Published : 14 Jan 2026, 02:00 AM
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ‘গুমের’ শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশন যাদের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে পেরেছে, তাদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা সংখ্যায় বেশি। আর ‘গুমের’ পর ফিরে না আসা রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্টদের ৬৮ শতাংশই বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের।
গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। মঙ্গলবার ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ শিরোনামে প্রকাশিত দীর্ঘ এ প্রতিবেদনে তাদের ‘গুম’ হওয়ার পেছনের নানা কারণও তুলে ধরা হয়েছে।
ইংরেজিতে লেখা ২২৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাপ্ত ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে দ্বিরুক্তি ও ‘গুম’ নয় এমন ঘটনা ধরে ১ হাজার ৫৬৯টিকে একক অভিযোগ হিসাবে বিবেচনায় নিয়েছে কমিশন।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সংঘঠিত ৯৪৮ গুমের শিকার ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীর সংখ্যা ৭১২ জন। আর সেখানে ২০৫ জন বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদল নেতাকর্মীর তথ্য পেয়েছে কমিশন।
এর বাইরে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১১ এবং হেফাজতে ইসলামের চারজনের তথ্য পাওয়ার কথা বলেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন।
গুমের শিকার ওই ব্যক্তিদের মধ্যে যে ২৫১ জন আর ফেরেননি। তাদের মধ্যে ১৫৭ জনের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে পারার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। কমিশনের প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এর আগে ৫ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে হস্তান্তরের সময় ‘গুম পরবর্তী’ ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করার কথা বলেছিলেন।
কমিশন বলছে, এসব নিখোঁজের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মী। এক্ষেত্রে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের সংখ্যা ২২ শতাংশ। নিখোঁজের হারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীও রয়েছে; ৭ শতাংশ।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয়ের বিষয়ে কমিশন প্রধান বলেছিলেন, “তাদের মধ্যে বেশিরভাগই রাজনৈতিক ব্যক্তি। তাদের শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষাসহ সম্ভাব্য সবরকম বিষয়ে কমিশন সুপারিশ করেছে।”
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে এই কাজে যুক্ত করার তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “তদন্তে মোট ৪০টি ‘ডিটেনশন সেন্টার’ (বন্দিশালা) পেয়েছে কমিশন। এর মধ্যে র্যাবের ২২ থেকে ২৩টি।”
চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন গুমের কারণ হিসেবে কমিশন বলেছে, এসব ঘটনা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ।
কমিশন ২০২৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেয়। পরদিন ওই প্রতিবেদনের প্রকাশিত কিছু অংশে ‘গুমের নির্দেশদাতা’ হিসেবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার দাবি করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ৪ জুন দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেয় কমিশন। সেখানে ‘গুমের’ শিকার ব্যক্তি এবং প্রত্যক্ষদর্শী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাতে নির্যাতান ও স্বীকারোক্তি আদায়ের সচিত্র বর্ণনা দেওয়া হয়।
‘গুমের’ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও অভিযোগ সামনে আসার পর ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর গুমের দুই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এছাড়া সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন সেনাকর্মকর্তারও বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের বাইরেও বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা, প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা এবং সরকারে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইন্ধনে শেখ হাসিনা সরকারের দেড় দশকেই নির্বিচারে ‘গুমের’ ঘটনা ঘটেছে বলে তুলে ধরেছে গুম বিষয়ক এই তদন্ত কমিশন।

ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ‘গুম ও আয়নাঘরের’ বিষয়টি আবার সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে এসে এসব ঘটনা তদন্তে ২০২৪ সালের ২৭ অগাস্ট হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের গুম তদন্ত কমিশন গঠন করে।
সেগুলোতে গুমের কারণ, কারা জড়িত, গুমে নেতৃত্ব দিত কারা, কোন সংস্থা বেশি গুম করেছে, আলোচনায় আসা আয়নাঘর, নির্যাতন সেল, নির্যাতনের ধরন, কীভাবে হত্যা, জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।
‘গুম’ হয়ে বিভিন্ন বাহিনীর হাতে বন্দি থাকা ভুক্তভোগীরা জিজ্ঞাসাবাদের সময়কার ঘটনার বর্ণনায় ইংরেজিভাষী বিদেশিদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার বর্ণনার কথাও দেয় গুম সংক্রান্ত কমিশন। প্রতিবেদনে, যাকে ‘ফরেন গেস্ট’ হিসেবে কমিশন তুলে ধরা হয়।
কমিশনের প্রধান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, বিগত সরকারের আমলে সশস্ত্র বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা ডেপুটেশনে র্যাব, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থায় কাজ করেছেন, তাদের ‘বেশিরভাগই গুম ও চাঁদাবাজিতে’ জড়িয়ে পড়েছিলেন।
সরকারের গুম সংক্রান্ত বিগত আমলে এসব সংস্থাকে ‘মিসইউজ’ করা হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, এসব বন্ধে দরকার ‘দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা’।
প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন সময়ে ‘অপব্যবহার’ করার কথা তুলে ধরে আইনশৃঙ্খলা ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে কমিশন।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের প্রধান মইনুল ইসলাম বলেন, “দেশের প্রত্যেকটা গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার করতে হবে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নাক গলায়’, কারণ তারা ক্ষমতার অংশ হতে চায়।
“তাদেরকে অপব্যবহার করা হয়েছে। এস আলমের পক্ষে ডিজিএফআই গিয়ে ইসলামী ব্যাংক দখল করেছে। এটা কি ডিজিএফআইয়ের কাজ ছিল? বা মিডিয়া হাউজ দখল করা কি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিজিএফআইয়ের কাজ? তাদেরকে নানাভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে।”
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামল কমিশনের বিবেচনায় আনা হচ্ছে।
চূড়ান্ত প্রতিবেদন ৫ জানুয়ারি হস্তান্তরের পর বিফ্রিংয়ে বলা হয়, “হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।”
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, আহমদ বিন কাসেম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান।
কমিশন সদস্যরা বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজে অনেকগুলো গুমের ক্ষেত্রে সরাসরি ‘নির্দেশদাতা’। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে ‘রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর)’ যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে করে এটি স্পষ্ট হয় যে সরকারের ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের’ নির্দেশেই এগুলো হয়েছে।
কমিশন বলেছে, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।

গুম বেড়েছে কখন, কমেছে যখন
চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গুমের শিকার কারা হয়েছে, তা বোঝার জন্য গুমের ঘটনাগুলো ঘটার সময় বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন, বছরওয়ারি ধারা পর্যালোচনা করি, তখন এটাকে কেবল বিক্ষিপ্ত আইন প্রয়োগ বলে মনে হয় না। বরং রাজনৈতিক চাপ, নির্বাচন, নিরাপত্তা সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এর বাড়া-কমার বিষয় উঠে আসে।”
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত গুমের ঘটনার বার্ষিক হিসাব দিয়ে গুম কমিশন বলেছে, “এখানে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাড়ার পর ২০১২ সালে হঠাৎ বেড়েছে এবং ওই দশকের মাঝামাঝিতে সংখ্যাটা বেশিই ছিল।
