Published : 17 Oct 2025, 12:56 AM
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা কাটেনি, এ অবস্থায় শুক্রবার রাষ্ট্র সংস্কারের সুপারিশ ও অঙ্গীকারনামা সম্বলিত দলিলটি সই হতে যাচ্ছে।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরের আগের দিন বৃহস্পতিবার জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ সাতটি দল বলেছে, তারা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ‘থাকবেন না’।
তার আগে বুধবার জুলাই সনদ স্বাক্ষরের প্রস্তুতির মধ্যে মতভিন্নতা মিটিয়ে জুলাই সনদ সই করা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা, যিনি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি।
সোয়া এক ঘণ্টার ওই বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় ও গণভোটের সময় নিয়ে মতভিন্নতার বিষয়টি আবারও উঠে আসে। ওই অবস্থাতেই শেষ হয় বৈঠক।
এ অবস্থায় এদিন সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের এল ডি হলে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ।
উৎসবমুখর পরিবেশে শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষরের জন্য দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আলী রীয়াজ এও বলেছেন, পরেও সনদে স্বাক্ষরের সুযোগ থাকবে।
কমিশনের মেয়াদে সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
এদিন এক বার্তায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচারে যুক্ত থেকে ঐতিহাসিক মুহূর্তের অংশ হতে দেশের প্রতিটি নাগরিককে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, “এটাই আমাদের একসাথে উদযাপনের সময় — ঐক্যের শক্তি অনুভব করার এবং গর্ব ও আশার এই ঐতিহাসিক দিন থেকে শক্তি আহরণ করার।”
শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে খোলা আকাশের নিচে ৩০টিরও অধিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছে।
সংসদের দক্ষিণ প্লাজার সিঁড়ির মাঝামাঝিতে তৈরি হবে স্বাক্ষর মঞ্চ। সেখানে প্রায় তিন হাজার অতিথিদের বসার ব্যবস্থা থাকবে বলে তথ্য দিয়েছেন অনুষ্ঠান আয়োজনের সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সাজসজ্জার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রদর্শনীর আয়োজন থাকবে বলে আভাস দিয়েছেন এ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
রাষ্ট্র সংস্কারের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা সম্বলিত জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে মঞ্চ তৈরিসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন আলী রীয়াজ।
সনদে সইয়ের অনুষ্ঠানের সূচিতে বিকাল ৪টায় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি প্রধানউপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি সনদে সই করার কথা রয়েছে।
গত বছরের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, যার ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে প্রথম ধাপে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
ফেব্রুয়ারিতে কমিশনগুলোর রিপোর্ট জমা পড়ার পর সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু হয়।
সংস্কার উদ্যোগের এ দীর্ঘ যাত্রায় এসব দল ও জোটের পূর্ণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ১৭টি বিষয়ে ৮৪ দফার জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত করেছে ঐকমত্য কমিশন। বাকি ৬৭টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ কেউ বিরোধিতা করেছে; দিয়েছে ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট।
জাতীয় সনদে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে ৮৪ দফা, তার মধ্যে ৪৭টি বিষয়কে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ এবং বাকি ৩৭টি বিষয়কে ‘আইন/অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ঐকমত্য কমিশন।
জুলাই সনদের পটভূমি ব্যাখ্যা করে সংস্কারযজ্ঞ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম তুলে ধরার পর সংস্কারের ৮৪ দফা তুলে ধরা হয়েছে ৪০ পৃষ্ঠার সনদে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কী অঙ্গীকার করছে, তা উল্লেখ করার পর রাখা হয়েছে স্বাক্ষরের জায়গা।
জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর আগামী ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।
দলগুলোর কারা কী বলছে
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির নিশ্চয়তা এবং সেই ভিত্তি দেওয়ার ধরণ সম্পর্কে পূর্ব ধারণা না পেলে সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ‘থাকবে না’ বলে জানিয়ে দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
বৃহস্পতিবার সকালে বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, “আগামীকাল যে অনুষ্ঠানটা হতে যাচ্ছে সেটা হচ্ছে জুলাই সনদে স্বাক্ষর। যেই আইনি ভিত্তির কথা আমরা বলছি, সেই আদেশ জারির আগে এমন স্বাক্ষর কিন্তু একটি আনুষ্ঠানিকতা। জুলাই সনদ ইতোমধ্যেই প্রণীত হয়েছে। সেই সাংবিধানিক আদেশের ভিত্তিতে গণভোট হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আগাবে।
“জুলাই ঘোষণাপত্রেরও একটা আইনি ভিত্তি দেওয়ার কথা বলেছিলাম। সেটা হয়নি। জুলাই ঘোষণাপত্রের টেক্সট বা শব্দচয়নেও একটা একটা প্রতারণা করা হয়েছে। সেটা আমাদেরকে দেখানো হয়নি। আগে যেটা দেখানো হয়েছে ঘোষণাপত্র পাঠের সময় সেটা অনেক পরিবর্তিত ছিল এবং অনেক কমপ্রোমাইজ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
