Published : 14 Jun 2025, 08:17 AM
ঢাকার মধ্যবাড্ডা থেকে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ওবায়দুল্লাহ খান নাবিন ও নাজমুল হাসানকে অপহরণের পর হত্যা মামলার এক দশক পার হলেও বিচার শেষ হয়নি।
ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হকের আদালতে গত ১৯ মে সবশেষ সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। সেদিন নিহতদের বাবা সামছুল হক ও স্বজন নাইম সাক্ষ্য দেন। মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যের জন্য আগামী ২৫ জুন দিন ঠিক করা হয়েছে।
২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল মধ্যবাড্ডার বাসা থেকে অপহরণের শিকার হয় সহোদর নাবিন (৯) ও নাজমুল (৫)। একদিন বাদে ৬ এপ্রিল গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতদের বাবা সামছুল বাড্ডা থানায় মামলা করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশীদ বলেন, “দুই শিশুকে খুনের ঘটনায় তাদের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেন। পুলিশ সন্দেহের বশে তাকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়। তাকে মারধর করে। আদালতে আসলে যদি সেই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়; এজন্য তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি।
“তিনি বাদী, কিন্তু সাক্ষ্য দিতে আসেন না। তার কারণে দীর্ঘদিন সাক্ষ্য হয়নি। পরে আদালতকে বলি অন্য সাক্ষীর সাক্ষ্য শুরু করার। দুই শিশুর মা সাক্ষ্য দেন। পরে তাকে বুঝিয়ে এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে নিয়ে এসেছি।”
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, দুই ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে ঢাকার মধ্যবাড্ডায় থাকতেন সামছুল হকের স্ত্রী হেলেনা। আর সামছুল ময়মনসিংহের নান্দাইলে মাছের ব্যবসা করতেন। গৃহকর্মী হেলেনার সঙ্গে তার ছোট বোন ও তার স্বামী রিকশাচালক রোমান ওরফে রুবেল থাকতেন।

পারিবারিক বিষয় নিয়ে রুবেল ও তার স্ত্রীর প্রায়ই বিবাদ হতো উল্লেখ করে এজাহার বলা হয়, একরাতে ফের ঝগড়ায় জড়ালে তাদেরকে বাসা থেকে বের করে দেন হেলেনা। রাতেই হেলেনার বোন বাসায় ফিরলেও রুবেল আসেনি।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল দুপুরে দিকে রুবেল হেলেনার বাসায় আসে। তখন হেলেনা বাসায় ছিলেন না। রুবেল তখন নাবিন, নাজমুল এবং হেলেনার দুই ভাইয়ের দুই ছেলে নাঈম ও শাহিনকে রিকশায় করে ঘুরতে নিয়ে যান। পরে নাঈম ও শাহিনকে বাসায় রেখে নাবিন ও নাজমুলকে অপহরণ করে গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরে নিয়ে যায় রুবেল।
ওইদিনই হেলেনা তার বোনকে নিয়ে রাজেন্দ্রপুর যান। সেখানে গেলে রুবেল অপহরণের কথা অস্বীকার করেন; আর রুবেলের মা-বাবা তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। পরদিন ফের রুবেলের বাড়িতে যান হেলেনা ও তার বোন। সেদিনও তিনি অপহরণের কথা অস্বীকার করেন। তখন ওই এলাকার একজনের কাছে ফোন নম্বর দিয়ে বাসায় ফেরেন হেলেনা।
এরপর ৬ এপ্রিল ওই ব্যক্তি ফোন করে জানান, গাজীপুরে দুটি লাশ পাওয়া গেছে, আছে হাসপাতালে। পরে হেলেনা ও তার বোন গিয়ে শিশু নাবিন ও নাজমুলের লাশ শনাক্ত করে।
মামলাটি তদন্ত করে বাড্ডা থানার পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন ২০১৬ সালের ৩১ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। এখন পর্যন্ত মামলাটিতে তিনজনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।
বিচার শেষ হবে কবে?
