Published : 08 Apr 2026, 11:46 PM
ছোট্ট ইনায়ার প্রচণ্ড জ্বর, সারা শরীরে র্যাশ; কচি হাতে পরানো ক্যানুলা দিয়ে চলছে স্যালাইন, নাকে নল।
নয় মাসের এ শিশুটির অনবরত কান্নায় তার মা আর দাদিও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন। কখনো ছুটছেন নার্সের কাছে, কখনো চিকিৎসক কিংবা কখনো ছুটছেন ওষুধের দোকানে।
শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ড ঘুরে ইনায়াদের মত এমন অবস্থা দেখা গেল প্রায় সবারই।
বুধবার সেখানে দেখা যায়, বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে ১৬টি আইসিইউ মোট ৬০টি শয্যার সবকটি রোগীতে পরিপূর্ণ। কিছু শিশুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও আইসিইউ পাচ্ছে না। সবারই হাতে ক্যানুলা, নাকে নল। শিশুদের চিৎকার-কান্না থামাতে পারছেন না মা-বাবা ও স্বজনেরা।
অভিভাবকদের কেউ শিশুকে সামলাচ্ছেন, কেউ নার্স-চিকিৎসকদের পেছনে যাচ্ছেন, কেউবা ওষুধ কিনতে হাসপাতালের বাইরে ছোটাছুটি করছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর ১১টা থেকে বুধবার দুপুর ১১টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জন হামে আক্রান্ত নতুন শিশু ভর্তি হয়েছে। আগে থেকে ভর্তি ছিল ৬১ জন। সবমিলিয়ে বর্তমানে ৭৮ জন শিশু ভর্তি রয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতালটিতে এপ্রিলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত তিনজন শিশুর মারা গেছে। একজন বর্তমানে ‘লাইফ সাপোর্টে’ রয়েছে।
আইসিইউ ও রোগী ধারণক্ষমতা বাড়ানোর দাবি
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে জেলা পর্যায় থেকে ঢাকার শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত হামে আক্রান্ত কিংবা হামের লক্ষণ নিয়ে আসা শিশুরা ভর্তি হচ্ছে। অনেক শিশুর শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি হলেও আইসিইউ না পেয়ে ওয়ার্ডেই চিকিৎসা চলছে। এমন অবস্থায় আইসিইউ বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন অভিভাবকরা।
ইনায়ার মা মীম আক্তার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চলতি মাসের শুরুতে আমার মেয়ের প্রচণ্ড জ্বর আসে। এক দিন পরে এই হসপিটালে নিয়ে আসছিলাম। তখন ডাক্তাররা দেখে বলছিল হাম নয়। তবে বাসায় নিয়ে যাওয়ার তিনদিন পর আবারও প্রচণ্ড জ্বর আসে, বমি করে হালকা র্যাশও দেখা যায়। বাধ্য হয়ে মঙ্গলবার হসপিটালে নিয়ে আসি। ডাক্তাররা দেখার পরেই ভর্তি করতে বলেছে।”
ইয়ানার দাদি মোর্শেদা আক্তার বলেন, “আমরা শুরুতে বাচ্চাকে হসপিটালে নিয়ে আসছিলাম। তখন ডাক্তার বলেছিল হাম হয়নি। তার কয়েক দিন পর বাচ্চার অবস্থা খারাপ হয়। দ্রুত বাচ্চাকে হাসপাতালে নিয়ে আসলাম, কিন্তু তার যে আইসিইউ প্রয়োজন, সেটা তো পাচ্ছি না।”

তিনি বলেন, “দেশের সব কিছুর উন্নয়নের কথা শোনা যায়। কিন্তু চিকিৎসা নিতে আসলে আমরা নানা ভোগান্তিতে পড়ি। তাই যেখানে জীবন-মৃত্যুর লড়াই হয় সেখানে উন্নতি সবার আগে দরকার।
“হামের পরিস্থিতি বাড়তেছে, কিন্তু ঠিকমত আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই বিভিন্ন হাসপাতালে সবার আগে আইসিইউ বাড়ানো উচিত।”
