Published : 15 Oct 2025, 11:56 PM
লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া এবং ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত অনুষ্ঠানের যে আমন্ত্রণপত্র সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় পাঠিয়েছে, তাতে ইংরেজির ভুল দেখে একজন বাংলাদেশি হিসেবে ‘লজ্জায়’ পড়ে গেছেন কবি ও ঔপন্যাসিক হাসনাত আবদুল হাই।
এই আয়োজনে কেন শিল্পকলা একাডেমিকে এড়িয়ে যাওয়া হল, সেই প্রশ্নও রেখেছেন তিনি।
ওই আমন্ত্রণপত্রে বাংলায় লেখা হয়েছে, “নতুন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় আধ্যাত্মিক সাধক লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবস আগামী ১৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ জাতীয়ভাবে পালিত হতে যাচ্ছে।
“এ উপলক্ষ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক ১৭-১৯ অক্টোবর ২০২৫ কুষ্টিয়ায় ০৩ (তিন) দিনব্যাপী আলোচনা সভা, লালন সংগীতানুষ্ঠান ও লালনমেলা এবং ১৮ অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকায় লালন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।”
হাসনাত আবদুল হাই তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “লালন উৎসব আগেও হয়েছে। আমন্ত্রণপত্রে 'নতুন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা' বলতে কী বোঝানো হয়েছে বোঝা গেল না।”
ইংরেজিতে আমন্ত্রণপত্রে লেখা হয়েছে–
“In course of the new cultural journey of Bangladesh, the Ministry of Cultural Affairs is going to commemorate nationally the 135th Death Anniversary of spiritual musician Lalon Shah on 17th October 2025.
“Accordingly, a three-day long programme has been chalked out to be held in Kushtia from 17th to 19th October 2025 that includes discussion on the philosophy of Lalon Shah, rendering of his music by his followers and organization of traditional Lalon Fair. In addition, a Lalon Festival will be held on 18th October 2025 at the Suhrawardy Uddyan, Dhaka.
“You are most cordially invited to attend all events of the programme.”

হাসনাত আবদুল হাই বলেছেন, “প্রথমেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে লালন সাঁইয়ের ১৩৫তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় এবং ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।
“অনুষ্ঠানটি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে না করে শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে হওয়া সমীচীন ছিল। মন্ত্রণলয়ের কাজ নীতি নির্ধারণ করা, কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুযোগ ও দায়িত্ব একাডেমিকে দেয়া। এভাবে একাডেমির ভূমিকা সংকুচিত করা খুব দুঃখজনক।”
এই সাহিত্যিক লিখেছেন, আমন্ত্রণ পত্রটি বাংলা ও ইংরেজিতে হওয়ায় ধন্ধে পড় গেলাম। ইংরেজিতে যে সব মারাত্মক ভুল দেখা যাচ্ছে, তাতে বিদেশিরা পড়লে কি মনে করবে ভেবে লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইংরেজি ডেস্ক আমন্ত্রণপত্রের ইংরেজি অংশ বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে।
প্রথম বাক্যটি—“In course of the new cultural journey of Bangladesh”—একটি ভুল ও অস্পষ্ট বাগধারা। এটি আরও স্বাভাবিকভাবে বলা যায় “As part of Bangladesh’s ongoing cultural initiatives” বা “In continuation of Bangladesh’s cultural journey.”
“is going to commemorate nationally the 135th Death Anniversary” বাক্যটিতেও শব্দ বিন্যাসের ত্রুটি আছে। ভালো হত যদি—“will nationally commemorate the 135th death anniversary” বা সহজভাবে “will commemorate the 135th death anniversary nationally” লেখা হত।
“three-day long programme has been chalked out” – এখানে chalked out শব্দবন্ধটি পুরোনো ও দাপ্তরিক ধাঁচের। আধুনিকভাবে বলা যায়—“a three-day programme has been planned.”
“discussion on the philosophy of Lalon Shah, rendering of his music by his followers and organization of traditional Lalon Fair” – বাক্যটিতে কাঠামোগত সমস্যা আছে এবং article অনুপস্থিত। এর বদলে—“discussions on Lalon Shah’s philosophy, performances of his music by his followers, and the organisation of a traditional Lalon Fair.” লেখা যেত।
“In addition, a Lalon Festival will be held on 18th October 2025 at the Suhrawardy Uddyan, Dhaka.” – এখানে “18th” ও “Uddyan”–এর ব্যবহার সঠিক হয়নি। ঠিক হবে—“In addition, a Lalon Festival will take place on 18 October 2025 at Suhrawardy Udyan in Dhaka.”
