Published : 25 May 2026, 12:48 AM
কোরবানির জন্য ছোট ও মাঝারি গরু এবং বড় ছাগলের চাহিদা বেশি; ভেড়ার কিনছেন কেউ কেউ।
ছোট-বড় গরুতে হাট ভরে গেলেও এখনো বাজার পুরোদমে জমেনি।
রোববার বিকালে ঢাকার কেরাণীগঞ্জের ঘাটারচরে শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুর পাশেই ‘মিলেনিয়াম সিটি’ আবাসিক এলাকায় সুলতানী হাট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
প্রায় ১০ একর জায়গার ওপর বুধবার থেকে বসা এই হাটে গরু, ছাগল ও ভেড়া নিয়ে এসেছেন পাবনা, কুষ্টিয়া ও সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারী ও ব্যাপারীরা। হাটে ভিড় থাকলেও বেচাকেনা এখনো জমেনি। সোমবার থেকে বেচাকেনায় গতি আসবে, আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

‘ঋণ করে কেনা গরু মারা গেল গরমে’
সুলতানী হাটে আনা পশু প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। রোববার বিকাল ৪টার দিকে একটি গরু ‘হিট স্ট্রোকে’ মারা গেছে।
ঋণ করে গরুটি কেনার কথা বলেছেন সিরাজগঞ্জের মোহনপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ মানিক হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “বড় গরু ঋণ করে কিনে এনেছি। এটা হঠাৎ সুলতানী হাটে আইস্যা স্ট্রোক করে মারা গেল।”
গরুটি ৪ লাখ টাকায় বিক্রি আশা করছিলেন এই ব্যাপারী।
৩ লাখ ৩৭ হাজার হাজার টাকায় সেই গরুটি কেনার কথা তুলে ধরে মানিক বলেন, “বেচাই শুরু করতে পারিনি, তার আগে সাড়ে ৩ লাখ টাকা লোকসান। আমার এখন বাড়িতে যাওয়ার উপায় নেই। পাওনাদার টাকা চাইবে। সরকার থেকে যদি কিছু সাহায্য ...!”
তার আরো দুটি গরু মুমূর্ষু ছিল, দ্রুত পশু চিকিৎসক ডেকে গরুগুলোর চিকিৎসা করানো হয়।
ওই গরুটি মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে চিকিৎসক আবদুল জলিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “(শরীরের) তাপমাত্রা বেশি। প্রায় ৬/৭ ঘন্টা ‘জার্নি’ করে আসছে। পানির প্রয়োজন ছিল। পানি না পাওয়ার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। অর্থাৎ পানির অভাবে মারা গেছে।”
“ওই লোকের আরো দুই গরুর অবস্থা খারাপ। তাপমাত্রা ১০৮ ডিগ্রি (ফারেনহাইট)। ১০২ ডিগ্রি স্বাভাবিক থাকে। প্রচুর পরিমাণে পানি দিলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।”
গরমে এ হাটে আরো অনেক গরু অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রচণ্ড গরমে অনেক গরুর বেহাল দশা। লম্বা জার্নি করার পর তাদের তাপমাত্রা বাড়ছে। পানিশূন্যতা দেখা দিচ্ছে। আজকে এই হাটে ১৪/১৫টা গরুকে চিকিৎসা দিলাম।”

ছোট ও মাঝারিতেই গরুতেই নজর
ভারতীয় গরু বাজারে না আসায় দেশি গরুর চাহিদা বেড়েছে। তবে ছোট ও মাঝারি গরুরই চাহিদাই বেশি।
শুক্রবার ১৮টি গরু নিয়ে এসেছেন কুষ্টিয়ার মনসুর আলী খাঁ। সবগুলোই মাঝারি আকারের।
তিনি বলেন, “সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে গৃহস্থের গরু নিয়ে এসেছি। বড় গরু মানুষে কম নেয়। তাই ছোট ও মাঝারি গরু এনেছি। বিক্রি হলে টাকা দেব। সব গরুর দাম দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ।”
তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন লালন খাঁ। তিনি কুষ্টিয়া থেকে নিজের পালন করা গরু নিয়ে এসেছেন।
লালন বলেন, “আমার গরু। চারটা ছোট ছোট এনেছি। একটি বিক্রি করেছি। দাম ভালই। মণ ৩৫ (হাজার) চলে।”
ভারতের গরু যেন না আসে, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে লালন বলেন, “ছোলা কেজি ৬০ টাকা, খেসারী ৫০ টাকা চলে। ভুষি, বিচুলি... খাবারের দাম অনেক বেশি। খরচা বেশি গ্যাছে। ভালো যদি বাজারটা হয়...।
“বাইরের গরু... ভারত থ্যাইকা না ডুকলি পরে দাম একটু পাবো নি। বাইরের গরু ডুকলি দাম পড়ে যাবেনি।”
একটি বড় গরু নিয়ে হাটে এসেছেন কুষ্টিয়ার মতিয়ূর রহমান, দাম হাকাচ্ছেন ৭ লাখ টাকা।
তিনি বলেন, “মাঝারি একটি গরু ছিল। ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু এই আতাউল্লাহ (গরুর নাম) বিক্রি হয় না।
“এটার দাম ৭ লাখ বলছি। চার বছর পালছি। খরচ গ্যাছে ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ। গতবছর জিঞ্জিরার বাজারেও তুলেছি। বড় গরু ‘লস প্রজেক্ট’। এইবার ‘লস’ হলেও বিক্রি করে দিব।”
পাবনার আতাইকুল থেকে আসা আবদুল গফফার বলছিলেন, “২১টি গরুর এনেছি। তিন দিনে মাত্র দুইটি বিক্রি হয়েছে।
“ক্রেতা আসে, গরুর দ্যাখে। দাম জিগায়, ছবি তুইল্যা চলি যায়। দুই-একদিন গেলেই বেচা বাড়বে। অফিস-আদালত বন্ধ হলে বিক্রি শুরু হবে।”
দীর্ঘ ১৬ বছরের গরুর ব্যবসার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রাজবাড়ীর সোনা মিয়া বলেন, “বেচাকেনা হয় শেষ দুই দিন। ঈদের আগের দিন বেশি।”
এদিকে, গরুর দাম নিয়ে সন্তুষ্ট কেরাণীগঞ্জের কলমাচর থেকে কিনতে আসা মোজাম্মেল হক। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনেছেন তিনি।

মোজাম্মেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দাম মোটামুটি ঠিক আছে। বাজেট ও পছন্দের মধ্যে কিনতে পারলাম।
“প্রচুর গরু আছে, বাজারে তেমন ভিড় নেই। দেখেশুনে কিনতে পারলাম। ছুটি শুরু হলে কাল থেকে ভিড় বেড়ে যেতে পারে। তাই আগেই কিনে রাখলাম।”
মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি হলেও বড় ছাগলের প্রতিও আগ্রহ বেশি ক্রেতাদের।
পাবনা থেকে ৩৫টি ছাগল নিয়ে আসা তানভীর বলেন, “বড় বড় ছাগলই বেশি নিচ্ছে। ৮টা বিক্রি হয়েছে। বড় ছাগলগুলো ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।
“শুধু ছাগল নয়, ভেড়া কিনছেন অনেকেই। নয়টি এনেছি। এখন আছে ৫টা। কালকেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে।”