১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মাঠে আছেন, কাগজে নেই: নারী কৃষকের স্বীকৃতির লড়াই

মাঠের কৃষিশ্রমে নারীর অংশগ্রহণ বেশি হলেও জমির মালিকানা, কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, সহায়তা কাঠামো এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি সীমিত।

মাঠে আছেন, কাগজে নেই: নারী কৃষকের স্বীকৃতির লড়াই
ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক আছেন, যার মধ্যে নারী কৃষকের সংখ্যা চার হাজারের মত।

বিডিনিউজ২৪

জেসমিন মলি, ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে ফিরে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Jun 2026, 11:53 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:19 PM

নার্গিস ঠিক জানেন না, তার বয়স কত। তবে সেটা ৩৫ এর আশপাশে হবে বলেই তার ধারণা।

থাকেন ভোলার বোরহানউদ্দিনে। স্বামীর সঙ্গে মাঠে যান। ধান আগান, খড় ঝাড়েন, বস্তা ভরেন, চর থেকে মাথায় করে ফসল টেনে আনেন। মাঠ থেকে ফিরে রান্না, সন্তান, হাঁস মুরগি পালন আর সংসারের কাজ সারেন।

এই কাজের জন্য আলাদা মজুরি পাওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন করতেই তার চোখে মুখে ফুটল বিস্ময়।

তারপর হাসি মুখে বললেন, “মূল্য দিব ক্যা আপু? স্বামীর তো নাই, থাকলে তো দিত। স্বামীরও আমি, আমারও স্বামী। আর কিছু নাইগো আপুমণি, আর কিছু নাই।”

নার্গিসের মত নারীরাই ভোলার বোরহানউদ্দিনের সাচড়া ও গঙ্গাপুর ইউনিয়নে কৃষির বড় অংশ সামলান। কিন্তু তাদের কাজের বড় অংশের কোনো মজুরি নেই, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও নেই।

কৃষিতে সরকার থেকে কোনো সহায়তা পান কি না জানতে চাইলে নার্গিস বললেন, “জি না আপু। সব আমরা, মানে নিজেদেরটা দিয়া করি। অন্যদের থেকে আইনা ধার কইরা নিজেরা কইরা আবার বেইচা হেইগোরে দিয়া দেই। আমগোরে এই সহযোগিতা কেউ করে না।”

মাঠের কৃষি থেকে ঘরের কাজ, সবাই সামলাতে হয় নারীদের।

মাঠের কৃষি থেকে ঘরের কাজ, সবাই সামলাতে হয় নারীদের।

অন্যদিকে সাচড়া ইউনিয়নের দেউলা শিবপুর গ্রামের শাহনাজ বেগমের স্বামী মারা গেছেন ২০১৬ সালে। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন।

অভাবের কারণে পড়াশোনা এগোয়নি। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়ে যায়। দুই সন্তানের মা হওয়ার পর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তারপর স্বামীর মৃত্যুতে একা হয়ে পড়েন শাহনাজ।

বাবার সামান্য জমি আছে। সেই জমির পাশাপাশি অন্যের কাছ থেকে বর্গা নেওয়া জমিতেও চাষ করেন তিনি। মিষ্টি আলু, মরিচ, বাদাম, ডালসহ বিভিন্ন ফসল ফলান। পাশাপাশি হাঁস, মুরগি, ছাগল পালন করেন।

‘কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর কৃষি ও পশুপালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন শাহনাজ। সরকারি দপ্তরের সেবা সম্পর্কে জেনেছেন। কৃষি অফিস থেকে বীজ, সার ও অন্যান্য সহায়তাও পেয়েছেন।

তার খামারে এখন ৪২টি হাঁস, চারটি ছাগল, রাজহাঁস ও দেশি মুরগি আছে। আর্থিক সহায়তা পেলে হাঁস মুরগির খামার আরও বড় করতে চান তিনি।

