Published : 16 Jul 2025, 11:36 PM
বাংলাদেশি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে দেশটির তরফে কী ধরনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশের অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা হয়েছে।
মামলাটি করা হয়েছে এনবিআরের শুল্ক নীতি শাখার দ্বিতীয় সচিব মুকিতুল হাসানের বিরুদ্ধে; তাকে এর আগে সাময়িক বরখাস্ত করে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে এনবিআরে ন্যস্ত করা হয়।
বুধবার বিকালে এনবিআরের বোর্ড প্রশাসনের দ্বিতীয় সচিব মো. নূরুল আমীন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে জানিয়েছেন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. ইমাউল হক।
মামলায় মুকিতুল হাসানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে আলোচনা চলছে তার তথ্য প্রকাশ করারও অভিযোগ আনার বিষয়টি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে দেশটির সঙ্গে দ্বিতীয় দফার আলোচনাকে ‘ইতিবাচক’ বলে দাবি করলেও বিস্তারিত জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার একদিন পর সোমবার সচিবালয়ে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তা প্রকাশ করতে রাজি হননি উপদেষ্টা। বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে আলোচনা প্রকাশ না করার শর্ত রয়েছে।”
তবে এ আলোচনার তথ্য যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করে দেন।

সেটি পরে ‘চাপ প্রয়োগ করে’ তুলে নেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি তার ফেইসবুক আইডিতে পুরো প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে দেন।
‘বাংলাদেশকে পাঠানো ইউএসটিআরের চিঠিতে বাণিজ্য আগ্রাসনের ছায়া’ শিরোনামে এটি প্রকাশ করেন জুলকারনাইন সায়ের। এতে ২১ পাতার চিঠিতে ছয় ধরনের শতাধিক শর্তের কথা তিনি তুলে ধরেন।
চিঠির এ কপি মুকিতুল হাসানের দপ্তর থেকে গেছে, এমন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল সরকার।
‘রাষ্ট্রের অত্যন্ত গোপন দলিল প্রকাশ’ করে চাকরির ‘শৃঙ্খলা পরিপন্থি’ আচরণ করার অভিযোগ তুলে বুধবার বিকালে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ।
কী ধরণের গোপন দলিল জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “এটা তো সবার জানার কথা। আমাদের ইউএসটিআরের সঙ্গে যে নেগোসিয়েশন হচ্ছে, তিনি তার তথ্য প্রকাশ করে দিছেন।”
মুকিতুল হাসানের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এখন বিধি মোতাবেক’ তার বিরুদ্ধে অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিকালে অনলাইনে মামলাটি হওয়ার কথা তুলে ধরেন শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. ইমাউল হক।
মামলা পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়ে ওসি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হ্যাঁ তার বিরুদ্ধে একটা মামলা হয়েছে। এখন মামলার তদন্ত হবে। তদন্তে তার দোষ পাওয়া গেলে তখন গ্রেপ্তার করা হবে। মামলা হলেই তো আর গ্রেপ্তার নাও হতে পারে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে প্রমাণ পেলে তখন।”
এর আগে এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে থাকায় বিভিন্ন কারণে ১৫ জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার এক দিনেই ১৪ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হন।
সবশেষ বরখাস্ত হওয়া মুকিতুল হাসানকে এনবিআরের দুই মাসের আন্দোলনে প্রকাশ্যে সেভাবে দেখা যায়নি। তবে তিনি এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের সদস্য তালিকায় ছিলেন।
৮ জুলাই প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে পাঠানো এক চিঠিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে তারা ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন, যা ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর তখন বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে।
এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সম্পূরক শুল্ক পুনর্বিবেচনা করতে ডনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি পাঠান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত তিন মাস স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হয় সেখানে।
এই তিন মাস সময় ট্রাম্প মূলত দিয়েছিলেন আলোচনার জন্য। বাংলাদেশের তরফ থেকেও সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বাজেটে।
কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। ৩৭ শতাংশের বদলে ট্রাম্প এবার ৩৫ শতাংশ শুল্কের খড়্গ নামিয়েছেন বাংলাদেশের ওপর।
এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, এখন নতুন করে আরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক বাড়ায় এটি দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।
তাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাত, কারণ যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার।
বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র এই বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে পোশাক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করে শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ভারতও চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, শুল্কের বিষয়ে বাংলাদেশও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসার চেষ্টা করছে। সেজন্য আলোচনাও চলছে।
আরও পড়ুন: