Published : 18 Apr 2026, 03:51 PM
শিশুদের জন্য হামের টিকার ব্যবস্থা না করে বিগত দুই সরকার ‘ক্ষমাহীন অপরাধ’ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভবিষ্যতে এ ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য সরকার দ্রুততার সঙ্গে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে এবং তাতে সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি কিছুটা রোধ করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, “সারাদেশে শিশুদেরকে হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত ইমিডিয়েট দুটি সরকারের জীবনবিনাশী ব্যর্থতা মনে হয় ক্ষমাহীন অপরাধ। ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনর্বৃত্তি না হয়, বর্তমান সরকার সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতি কিছুটা অবনতি কিছুটা রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
“আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আপনাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে এটিকে আমরা রোধ করে নিয়ে আসতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।”
হামের সংক্রমণ থেকে শিশুদের তাৎক্ষণিক রক্ষায় নিয়োজিত সব চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘‘যারা তাদের প্রিয় সন্তানদেরকে হারিয়েছেন সেই সকল পিতা-মাতা এবং স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।”
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক সম্মেলনে কথা বলছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আয়োজনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও উপজেলা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেখানে ভবিষ্যতের স্বার্থে যে কোনো মূল্যে মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পরিপূর্ণ মাতৃকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্য সেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করার তাগিদ দেন তিনি।
‘চিকিৎসা নিয়ে সাধারণের পাশে দাঁড়ান’
দেশের সাধারণ মানুষদের জন্য চিকিৎসা সেবা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “সকল চিকিৎসকদের কাছে আমি সহযোগিতা চেয়ে চাচ্ছি যাতে যেকোনো মানুষ মিনিমাম হলেও চিকিৎসা সেবা পান। মানুষকে সহায়তা করুন, মানুষকে হেল্প করুন। কারণ সে আপনারই কেউ না কেউ, সে আপনারই একজন, সে আপনার এই সমাজের একজন সদস্য, সে আপনার এই দেশের একজন নাগরিক।
“এই ঘরে (ওসমানি মিলনায়তনে) যে কজন মানুষ আমরা উপস্থিত আছি…আমরা কোনো না কোনো ভাবে প্রিভিলেজড… কেউ কম কেউ বেশি…কেউ না বলতে পারবেন না কিন্তু । বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, অধিকাংশ নাগরিক কিন্তু নট প্রিভিলেজড। আসুন, যারা নট প্রিভিলেজড আমরা অল্পসংখ্যক মানুষ যারা প্রিভিলেজড আছি চেষ্টা করি কিভাবে নট প্রিভিলেজদেরকে কিছুটা সহযোগিতা করতে কিছুটা সাহায্য করতে কিছুটা তাদের কষ্ট লাঘব করতে। আমি বিশ্বাস করি, যেকথা গুলো, যে অনুরোধগুলো আপনাদের সামনে আমি করেছি ,আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হব।”

সম্মেলনে উত্থাপিত মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সমস্যা পর্যায়ক্রমে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “আপনাদের সমস্যাগুলো একবারে আমাদের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না, তবে পর্যায়ক্রমিকভাবে করা হবে।”
এছাড়া মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দ্রুত সমাধান এবং তাদের গাড়ি ও চালক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনাও রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
“উপস্থিতিবৃন্দ আমি কিন্তু একটি কথা বলেছি ক্রমান্বয়। একবারে এটি সম্ভব না আমাদের পক্ষে, আমরা ক্রমান্বয়ে করব।
“আমেরিকার একজন বিখ্যাত পুষ্টিবিদ জ্যাক লায়েন- তার একটি কথা এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন আজকের স্বাস্থ্য সেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। এ কারণেই যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এনএইচএস এর জেনারেল প্র্যাকটিশনার- জিপির আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ইউনিট স্থাপন করা যায় কীনা সেটি আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে রয়েছে। এই স্বাস্থ্য সেবা ইউনিটগুলোর দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে এক লক্ষ হেলথকেয়ার নিয়োগ দেওয়ারও একটি পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত রয়েছে এবং এই হেলথকেয়ারদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী সদস্য। হেলথকেয়ারগণ মানুষের দৌড়গোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথকেয়ার দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো তাদেরকে দেবেন।”
‘চিকিৎসা সেবা পাওয়া নাগরিকের অধিকার’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের একটি দাবি।