স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে ও পরের জীবনের পার্থক্য তুলে ধরে শাহনাজ বললেন, “আগে তো কথাই কইতে পারতাম না। এলাকায় বাইর হইতাম না। এখন উনাদের সহযোগিতায় ঘর থেকে বাইর আইতেছি।”

নার্গিস ও শাহনাজ দুজনই কৃষির সঙ্গে যুক্ত। পার্থক্য একটাই; শাহনাজ একটি সংযোগ পেয়েছেন, প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, দপ্তরে যেতে শিখেছেন। নার্গিস এখনও সেই কাঠামোর বাইরে।

গ্রামের নারীদের কাজের বড় অংশের কোনো মজুরি নেই, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও নেই। 

গ্রামের নারীদের কাজের বড় অংশের কোনো মজুরি নেই, আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও নেই।

উপজেলার কৃষকদের ১০% নারী, কিন্তু জমি?

কৃষি শুমারির তথ্য অনুযায়ী, বোরহানউদ্দিনে মোট জমির পরিমাণ ২৮ হাজার ৪৬৭ হেক্টর। এর মধ্যে নিট ফসলি জমি ২১ হাজার ১৬৮ হেক্টর। এক ফসলি জমি ১ হাজার ৫৪৮ হেক্টর, দুই ফসলি জমি ১০ হাজার ২৪০ হেক্টর এবং তিন ফসলি জমি ৯ হাজার ৩৮০ হেক্টর।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা গোবিন্দ মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উপজেলায় সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার কৃষক আছেন, যার মধ্যে নারী কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক চার হাজার।

তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কম করে হলেও ৫০০ নারীকে কৃষি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

গত ১৩ মে বোরহানউদ্দিনের সাচড়া ও গঙ্গাপুর ইউনিয়নে মাঠতথ্য সংগ্রহের সময় শাহিনা বেগম, বিবি হাজেরা, ফখরুন্নেছা, রাবেয়া, বিবি রহিমজানসহ আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা হয়। তাদের জীবনে কৃষি, সংসার আর জলবায়ু ঝুঁকির চাপ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

কেউ স্বামীর জমিতে কাজ করেন। কেউ স্বামী হারিয়ে সন্তান নিয়ে একা কৃষি আর ঘর সামলাচ্ছেন। 

চর গঙ্গাপুরের বিবি হাজেরার স্বামী ইউসুফ বজ্রপাতে মারা গেছেন। ফখরুন্নেছার স্বামীও মারা গেছেন। বিবি রহিমজানের ১৮ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী মেয়ে আছে, বড় ছেলে নদীতে জাল বায়।

কারও নামে জমি আছে কি না জানতে চাইলে কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠলেন–এদিককার মানুষ মহিলাদের জমি দেয় না।

আর জমির কাগজে নাম না থাকলে কৃষি সহায়তা, ঋণ বা আনুষ্ঠানিক কৃষক পরিচয়ে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে। 

শাহিনা বেগম জানালেন, নিজের নামে জমি না থাকায় তিনি ব্যাংক থেকে ঋণ পাননি।

আগাম বন্যা আর জোয়ারের অস্বাভাবিক পানিতে তলিয়ে যাওয়া বাদাম ক্ষেত দেখাচ্ছেন বিবি রহিমজান।

আগাম বন্যা আর জোয়ারের অস্বাভাবিক পানিতে তলিয়ে যাওয়া বাদাম ক্ষেত দেখাচ্ছেন বিবি রহিমজান।

স্থানীয় উন্নয়নকর্মীরাও বলছেন, ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পেতে অনেক নারী কৃষক ‘ডকুমেন্ট জটিলতায়’ পড়েন। ফলে তারা আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় ধার বা ছোট প্রকল্পের সহায়তার ওপর নির্ভর করেন।

গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার (জিজেইউএস) প্রজেক্ট অফিসার ইরিন ইশরাত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উপকূলীয় এই অঞ্চলে পুরুষদের অনেকে নদীতে মাছ ধরেন। ফলে বাড়ির আশপাশের জমি, আঙিনার সবজি, হাঁস মুরগি, গবাদিপশু, পুকুরের মাছ এবং ফসল তোলার পরের কাজগুলোতে নারীদের ভূমিকা বেশি।