“২০১৮ সালে সংখ্যাটা কমার মানে এই নয় যে এই চর্চাটা বন্ধ হয়ে গেছে। বরং অল্প পরিমাণে থাকা এই সংখ্যা বড় মাত্রারই।”
২০০৯ সালে গুমের সংখ্যা ১০ থেকে অল্প করে বাড়তে বাড়তে ২০১২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৬১টিতে। ২০১৩ সালে ১২৮টি উল্লম্ফনের পর ২০১৪ সালে তা নাপমে ৯৫টিতে। ২০১৫ সালে ১৪১টি গুমের ঘটনার ২০১৬ সালে সংখ্যাটি পৌঁছায় ২১৫টিতে।
এরপর ২০১৭ সালে ১৯৪, ২০১৮ সালে ১৯২ এবং ২০১৯ সালে ১১৮টি গুমের ঘটনা পেয়েছে গুম বিষয়ক কমিশন। পরের দুবছর মিলিয়ে মোট ১০৭টি ঘটনার পর ২০২২ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১১০ এ। সবশেষে ২০২৩ সালে ৬৫টি এবং ২০২৪ সালে ৪৭টি গুমের ঘটনা ঘটেছে।
কমিশন বলেছে, সুনির্দিষ্ট বাৎসরিক রেকর্ড হিসাবে এটাকে ব্যাখ্যা না করাটা গুরুত্বপূর্ণ। এমন তথ্যটা এসেছে প্রাপ্ত তথ্যের কারণে। যেসব ব্যক্তি অনেক বছর আগে নিখোঁজ হয়েছেন এবং পরে ফিরেছেন, তারা ট্রমা বা ভীতির কারণে হয়ত কমিশনের মুখোমুখি হননি।
“শুরুর বছরগুলোতে এমন নীরব ঘটনা হয়ত আছে, যেগুলো কখনও তথ্যে আসবে না। এ কারণে আমরা এখানে যা দেখছি, বিশেষ করে ২০১২ সালের আগের সংখ্যাকে পূর্ণ হিসাব নয়, বরং সর্বনিন্ম অনুমান হিসাবে পড়তে হবে।”
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে এই ধারার মিল পাওয়ার কথা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৩ সালে সংখ্যাটি বেড়ে যাওয়ার এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে অস্থিতিশীলতা একই সময়ে ঘটেছে, যখন ব্যাপক বিক্ষোভ ও বিরোধীদের দমনের ঘটনা পাওয়া যায়।
“এই রকমের ধারায় ২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরেও দেখা গেছে, যেটির আগে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা ও প্রতিরোধমূলক আটকের ঘটনা ছিল। ভোটকেন্দ্রিক না হলেও ২০২২ সালে নতুন করে রাস্তায় বিক্ষোভ ও বিরোধ ছিল, তা এই সংখ্যায় প্রতিফলিত হচ্ছে।”

নিরাপত্তা সংকট এক্ষেত্রে বাড়তি ভূমিকা রেখেছে মন্তব্য করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারি হামলায় সন্ত্রাসবাদবিরোধী অপারেশন ব্যাপকতা পায়। এর পরের বছরগুলোতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আর সন্ত্রাস-মোকাবেলায় পুলিশিংয়ের মধ্যে ভেদরেখা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
“একই প্রতিষ্ঠান ও একই কর্মকর্তা দুক্ষেত্রে সমানতালে কাজ করার কারণে বেআইনি পদ্ধতিও তাদের সঙ্গে চলতে থাকে।”
বাহিনীর নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাবও গুমের সংখ্যা বাড়া-কমার ক্ষেত্রে পড়েছে তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের চলে যাওয়ার একই সময়ে একেবারে নিখোঁজ হওয়ার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমার ধারায় লক্ষ্য করা যায়।
“তার মানে এই নয় যে, বলপ্রয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। বরং এই বলপ্রয়োগের বিবর্তন হয়েছে, কম লোক পুরোপুরি নিরুদ্দেশ হচ্ছে। তবে একই সময়ে হেফাজতে দেখানো এবং বানোয়াট বিচারিক কার্যক্রম মুখোমুখি করা হয়েছে।”
গুম হওয়ার ২৮৬ জন নিখোঁজ ব্যক্তির বছরভিত্তিক যে হিসাব গুম কমিশন দিয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২০১৩ সালে সর্বোচ্চ ৪৫ জন নিখোঁজ হন এবং ২০১৬ সালে সংখ্যাটি ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, ৪১ জন।
২০১৭ সালের নিখোঁজের সংখ্যা ২২ জনে নামার পরের বছরগুলো এই ৯ জনের নিচে ছিল। ২০২১ ও ২০২২ সালে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ২ জন করে।
২০০৯ সালে ৮ জন, ২০১০ সালে ২২ জন, ২০১১ সালে ৩৪ জন, ২০১২ সালে ৩০ জন, ২০১৪ সালে ২৮ জন, ২০১৫ সালে ২০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২০১৭ সালের
যারা কখনও ফেরেননি, তাদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন ধরনের ধারা সামনে আসার কথা তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা বেশি ২০১১ এবং ২০১৬ সালের মধ্যে, এরপর হঠাৎ কমেছে। ২০১৭ সালের পর গুমের ঘটনা অব্যাহত থাকলেও একেবারে নিরুদ্দেশ হওয়ার সংখ্যাটি ছিল অনেক কম।
