Published : 13 Jan 2026, 01:59 AM
আশুলিয়ার একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় আগে যেখানে ঘণ্টায় ১০০ ইউনিট উৎপাদন হত, এখন তা চার গুণ বেড়ে গেছে। এই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা।
এ কারখানার ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল কুদ্দুছ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা যখন প্রথম কাজ শুরু করি, তখন নিজেরাই শিখতাম। শুরুতে সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেছি, পরে নিট ফ্যাক্টরিতে আসি। বড় কোনো যন্ত্র এলে যে একটু পড়াশোনা জানে বা যন্ত্র বোঝে, মালিকরা তাকে শিখে নিতে বলত। মালিকরাই কমবেশি শেখাত।”
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম্পিউটার বা মেশিনকে মানুষের মত চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে কাজ করানো হয়। টেক্সটাইল উৎপাদনে এআই প্রযুক্তি বিভিন্ন ধাপের অটোমেশন এবং অপটিমাইজেশন করতে সাহায্য করে।
যেমন ডিজাইন ট্রেন্ড, রঙ, ও ক্রেতার পছন্দ বিশ্লেষণ করে নতুন পোশাকের নকশ করতে সাহায্য করতে পারে এআই। এআই-চালিত মেশিনগুলো কাটিং, সেলাই, কোয়ালিটি চেক ইত্যাদি কাজ দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করতে পারে। তাতে সময় ও খরচ দুটোই কমে।
এআই ডেটা বিশ্লেষণ করে বলে দিতে পারে কোন ডিজাইনের চাহিদা বেশি, কোন বাজারে কোন প্রোডাক্ট ভালো বিক্রি হবে, কখন নতুন স্টক আনা উচিত। তাতে মার্চেন্ডাইজিং ও সাপ্লাই চেইন সাজানো সহজ হয়।

এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা আসার পর কাজের ধরন পুরোপুরি বদলে গেছে মন্তব্য করে আব্দুল কুদ্দুছ বলেন, ''আমাদের কারখানায় এখন ক্যামেরা আর এআই দিয়ে কাপড় ও সেলাই ঠিক আছে কি না দেখা হচ্ছে। সেলাইয়ের ভুল, কাপড়ে দাগ, রঙ বা ডিজাইন ঠিকমত মিলছে কি না এসব এখন খুব দ্রুত ধরা পড়ে। তাতে কাজ করতে হয় কম, আর মাল ফেরত যাওয়ার ঝুঁকিও কমে।
''কাটিং সেকশনে অটোমেটিক কাটিং মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কাটিংয়ের কাজ দ্রুত হয় এবং কাপড়ের অপচয়ও কম হয়। এছাড়া ফ্যাব্রিক পাস করা, স্যাম্পল প্রস্তুত করা এখন এআই সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়। অটোমেটেড মেশিন থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শুধু সুইচ দিলেই কাজ শুরু হয়ে যায়, ফলে সময় ও শ্রম দুটোই বাঁচে।''
কুদ্দুছ বলেন, এর ফলে মালিক যেমন লাভবান হচ্ছেন, শ্রমিকরাও কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারায় মানসিকভাবে কিছুটা ‘স্বস্তি’ পাচ্ছেন। তবে এর অন্য একটি দিকও আছে।
“এআই আর অটোমেশনের কারণে এখন আগের মত এত মানুষ লাগে না। অনেক সময় দশজনের কাজ একজন দিয়েই করা যায়। এতে কাজ দ্রুত হয়, ভুলও কম হয়। তবে একটা সমস্যা আছে, মেশিন বেশি হলে শ্রমিকের চাহিদা কমে যায়, আর কিছু মানুষের চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকে।
“তারপরও সত্যি কথা হল, বিশ্বের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে এআই আর অটোমেশন এখন প্রয়োজন।”

বিশ্বের ৬৫% কোম্পানি ব্যবহার করছে এআই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এখন আর শুধু একটি প্রযুক্তিগত ‘টুল’ হিসেবে দেখা হয় না। এটি এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির কাঠামো বদলে দেওয়া শক্তিশালী এক চালিকাশক্তি।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রে থাকা এই প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, রপ্তানি, শ্রমবাজার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনজি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (এমজিআই) ২০২৪ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, বিশ্বের ৬৫ শতাংশ কোম্পানি নিয়মিতভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে স্ট্যানফোর্ড এআই ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৭৮ শতাংশ কোম্পানি তাদের অন্তত একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআই ব্যবহার করেছে। আগের বছরে এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ।