সুইডেন সরকারের অর্থায়নে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ‘কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি’ বা ‘সিআরইএ’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও ভূমিহীন মানুষের সহনশীলতা বাড়ানো এ প্রকল্পের লক্ষ্য।

প্রকল্পের আওতায় নারীদের নেতৃত্ব সক্ষমতা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, গবাদিপশু পালন ও আয়বর্ধক কাজের সুযোগ তৈরিতে সহায়তা দেওয়া হয়। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোও এর কার্যক্রমের অংশ।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত চলার কথা। এমজেএফের তথ্য অনুযায়ী, ভোলাসহ ১৪ জেলায় ১৩টি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর সরাসরি সুবিধাভোগী ২২ হাজার ৬৮০ জন।

প্রকল্পের আওতায় আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের জন্য ২৮টি নারী দলের মধ্যে ২১টি দলকে ‘ইনকাম জেনারেটিং অ্যাক্টিভিটিজ’ (আইজিএ) সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি দলকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এই সহায়তা দিয়ে নারীরা হাঁস মুরগি পালন, সবজি চাষ বা ছোট কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ শুরু করছেন।

প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, নারী কৃষকেরা সরকারি ব্যাংক থেকে তেমন সুবিধা পান না। জমির কাগজসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট জটিলতার কারণে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে থেকে যান। শাহিনার মতো অনেকেই তাই প্রকল্পের এই ছোট সহায়তায় আয়বর্ধক কাজ শুরু করেছেন।

এমজেএফ এর অধিকার ও সুশাসন কর্মসূচির পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী মনে করেন, নারী কৃষকদের ‘অদৃশ্য’ থেকে যাওয়ার পেছনে কাঠামোগত ও নীতিগত দুই ধরনের সমস্যাই কাজ করছে।

“নারীরা গরুর ঘর পরিষ্কার করে, গরুর খাবার তৈরি করে, ধান শুকায়, মাড়াই করে, খড় গাদা করে, বীজ সংরক্ষণ করে। সবগুলোই কৃষির অংশ। কিন্তু এগুলোকে ঘরের কাজ হিসেবে দেখা হয়।”

তার ভাষায়, কৃষক পরিচয় এখনও জমির মালিকানা ও পুরুষতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

“আমরা কৃষক বললেই পুরুষ বুঝি। কৃষি নীতিতে বিষয়টি মালিকানার সঙ্গে যুক্ত। ফলে নারীর শ্রমকে উৎপাদনশীল শ্রম হিসেবে দেখা হয় না।”

বোরহানউদ্দিনের নারীদের জীবনে কৃষি, সংসার আর জলবায়ু ঝুঁকির চাপ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বোরহানউদ্দিনের নারীদের জীবনে কৃষি, সংসার আর জলবায়ু ঝুঁকির চাপ একসঙ্গে জড়িয়ে আছে।

প্রতিপক্ষ যখন জলবায়ু সঙ্কট

বিবি রহিমজান নিজের বাদামক্ষেত দেখাচ্ছিলেন। আগাম বন্যা আর জোয়ারের অস্বাভাবিক পানিতে তার ক্ষেতের বড় অংশ তলিয়ে গেছে। ফসলের ক্ষতির কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি।

শুধু রহিমজান নন, এ এলাকার অনেক কৃষকের একই অভিজ্ঞতা। চাষে শ্রম দেন, বীজ কেনেন, জমিতে সময় দেন। কিন্তু জোয়ারের পানি বা আগাম বন্যা এলে এক মৌসুমের আশা মুহূর্তেই ডুবে যায়।

নারী কৃষকদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হয় বাড়তি চাপ। ফসল নষ্ট হলে পরিবারের খাদ্য, ঋণ শোধ, হাঁস মুরগির খাবার, সন্তান ও অসুস্থ সদস্যের যত্ন, সব হিসাবই নতুন করে মেলাতে হয় তাদের।

