Published : 24 Oct 2025, 09:17 PM
কবি ও রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিক দুভাবে ভাষা সংগ্রামী ছিলেন বলে মনে করেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তার যুক্তি, আহমদ রফিক যেমন প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন, আবার পরবর্তী সময়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে তিনি ভাষাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। ভাষার জন্য সংগ্রাম, অন্যদিকে ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য সংগ্রামের কারণেই আহমদ রফিক 'ভাষা সংগ্রামী'।
কেবল 'ভাষা সংগ্রামী' বললেও আহমদ রফিককে সঠিক বিশ্লেষণ করা যাবে না মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "আহমদ রফিক একজন 'সমাজ বিপ্লবীও'। তিনি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন।"
গত ২ অক্টোবর রাত ১০টা ১২ মিনিটে বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৬ বছর বয়সে মারা যান আহমদ রফিক। তার মরদেহ চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দান করা হয়।
শুক্রবার বিকালে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে শোকসভার আয়োজন করে 'আহমদ রফিক শোকসভা জাতীয় কমিটি'।

কমিটির আহ্বায়ক ও এমিরেটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "আমরা তাকে ভাই বলতাম, রফিক ভাই। আমরা তাকে ভাষা সংগ্রামী বলে ডাকি। ভাষা সংগ্রামী হিসেবে পরিচয় দিতে তিনিও কুণ্ঠাবোধ করতেন না। তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। দ্বিতীয়ত তিনি সাহিত্যিক ছিলেন। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন।"
ভাষা আন্দোলন কেবল একটি রাষ্ট্রভাষা করার জন্য আন্দোলন ছিল না এবং এই আন্দোলন ছিল সমাজ বদলে দেওয়ার আহ্বান, তা আহমদ রফিক কাজের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন বলেও মন্তব্য করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, "আহমদ রফিক জানতেন গোটা সমাজ অসুস্থ, সেই সমাজকে ওষুধ দিয়ে সাড়ানো যাবে না। সমাজকে বদলাতে হবে। সমাজ বদলানোর জন্য তিনি সংগ্রাম করেছেন।
"তিনি ব্যক্তি মালিকানায় বিশ্বাস করতেন না, সামজিক মালিকানায় বিশ্বাস করতেন। এজন্য তার ব্যক্তিগত সম্পদও দান করে গেছেন। আমরা তাকে দেখব, একজন সমাজ বিপ্লবী হিসেবে। আমরা এখানে একজন সমাজ বিপ্লবীকে স্মরণ করছি।"

গোটা পৃথিবী এখন গভীর সংকটে আছে মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, "এই সংকট কেবল সভ্যতার সংকট নয়, এটা মনুষ্যত্বের সংকট। এর পেছনে আছে পুঁজিবাদ। এই পুঁজিবাদ বৈষম্য বাড়াচ্ছে। যত উন্নয়ন হচ্ছে, ততই বৈষম্য বাড়ছে। পৃথিবীব্যাপি এখন দক্ষিণপন্থীদের উত্থান ঘটছে। ধর্ম ব্যবসায়ী বাড়ছে। নারীর উপর নিপীড়ন বাড়ছে।
“ব্যক্তি মালিকানা এখন চরম জায়গায় চলে গেছে। ধনীরা ক্রমাগত ধনী হচ্ছে।"
এর বিপরীতে 'সামাজিক মালিকানা' দরকার মন্তব্য করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'সামাজিক বিপ্লব'। সামাজিক বিপ্লব হবে না, যদি সাংস্কৃতিক বিপ্লব না হয়। আহমদ রফিক সামাজিক বিপ্লবের জন্য সাংস্কৃতিক কাজকে এগিয়ে নিতে কাজ করেছেন। এজন্যই তার সাংস্কৃতিক চর্চা কখনোই উদ্দেশ্যহীন ছিল না। ফলে আমরা সাংস্কৃতিক কাজকে যত এগিয়ে নিতে পারব, তত আমরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারব।"
আহমদ রফিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মুনীর সিরাজ বলেন, "দীর্ঘ জীবনে আহমদ রফিকের অবিরাম লেখার একটি উদাহরণ হচ্ছে যে, একমাত্র রবীন্দ্রনাথের ওপরেই তিনি ২০টি গ্রন্থ বা ১০৫টি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। উভয় বাংলায় রবীন্দ্র গবেষণার উপর লেখা ও গবেষণার জন্য তিনিই সম্ভবত প্রধান পুরুষ। তিনি ২১শে পদক এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অজস্র পদক এবং সম্মাননা পেয়েছেন।
"তার সমস্ত লেখা, পদক, সম্মাননা, ক্রেস্ট, সমস্ত সংরক্ষণের জন্য 'ভাষা সংগ্রামী আহমদ রফিক' নামে ফাউনেডশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।"

আহমদ রফিকের সহকারী আবুল কালাম বলেন, "স্যারের সঙ্গে ১৯৮৯ সাল থেকে আমি ছিলাম। শেষ দিকে স্যারের চোখ খারাপ হওয়ায় লিখতে পারতেন না, এটা নিয়াই স্যারের বেশি কষ্ট ছিল।"
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, "রফিক ভাই সাম্যবাদে বিশ্বাস করতেন, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। রফিক ভাইয়ের সাথে আমার ৭১ সালের আগে খুব একটা দেখা বা পরিচয় হয়নি। ইলা মিত্রের মাধ্যমেই আমি প্রথম রফিক ভাইয়ের নামটা জানতে পারি।
"আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ইলা মিত্রের বাসায় গিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, 'রফিককে চেনো?’ এরপর ইলা মিত্রের সঙ্গে যতবার দেখা হয়েছে, রফিক ভাইয়ের কথা জিজ্ঞাসা করেছেন। পরে আমার সঙ্গে যখন তার দেখা হয়েছিল, বিপুল শ্রদ্ধা নিয়ে তার দিকে তাকিয়েছিলাম।"
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, "একজন প্রগতিশীল মানুষ আহমদ রফিক। তিনি কীভাবে মেডিকেলে পড়ার সময় রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিত।"
সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক, অধ্যাপক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, বাসদের (মার্ক্সবাদী) সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক মফিজুর রহমান লাল্টু, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি এস এম কামাল উদ্দিন, মোশরেফা মিশু ও শুভ্রাংশু চক্রবর্তী।