“নীতি ও চর্চার পরিবর্তন যে হয়েছে, এর মাধ্যমে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আগের বছরগুলো হরহামেশায় মৃত্যু বা স্থায়ী ক্ষতিই ছিল ঘটনা। আর পরের বছরগুলোতে আটক, ভীতি প্রদর্শন এবং কালক্রমে আইনি প্রক্রিয়ায় সামনে নিয়ে আসা হয়েছে বেশি সংখ্যায়। বলপ্রয়োগের ব্যবস্থাপনা ঠিকই কার্যকর ছিল, তবে ফলাফলে পরিবর্তন এসেছিল।”

গুম-নিখোঁজ সমানুপাতিক নয় যে কারণে
এই দুই প্রেক্ষাপট একসঙ্গে জামায়াত-শিবির এবং বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুম এবং নিখোঁজের তথ্যের সমানুপাতিক না হওয়ার পেছনে সময় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীতিতে পরিবর্তন দেখার কথা বলেছে গুম কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “দুটি রাজনৈতিক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু একই রকমভাবে নয়। দুই ধরনের ক্ষতির ধারা পাওয়া যায়। প্রথমত- আটক, হয়রানি, নজরদারি এবং ফৌজদারি মামলার মাধ্যমে বিচারাধীনদের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্যদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
“এর বিপরীতে, বিএনপি কর্মী এবং সহযোগী সংগঠনগুলিকে নিখোঁজ করা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে নির্মূল করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, বিএনপির নিহত প্রায় ৭০% ভুক্তভোগীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ২০১৬ এর পূর্ববর্তী সময়ের মধ্যে পড়ে। আর ২০১৬ পরবর্তী পুনরুত্থানের ঘটনাগুলিতে জামায়াত-শিবিরের ভুক্তভোগীদের সংখ্যা বেশি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
“তার মানে এই না যে, একটি গোষ্ঠী এককভাবে জীবিত ছিল যখন অন্যটি পারেনি। বরং এটি রাজনৈতিক দমন-পীড়নের সামগ্রিক ব্যবস্থায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পদ্ধতি এবং ফলাফলের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে।“
দুই বিষয় এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করে গুম কমিশন বলেছে, “প্রথমত, ২০১৬-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ তীব্রতর হওয়ার ফলে প্রণোদনাটা বদলে গেছে। আটককৃতদের, বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের ‘দাঁড়িওয়ালা’ ব্যক্তিদের জীবিত অবস্থায় হাজির করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরায় সহায়ক হয়েছে।
“রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের প্রয়োজন পড়েনি; আটক, বিচার এবং নিয়ন্ত্রিত পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়া যাচ্ছিল। এটা উল্লেখ করা জরুরি যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থায়নে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট গঠন করা হয়।”
প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের পরিবর্তনও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল বলে তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, “হত্যার পদ্ধতি ব্যবহারে সম্মুখসারির ভূমিকায় থাকা জিয়াউল আহসানের মতো কর্মকর্তাদের ২০১৬ সালে পদোন্নতি দিয়ে র্যাবের বাইরে পাঠানো হয়।
“তাদের তৈরি অত্যন্ত দক্ষ ব্যবস্থাটি বিলুপ্ত হয়নি, তবে এটির প্রতিলিপি তৈরিতে সময় লেগেছে মাত্র। আর এর মধ্যে পদ্ধতিগুলির বিলুপ্তির পরিবর্তে ভিন্নভাবে ব্যবহারে অভিযোজিত হয়েছে।”
গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘নাক গলায়’: গুম কমিশন প্রধান
গোয়েন্দা সংস্থার অপব্যবহার বন্ধে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা: গুম কমিশনের প্রধান
গুম: শেখ হাসিনা 'নির্দেশদাতা', প্রমাণ পাওয়ার দাবি কমিশনের
টিএফআই’তে ‘গুম-নির্যাতন’: হাসিনা, কামাল ও ১৫ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরুর আদেশ
'গুমের' শিকারদের নির্যাতনের যত নিষ্ঠুর কায়দা
‘গুমের’ পেছনে ‘সরকার-সুবিধাভোগীরা’, কমিশনের প্রতিবেদনের পরতে পরতে চমকে দেওয়া তথ্য
গুমের দুই মামলায় ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল
গুমে জড়িতরা এখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে, ভিকটিমদের দিচ্ছে হুমকি: গুম সংক্রান্ত কমিশন
গুম কমিশনের প্রতিবেদন: ‘জোর করে’ জবানবন্দি, ‘জড়িত’ ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেটরাও
গোপন বন্দিশালায় জিজ্ঞাসাবাদে 'আমেরিকানরাও': গুম কমিশনের প্রতিবেদন