Published : 25 Jun 2025, 07:55 PM
বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় জেলা বরগুনায় ডেঙ্গু প্রকোপ আকার ধারণ করেছে; যেখানে এ রোগের বাহক এইডিস মশার উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার চেয়েও আটগুণ বেশি।
বুধবার সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের জরিপের ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
জরিপে দেখা গেছে, জেলার অন্য এলাকার চেয়ে শহরের পৌর এলাকায় তা কিছুটা কম, দ্বিগুণের বেশি।
বিস্তারের কারণ হিসেবে খাবার পানির সঙ্কটে থাকা এ জেলায় ড্রামে ও বিভিন্ন পাত্রে দীর্ঘদিন পানি জমিয়ে রাখাকে অন্যতম বলে মনে করছে আইইডিসিআর। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ড্রামের ঢাকনা বন্ধ রাখার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এদিন মহাখালীতে প্রতিষ্ঠানটির সম্মেলন কক্ষে অবহিতকরণ সভায় জরিপের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন।
বরগুনা পৌরসভা ও জেলায় এইডিস মশার উপস্থিতি নিয়ে গত ১৬ থেকে ২২ জুন এ জরিপ করা হয়। আইইডিসিআরের জরিপকারীরা পৌর এলাকার ১৩৮টি এবং সদর উপজেলার ৪৬টি বাড়ি পরিদর্শন করেন।
জরিপের ফলে দেখা গেছে, পৌর এলাকার ব্রুটো ইনডেক্স পাওয়া যায় ৪৭.১০। অর্থাৎ ওই এলাকায় এইডিস মশার উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার দ্বিগুণের বেশি। বরগুনা সদর এলাকার ব্রুটো ইনডেক্স ১৬৩.০৪, অর্থাৎ আটগুণের বেশি।
কোনো এলাকায় এইডিস মশার উপস্থিতির পরিমাপের একক হল ব্রুটো ইনডেক্স। ব্রুটো ইনডেক্স ২০ এর বেশি হলে সেখানে মশার ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি আছে ধরে নেওয়া হয়।
শুধু ডেঙ্গুর বাহক এইডিস মশার বিস্তার বেশি নয় এ জেলায় এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও বেশি। এ বছর দেশজুড়ে যত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তাদের এক চতুর্থাংশের বেশি এসেছে বরগুনা থেকে।
বুধবার পর্যন্ত এ বছর সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ৮৭০ জন। তাদের মধ্যে বরগুনা জেলা থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয়েছে ২৪২৭ জন। অর্থাৎ সারাদেশে মোট ভর্তি রোগীর ২৭ দশমিক ৩৬ শতাংশই এসেছে ওই জেলা থেকে।

এ বছর সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে এ জেলায় মারা গেছে ছয়জন।
বুধবার সংবাদ সম্মেলনে ডা. তাহমিনা বলেন, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বেশির ভাগই বরগুনা সদর উপজেলার। এছাড়া পাথরঘাটা ও বামনা উপজেলায়ও রোগীর সংখ্যা বেশি। এপ্রিল মাস থেকে সেখানে রোগী বাড়তে থাকে, জুন মাসে রোগী আরও বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
“আমরা রোগীর যে সংখ্যা বলেছি তা তারা সবাই রিপোর্টেড। আমরা যদি কমিউনিটিতে যাই তাহলে হয়তো আরও বেশি রোগী পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে মৃত্যুর হার কমে যাবে। কমিউনিটিতে যেহেতু আমরা সেভাবে যেতে পারিনি সে কারণে বলতে চিত্রটা কতটা ভয়াবহ আমরা বলতে পারছি না।”
এইডিস মশার বিস্তারের কারণ হিসেবে ডা. তাহমিনা বলেন, বরগুনা এলাকায় খাওয়ার পানির সঙ্কট রয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন বাড়িতে বৃষ্টির পানি ড্রামসহ বিভিন্ন পাত্রে ধরে রাখা হয়। পাত্রগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করা, দীর্ঘদিন পানি জমিয়ে রাখায় সেগুলোতে মশার লার্ভা জন্মাচ্ছে। এছাড়া মগ, পাত্র, বদনায় মশার লার্ভা বেশি পাওয়া গেছে।
“যে পাত্রগুলো পানি ধারণ করে বৃষ্টির বা জমানো সেখানে লার্ভা জন্মাচ্ছে। আর ওই এলাকায় যেহেতু বৃষ্টির পানি ধরে রাখে তাই সেখানে লার্ভা হচ্ছে। এ কারণে ড্রামের মুখটা বন্ধ করে রাখলে মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। মূল বিষয়টা হল পানি জমতে দেওয়া যাবে না। বাসার মধ্যে মশা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, এ কারণে জনসচেতনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, বরগুনায় শহরাঞ্চলে এইডিস ইজিপ্টি এবং শহরের বাইরে এইডিস অ্যালবোপিক্টাস মশার উপস্থিতি বেশি।
“আমরা যখন মশা নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করব তখন এ বিষয় মাথায় রেখে করতে হবে। তবে ঢাকার বাইরের এবারের মতো মশার ডিস্ট্রিবিউশন আমরা আগে জানতাম না। এখন যেহেতু জেনেছি সেভাবেই স্ট্র্যাটেজি ডেভেলপ করতে হবে।”
বরগুনায় আক্রান্তের ৪৬ শতাংশ ‘ডেন–৩’
অবহিতকরণ সভায় জেনোম পরীক্ষার তথ্য তুলে ধরে ডা. তাহমিনা বলেন, এ বছর বরগুনায় আক্রান্ত রোগীদের ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশের ডেঙ্গুর ধরন ডেন-৩ এ আক্রান্ত।
তিনি বলেন, ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ রোগী ডেন-২ এ আক্রান্ত হয়েছেন। বাকি ১৪ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন উভয় ধরনেই।