বোরহানউদ্দিনের মাঠে শুধু কাজের চাপ নয়, আছে শরীরের ঝুঁকিও। জোয়ারের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে জমিতে। সেই পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়।

জিজেইউএসের ইরিন ইশরাত বলেন, “পুকুরের পানি দেখলে আপনার অটোমেটিক ঘেন্না আসবে, কিন্তু ওই পানি দিয়ে ওরা সব কাজ করে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, জোয়ারের লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকে পড়লে বাদাম, সবজি ও ডালের ক্ষতি হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘসময় সেই পানিতে কাজ করায় নারীদের ত্বকে চুলকানিসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়।

খাবার পানিওর সংকট আছে। সব ঘরে টিউবওয়েল নেই। কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘর মিলে একটি টিউবওয়েল ব্যবহার করে। পুকুরের পানিতে রান্না হয় অনেক বাড়িতে।

চর ও উপকূলঘেঁষা ওই এলাকায় লবণাক্ততা শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, নারীদের শরীরেও চাপ তৈরি করছে। 

নিরাপদ মিঠা পানির সংকটে পান করা, রান্না, গোসল ও মাসিক স্বাস্থ্যবিধিতে সমস্যার কথা বলেছেন এলাকার নারীরা। 

বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তায়েবুর রহমান জানান, এ উপজেলায় ডায়রিয়ার রোগী তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে পানির লবণাক্ততার মাত্রা বেড়েছে কি না, তা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্যের বিষয় নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চাষের ধরনও বদলাচ্ছে। জোয়ারের পানি এলে মাটির ঘর ডুবে যায়, ছাগলের আস্তানা নষ্ট হয়। সমাধান হিসেবে জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে কোথাও কোথাও উঁচু মাচার ওপর ঘর তৈরি করে ছাগল পালনের ব্যবস্থা শেখানো হচ্ছে।

গঙ্গাপুর ইউনিয়নের জয়া গ্রামের ফাতেমা বেগম ‘সিআরইএ’ প্রকল্পের অধীনে গঠিত যুঁথি নারী দলের সভাপতি। প্রকল্প থেকে অভিযোজন প্রযুক্তির জন্য ১০ হাজার টাকা সহায়তা নিয়ে তিনি ১০০টি বস্তায় আদা চাষ করছেন।

ফাতেমা কমিউনিটি সভা ও দলীয় বৈঠকে নিজের অভিজ্ঞতা অন্য নারীদের সঙ্গে ভাগ করছেন, অন্য নারীদের উৎসাহিত করছেন।

তবে তারও নিজের নামে জমি নেই, কৃষক কার্ড পাননি, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ নেই। 

ফাতেমার ভাষায়, “আমি চাই সরকার আমাকে কৃষক হিসেবে চিনুক। বস্তায় চাষ করেও আমি কৃষক।”

নারী কৃষকেরা সরকারি ব্যাংক থেকে তেমন সুবিধা পান না। জমির কাগজসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট জটিলতার কারণে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে থেকে যান।

নারী কৃষকেরা সরকারি ব্যাংক থেকে তেমন সুবিধা পান না। জমির কাগজসহ বিভিন্ন ডকুমেন্ট জটিলতার কারণে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার বাইরে থেকে যান।

অবৈতনিক যত্নশ্রম ও সময়ের দারিদ্র্যের চক্কর

বোরহানউদ্দিনের নারীরা মাঠের কাজ শেষে ঘরে ফেরার পর যে কাজ শুরু করেন, তাকে আলাদা করে ‘কৃষি’ বলা হয় না। 

