Published : 20 Feb 2026, 09:12 AM
ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচার যেন এগোচ্ছে না কিছুতেই।
সাত বছর আগের ওই ঘটনার পর বিচার শুরু হয়েছে, তাও তিন বছর হয়ে গেছে। এই তিন বছরে সাক্ষ্য নেওয়া গেছে কেবল ৬ জনের।
কবে নাগাদ বিচার শেষ হবে, নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউ। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আশ্বাস দিচ্ছেন। স্বজন হারানো মানুষেরা বিচারের আশায় রয়েছে। আসামিপক্ষও চাইছে বিচার শেষ হোক; তবে তা যেন ‘ন্যায়বিচার’ হয়।
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টা মোড়ের কাছে চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে লাগা আগুন আশপাশের কয়েকটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে।
গায়ে গায়ে লেগে থাকা ভবনগুলোতে থাকা রাসায়নিক দ্রব্য, প্লাস্টিক ও পারফিউমের দোকান-গুদাম থাকায় মুহূর্তেই গোটা এলাকা পরিণত হয় অগ্নিকুণ্ডে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেকে ছাই হয়ে যান। আগুনের প্রচণ্ডতায় দুমড়ে-মুচড়ে যায় দোকান-পাট, রিকশা-গাড়ি।
ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ১৪ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ৬৭ জনের পোড়া লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ জনে।

আসামি কারা
ওই ঘটনায় নিহত চকবাজারের ওয়াটার ওয়াকর্স রোডের ৩২/৩৩ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা জুম্মনের ছেলে মো. আসিফ আহমেদ ‘অবহেলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিসংযোগের ফলে মৃত্যু ঘটাসহ ক্ষতিসাধনের’ অভিযোগে চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন।
মামলায় বলা হয়, ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে তাদের চারতলা বাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে দাহ্য পদার্থ রাখতেন। মানুষের জীবনের ঝুঁকি জেনেও অবৈধভাবে রাসায়নিকের গুদাম করার জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে বাসা ভাড়া দেন তারা।
মামলাটি তদন্ত করে তিন বছর পর ২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ৮ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাইউম।
অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়- হাসান ওরফে হাসান সুলতান, সোহেল ওরফে শহীদ ওরফে হোসেন সুলতান, ইমতিয়াজ আহমেদ, মোজাম্মেল ইকবাল, মোজাফফর উদ্দিন, জাওয়াদ আতিক, মোহাম্মদ নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফকে।
এদের মধ্যে দুই ভাই হাসান সুলতান ও হোসেন সুলতান হলেন ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক। ১০ কাঠা জমিতে নির্মিত ভবনটির দোতলার পুরোটা জুড়েই ছিল গুদাম। অন্যান্য তলায় ছিল বিভিন্ন দোকান।
বাকি আসমিরা সবাই পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে মালিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। পার্লের গুদাম থেকেই আগুন ছড়িয়েছিল।
আসামিদের মধ্যে ইমতিয়াজ পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিক, ইকবাল পরিচালক এবং মোজাফফর ব্যবস্থাপক। জাওয়াদ আতিক, নাবিল ও কাশিফ পার্ল ইন্টারন্যাশনালের কর্মী।


অভিযোগপত্রে বলা হয়, দুই ভাই হাসান ও হোসেন অবৈধ জেনেও আবাসিক ভবনে রাসায়নিকের গুদাম ভাড়া দিয়েছিলেন ‘পার্ল ইন্টারন্যাশনাল’কে। আর ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মীরা জান-মালের ক্ষতি হতে পেরে জেনেও দাহ্য পদার্থের মজুত, সংমিশ্রণের কাজ করতেন। তাদের অবহেলার কারণেই এত মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটেছে।
বাড়িওয়ালা হাসান সুলতান আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, পার্ল ইন্টারন্যাশনাল ভাড়া নেওয়ার সময় জানিয়েছিল তারা বিভিন্ন প্রকার পারফিউম, বডি লোশন, অলিভ ওয়েল, বেবি পাউডার, বেবি লোশন, কটন বাড, ডায়াপার ইত্যাদির ব্যবসা করে। প্রতিষ্ঠানের ‘বিহারি’ মালিক গুদামে তেমন একটা আসতেন না। ‘বিহারি’ দুই ভাই নাবিল ও কাশিফ ওই কোম্পানির সেলসম্যানের কাজ করতেন।
তবে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সেলসম্যান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও নাবিল ও কাশিফ দুই ভাই ওই কোম্পানির অংশীদার বলে সাক্ষীদের কাছ থেকে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশ আসামিদের আটজনকেই গ্রেপ্তার করেছিল। তবে তাদের কয়েকজন জামিনে ছাড়া পেয়ে যান পরে।