সন্তানের জ্বর ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে শুরুতে ভোলার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করান মিজানুর রহমান। সেখানে আইসিইউ না পেয়ে সন্তানকে নিয়ে ঢাকার শিশু হাসপাতালে চলে আসেন তিনি।
মিজানুর রহমান বলেন, “ঈদের পরই আমার বাচ্চার জ্বর আসে। শুরুতে ভোলার সরকারি হাসপাতালে বাচ্চার চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। সেখানে বাচ্চার অবস্থা খারাপ হলেও আইসিইউ পাচ্ছিলাম না। তাই বাধ্য হয়ে ঢাকায় চলে আসি।
“এখানে আসার এক দিন পর আইসিইউ পেয়েছিলাম; বাচ্চাও এখন সুস্থ।”
ছয়-সাত মাসের শিশু তাসলিমাও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশু হাসপাতালে। শুরুতে তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও উন্নতি না হওয়ায় ভর্তি ঢাকায় আনা হয়।
তাসলিমার মা সোনিয়া আক্তার বলেন, “সপ্তাহখানেক আগে মেয়ের জ্বর আসে। শুরুতে জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলাম। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হলে ঢাকায় নিয়ে এসেছি।
“হাসপাতালে ভর্তির পর প্রয়োজনীয় পরামর্শের পাশাপাশি অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। বাকি সব ধরনের ওষুধপত্র বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হচ্ছে। ফলে একজন বাচ্চার কাছে থাকতে হচ্ছে, আরেকজনকে বাইরে থেকে ওষুধপত্রসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে আসতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে জরুরি কিছু ওষুধ দিলে আমাদের ভোগান্তি কম হতো।”
হাসপাতালটির সিনিয়র স্টাফ নার্স দোলা বলেন, রোগীর চাপের কারণে প্রতিদিন অতিরিক্ত কাজ করছি। আইসিইউ থেকে ওয়ার্ডের বাইরে পর্যন্ত রোগীর চাপ বেড়েই চলছে।”

‘রোজার ঈদের পর থেকেই রোগীর চাপ’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে মোট শয্যা ৬০টি। এর মধ্যে সাধারণ শয্যা ৪৪টি ও আইসিইউ ১৬টি। গত রোজার ঈদের পর থেকেই কোনো শয্যা ফাঁকা থাকছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হামের আক্রান্ত শিশুদের চাপের কারণে রোজার ঈদ থেকে বিশেষায়িত ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। আগে থেকেই হামে আক্রান্ত শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিল। তবে ঈদের দিনই আলাদা করে ইউনিট করা হয়েছে।”
হামের টিকা দেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “হামের টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস ও ১৫ মাসে। এ টিকা দেওয়ার আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।
“৯ মাসের আগে হামের টিকা দেওয়ার দরকার হয় না। কিন্তু অর্ধেক শিশু তার আগেই আক্রান্ত হয়েছে। তাই টিকা দেওয়ার সময় এগিয়ে নেওয়া যায় কিনা সেটা দেখতে হবে।”
এ চিকিৎসক বলেন, “হামের সাধারণ লক্ষণ হল জ্বর, সর্দি ও র্যাশ উঠবে। এই র্যাশের দাগ কয়েক দিন পর্যন্ত থাকবে। শুধু জ্বর বা ঠান্ডা লাগায় হাম নয়। অনেকে এসব লক্ষণ নিয়ে বাচ্চাদের হাসপাতালে নিয়ে আসছেন। তবে এসব হওয়া বাচ্চাদের ভয় নেই।
“তবে কোনো বাচ্চার জ্বর, র্যাশ ও অস্বাভাবিক শ্বাস- এই তিন লক্ষণ এক সঙ্গে দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। এ ছাড়া অযথা বাচ্চা বাইরের বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে।”