অথচ রান্না, পানি আনা, জ্বালানি জোগাড়, শিশুর যত্ন, বয়স্কের সেবা, হাঁস মুরগির খাবার, খাদ্যশস্য সংরক্ষণ বাদ দিলে কৃষি পরিবারের টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এলাকার কয়েকজন নারী কৃষক জানালেন, তাদের পরিবারে একবার রান্না করে সেই খাবারই ভাগ করে খাওয়া হয় তিন বেলা। তাতে জ্বালানি, সময় আর খরচ কিছুটা কমে। 

আর রান্না থেকে খাবার সংরক্ষণ, গরম করা, পরিবারের সবাইকে খাওয়ানোর পুরো ব্যবস্থাপনাটাই সামলান নারীরা।

ডিফেন্ডিং পেজেন্টস রাইটসে প্রকাশিত ২০২৬ সালের এক প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বিশ্বে প্রতিদিন ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘণ্টা অবৈতনিক যত্নশ্রম হয়। ন্যূনতম মজুরি ধরে এর আর্থিক মূল্য বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৯ শতাংশ, যা প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ডলারের সমান। এই কাজের ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ করেন নারী ও মেয়েরা।

প্রবন্ধে বলা হয়, গ্রামীণ নারীরা কৃষি উৎপাদন, ঘরের যত্নশ্রম এবং কমিউনিটি কাজ একসঙ্গে সামলান। জলবায়ু পরিবর্তন পানির সংকট, জ্বালানির অভাব, ফসলের ক্ষতি ও পরিবারের অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়িয়ে নারীর কাজ আরও বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউএন উইমেনের যৌথ উদ্যোগে প্রণীত ‘অবৈতনিক গৃহস্থালি উৎপাদন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টিং-২০২৩’ অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২১ থেকে ৩০ শতাংশের সমান মূল্য তৈরি হয় অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ থেকে। এই কাজে নারীরা পুরুষের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি সময় ব্যয় করেন।

বিবিএসের ২০২২ সালের ‘সময় ব্যবহার জরিপে’ আরও দেখায়, নারীরা পুরুষের চেয়ে ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি সময় দেন অবৈতনিক ঘরের কাজে। 

গ্রামীণ নারীদের ওপর এই সময়ের চাপ আরও বেশি। পানি সংগ্রহ, জ্বালানি সংগ্রহ, সন্তান ও অসুস্থ সদস্যের যত্ন, এসব কাজে তারা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করেন। 

এ কারণে পরিসংখ্যানের খাতায় কর্মবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ কম, প্রায় ৩৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের ওপরে (বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২)।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শারমিন্দ নীলর্মী বলেন, বাংলাদেশের নারীদের বড় অংশ অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমে যুক্ত। এই শ্রমের স্বীকৃতি মানে সরাসরি নারীর হাতে টাকা দেওয়া নয়, বরং অর্থনীতিতে তাদের অবদানের হিসাব দৃশ্যমান করা।

তিনি বলেন, “স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টিং করলে ধারণা পাওয়া যাবে, নারীর অবৈতনিক শ্রম অন্তর্ভুক্ত হলে জিডিপির আকার কত বাড়ত। এর জন্য সরকারের কোনো আর্থিক দায় তৈরি হয় না, কিন্তু নারীর কাজের মূল্য দৃশ্যমান হয়।”

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৮ সালের  হিসাব বলছে, বিশ্বব্যাপী মোট অবৈতনিক যত্নশ্রমের ৭৬ দশমিক ২ শতাংশ করেন নারী ও মেয়েরা। এই বৈষম্যই তাদের বেতনের চাকরি, নেতৃত্বের পদ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করে দেয়।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২০-এ বলা হয়েছে, ‘সময়ের দারিদ্র্য’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নাগরিক অংশগ্রহণকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে।

এটেকের ২০২৪ সালের ‘ইলেকট্রিক কুকিং অ্যান্ড উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক কেইস স্টাডিতে দেখা যায়, বাংলাদেশে নারী ও মেয়েরা দিনে গড়ে ৫ দশমিক ৯ ঘণ্টা অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নশ্রমে ব্যয় করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে তা শূন্য দশমিক ৮ ঘণ্টা।