সাক্ষী আসে না
২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে আসামিদের বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত। বর্তমানে ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ খোরশেদ আলমের আদালতে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।
সর্বশেষ গত ১২ নভেম্বর মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওইদিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। আগামী ২৯ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মিলন হোসেন।
সর্বশেষ সেলিম আহমেদ লিটন নামে এক সাক্ষী গত বছরের ৩১ জুলাই সাক্ষ্য দেন। এরপর দুটি ধার্য দিনে কোনো সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার ১৬৭ সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৬ জনের সাক্ষ্য শুনেছে আদালত।
সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রসিকিউটর মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, "মামলাটি নিয়ে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তৎপর। বিচারকের সাথেও বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেছি। সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে আদালত থেকে সমন পাঠানো হয়। কিন্তু তারা আদালতে আসেন না।
“তারা নিয়মিত আদালতে এসে সাক্ষী দিলে মামলার বিচারটা দ্রুত শেষ হয়ে যেত। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, সাক্ষীদের হাজির করে সাক্ষ্যগ্রহণ করে মামলার বিচার শেষ করার।”
মামলার বাদী আসিফ আহমেদ বলেন, "বছরে একবার সরকার এসে খোঁজ নেয়, শোডাউন দিয়ে ছবি তুলে চলে যায়। অথচ ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা বা কর্মসংস্থানের কোনো উদ্যোগ নেয় না। এখন পর্যন্ত তো বিচারই হয়নি, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়নি।
“আমাদের মনে হয় না, বাংলাদেশে আমরা সুষ্ঠু বিচার পাব। তবে নতুন সরকারের কাছে একটাই চাওয়া, তারা যেন বিচারটা শেষ করে।"
আসামি হাসান ও হোসেনের আইনজীবী মো. মোস্তফা পাঠান (ফারুক) বলেন, "মামলার সাক্ষ্য চলছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে যারা ছিলেন, তারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন। সরকারি লোক ক্রমান্বয়ে সাক্ষ্য দেবে। আমারা মক্কেলরা নিজেরা ভিকটিম। তাদের ভবন পুড়ে গেছে। আগুনে তাদের মা আহত হন। পরে মারা যান।"
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মামলার বিচারে বিলম্ব হোক, আমরা তা চাই না। তাদের (আসামিদের) তো নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে। আর চুড়িহাট্টার মামলাকে বিশালভাবে দেখিয়ে দেশের মানুষের টোটাল মুভমেন্ট অন্যদিকে ঘুরিয় দিয়েছিল তখনকার সরকার। যদিও বিগত সময়ে যারা এটি সাজিয়েছিল, তারা একটি গ্রুপ ছিল।
“তারা রানা প্লাজাকেও (সাভারের রানা প্লাজা) কত রকমভাবে সাজিয়েছিল। একটা মেয়েকে দিয়ে সফলতা দেখালে। পরবর্তীতে আবার সেটা ধরা খেল। সরকার এ মামলাটায় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। কাউকে তো মামলার আসামি দিতে হবে। যারা ভিকটিম, তাদের আসামি করেছে। যাদের ক্ষতি হল, তারাই আসামি হল।"

পার্লের ৩টি গুদাম ছিল ভবনে
ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় পার্ল ইন্টারন্যাশনালের তিনটি গুদাম ছিল। প্রতিষ্ঠানটি নানা রকম প্রসাধনীর ব্যবসা করে।
ভবনের দ্বিতীয় তলার একপাশে পার্ল ইন্টারন্যাশনালে নিজস্ব গুদাম ছিল। আরেক পাশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মোজাফ্ফর গুদাম হিসেবে ভাড়া নিয়ে স্কচটেপ ও এনার্জি বাল্বের ব্যবসা করতেন। ভবনের তৃতীয় তলার এক পাশে ছিল পার্লের গুদাম ছিল। চতুর্থ তলার একপাশেও পার্লের গুদাম ছিল।
অভিযোগপত্রে ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ওই ভবনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় বিপুল পরিমাণ বডি স্প্রে, অ্যারোসল, গ্যাস লাইটারের ফুয়েল মজুদ করা ছিল।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের আলোকে পার্ল ইন্টারন্যাশনালের গুদামকেই অগ্নিকাণ্ডের উৎসস্থল বলে চিহ্নিত করা হয় পুলিশের অভিযোগপত্রে।
বলা হয়, দোতলায় পলিব্যাগ সিল মেশিনের কাজের সময় সৃষ্ট তাপে বা যে কোনোভাবে ইলেকট্রিক স্পার্ক ওই বিস্ফোরক মিশ্রণের সংস্পর্শে এলে দোতলায় বিস্ফোরণ ঘটে এবং সব দেয়াল ভেঙে বাইরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
অগ্নিকাণ্ডের পর প্রথমে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণকে দায়ী করা হচ্ছিল, পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে যে আসলে তা ঠিক নয়।

