Published : 28 Jul 2025, 12:54 AM
ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে হেরোইনসহ এক যুবককে আটকের পর মামলা করে পুলিশ। পরে সেই মামলা ‘গায়েব’ করে একই নম্বরে অন্য একটি ছিনতাইয়ের মামলা করার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদপুর থানার ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে।
মে মাসের প্রথম সপ্তাহের এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, হেরোইনসহ আটক যুবককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে পুরনো মামলায়। আর মাদক মামলার বদলে একই নম্বরে দায়ের করা ছিনতাইয়ের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে আরেকজনকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা ওই মামলার এজাহারে মোহাম্মদপুরের জেনিভা ক্যাম্প থেকে ওই আসামিকে আটকের সময় ১০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের অভিযোগ দেওয়া হয়। পরে এই এজাহারের পাশাপাশি আনুমানিক ১০ লাখ টাকার ওই হেরোইনও ‘গায়েব’ করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি জানাজানি হলে সম্প্রতি এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসানসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের কারা জড়িত তা তদন্তে নেমেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
পাশাপাশি শনিবার ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ এ ঘটনার অনুসন্ধানে একজন অতিরিক্ত উপকমিশনারকে দায়িত্ব দিয়েছে বলে জানান এ বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান। বলেন, “তাকে জরুরিভিত্তিতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।”
তবে ওসির বিরুদ্ধে তদন্তের পাশাপাশি মোহাম্মদপুর থানার আর কয়জন জড়িত তা তদন্ত করা হচ্ছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এ অভিযোগ তদন্তে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে একটি অনুসন্ধান কমিটি করার তথ্য দেন। তবে সেই কমিটি কত সদস্যের এবং কারা এর দায়িত্বে তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি।
হেরোইন উদ্ধারের পর প্রথমে দায়ের করা মামলার এজাহারের তথ্য বলছে, গত ৬ মে রাতে মোহাম্মদপুরের জেনিভা ক্যাম্পে অভিযান চালিয়ে আনুমানিক ১০ লাখ টাকা মূল্যের ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ মাদক কারবারি মো. সাদ্দাম ওরফে ম্যানেজার সাদ্দামকে (৩৫) আটক করে পুলিশ।
ওইদিন রাতেই তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা (নম্বর-২৪) করেন এ থানার এসআই মো. শাখাওয়াত হোসেন।
কিন্তু পরে সাদ্দামকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে ২০২৪ সালের একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানামূলে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে হেরোইন উদ্ধারের বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
পরে সাদ্দামের বিরুদ্ধে করা মাদকের মামলাটি ‘গায়েব’ করে একই নম্বরে কাছাকাছি সময়ে একটি ছিনতাইয়ের মামলা করেন এসআই মো. ফেরদৌস জামান। যে মামলায় মামুন হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
একইসঙ্গে প্রথম মামলায় জব্দ দেখানো হেরোইনও ‘গায়েব’ হয়ে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যে এ দুটো মামলা করার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
সাদ্দামের বিরেুদ্ধে করা মাদক মামলার বাদী তৎকালীন মোহাম্মদপুর থানার এসআই শাখাওয়াত বর্তমানে বরিশালে কর্মরত রয়েছেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “ঘটনার দিন আমি, এসআই আলতাফ এবং এএসআই সাত্তার রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের পাশে মোটরসাইকেলে ডিউটি করছিলাম। ওই সময় জেনিভা ক্যাম্প থেকে খবর আসে সেখানে মারামারি হচ্ছে। খবর পেয়ে আমরা ক্যাম্পের ভেতরে গিয়ে দেখি অনেক লোক।
“২০-৩০ জন মিলে তাকে আটকে রেখে মারধর করেছে। তখন এসআই আলতাফ তাদের কাছ থেকে সাদ্দামকে উদ্ধার করে। এরমধ্যে আমরা মোবাইলে সিডিএমএস (ক্রিমিনাল ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) যাচাই করে দেখলাম সাদ্দামের বিরুদ্ধে দুটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে।”
এর ভিত্তিতে সাদ্দামকে নিয়ে জেনিভা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আসেন তারা। পরে সাদ্দামকে নিয়ে থানায় চলে যেতে এসআই শাখাওয়াত ও এএসআই সাত্তারকে বলেন এসআই আলতাফ।
এর প্রেক্ষিতে মোটরসাইকেলে করেই সাদ্দামকে থানায় নিয়ে আসার তথ্য দিয়ে এসআই শাখাওয়াত বলেন, “থানায় নিয়েই আমি সাদ্দামকে ডিউটি অফিসারের কাছে জমা দিয়ে দেই। তখন ওয়ারেন্টের কথা বললে ডিউটি অফিসার বলেন ৫ অগাস্টের আগের যে ওয়ারেন্ট ছিল সেটি পুড়ে গেছে, সেটির বিষয়ে আপনি একটা প্রতিবেদন দিয়ে দিয়েন।
“সে অনুযায়ী আমি সিডিএমএস থেকে ওয়ারেন্টটা প্রিন্ট দিয়ে আদালত বরাবর একটা প্রতিবেদন লিখে দিয়েছি। এর বাইরে এই বিষয় নিয়ে থানার ওসি থেকে শুরু করে কারও সাথেই আমার কোন কথা হয়নাই।”
কীভাবে তাকে মাদক মামলার বাদী বানানো হলো নিজেও ‘জানেন না’ দাবি করে তিনি বলেন, “মামলা করতে হলেতো এজাহার দিতে হয়, আমি এজাহারও দেইনি। জব্দ তালিকাও বানাইনি। কে কীভাবে মামলার বাদী হিসেবে আমার নাম দিল আমি জানিও না।
“বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র অফিসাররা আমাকে ফোন করেছিল। আমি বলেছি যে দোষী তার শাস্তি হোক। ঘটনার দিনের থানার সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলেও আমার গতিবিধি পাওয়া যাবে।”
মাদক মামলা হওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “ঘটনার দিন সাদ্দামকে পাবলিক ধরে মারধর করতেছিল। তাকে আমরা সেখান থেকে নিয়ে আসছি। তার কাছ থেকে আমরা কোনো মাদক উদ্ধার করি নাই।”
অপরদিকে একই নম্বর ব্যবহার করে দায়ের করা ছিনতাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া এসআই রাজু আহমেদ বলেন, “কোনো মামলায় তদন্তভার দেওয়া হলে আমাকে জানানো হতো, কিন্তু এমন কোনো মামলার বিষয় আমার জানা নেই।”
তার ভাষ্য, “মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাকে নিয়োগ করবেন সেটি নির্ধারণ করেন থানার ওসি। পরে থানা থেকে বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়।”
তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদপুর থানার ওসি আলী ইফতেখার হাসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, “বিষয়টি আমলে নিয়ে আমরা তদন্ত করছি, তদন্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
'অভিযোগ নিয়ে গড়িমসি': মোহাম্মদপুরের ওসির অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