Published : 31 Aug 2026, 03:34 PM
বছর খানেক আগে মাগুরায় আট বছরের শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে হাই কোর্ট।
আসামির আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানি নিয়ে সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ এ রায় দেয়।
মাগুরার শ্রীপুর উপজেলায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ ধর্ষণের শিকার হয় আট বছরের ওই শিশু। ওইদিন তাকে মাগুরা সদর হাসপাতাল থেকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৮ মার্চ তাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ শিশুটির মৃত্যু হয়।
এর আগে ৮ মার্চ শিশুটির মা হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। শিশুটির মৃত্যুর পর ওই মামলায় হত্যার অভিযোগও যুক্ত করা হয়। মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখ ১৫ মার্চ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। পুলিশ তদন্ত শেষে ১৩ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় এবং ২৩ এপ্রিল বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত।
ঘটনার মাত্র দুই মাস ১১ দিনের মাথায় ১৭ মে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মামলার অপর তিন আসামি শিশুটির বোনের স্বামী সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখ ও তাদের মা জাহেদা বেগমকে খালাস দেওয়া হয়। রায়ের পর হিটু শেখ হাই কোর্টে আপিল করেন। গত জুনে পেপারবুক হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছানোর পর শুনানি শুরু হয়।
হাই কোর্টের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হিটু শেখ তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা, ব্যর্থ হয়ে ব্লেড দিয়ে তার স্পর্শকাতর স্থান কাটার চেষ্টা, পরে মুখ ও গলা চেপে ধরা এবং ওড়না দিয়ে গলা চেপে ধরার কথা তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন। শিশুটি অবচেতন হয়ে যাওয়ার পরও হিটু শেখ তার ওপর যৌন নির্যাতনের চেষ্টা চালিয়ে যান। তার পরিহিত লুঙ্গিতে বীর্য পাওয়া যায় এবং ডিএনএ পরীক্ষায় তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, হিটু শেখ নিজেও ঘটনার পর পালিয়ে পাশের একটি ক্ষেতে গিয়ে লুকিয়েছিলেন। পরে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তার ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
পুলিশ কাস্টডিতে থাকা অবস্থায় জবানবন্দি নেওয়ার কারণে এর সাক্ষ্যগত মূল্য নেই বলে আসামিপক্ষ যে যুক্তি দিয়েছিল, সে বিষয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হলে হিটু শেখ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার সময় বিষয়টি উল্লেখ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি এমন কোনো অভিযোগ না করায় আদালত তার জবানবন্দিকে স্বেচ্ছায় দেওয়া ও সত্য বলে গ্রহণ করেছে।
এজাহারে ঘটনার সময় ভোর এবং অভিযোগপত্রে সকালের কথা উল্লেখ থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঘটনার পরপর যে মামলা হয়, তাতে সব বিস্তারিত তথ্য থাকা সম্ভব নয়। ৬ মার্চের ঘটনা ৮ মার্চ মামলা হওয়ায় প্রাথমিক তথ্যবিবরণীতে মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। এজাহারকারী মা ঘটনাস্থলে ছিলেন না; তিনি মোবাইল ফোনে খবর পেয়ে অসুস্থ মেয়েকে দেখতে যান এবং যতটুকু জানতে পেরেছেন, ততটুকুই উল্লেখ করেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বিস্তারিত তদন্ত শেষে যে তথ্য পেয়েছেন এবং আদালতে সাক্ষীরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই রায় হয়েছে বলে তিনি জানান।
নিম্ন আদালতে খালাস পাওয়া অপর তিন আসামির বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, সজীব ও রাতুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং প্রকাশ করলে ক্ষতি করার ভয়ভীতি দেখানোর। আর জাহেদার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গোপন করার অভিযোগ ছিল। ট্রাইব্যুনাল তাদের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় খালাস দিয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় হাই কোর্টেও সেই খালাসের রায় বহাল রয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বিচারিক আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি বলে মনে করে হাই কোর্ট।
রায়ে আদালত বলেছে, সাক্ষীদের জেরার ক্ষেত্রেও একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইনজীবী থাকলে সঠিকভাবে জেরা করার মাধ্যমে আসামিপক্ষ কিছু সুবিধা পেতে পারত। এ ধরনের মামলায় যথাযথ প্রতিনিধিত্ব না হলে আদালত একজন সিনিয়র ও অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করতে পারত।
এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল বলেন, আদালতের এই মন্তব্য মামলার রায়ের বিচারিক কারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়; এটি আদালতের পার্শ্ব মন্তব্য। মামলার রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে হিটু শেখের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
রায়ের শুরুতে হাই কোর্ট বলেছে, কোনো ঘটনার বিচার সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে হয়। কিন্তু মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত তথ্যের পাশাপাশি অপতথ্য ছড়ানো এবং সামাজিক চাপ ও একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ তৈরি হওয়ার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিচার হওয়ার আগে কেউ যেন মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার না হন, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে মানুষের মনে ন্যারেটিভ তৈরি হলে তা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে বলেই আদালত এ উদ্বেগ জানিয়েছে।
আইনি প্রবাদ ‘জাস্টিস হারিড জাস্টিস বারিড’ উল্লেখ করে আদালত বলেছে, বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো করা যাবে না এবং আইনে নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করতে হবে। কোনো মামলা ধীরগতিতে চলবে, তার অর্থ এই নয় যে তা বছরের পর বছর চলবে। আবার দ্রুত বিচার মানে এমন গতিতে চলাও নয়, যাতে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় ধাপগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা না হয়।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—উভয়েরই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখতেই আদালত এটি বলেছে।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বেডশিটে পাওয়া মিশ্র ডিএনএ প্রোফাইলের বিষয়টিও উল্লেখ করেছে আদালত। সেখানে ভিকটিম, তার দুলাভাই সজীব এবং হিটু শেখের ডিএনএ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
আদালত বলেছে, এজাহারেই বলা আছে যে ঘটনার রাতে ভুক্তভোগী শিশু, তার বোন ও সজীব একই বিছানায় ছিলেন। ফলে ওই বেডশিটে তাদের ডিএনএ পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। এ কারণে বেডশিটের মিশ্র ডিএনএ হিটু শেখের দায় থেকে তাকে মুক্ত করার কোনো সুযোগ সৃষ্টি করে না।
আসামিপক্ষের আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আদালত সাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে হিটু শেখের আপিল খারিজ ও ডেথ রেফারেন্স গ্রহণ করেছে।
“এখন আসামি পক্ষের জন্য আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তারা চাইলে আইনজীবী নিয়োগ সাপেক্ষে আপিল করতে পারবেন।”
আরও পড়ুন
মাগুরায় শিশু ধর্ষণ-হত্যা: হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় পেছাল
মাগুরায় শিশু ধর্ষণ-হত্যা: ফাঁসির আসামি হিটু শেখের পক্ষে আইনজীবী দিল হাই কোর্ট
মাগুরার শিশু ধর্ষণ-হত্যা: হিটু শেখের প্রাণদণ্ড, ৩ জন খালাস
মাগুরার সেই শিশু ধর্ষণ-হত্যার বিচার শুরু
মাগুরার সেই শিশু ধর্ষণ: হিটু শেখের ডিএনএ প্রতিবেদন, 'সব পজিটিভ'