Published : 16 Jul 2025, 08:27 PM
পদ্মা ব্যাংক লিমিটেডের কার্যালয় ‘স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ’ এবং গুলশানের ‘একটি প্লট হস্তান্তর করে অর্থ পাচারের’ অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।
বুধবার দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের এ তথ্য দিয়েছেন।
দুদক বলছে, পদ্মা ব্যাংকের ৬৬ কোটি টাকার বেশি ‘আত্মসাতের অভিযোগে’ করা মামলায় নাফিজ সরাফতসহ আসামি করা হয়েছে ১০ জনকে।
আর গুলশানের একটি প্লট হস্তান্তরের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকার বেশি ‘পাচারের’ অভিযোগ করা মামলায় তার সঙ্গে আসামি করা হয়েছে সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ আরও তিনজনকে।
দুটি ঘটনার অনুসন্ধানে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কথা বলেছে দুদক। গত অক্টোবরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাফিজ সরাফতের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গুলশান আবাসিক এলাকার সিইএন (ডি) ব্লকের ২২/৫ নম্বর প্লটকে ‘বাণিজ্যিক (ফার) সুবিধা’ দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের সহায়তায় রাজউক চেয়ারম্যানকে প্রভাবিত করে এ সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
দুদক বলেছে, নাফিজ সরাফত তখন পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদে থেকে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ডাইনেস্টি হোমস লিমিটেড এর মাধ্যমে এই ভবনে পদ্মা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও গুলশান শাখা স্থানান্তর করেন।
এতে তিনি কমপক্ষে ১৪ কোটি টাকা অগ্রিম গ্রহণ করেন এবং ভবন নির্মাণ খরচসহ মোট ৬৬ কোটি ৫১ লাখ টাকারও বেশি ‘আত্মসাৎ করেন’ বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদক বলছে, তাদের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে যে ২০১২ সালের ১৫ জুন সার্কুলার (নম্বর-১২) জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া নির্দেশনা লঙ্ঘন করে পদ্মা ব্যাংক ডাইনেস্টি হোমস এর সাথে ভবন ভাড়া চুক্তি করে এবং তাদের গুলশান-২ শাখা ও প্রধান কার্যালয় স্থানান্তর করে ‘ফাইন্যান্স স্কয়ার’ ভবনে।
এই মামলায় যাদের নাম আসামি করা হয়েছে, তারা হলেন-পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিজ সরাফত, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরা সাহিদ, তাদের ছেলে রাহীব সাফওয়ান সরাফত চৌধুরী, ডাইনেস্টি হোমসের সাবেক চেয়ারম্যান এস কে মেহেদী হাসান, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারহানা মোনেম, রিমন কর্মকার, ডালিয়া চৌধুরী, সাজিদ হক, আমানি নাওয়ার চৌধুরী ও পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রিয়াজ খান।
দ্বিতীয় মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আঞ্জুমান আরা সাহিদ তার ‘নাবালক’ ছেলে রাহীব সাফওয়ান সরাফতের নামে হেবা ঘোষণার মাধ্যমে গুলশানের ২২/৪ নম্বর প্লট হস্তান্তর করেন।
পরে, একইভাবে রাজউকের অনুমোদন ছাড়া তৎকালীন মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের সহায়তায় রাজউক চেয়ারম্যানকে প্রভাবিত করে সেই প্লটেও ‘বাণিজ্যিক অনুমোদন’ নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফাত।
দুদকের অভিযোগ, আঞ্জুমান আরা সাহিদ অবৈধভাবে অর্জিত ৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা ‘ছদ্মবেশে রেখে মানিলন্ডারিং’ করেছেন। তাদের ছেলে রাহীব সাফওয়ান নিজের নামে আয়কর নথি না থাকা সত্ত্বেও রাজউককে ৪৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করেছেন, যা ‘মানিলন্ডারিংয়ের শামিল’।
এই মামলায় চৌধুরী নাফিজ সরাফত, আঞ্জুমান আরা সাহিদ, রাহীব সাফওয়ান সরাফত চৌধুরী ছাড়াও আসামি করা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গত তিন মেয়াদে আর্থিক খাতের অনিয়মে বারবার নাফিজ সরাফতের নাম এলেও তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দুদক আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী অনেক ব্যবসায়ীর মত নাফিজ সরাফতের বিষয়েও অনুসন্ধান শুরু করে।
তার বিরুদ্ধে তদন্তে নামে অর্থপাচার প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে পদত্যাগ করেন অনিয়ম আর ঋণ কেলেঙ্কারিতে পদ্মা ব্যাংক।
অনিয়ম আর ঋণ কেলেঙ্কারিতে ফারমার্স ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ঘটে ২০১৭ সালে।
সে সময় চাপের মুখে চেয়ারম্যানের পদ ছাড়েন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য মহীউদ্দীন খান আলমগীর। পরের বছর ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন চৌধুরী নাফিজ সরাফত, যিনি রেইস অ্যাসেট ম্যানেজেমেন্ট পিএলসি এবং কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ট্রাস্টি বোর্ডেরও চেয়ারম্যান।
পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনের পর ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ফারমার্স ব্যাংকের নাম হয় পদ্মা ব্যাংক।
গত বছরের আগস্টে নাফিজ সরাফতের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল ও শেয়ারবাজার থেকে অর্থ লোপাটের মাধ্যমে ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
এর পর নাফিজ সরাফত ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেয় আদালত। এছাড়া তার পরিবারের ফ্ল্যাট, প্লট, বাড় ও জমি জব্দের আদেশ আসে। দুবাইয়ে থাকা নাফিজ সরাফতের ফ্ল্যাট ও ভিলা জব্দের আদেশ দেওয়া হয়।