Published : 23 Jun 2025, 06:30 PM
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাকে কথিত ছাত্র-জনতার হেনস্তার ঘটনায় ‘সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই’ বলে মনে করছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র–আসক।
সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসক বলেছে, “শুধুমাত্র ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে জুন পর্যন্ত এ ধরনের অরাজকতায় উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে কমপক্ষে ৮৩ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, যা একটি সভ্য রাষ্ট্রে ঘোরতর নৈরাজ্যের ইঙ্গিত বহন করে।”
‘জনগণের ভোট ছাড়া’ নির্বাচন সম্পন্ন করার অভিযোগে বিএনপি রোববার ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করে, যেখানে আওয়ামী লীগের সময়ে দায়িত্ব পালন করা তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনারদের আসামি করা হয়।
ওই মামলা হওয়ার ছয় ঘণ্টার মাথায় রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে কথিত ছাত্র-জনতা ঢাকার উত্তরায় নূরুল হুদার বাসায় চড়াও হয়। তারা সাবেক সিইসির শরীরে ডিম ছুড়ে মারে। তাকে ফ্ল্যাট থেকে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা অবস্থায় নিচে নামিয়ে গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়। পরে সেই জুতা দিয়ে তাকে মারধরও করেন একজন।

এ সময় পাশে পুলিশ সদস্যদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এসময় হামলাকারীদের অনেকেই ফেইসবুকে লাইভ করেন, সেসব লাইভে তাকে হেনস্তার পুরো চিত্রই দেখা গেছে।
লাইভ চলাকালে কথিত ছাত্র-জনতাকে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর উত্তর এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দিতেও শোনা যায়।
এ ঘটনায় সমালোচনা শুরু হলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে বিবৃতি দেওয়া হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে।
ওই ঘটনায় দলের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
তবে আইন ও সালশি কেন্দ্র বলছে, “এ জাতীয় পরিস্থিতিতে ইতিপূর্বেও (সরকারের তরফ থেকে) এ ধরনের বিবৃতি লক্ষ করা গেলেও কার্যত দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার কোনো নজির দেশের জনগণ দেখতে পারেনি। কাজেই এ ধরনের ঘটনাগুলোতে সরকারের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দুয়েকবার সতর্কতা উচ্চারণ করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সংঘবদ্ধ সহিংসতার বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বরং আপাতদৃষ্টিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা এসব সহিংস গোষ্ঠীগুলোর অপকর্মে পরোক্ষভাবে প্রভাব জোগাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”
আসক বলছে, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা রাষ্ট্রের একজন নাগরিক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা।
“তাকে এভাবে সংঘবদ্ধ সহিংস গোষ্ঠীর দ্বারা হামলার শিকার করে লাঞ্ছিত করা শুধুমাত্র ব্যক্তির অপমান নয়, এটি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আইনের শাসনের প্রতি অবমাননার সামিল।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “কেএম নুরুল হুদাকে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বেআইনি সমবেত হয়ে গলায় জুতার মালা পড়িয়ে মারধর করে এবং পরে তাকে পুলিশের কাছে সোর্পদ করা হয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে প্রকাশিত এই দৃশ্য শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং দেশের সংবিধান, মানবাধিকারের ন্যূনতম মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের প্রতি সরাসরি আঘাতের নামান্তর।
“আসক মনে করে, নাগরিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বাংলাদেশ সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত। অতীত দায়িত্ব বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ আইন অমান্য করেছেন কি না, তা নির্ধারণের এখতিয়ার কেবলমাত্র আদালতের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়।”
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি কোনো গুরুতর অভিযোগ থেকেও থাকে, তা নিষ্পত্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সংবিধান ও প্রচলিত আইনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া।
“উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুষ্কৃতকারী ব্যক্তিরা যদি এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটিয়ে থাকে, তা বিচারহীনতার একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। যা ভবিষ্যতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথকে আরও জটিল করে তুলতে পারে এবং আইনের শাসনের পরিবর্তে ‘মব সংস্কৃতি’কে যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার প্রচ্ছন্ন সংকেত দেয়।”
‘সরকার দায় এড়াতে পারে না’
নূরুল হুদার ওপর হামলার ঘটনায় সরকার দায় এড়াতে পারে না বলে মনে করছে আরেকটি বেসরকারি সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সোমবার বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, “একজন সাবেক রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তির সঙ্গে এ ধরনের অসম্মানজনক আচরণ গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার ও আইনের শাসনের পরিপন্থি।
”এই ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না। যদিও তার বিরুদ্ধে নির্বাচন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্থ করা এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন দিনের ভোট রাতে করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। প্রহসনের নির্বাচনের অভিযোগ করে বিএনপির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে গতকাল (রোববার) মামলা করা হয়েছে।”
অন্তর্বর্তী সরকার, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান বিবৃতিতে বলা হয়, “এই ঘটনার যেন যথাযথ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হয় এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।”