদ্ধের সময় ছিল না, এই যে বিচ্ছু বলে, তারপর ক্র্যাক প্লাটুন দিজ আর অল বাকওয়াজ।
“আজকে এই ৫০ বছরের ন্যারেশন মানে আওয়ামী লীগের ন্যারেশন। তো, আমাদের ন্যারেশনের মধ্যে এই ন্যারেশনগুলো চলে এসছে।”
জুনে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকায় বিশ্ব ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে সফল অপারেশনের পর ঢাকাই গেরিলা যোদ্ধাদেরকে বড় পরিসরে কাজে লাগানোর দিকে এগোনোর কথা বলেন তিনি।
“যেটা আমি ১৭ জন প্রথম নিয়ে আসি, তার মধ্যে মায়া, জিয়া (আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন বীর প্রতীক), গাজী, সিরাজ (প্রকৌশলী সিরাজ ভুঁইয়া) অনেকেই ছিল। এই অ্যাকশনটা যেটা খালেদ মোশাররফ (২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ, পরে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন) কিন্তু বেসিক্যালি আমাদেরকে এটা দিয়ে টেস্ট করতে চেষ্টা করেছে, আমরা কতটুকুন পারব, কতটুকুন যেতে পারব।
“ওই অ্যাকশন করার পরে তাদের টনক নড়ল যে, আমরা কিছু করতে পারব। তখন খালেদ মোশাররফ বলল যে, আলম, বাদলকে (শহীদুল্লাহ খান বাদল) নিয়ে, আমাদেরকে নিয়ে বলল যে, ‘আমার একটা পরিকল্পনা আছে, আমি ঢাকাকে চার ভাগে ভাগ করব। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ। তুমি যে ১৭ জন নিয়ে গেছ, ১৭ জনকে ভাগ করে দিব।”
এরপর মায়া, গাজি ও জিয়াকেও তিনটি গ্রুপ দেওয়া হয়েছিল। এরপর একে একে বহু সফল অপরাশেন করতে থাকেন ঢাকার এই গেরিলা যোদ্ধারা।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ২ অপারেশন
বিদেশিদের আনাগোনা থাকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢাকাই গেরিলা যোদ্ধাদের দুটি সফল অপারেশন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। যার একটি ছিল জুনে, আরেকটি অগাস্টে।
জুনের ৯ তারিখে হওয়া প্রথম অপারেশনের বর্ণনা দিয়ে হাবিবুল আলম বলেন, “যেটা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিমের। এটা ছিল এই রকম যে, আমি বলব যে, আল্লাহ আমাদের উপর সদয় ছিলেন।
“দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান আর্মি স্বপ্নেও ভাবে নাই, যে মাগরিবের আজান হবে সঙ্গে সঙ্গে বোমা ছোঁড়া হবে, গ্রেনেড ছোঁড়া হবে এবং সেখানে এমন ধরনের কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে।”
বিবিসিতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিসরে সেটার খবর প্রচারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “খালেদ মোশারফ ওয়াজ সো হ্যাপি। তো আমরা গেছি এর পরের দিন, বলল যারা যুদ্ধ করবা, তারা চলে আসবা।”
পাঁচজনের সেই অপারেশনে তার সঙ্গে এফডিসির ক্যামেরাম্যান বাদল, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, আলী আহমেদ জিয়াউদ্দিন এবং কামরুল হক স্বপন থাকার কথা জানান হাবিবুল আলম।
তিনি বলেন, “প্রথম গ্রেনেড বোধহয়য় জিয়া মারে। তারপর বোধহয় আমি। মায়া তারপর অথবা আমি। এভাবে ৭-৮টা গ্রেনেড ফেলা হয়েছে। বুঝতে পারেন, এটা ছিল পুরোপুরি বিশৃঙ্খলা। আমরা পরের দিন যখন পৌঁছেছি, খালেদ মোশাররফকে বললাম, স্যার আমরা… ’দূর মিয়া বস’, খুব খুশি, শুনতেই রাজি না। বললেন, ’আমার যেটা দরকার ছিল, সেটা হয়ে গেছে’।