অতিদাহ্য সুগন্ধী
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ওই ঘটনার পর পুলিশ চার ধরনের ৪৯টি আলামত সংগ্রহ করে। আলামতের মধ্যে ২৬টি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রসাধনীর টিউব, বোতল ও ক্যান। এসব আলামত পরীক্ষার জন্য সিআইডির পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছিল। তাতে সুগন্ধিগুলো থেকে আট রকমের উচ্চ মাত্রার দাহ্য বস্তুর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
সেই অভিযোগপত্রে আগুনের বিস্তারের কারণ হিসেবে অতি দাহ্য ওই রাসায়নিককে দায়ী করা হয়েছে, যা পাওয়া গেছে ১০ রকমের (ব্রান্ডের) সুগন্ধির ক্যানিস্টার ও বোতল থেকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, আগুন লাগার পর ওয়াহিদ ম্যানশনে সশব্দে ক্যানগুলো বিস্ফোরিত হচ্ছিল। বিস্ফোরিত জ্বলন্ত ক্যান উড়ে এসে রাস্তাতেও পড়ে।
সুগন্ধী তৈরিতে ব্যবহৃত অতি দাহ্য রাসায়নিকগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইথাইল অ্যালকোহল, বিউটেন, আইসো বিউটেন, প্রোপেইন, বুটোক্সি ইথানল, গ্লাইকল ইথার, ডাইইথাইল থালেট ও প্রোপিলিন।
সাধারণত লাইটারের গ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত বিউটেন অতি উচ্চ মাত্রার দাহ্য হিসেবে বিবেচিত। আইসো বিউটেন ব্যবহৃত হয় জ্বালানি তেল, রেফ্রিজেটরের শীতক হিসেবে, অ্যারোসল স্প্রের উপাদান হিসেবে। এলপিজি, এলএনজিসহ নানা গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত হয় প্রোপেইন গ্যাস। বুটোক্সি ইথানল ব্যবহার করা হয় রং (পেইন্ট) ও থিনারে। গ্লাইকল ইথার ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন ধরনের পরিষ্কারক রাসায়নি (ক্লিনিং কম্পাউন্ড), তরল সাবানসহ নানা ধরনের প্রসাধন তৈরিতে। ডাইইথাইল থালেট প্লাস্টিক, কীটনাশকসহ নানা উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। প্রোপিলিন ইনজেকশন তৈরির প্লাস্টিক মোল্ডসহ নানা রাসায়নিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেছিলেন, এগুলো সব রাসায়নিক নানাভাবে সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহার হয়। এগুলোর নানা মাত্রার মিশ্রণে সুগন্ধির রং ও গন্ধের তারতম্য আনা হয়।
চকবাজার হচ্ছে বাংলাদেশের প্রসাধন শিল্পের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার। স্নো, ক্রিম, পাউডার থেকে শুরু করে নামী-দামী ব্রান্ডের পারফিউম ও প্রসাধনী পাওয়া যায় এখানে। তবে চকবাজারে নকল প্রসাধনী তৈরি ও বিক্রির কুখ্যাতিও রয়েছে।
চকবাজারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন এরকম নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, এখানকার অনেক ব্যবসায়ী চীন থেকে সস্তায় নামী-দামী ব্রান্ডের বোতল বা ক্যান বানিয়ে আনতেন। এরপর সেগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি রাসায়নিক ভরেন। ওয়াহেদ ম্যানশনেও মূলত এমন সুগন্ধি তৈরি হত।
তবে সেখানে নকল পণ্য তৈরি হত কি না, পুলিশের অভিযোগপত্রে তার কোনো উল্লেখ নেই।