“You are most cordially invited to attend all events of the programme.”–বাক্যটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ। সংক্ষিপ্ত ও স্বাভাবিকভাবে বলা যায়—“You are cordially invited to attend all the events.”
এ ছাড়া, “Death Anniversary”–র মতো শব্দগুচ্ছ বাক্যের মাঝখানে বড় হাতের অক্ষরে লেখা উচিত নয়।
সবশেষে, “at the Suhrawardy Udyan, Dhaka”–এর আগে “the” ব্যবহার অপ্রয়োজনীয়; সঠিক রূপ হবে “at Suhrawardy Udyan, Dhaka.”


লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসের আয়োজন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ফেইসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে বলা হয়, "আখড়াবাড়িতে দিনভর ভাবগীতির সুর, আলাপ, দর্শনচর্চা আর মাটির গন্ধে ভরে উঠবে ছেউড়িয়ার লালন ধাম। টুনটুন বাউল, সুনীল কর্মকার, রওশন ফকির, লতিফ শাহসহ গাইবেন সারাদেশ থেকে আগত বাউল- ফকিরগণ।"
পরে ঢাকার আয়োজনটি হবে ১৮ অক্টোবর; তাতে লালনের গান পরিবেশন করবেন ইমন চৌধুরী ও বেঙ্গল সিম্ফনি, লালন ব্যান্ড, নীরব এন্ড বাউলস, পথিক নবী, সূচনা শেলী, বাউলা ব্যান্ড, অরূপ রাহী, সমগীতসহ আরও অনেক শিল্পী ও গানের দল।"
হাসনাত আবদুল হাইকে ফোন করা হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "লালন নিয়ে অনুষ্ঠান হচ্ছে, এটা তো ভালো। কিন্তু এই আয়োজন কেন মন্ত্রণালয় করবে? আমন্ত্রণপত্রে লেখা আছে আয়োজক মন্ত্রণালয়, ব্যবস্থাপনায় শিল্পকলা একাডেমি।"
"আমি তো সচিব ছিলাম। এ ধরনের অনুষ্ঠান সরাসরি মন্ত্রণালয় আয়োজন করে না। এগুলো আয়োজন করার দায়িত্ব শিল্পকলার মতো প্রতিষ্ঠানের। মন্ত্রণালয়ের উচিত তাদের সহযোগিতা করা। কিন্তু মন্ত্রণাণালয় নিজেই কেন আয়োজক হচ্ছে, এটা বোধগম্য হল না।"
আমন্ত্রণপত্রের ইংরেজি অংশের ভুল নিয়ে তিনি বলেন, "একাধিক ভুল আছে। বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখা কেন, তাও তো বুঝিনি।
"হয়তো বিদেশিদের জন্য ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। এখন ভুল বাক্যে লেখা আমন্ত্রণপত্র বিদেশিদের হাতে গেলে তো লজ্জা পেতে হবে। এই কার্ড ছাপানোর আগে উচিত ছিল, ইংরেজি যিনি জানেন বা বোঝেন- এমন কাউকে দেখিয়ে নেওয়া।"
এ বিষয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণাণালয় এবং শিল্পকলা একাডেমির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে, তারা কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীকে কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
গত ২৮ অগাস্ট এক ফেইসবুক পোস্টে ফারুকী বলেছিলেন, উপদেষ্টা পরিষদে লালনের তিরোধান দিবসকে ‘ক’ শ্রেণীর জাতীয় দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, "লালন সেলিব্রেট করার মধ্য দিয়ে আমরা রবীন্দ্র-নজরুলের পাশাপাশি চেনা ছকের বাইরে তাকাতে শুরু করলাম। এটা কেবল শুরু। আমি নিশ্চিত, সেদিন বেশি দূরে না যখন কনটেমপোরারি মাস্টার আর্টিস্টদেরও আমরা সেলিব্রেট করব রাষ্ট্রীয়ভাবে।"