এআই ব্যবহারে এগিয়ে থাকা দেশগুলো প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত কাঠামোতে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
ফ্রান্সভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) বলছে, এআই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য চারটি বিষয় ‘অপরিহার্য’। সেগুলো হল তথ্য-উপাত্ত, দক্ষতা, গভর্ন্যান্স ও বিনিয়োগ।
বিশ্বের অনেক দেশ এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো নিয়ে কাজ শুরু করেছে। পাশের দেশ ভারতে প্রতিবছর লাখের বেশি প্রকৌশলী তৈরি হচ্ছে এআই বিষয়ে।
ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে জাতীয় এআই নীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বিপরীতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশ হলেও এআই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে আছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সংকটের মূলে ‘দক্ষ মানবসম্পদের অভাব’
বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম সায়েন্সডিরেক্টে সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর শিরোনাম ছিল ‘প্র্যাকটিসেস অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টু ইমপ্রুভ দ্য বিজনেস ইন বাংলাদেশ’।
এই গবেষণার জন্য ২০২৪ সালে দেশের ১০টি খাতের ১২০টি কোম্পানির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশের ৯৭ শতাংশ কোম্পানি জানিয়েছে যে, তারা দক্ষ এআই কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না।
অন্যদিকে ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের ‘এআই ব্যবহারে দেশের প্রস্তুতির সূচক’ বলছে, বাংলাদেশে এআই দক্ষতা, গবেষণা সক্ষমতা, তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং নীতি-গভর্ন্যান্সে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
দুটি মূল্যায়নই বলছে, বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তি গ্রহণের পথে প্রধান বাধা প্রযুক্তির অভাব নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ ও কাঠামোগত প্রস্তুতির ঘাটতিই এখানে মূল অন্তরায়।
আর দক্ষ মানবসম্পদ ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলছেন, সরকার জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলের আওতায় এআই গভর্ন্যান্স, ডেটা ব্যবস্থাপনা মানবসম্পদ উন্নয়ন— এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “একটি সমন্বিত জাতীয় এআই দক্ষতা কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাংকিং, তৈরি পোশাক, টেলিকম ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক এআই দক্ষতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“পাশাপাশি ডেটা সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যেন এআই প্রযুক্তি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও আস্থা রক্ষা করতে পারে।”

‘এআই না জানলে বাজার হারাবে বাংলাদেশ’
কানাডার ডালহৌসি ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন শুভ্র পাল। তার গবেষণার বিষয় ‘অটোনোমাস সিস্টেম’ ও ‘এজ ইন্টেলিজেন্স’। এর আগে তিনি বাংলাদেশে দুটি স্টার্টআপে কাজ করেছেন। একটি ‘মার্কোপলো এআই’; অন্যটি ‘যান্ত্রিক লিমিটেড’। দুটি প্রতিষ্ঠানেই তিনি শীর্ষ এআই ডেভেলপার ছিলেন।
তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় পিছিয়ে থাকায় বাংলাদেশ এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এআইয়ে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি পূরণ না হলে অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা আসতে পারে।
শুভ্র পাল বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মডেলটি হলো— সস্তা শ্রম ও সাধারণ মানের কোডিং কাজনির্ভর ফ্রিল্যান্সিং।