“আমাদের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এটি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের করুণা নয় বরং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সুচিকিৎসা পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। ”
‘হেলথ কার্ড ও হেলথ বীমা’
প্রধানমন্ত্রী তার কর্ম পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই- হেলথকার্ড চালু করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ থাকবে, সংরক্ষিত থাকবে।
এতে যেকোন নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যে কোনো হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করার পরিকল্পনা বা চিন্তাভাবনাও করছে। যাতে করে যাতে করে নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
তারেক রহমান বলেন, “আমাদের লক্ষ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোকে আরো উন্নত করা। প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা আরো সহজ ও কার্যকর করা।
‘‘নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন নিরাপত্তা মর্যাদা এবং জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সম্পর্কেও সরকার অবশ্যই ওয়াকিবহাল। এ ব্যাপারে সরকার সাধ্যমত যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বদ্ধপরিকর।”

‘জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্য সেবা গড়ে তুলুন’
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমি একটি কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নিজ নিজ এলাকায় একটি কার্যকর জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক স্বাস্থ্য সেবা গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেবেন।
“একটি সুস্থ জাতি গড়ার যে স্বপ্ন বা যে আকাঙ্ক্ষা আমাদের মধ্যে রয়েছে সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়নের রূপ দেওয়ার মূল কারিগর কিন্তু আপনারা। আমরা সবাই মিলে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়তে চাই যা হবে সবার জন্য সহজলভ্য কার্যকর এবং মানবিক। আপনারা একটি জবাবদিহিমূলক টেকশই এবং জনকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আপনাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ এলাকার কর্মস্থলকে একটি স্বাস্থ্য মডেল সেবা কেন্দ্রে পরিণত করবেন...এটিও আমাদের প্রত্যাশা বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে।”
নির্বাচনি ইশতেহারে থাকা বিএনপির স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা উন্নয়নে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরনে প্রধানমন্ত্রী।
চিকিৎসকদের আন্তরিক ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সবাই যদি আমরা আন্তরিক হই, তার হলে পরিবর্তন হবে, কেন হবে না, অবশ্যই হবে। আমি সংক্ষিপ্ত একটি ঘটনা বলব, এই ঘটনাটি হচ্ছে,আপনাদের একটি নামের সাথে বোধহয় বেশ কিছু মানুষ পরিচিত আছেন। ফাতেমা নামে একটি নাম। এই মেয়েটি আমার আম্মার সাথে জেলেও ছিলেন, যেহেতু আম্মা অসুস্থ ছিলেন। ও অনেকদিন অনেক বছর ধরে আছে। আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গিয়েছে সে। দুদিন আগে তার এক আত্মীয় ওর বাড়ি বরিশালের দিকে তার প্রসুতি কমপ্লিকেসি দেখা দেয়। দেখা দেবার পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথে বরিশাল হাসপাতালে নেওয়া হল...বরিশাল হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথে তারা বলল বিভিন্ন রকম কমপ্লিকেসি…।
“তাকে সাথে সাথে ঢাকায় রেফার করা হচ্ছে। আমি বাসায় যাওয়ার পরে আমার স্ত্রীর কাছে শুনলাম যে সামান্য বেসিক জিনিসটা ওখানে দেওয়া সম্ভব হয়নি বা দিচ্ছে না। ঢাকায় সাথে সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছে কিন্তু ফাতেমা স্বাভাবিকভাবে আমার ওয়াইফকে বলেছে ,উনিও দুই একজনের সাথে কথা বলেছেন। সেইজন্য ফাতেমার সেই আত্মীয় খুব স্বাভাবিকভাবে বেটার চিকিৎসা পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি যেটা সেটা হচ্ছে সবাইতো ফাতেমা না বা সবাই ফাতেমার আত্মীয় না। যেহেতু আমার স্ত্রী ঘটনাটি জানতে পেরেছেন সে স্বাভাবিকভাবে উনি টেক কেয়ার করেছেন।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেই কথাটা আমি বলতে চাইছি ওখানে যারা দায়িত্বরত ছিলেন তারা যদি আরেকটু যত্নশীল হতেন, তারা যদি আরেকটু কেয়ারফুল হতেন তাহলে হয়তো অনেকগুলো সমস্যাকে এড়ানো যেত…সব না হলে অনেকগুলো সমস্যাকে এড়ানো যেত।
“আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে এই দেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমাদেরকে সাহায্য করুন, সরকারকে সাহায্য করুন। যেন আমরা কাউকে ফাতেমার আত্মীয় হওয়ার প্রয়োজন হবে না। যেকোনো মানুষ যাতে মিনিমাম হলেও চিকিৎসা সুবিধাটি নিতে পারেন।”
উপজেলা পর্যায়ের ৬ জন চিকিৎসক শোভন কুমার বশাখ, মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, মজিবুর রহমান, সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, সুমন কান্তি সাহা এবং তাসনিম জুবায়েরকে কর্মদক্ষতার জন্য তাদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন বক্তব্য রাখেন।