নিহতদের খালু রুবেল ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাতে তিনি বলেন, তার স্ত্রী ও স্ত্রীর দুই বোন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায়ই তার সঙ্গে ঝগড়া করতেন। অনেক সময় মারধরও করতেন।
এ নিয়ে রাগ করে একদিন নাবিন ও নাজমুলকে নিয়ে রিকশা গ্যারেজে জমা দিয়ে হেঁটে শুটিং ক্লাবে যাওয়ার কথা বলেন রুবেল। তিনি বলেন, “সেখান থেকে ভুলিয়ে ভালিয়ে রিকশায় করে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যাই। সেখান থেকে ২৭ নম্বর গাড়িতে রাজেন্দ্রপুর নিয়ে যাই। সেখানে ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে নিয়ে সন্ধ্যার পর একটি পুকুরপাড়ে নিয়ে গলা টিপে মেরে ফেলি।”
নিহতদের মা হেলেনা বলেন, “তারা (রুবেলরা) স্বামী-স্ত্রী সারাদিন ঝগড়া করতো। একদিন রাতে তারা ঝগড়া করছিল। তাদের দুজনকেই বাসা থেকে বের করে দেই। ছোট একটা বিষয় নিয়ে এতো বড় ঘটনা ঘটবে বুঝতে পারিনি।
“পরিকল্পিতভাবে সে (রুবেল) আমার দুই ছেলেকে খুন করেছে। দুই ছেলেকে এক সাথে দাফন করেছি। এটা যে কত কষ্টের! মায়ের যন্ত্রণা কেউ বুঝবে না।”
তিনি বলেন, “আমি আর আমার ভাই পাশাপাশি থাকতাম। আমার দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়তো। সারাদিন তারা মাদ্রাসাতেই থাকতো। ভোর ৬টায় যেত, আর আসতো রাত ৮ টায়। আমার ভাইয়ের দুই ছেলে। তারা চারজন এক সাথেই খেলতো। ঘটনার দিন তারা একসাথে খেলছিল।
“সেদিন আবার আমার বড় বোন বাসায় আসে। তাকে বলে, আমার দুই ছেলেকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। আমার বোন বলে, ‘ওর মা কাজে গেছে। ফিরলে তার কাছে বলে নিয়ে যেও’। পরে চারজনকে একসাথে রিকশায় নিয়ে যায়। ঘুরিয়ে আমার ভাইয়ের দুই ছেলেকে রেখে আমার দুই ছেলেকে নিয়ে যায়। বড় ছেলে মসজিদে আজান দেবে, নামাজ পড়াবে একথা বলতো সবসময়।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেন, মামলাটিতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। তিনজনের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে।
“এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ মামলা। দুই শিশুকে হত্যা। আমরা সাক্ষীদের আদালতে হাজির করে দ্রুত মামলার বিচার শেষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। বিচারে যেন ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায়, সেই চেষ্টা করব।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রশীদ বলেন, “আসামি দুই শিশুকে নিয়ে যায়। তাদের মা বাসায় এসে তাদের পায় না। পরে তো জানা গেল, আসামি দুই শিশুকে খুন করেছে। সে নিজেও স্বীকার করেছে। আশা করছি, বিচারে এ আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হবে।”
রুবেলের নিযুক্ত কোনো আইনজীবী নেই। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হুমায়ন কবীর খান তার পক্ষে লড়ছেন।
তিনি বলেন, “যেকোনো হত্যাই কষ্টদায়ক। আর এটা একটা মর্মান্তিক ঘটনা। দুই শিশু হত্যার অভিযোগ। ন্যায়বিচার পাওয়া সবার অধিকার। তার পক্ষ থেকে লড়ে যাচ্ছি, যেন তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হন।
“বাকিটা বিচারের মাধ্যমে হবে। তাকে নির্দোষ প্রমাণের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
এক প্রশ্নের জবাবে হেলেনা বলেন, “মামলার পর রুবেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রুবেল আমার স্বামীকে ফাঁসিয়ে দেয়। র্যাবকে জানায়, আমার স্বামী নাকি তাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছে দুই ছেলেকে খুন করতে। পরে একদিন আমাকে পুলিশ ফোন দিয়ে বলে আমার স্বামীকে নিয়ে যেন থানায় যাই।
“আমি তাকে নিয়ে যায়। তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়। অনেক পরে পুলিশ বুঝতে পারে, আমার স্বামী নির্দোষ। কিন্তু সেই ১০ দিনের রিমান্ডই আমার জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। আমার স্বামী বলে, আমি নাকি তাকে ইচ্ছে করে গ্রেপ্তার করিয়েছি। একে তো আমার দুই ছেলে খুন হয়েছে, আবার পুলিশ স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ কারণে তার সাথে আমার সম্পর্কই শেষ হয়।”