বনশ্রী মিত্র নিয়োগী বলেন, “ঘরের শ্রমের কারণে নারী কৃষি, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কাজে যেতে সময় পান না। আমরা নারীর এই সময়ের দারিদ্র্যকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখাতে চাই।

“আমরা চেষ্টা করি ইউনিয়ন পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো, স্ট্যান্ডিং কমিটি, সালিশ প্রক্রিয়া, বাজার কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে। নারী কৃষক কার্ড বা ভর্তুকি পাচ্ছে না, এটা সমস্যা। কিন্তু আমরা বসে নেই।”

জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে বোরহানউদ্দিনের কোথাও কোথাও উঁচু মাচার ওপর ঘর তৈরি করে ছাগল পালনের ব্যবস্থা শেখানো হচ্ছে।

জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে বোরহানউদ্দিনের কোথাও কোথাও উঁচু মাচার ওপর ঘর তৈরি করে ছাগল পালনের ব্যবস্থা শেখানো হচ্ছে।

কৃষক কার্ডের কী হবে

দেশের কৃষকদের ডিজিটাল পরিচয় প্রদান, স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি প্রণোদনা বিতরণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে সমন্বিত কৃষক কার্ড চালু করেছে বাংলাদেশ সরকার। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা কৃষি ঋণ, কৃষি উপহরণ, সেচ সুবিধা, ভর্তুকি, প্রণোদনাসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। 

ভোলার বোরহানউদ্দিনে পুরুষের পাশাপাশি ফসল ফলানো নারীদের প্রশ্ন, তারা কি এই কৃষক কার্ড পাবেন?

অধ্যাপক শারমিন্দ নীলর্মী বলেন, কৃষক কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষক হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার বিষয়টি আগে আসে। সেখানে উৎপাদনের উপকরণের ওপর মালিকানা একটি বড় শর্ত।

“কৃষি শ্রমিকের সঙ্গে কৃষকের একটা পার্থক্য আছে। সে কারণে হয় আপনার জমি থাকতে হবে, নয়তো নিজ নামে লিজ দলিল থাকতে হবে।”

বাংলাদেশে বেশিরভাগ নারীর নামে জমি নেই; লিজ নিলেও তা অনেক সময় লিখিত থাকে না। এ কারণে নারী কৃষকের নামে কার্ড কম হয় বলে মনে করেন তিনি।

শারমিন্দ নীলর্মী বলেন, “তাই বলে সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নারী কৃষকের কাছে পৌঁছায় না, ব্যাপারটা এরকম না। আগে এটা কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড ছিল। অনেক নারী স্বামীর কার্ড ব্যবহার করে উপকরণ সহায়তা নিতে পেরেছেন। কিন্তু নিতে পেরেছেন বলে তার নিজের নামে কার্ড হওয়ার যৌক্তিকতা কমে যায় না।”

তার প্রস্তাব, পারিবারিক কৃষি কার্ড চালু করা যেতে পারে, যেখানে নারী ও পুরুষ দুজনের নাম থাকবে। সামাজিক সুরক্ষার পারিবারিক কার্ডের সঙ্গে কৃষি সহায়তার সুবিধা যুক্ত করলেও নারীর কাছে সেবা পৌঁছানো সহজ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেছেন, কৃষক কার্ড পেতে জমির মালিকানা একমাত্র শর্ত নয়। যিনি মাঠে কৃষিকাজ করছেন, তিনি নারী বা পুরুষ যাই হোন, কৃষক হিসেবে কার্ডের আওতায় আসতে পারেন।

“আমাদের দেশের সমাজব্যবস্থায় এখনো দেখা যাচ্ছে যে নারীরা আসলে কৃষি কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু তাদের জমির মালিকানা তাদের গার্ডিয়ান বা হাজবেন্ডের নামেই থাকে। মাঠে যিনি কাজ করছেন, তিনিই কৃষক হিসেবে সেই কার্ডটা পাবেন।”

তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের ডেটাবেজ তৈরি হলে নারী কৃষকের সংখ্যা ও শ্রেণিভিত্তিক তথ্য পাওয়া যাবে।

“কৃষক কার্ডের কাজ এখন প্রি পাইলটিং পর্যায়ে আছে। সারাদেশের ১০ জেলার ১১ উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে প্রি পাইলটিং হয়েছে। এরপর পাইলটিং পর্যায়ে উপজেলার সব ব্লকের কৃষকের তথ্য নেওয়া হবে। পরে আরও ১০০ উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে ৩৮৫ উপজেলায় এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।”

প্রি পাইলটিং উদ্বোধনের সময় ১৫ জন কৃষকের মধ্যে আটজন নারী কৃষক ছিলেন বলেও জানান তিনি।

জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে ভোলার বোরহানউদ্দিনে বস্তায় আদা চাষ করছেন নারীরা।

জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে ভোলার বোরহানউদ্দিনে বস্তায় আদা চাষ করছেন নারীরা।

কৃষি সিদ্ধান্তে নারী কোথায়

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে কৃষিতে নিয়োজিত নারীর সংখ্যা ১ কোটি ৭২ লাখ ৫০ হাজার। একই খাতে পুরুষের সংখ্যা ১ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার। 

আর বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে মাত্র ১৩ শতাংশ নারী একক বা যৌথভাবে কৃষিজমির মালিক। পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার ৭০ শতাংশ।

অর্থাৎ মাঠের কৃষিশ্রমে নারীর অংশগ্রহণ বেশি হলেও জমির মালিকানা, কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি, তালিকাভুক্তি ও সহায়তা কাঠামোয় তাদের উপস্থিতি সীমিত। 

উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি পরিকল্পনা ও সহায়তা বিতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ শূন্য।  

কৃষি প্রশিক্ষণের সুফলভোগী কীভাবে নির্বাচিত হন জানতে চাইলে বোরহানউদ্দিন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা গোবিন্দ মণ্ডল বললেন, আগে থেকেই গ্রুপ তৈরি করা থাকে।

“ধরেন, একটা প্রকল্প আছে। ওই ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের প্রত্যেকটা গ্রুপ আগে থেকেই তৈরি করা আছে। ওই গ্রুপের যারা মহিলা আছে, তাদেরকে আমরা ট্রেনিং দিচ্ছি।”

কর্মকর্তারা কীভাবে যাচাই করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দেখেন ওই এলাকায় ফসল চাষের উপযোগী জায়গা আছে কিনা, কৃষি কাজ করে কিনা। আমাদের এখানে ১৬ জন কর্মকর্তা সেকেন্ড ক্লাস অফিসার পর্যায়ে কাজ করছে।”

গ্রামের নারীরা পুরুষের চেয়ে ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি সময় দেন অবৈতনিক ঘরের কাজে।

গ্রামের নারীরা পুরুষের চেয়ে ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি সময় দেন অবৈতনিক ঘরের কাজে।

গ্রুপের বাইরের কৃষকদের বিষয়ে তিনি বলেন, “যদি আমরা খুঁজে পাই যে তাকে গ্রুপের মধ্যে আনতে পারি নাই, অন্য কোনো উপায়ে সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করি।”

এমজেএফের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সোমা দত্ত বলেন, “বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী কৃষকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে তাদের শ্রম এখনো অবমূল্যায়িত ও অদৃশ্য রয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের অঙ্গীকারের সাথে নারী কৃষকদের অধিকার প্রাপ্তির বিষয়ে বলা হয়েছে। জমির মালিকানা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে জেন্ডার সংবেদনশীল কৃষি নীতি ও বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। 

“একইসাথে, এই কাজ নারীদের উপর দ্বৈত শ্রমের চাপ ও সহিংসতা বাড়াচ্ছে কিনা সে বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে নজর দেওয়া দরকার।”