Published : 30 Apr 2025, 12:35 AM
আসন্ন ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজাটে শিক্ষাখাতে জিডিপির অন্তত ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশে এখনও এই বরাদ্দ যে ২ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, সেই তথ্য তুলে ধরে তারা বলছেন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্যই শিক্ষাখাতে বরাদ্দ আন্তর্জাতিক মানে নেওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘জনবান্ধব বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ সুপারিশ উঠে এসেছে।
সমাজিক সংগঠন নাগরিক বিকাশ ও কল্যাণ-নাবিকের উদ্যোগে চার সেশনের এই গোলটেবিল বৈঠকে ‘বাজেটে শিক্ষাখাত’ সেশনের ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও শিক্ষা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মো. সাব্বির হোসেন।
তিনি বলেন, ইউনেস্কো ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হওয়া উচিত মোট জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও তা অনেক পিছিয়ে আছে।
“২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে আমরা আশা করব, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অন্তত জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করা হোক। কেননা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।”
তার ভাষ্য, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে পাসের হার বেড়েছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি রয়েছে। কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল শিক্ষার গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এখনও এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
“বাজেটে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ভার্চুয়াল সিমুলেশন ল্যাব, অনলাইন প্রশিক্ষণ এবং ক্লাস্টার ভিত্তিক মাস্টার টিচার নিয়োগে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা আবশ্যক। শিক্ষকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বেতন কাঠামো পাইলটিং করার জন্যও বাজেটে বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।
“অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিবন্ধী, পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপ, স্কুল ফিডিং প্রোগ্রাম ও আর্থিক প্রণোদনা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি, নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি উচ্চবিত্তদেরও আর্থিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।”
মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র প্রকাশ ও উচ্চতর গবেষণার জন্য ‘বিশেষ বাজেট হেড’ চালু করার প্রস্তাব রেখে সাব্বির বলেন, “বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ও বিশ্বের সেরা শিক্ষকদের গেস্ট শিক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন।
“মাদ্রাসার শিক্ষার আধুনিকায়নে দৃশ্যমান ও আলাদা বাজেট বরাদ্দ রাখা যেতে পারে। কারিগরি খাতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়নে ভার্চুয়াল সিমুলেশন ল্যাব ও স্কিল রিসোর্স নেটওয়ার্কিং পোর্টাল তৈরির জন্য বাজেট বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। সুস্থ শিক্ষাবিনোদনের জন্য বিশেষ বাজেট খাত তৈরি করা যেতে পারে।”
বাংলাদেশি শিক্ষক প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল অনলাইন ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখারও সুপারিশ করেন এই বিশেষজ্ঞ।
শিক্ষায় দুর্নীতি ও অপচয় রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, “আফগানিস্তান যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটা জায়গা, সেখানে জিডিপির ৪ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। যেখানে ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে ৪ থেকে ৬ শতাংশ জিডিপির বরাদ্দ দিতে হবে, দ্যাট ইজ দ্যা মিনিমাম। কিন্তু আমাদের প্রতিযোগিতা দিয়ে কমছে, দুইয়ের নিচে বারবার যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, বাজেটে প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে এনে মানবসম্পদ উন্নয়ন আর যন্ত্রপাতি কেনাকে এক জায়গায় করে বরাদ্দের বড় একটা অংক দেখানো হচ্ছে।
“এটা আসলে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বরাদ্দ দিতে হবে, বাচ্চাদের পড়ালেখার জায়গা দিতে হবে, বই বিনাপয়সায় এক্সস দিতে হবে, অটোমেশনের সুযোগ দিতে হবে, ওখানে ওয়েস্টেজ ম্যানজমেন্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে, তাদের স্বাস্থ্য ও মেজাজ ঠিক রাখতে হবে।”
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ ১৯ কোটি টাকা কমছে বলে আলোচনায় তথ্য দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মো. মুনিনুর রশিদ বলেন, “অনেকে মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাষক এক লাখ টাকা বেতন পান। কিন্তু একজন লেকচারার ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা বেতন পান। তিনি ঢাকা শহরে বসবাস করে বাসাভাড়া কী দেবেন? খাবেন কী? রিসার্চ করবেন কী? কী কাজটা করবেন?
“আমরা যদি বিপরীত দেখি, অ্যাডমিন ক্যাডারের দিকে তাকাই, তারা খিচুড়ি রান্না শিখতে কোথায় যান? দেশের বাইরে। তারা হাত ধোয়া শিখতে কোথায় যান? দেশের বাইরে। কোথায় খরচ করতে হবে, কোথায় খরচ করতে হবে না–এ ব্যাপারে তাদের আইডিয়া নেই? না আইডিয়া আছে, কিন্তু তারা ভাবে না।”
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের বেতন ৮০ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়– এমন তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে ৮০ হাজার, নর্থসাউথে এক লাখ টাকা। একজন প্রফেসর নর্থসাউথে বেতন পান ৮ লাখ টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রফেসর বেতন পান ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর ইমপ্যাক্ট কিন্তু রয়েছে। নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি তারা র্যাংকিংয়ে ধু ধু করে এগিয়ে যাচ্ছে, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়।
“আমরা নেতিয়ে পড়ছি, আর এই নেতিয়ে পড়ে থাকলেই সরকারের লাভ। সরকার তত বেশি লাভবান হবে যত বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।”
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলে মাহাথির মোহাম্মদ ১০ বছরে মালয়েশিয়ার চেহারাই বদলে দিয়েছিলেন।
“দক্ষিণ কোরিয়াও আমাদের দেশ থেকে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু শিক্ষা উন্নতি করে দেশটি এখন বিশ্বের উন্নত দেশের তালিকায় ওঠে এসেছে।”
এশিয়ার কয়েকটি দেশের শিক্ষায় জিডিপির বরাদ্দের তালিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ কমে এসেছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দ তলানির দিকে। বিগত বছরগুলোতে যেই পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, সেই টাকা শিক্ষায় বিনিয়োগ করা হলে দেশের চেহারা বদলে যেত।”
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন ভাতা যে আকর্ষণীয়, সে কথা তুলে ধরে অধ্যাপক রব বলেন, “শিক্ষায় উন্নতি করতে হলে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে। নইলে মেধা পাচার হয়ে যাবে। শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি বাজেট দিতে হবে। গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষাকে বিস্তার করতে হবে।”
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ ও প্রশাসন শাখার পরিচালক বি এম আব্দুল হান্নান বলেন, “আমরা মুখে বলি গুণগত মানোন্নয়ন হোক, কিন্তু বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দেখা যায় আমাদের মত দেশে জিডিপির দুই থেকে আড়াই পারসেন্টের মত ওঠানামা করে। আমাদের যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে, সেগুলো মোকাবিলার জন্য শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির ৪ পারসেন্ট হওয়া উচিত।”
গ্লোবাল নলেজ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “আমরা যতই শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, সেই শিক্ষিত মানুষগুলোই একটা ছাগল ক্রয়ের জন্য কোরবানির দুই কোটি টাকা ব্যয় করতেও দ্বিধান্বিত হচ্ছে না।
“অথচ তার বাসার যে কাজের মেয়ে আছে, লোহার খুন্তি দিয়ে গরম করা হচ্ছে তার শরীর। তার কারণ এডুকেশন ইকোসিস্টেম বা নলেজ ইকোসিস্টেমের কথা আমার জাতি ভাবতে পারে নাই। আমি ভাবছি এক দেড় কোটি মানুষের কথা যারা প্রাইমারি, সেকেন্ডারি বা ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে।”