তিনি বলেন, বাজারে এ ধরনের কাজের একসময় বেশ চাহিদা ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এআই এখন এসব কাজ দ্রুত করতে পারছে। একই সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গেও কাজ সম্পন্ন করতে পারছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ফ্রিল্যান্সারদের উচ্চমূল্যের এআই–দক্ষতা বাড়ানো না যায়, তাহলে বাংলাদেশ এই বাজার হারাতে পারে। ভিয়েতনাম বা অন্য দেশগুলো এই সুযোগ কাজে লাগাবে।
ঝুঁকি শুধু ডিজিটাল খাতে নয়; শিল্প উৎপাদনেও একই সমস্যা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শুভ্র পাল বলেন, “চীন ও ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ফলে তাদের উৎপাদন খরচ কমছে; উৎপাদনে গতি বাড়ছে; আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ যদি এখনো ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় পড়ে থাকে, তাহলে গ্লোবাল মার্কেটে দামে টিকে থাকা কঠিন হবে। এই সক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।”
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে মন্তব্য করে শুভ্র পাল বলেন, “গুগল, মাইক্রোসফট বা অ্যামাজনের মত বড় কোম্পানি আগে দক্ষতা যাচাই করে। তারা দেখে, সেই দেশে দক্ষ প্রকৌশলী আছে কি না। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংক্রান্ত দক্ষতা আছে কিনা। বাংলাদেশে যদি এআই ট্যালেন্ট না থাকে, তাহলে এসব কোম্পানি বিনিয়োগ অন্য দেশে নিয়ে যাবে।”
তার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন ‘মানুষ বনাম এআই নয়, বরং এআই-জানা দেশ বনাম এআই না জানা দেশের মধ্যে।”

কৃষিখাতে এআই সাফল্যের নজির
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতির প্রভাব এখন ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে। কৃষি, ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার মত গুরুত্বপূর্ণ খাতে এআই ব্যবহার বাড়লেও বাংলাদেশে তার পুরো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ দক্ষতার অভাব রয়েছে, কাঠামোগত প্রস্তুতিও দুর্বল।
বাংলাদেশে কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হয় ২০২১ সালের দিকে। এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ও সফল উদ্যোগ হল জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের ‘ডা. চাষী’ অ্যাপ।
এই অ্যাপে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কৃষকের দরকার হবে ইন্টারনেট সংযোগসহ একটি স্মার্টফোন, যেখানে ‘ডা. চাষী’ অ্যাপ ডাউনলোড করে নিতে হবে। কৃষক এই অ্যাপি থেকে ফসলের আক্রান্ত স্থান বা পোকামাকড়ের ছবি তুললে অ্যাপ বলে দেয় কোন পোকা বা রোগ আক্রমণ করেছে। সেই সঙ্গে সমাধানও বলে দেয়। কোন ধরনের ওষুধ বা কীটনাশক দিতে হবে, সেই পরামর্শ দেয়।
কৃষক অনেক সময় কৃষিবিদের পরামর্শ না নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা মাটিও পরিবেশের ক্ষতি করে। ‘ডা. চাষী’ অ্যাপ সার ও কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়েও কৃষককে পরামর্শ দিতে পরে। তাতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের জন্য অর্থের অপচয় এবং রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে ফসল বাঁচানো যায়।
ডা. চাষী অ্যাপ আগাম সাত দিনের কৃষি আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়। তাতে কৃষকের বীজ বোনা, ফসল কাটাসহ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
এ ছাড়া এই অ্যাপে আইওটি–ভিত্তিক মাটির সেন্সর রয়েছে। ‘স্প্রে ড্রোন’ ব্যবহার করা হচ্ছে। আরও নানা স্মার্ট কৃষি সমাধানও যুক্ত আছে এতে।
জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী মেদিনা আলী বলেন, চ্যাটজিপিটির মত এআই টুল সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয় ২০২২–২৩ সালে। কিন্তু দেশের কৃষকরা এর আগেই এআই প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হন।
বর্তমানে ‘ডা. চাষী’ অ্যাপের নিবন্ধিত ব্যবহারকারী ৮৭ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষক। বাকিরা শিক্ষার্থী, বিজ্ঞানী, কৃষি পেশাজীবী ও অন্যান্য শ্রেণিপেশার।
জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের ভাষ্য, এই অ্যাপের ব্যবহার মাঠপর্যায়ে ফল দিচ্ছে। ফসলের ফলন বেড়েছে ১২–১৬ শতাংশ। কীটনাশকের ব্যবহার কমেছে ২৫–৩০ শতাংশ। সারের ব্যবহার কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। সময় ও খরচ সাশ্রয় হয়েছে গড়ে ৩৩ শতাংশ।
মেদিনা আলী বলেন, “এই ফল প্রমাণ করে, এআই কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমছে; ঝুঁকি কমছে। অনেকে কৃষিকে এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক পেশা হিসেবে দেখছেন।”
কৃষিতে এ ধরনের ইতিবাচক চিত্র থাকলেও অন্যান্য খাতে তা দৃশ্যমান নয়।

ব্যাংকিং: প্রযুক্তিনির্ভর, কিন্তু লোকবল সংকট
দেশের ব্যাংকিং খাতে এআই ব্যবহার বাড়ছে। প্রতারণা শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। ঋণ ঝুঁকি নির্ধারণেও এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। গ্রাহকের আচরণ বিশ্লেষণ ও স্বয়ংক্রিয় গ্রাহক সেবায়ও এআই যুক্ত হচ্ছে। তবে এ খাতেও বড় সমস্যা হলো দক্ষ জনবল।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যম স্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের কাছে ডেটা আছে, কিন্তু সেই ডেটা দিয়ে কাজ করার লোক নেই।”
অনেক ব্যাংক পরীক্ষামূলকভাবে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ না থাকায় পুরোপুরি সুফল মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে; বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগছে; সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সংকট আরো জটিল হচ্ছে দুর্বল তথ্য ব্যবস্থাপনার কারণে। অনেক কোম্পানির ডেটা অসম্পূর্ণ; অনেক তথ্য অগোছালো। এসব কারণে এআই মডেলের ফল নির্ভরযোগ্য হয় না।
২০২৫ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) একটি জরিপ চালায়। জরিপে ব্যাংকগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রস্তুতির চিত্র তুলে ধরা হয়।
জরিপে বলা হয়, মাত্র ৩২ শতাংশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক এআই নীতিমালা রয়েছে। ৬৯ শতাংশ ব্যাংক নিজেদের আংশিক প্রস্তুত মনে করে। আর ১১ শতাংশ ব্যাংক দাবি করেছে যে, তারা পুরোপুরি প্রস্তুত।
জরিপে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ ব্যাংক মনে করে, ভবিষ্যতে এআই ব্যবহার প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠবে। বিশেষ করে জটিল সাইবার আক্রমণ মোকাবিলা, অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানো ও গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার মতো কাজে এটি প্রয়োজন পড়বে। কিন্তু দক্ষ জনবল ও নীতিগত কাঠামো ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন বলেও তারা মনে করে।
মোবাইল আর্থিক সেবা দেওয়া কোম্পানি বিকাশ এআই ব্যবহারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে।
কোম্পানির ‘করপোরেট কমিউনিকেশনসের’ প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত করতে তারা নিয়মিত কর্মীদের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়ায় এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় ফ্রড শনাক্তকরণে এআই যুক্ত আছে। সাইবার হুমকি মোকাবিলায়ও এআইভিত্তিক সমাধান ব্যবহৃত হচ্ছে।”
তার মতে, দেশে এআই বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগানো জরুরি।
“পাঠ্যক্রম ও পেশাগত প্রশিক্ষণে এআই যুক্ত করা গেলে দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব,” বলেন তিনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কৃষি ও ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করে। সেটা হল–প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়; দক্ষ মানবসম্পদ দরকার; ডেটা সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতিও দরকার; নীতিগত সহায়তাও প্রয়োজন। এসব ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থেকে যাবে বলে মনে করছেন তারা।