“তার দরকার ছিল, বিশ্বকে এমন তথ্য দেওয়া যে, বাংলাদেশে পাকিস্তান আর্মির জন্য পুরোপুরি স্বাধীনভাবে চলাচলের পরিস্থিতি নেই। এটাতো আমরা বুঝি নাই। আমরাতো অ্যাকশন ডিটেইল বলতে গেছি। তিনি আগ্রহী ছিলেন না। তার যেটা দরকার, সেটা হয়ে গেছে।”
বিবিসি, অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন, ভয়েস আমেরিকাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি ফলাও করে প্রচার হওয়ার কথা বলেন তিনি।
অগাস্টের দ্বিতীয় অপারেশনটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ভেতরে হওয়ার কথা তুলে ধরে এই গেরিলা যোদ্ধা বলেন, “ভেতরে ব্লাস্ট করা হলো এবং দ্যাট গিভ রিয়েল ইমপ্যাক্ট, ভয় ধরিয়ে দেয়। বোমা পোতা হয়েছিল টয়লেটের ভেতরে। এবং আমি তো বলব, যেটা ছিল ওয়ান অব দি বেস্ট ফ্যান্টাস্টিক অপারেশনস।”

জামায়াত প্রসঙ্গে
একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর এখন অনেকটা পরিবর্তন হলেও অতীত কর্মকাণ্ড মনে রেখে তাদের মূল্যায়ন করার কথা বলেছেন হাবিবুল আলম।
জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে করা প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি বলব না যে, এখানে পরিবর্তন এসে গেছে। না, এখানে পরিবর্তন আসা এখনও বাকি রয়েছে। আলামতটা হচ্ছে যে, হয়ত এটা ভালোর দিকে। আমি বলব হয়ত এটা ভালোর দিকে।
“কিন্তু তার মানে এই না যে, আমি বা আমরা, ‘না, এখন জামায়াত এতটা করছে, আগেরটা ভুলে যাও। স্যরি, দ্যাটস রং নাম্বার।”
সম্প্রতি জামায়াতের আমির বলেছেন, একাত্তরে এদেশের মানুষের স্বাধীনতা প্রত্যাশাকে তখনকার জামায়াত নেতৃত্বের সম্মান করা উচিত ছিল। তবে তারা কেন করেননি, তা নিয়ে কথা বলার জন্য তিনি উপযুক্ত ব্যক্তি নন, কারণ তিনি তখন ছিলেন না।
এই বক্তব্য টেনে করা প্রশ্নে হাবিবুল আলম আরও বলেন, “উনি ছিলেন না সেটা মানলাম, তার মানে এই না যে, আমি তখনকার জামায়াতকে ক্ষমা করে দিব। এখনকার জামায়াত আর তখনকার জামায়াতের মধ্যে অনেক তফাত আছে। স্যরি, আই উইল নট ইকুয়েট তখনকার গোলাম আজম আর এখনকার সময়, দিজ আর টু ডিফারেন্ট স্টোরিজ।
“ওই জামায়াতকে আমি মাফ করতে রাজি না। এই জামায়াত ইজ সামথিং এলস, এই জামায়াতের চিন্তাধারা আমি মনে করি খুব ভিন্ন। যেটা প্রমাণ করেছে এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইলেকশনে, দেখলাম তো।”

পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান ‘পাল্টে দেওয়া’ প্রসঙ্গে
মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে আনতে অতীতের সবগুলো সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ব্যর্থতা দেখিয়েছে বলে মনে করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম।
পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান কৌশলে পাল্টে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সেই প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি কিন্তু ১৯৭২ থেকে নিয়ে এই আজ অব্দি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মাফ করতে রাজি না। বিকজ দে হ্যাভ নট ইয়েট ফর্মড আ রিসার্চ টিম। তারা যদি রিসার্চ টিমটা ফর্ম করত তাহলে কারো ন্যারেটিভই আসত না, যে ন্যারেটিভগুলো সত্য সেটা আসত।