“ফলে আমরা আরেকটা ঘটনার সাক্ষী হতে চাই না যেটার কোনো মিনিং নাই। আমরা আইনি ভিত্তি ও আদেশের নিশ্চিয়তা ছাড়া সনদে স্বাক্ষর করলে মূল্যহীন হবে। পরবর্তীতে সরকার কিসের ভিত্তিতে আদেশ দেবে সেই নিশ্চিয়তা পাচ্ছি না। এই বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা জুলাই সনদে স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে অংশীদার হব না।”
বিদ্যমান সংবিধানের চার মূল নীতিকে বাদ দেওয়া, অঙ্গীকারনামায় মৌলিক অধিকার পরিপন্থি ও স্বাধীনতার ঘোষণা বাদ দেওয়া সাত কারণ দেখিয়ে জুলাই সনদে সই না করার কথা বলেছে চার দল।
দলগুলো হল-বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা বাংলাদেশ জাসদ।
এদিন বিকালে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দলগুলোর তরফে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিকে প্রকারন্তরে ‘অস্বীকার’ করা হচ্ছে এই সনদে। আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না, এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করে সনদে স্বাক্ষর করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমানও জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করার কথা বলেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, বিদ্যমান সংবিধানের চার মূলনীতিকে বাদসহ কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন, যেগুলো নিয়ে তারা শুরু থেকেই আপত্তি করে আসছেন।
“সনদে এখনো নিয়ে আমাদের কোন কথা রাখা হয়নি। তাই আমরা স্বাক্ষর করবো না।”
রাষ্ট্র সংস্কার অন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত কাইয়ুম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা ঐকমত্য কমিশনকে কিছু শর্ত দিয়েছি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে, সেগুলোর সমাধান পেলে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যাবো, না পেলে স্বাক্ষর করবো না।”
বৃহস্পতিবার রাত হয়ে গেছে, এখনও সমাধান পাননি, কাল স্বাক্ষর, তাহলে কি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা এখনও নিশ্চিত না, নিজেদের মধ্যে আরও আলাপ আলোচনা করবো।”
গণভোট কখন হবে সেই প্রশ্নে স্বক্ষর অনুষ্ঠানে যাবে কি না তা নিয়ে দোলাচল তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামের মধ্যেও।
বুধবার প্রধান উপদেষ্টার জরুরি বৈঠক শেষে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের বলেন, “এখন, গণভোট কখন হবে, এই নিয়ে আবার কিছুটা আমাদের ভেতরে মতপাথক্য আছে।
শুক্রবার জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যাবেন কি না, এমন প্রশ্নে তাহের বলেন, “মাত্র একদিন বাকি আছে, ওইদিন গেলেই ইনশাল্লাহ দেখে ফেলবেন।”
যদিও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মতিউর রহমান আকন্দ সনদ স্বাক্ষরের পর নভেম্বরে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আজ বলব-জুলাই সনদ তৈরির ক্ষেত্রে যেসব পয়েন্টে আমরা একমত হয়েছি সেগুলো নিয়ে সনদে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছি। এ সনদ স্বাক্ষরের পর আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য যে গণভোটের কথা বলা হয়েছে, আমার দলের স্পষ্ট বক্তব্য ইসিকে পেশ করা হয়েছে।”
সেদিন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তাদের দল স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবে।
তিনি বলেছেন, “আমরা জুলাই সনদ সবাই স্বাক্ষর করব, যে সমস্ত বিষয়ে ভিন্নমত আছে, নোট অব ডিসেন্ট আছে, এগুলো একদম পরিষ্কারভাবে দফাওয়ারি উল্লেখ থাকবে, কি কি বিষয়ে, কীভাবে। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে? কারণ ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়ার এখতিয়ারের জন্যই তো আমরা ঐক্যমত কমিশনে আলাপ আলোচনা করেছি। যদি তা না হত, তাহলে ঐকমত্য কমিশন যদি আমাদেরকে প্রস্তাব দিত, সেই সকল প্রস্তাবে যদি সবাই একমত হয়ে যেত, তাহলে তো আলোচনার কোনো প্রয়োজন ছিল না।
“গণভোটের মধ্য দিয়ে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সেই সম্মতিটা নেওয়া যায়। যার মধ্য দিয়ে জুলাই জাতীয় সনদের সমস্ত প্রস্তাব, যেগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে; ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ, সেটা বাস্তবায়ন হবে।”
‘আশাবাদী’ ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি
দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকার পাশাপাশি সনদে স্বাক্ষর না করার ঘোষণা আসায় অনুষ্ঠান কতটা সফল হবে, এমন প্রশ্নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ আশার কথা শুনিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমরা অপেক্ষায় আছি, শুক্রবার সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তারা সকলে উপস্থিত থেকে সই করে গত এক বছরের দীর্ঘ চেষ্টার একটা পর্যায়ে উপনীত হতে পারবো।
“বিভিন্ন রকমের মতভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা আশা করি, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, সেই দলগুলোর নেতারা উপস্থিত থাকবেন। তারা সনদে স্বাক্ষর করার মধ্য দিয়ে আরেকটি পর্যায়ে আমরা অগ্রসর হতে পারবো।”
এক সাংবাদিক জানতে চান, শুক্রবার কোনো দল জুলাই সনদে সই না করলে পরবর্তী সময়ে তারা স্বাক্ষর করতে পারবে কি না?
জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, “শুক্রবার সব দলের স্বাক্ষর নিতে পারলে ভালো। তবে যদি কোনো দল পরবর্তীতে স্বাক্ষরের কথা বলে...তারা তো সনদ প্রক্রিয়ার অংশীদার। শরিক হিসেবে তারা সেটা করতে পারবে। তবে কমিশন আশা করে, সকলে একসঙ্গে বসে উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাক্ষর করবে।”