Published : 10 Apr 2026, 09:06 PM
জাতীয় সংসদে একের পর এক বিল পাসের মধ্যে ‘শেষ মুহূর্তে’ সেগুলোর কপি পাওয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, এসব বিলের তিনি ‘কিছুই বুঝতে পারেননি’।
জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, কিছুই বুঝতে না পেরে হ্যাঁ বা না বলা দুটোই অপরাধ হবে।
শুক্রবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে বিভিন্ন অধ্যাদেশ থেকে আনা বিল পাসের একপর্যায়ে সেগুলো নিয়ে কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিশেষ কমিটির সুপারিশ এবং সংবিধানের ৩০ দিনের বাধ্যবাধকতা মেনেই বিলগুলো আনা হয়েছে।
তবে স্পিকারও স্বীকার করেন, বিল এত ‘শেষ মুহূর্তে’ পেলে তার ওপর আলোচনা করা কঠিন।
শফিকুর রহমান বলেন, কার্য উপদেষ্টা কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে তারা দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে চেয়েছিলেন। একটি হল ১৩৩টি অধ্যাদেশের সবগুলো সংসদে আসবে। অন্যটি হল- নথি অন্তত এক দিন আগে দিতে হবে।
তিনি বলেন, “আমি তো অর্থনীতির ছাত্র না। এ জন্য এতগুলো ডকুমেন্ট এখানে টেবিলে আসার পরে আমাদের দেওয়া হয়েছে। একদিকে সংসদ চলছে, আরেকদিকে ডকুমেন্টগুলো এখানে রাখা হয়েছে।
“যেহেতু আমি দুর্বল ছাত্র, এ জন্য কিছুই বুঝতে পারিনি। এখন উপরে হাত তুলব না নিচে নামাব, এটাও বুঝতে পারিনি। যদি সংসদ সদস্য হিসেবে কিছু না বুঝে হ্যাঁ বলি, এটা হবে অপরাধ। যদি না বুঝে না বলি, এটাও হবে অপরাধ। এই জন্য আমরা চুপ থেকেছি। এটা আমাদের অক্ষমতা।”
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি ও বিশেষ কমিটি আইনগুলো পর্যালোচনা করেছে। জয়নাল আবেদীনের সভাপতিত্বে গঠিত সেই বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরাও ছিলেন এবং আইনমন্ত্রীসহ সবাই আলোচনা করে কোন কোন অধ্যাদেশ ‘যেমন আছে’ তেমনভাবে পাস হবে, সেটি ঠিক করেছেন।
“কিছু বিলের ক্ষেত্রে বিরোধী সদস্যরা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন, কোথাও আলোচনা চেয়েছেন, আর স্পিকারও প্রয়োজনমতো দুই মিনিটের জায়গায় ১০ বা ১৫ মিনিট পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। এখন যদি এই পর্যায়ে বিল পাস হয়ে যাওয়ার পরে বলা হয় ‘আমি কিছু বুঝলাম না’, তাহলে আমার মনে হয়, আপত্তি যদি থাকত, উত্থাপনের পর বা বিবেচনার সময় বলা যেত।”
একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতা ও এমপিদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। হ্যাঁ বুঝে দিয়েছেন, না বুঝে দিয়েছেন- এই অপরিসীম সহযোগিতার জন্য সরকারি দলের পক্ষ থেকে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।”
এরপর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বিশেষ কমিটিতে এমন কোনো আলোচনা হয়নি যে সংসদ চলার মধ্যে টেবিলে বিল এসে হাজির হবে। ‘তিন দিন আগেই কপি দেওয়ার কথা ছিল’ বলে দাবি করেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উঠবে- এমন আলোচনা বিশেষ কমিটিতে হয়েছিল। সেইসঙ্গে যেগুলো নিয়ে তাদের আপত্তি আছে, সেগুলো ছাড়াও সংসদে কথা বলার সুযোগ থাকবে বলেও তারা বুঝেছিলেন।
তিনি বলেন, “কথা বলা আমাদের অধিকার; এ সুযোগ থাকা উচিত ছিল।”
এরপর আইনমন্ত্রী সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ তুলে ধরে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ সংসদে আনতে হয়। কোনোটি উত্থাপন না করা হলে তা ‘ল্যাপ্স’ করে, আর উত্থাপন করা হলে তা হয় বিল আকারে অনুমোদন পায়, নয়তো অনুমোদন পায় না।
“যেগুলো উপস্থাপন করা হবে না, সেগুলো আমরা উপস্থাপন করিনি। ফলে ওগুলোর ওপর আলোচনার সুযোগ রুলস অব বিজনেস ও সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৯৩ এ নেই।”
আইনমন্ত্রী বলেন, যেগুলো উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো বিল আকারে পাস হয়েছে। কোনোটি পাস না হলে তা অনুমোদন না পেয়ে বাদ পড়ত। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর আইনমন্ত্রী বলেন, “সরকারকে ধন্যবাদ না দিলেও ১৩৩টি আইন-অধ্যাদেশ পড়ে, শুনে, বুঝে, দাড়ি-কমা-সেমিকোলন ঠিক করে আইন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং বিশেষ করে বিজি প্রেস যেভাবে ‘নির্ঘুম রাত’ কাটিয়েছে, অন্তত তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য ছিল।”
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তিনি বিশেষ কমিটিতে ছিলেন না, তাই সে বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করবেন না। কিন্তু কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে তার সভাপতিত্বে যে আলোচনা হয়েছে, সেখানে অন্তত দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছিল যে, সবগুলো বিল আসবে এবং ডকুমেন্ট অন্তত একদিন আগে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বিশেষ কমিটির সদস্যরা বিজ্ঞ হতে পারেন, কিন্তু তাদের রায়ই যদি চূড়ান্ত হয়ে যায়, তাহলে সংসদ সদস্যদের কাছে কাগজপত্র দেওয়ার প্রয়োজন কী থাকে?
“তাহলে আমাদের যে অধিকার, শুধু অধিকার নয়, দায়িত্ব, সেটা পালন হবে কীভাবে?”
এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এসব কথা প্রত্যেকটি বিল উত্থাপনের সময় বলা যেত। সব বিল পাস হয়ে যাওয়ার পর আপত্তি তোলার অর্থ আগের সিদ্ধান্ত উল্টে দিতে চাওয়া।”
পরে স্পিকার নিজেই বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সঙ্গে খানিকটা একমত হয়ে বলেন, “বিল এত শেষ মুহূর্তে পেলে এর ওপর আলোচনা করা কঠিন।”
তবে স্পিকার ব্যাখ্যা করেন, ৩০ দিনের সাংবিধানিক সময়সীমার কারণেই সব বিল ওই দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করতে হয়েছে। নাহলে আরও ১৫ দিন বা এক মাস সময় নেওয়া যেত।
স্পিকার বলেন, এই সময় সীমাবদ্ধতার কারণেই দ্রুত বিলগুলো পাস করতে হয়েছে। বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্তগুলো মানা হয়েছে, কেবল সময়ের জায়গায় তিনি স্পিকার হিসেবে ছাড় দিয়েছেন।
ভবিষ্যতে বিল এমপিদের হাতে যথাসময়ে পৌঁছানোর বিষয়ে আরও যত্নবান হওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
“অন্তত এক দিন আগে হলেও যাতে সদস্যরা কপি পান, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা হবে,” বলেন স্পিকার।