“এখন তুমি যদি বলো, ভাই ওই ১৫ বছর যারা করছে তারাই খালি ক্ষতি করছে, নো দ্যাটস নট কারেক্ট। এর আগে এরশাদ, এর আগে জেনারেল জিয়াও তো কমপ্লিট করে যেতে পারে নাই। এর আগে শেখ মুজিব, শেখ মুজিব কম ক্ষতি করছে? সে তো আরো বেশি ক্ষতি করে শিক্ষা মন্ত্রলালয়কে প্রথম ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। তারপর না বাকি সব শুরু হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আমি বিগত ৫৪ বছরের সব সরকারকে দায়ী করব। ৫৪ বছর ধরে যারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছে, তারা করেছে একটা দেশকে ধ্বংস করতে যা যা দরকার।”
অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, যারা গেজেটটা পড়েছে, তাদের কারোরই একটা বক্তব্য রাখার কথা না।
“কেউ বাদ পড়ে নাই। বাট আমরা দুটোকে ভাগ করেছি। ভাগ করাতে অ্যাডভান্টেজ হচ্ছে যে, যারা প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা আছে। আর যারা করে নাই তারা পড়ে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে এখন যেটা হচ্ছে, ওখানে দেখা গেছে যার বয়স আট-দশ ছিল, গত সরকার তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে।
“পুলিশে চাকরি করেছে ৭২ থেকে আজ অব্দি। মানে রিটায়ার করে গেছে এখন বেঁচে আছে সার্টিফিকেটে লেখা ২৯/১২/১৯৭১ উনি যুদ্ধ করতে জয়েন করেছেন, এবং উনার যুদ্ধ শেষ হয়েছে ১২ কি ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ সাল। অতএব উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ঠিক আছে? তো হাসিনা সরকার তাদেরকে পয়সা দিয়ে বেড়িয়েছেন। বাড়ি গোপালগঞ্জ অসুবিধা নাই!”

মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান
জুলাই অভ্যুত্থানকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলার প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে হাবিুবল আলম বলেন, “এই ইয়াং ছেলেমেয়েরা দ্বিতীয় স্বাধীনতা যে বলে, আমি কিন্তু এদের খারাপ বলছি না।
“আমি হলে কী করতাম? আমরা যে যুদ্ধ করেছিলাম সেটা ১৯ থেকে ২৫-২৬ বছর বয়স। আমার তখন ২১ বছর, পৃথিবী তো আমার মুঠোর মধ্যে। প্রশিক্ষিত আর্মির সঙ্গে যুদ্ধ করছি না বুঝে, কতটুকুইবা শিখাইছে আমাদেরকে। যেটা দুই বছরের কোর্স, আমি দুইদিন, সাত দিনের মধ্যে করছি। আর কত সংক্ষিপ্ত করব একটা কোর্সকে।”
তিনি বলেন, এদেরকে দেখে যেটা মনে হচ্ছে যে, তারা একটা কঠিন অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু এদের যদি একটা গাইডলাইনস থাকত, তাহলে অনেক কিছু হত।
“এরা ধরে নিয়েছিল যে, আমরা যেটা করব সেটাই হবে। ওরা বোধহয় জানে না যে, ইয়াং মাইন্ড ক্যান নেভার উইন অ্যান ওল্ড এজ।”
তরুণ প্রজন্মকে লেখাপড়ার করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “দেখো, খোদা তায়ালা কিন্তু সবকিছু বিকল্প দিছে। তাই বউ গেলে আরেকটা বউ পাওয়া যায়, স্বামী গেলে আরেকটা স্বামী পাওয়া যায়, বাচ্চা গেলে গিয়ে আরেকটা বাচ্চা পয়দা করো, ঠিক আছে।
“এমনকি ফজরের নামাজ মিস করলে জোহরের নামাজ পড়, জোহরের নামাজ মিস করলে আসর পড়। আসর না পড়লে মাগরিব পড়, এশায় পড়। বিকল্প তো আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বিকল্প দিয়েছে। একটা জিনিস বিকল্প দেয় নাই এই মুহূর্ত পর্যন্ত। এটা পৃথিবী শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত থেকে যাবে সেটা হল পড়াশোনা।”