Published : 21 Jun 2026, 08:55 AM
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তাঁর জানাজায় শামিল হয়েছিলাম গতকালকে (২০ জুন,শনিবার)। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর জানাজার আগে কয়েকজন কবি, সংগঠক এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বক্তব্য রাখলেন। জানাজা হলো। শেষ দেখা দেখলাম। তিনি শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছেন। অনন্ত পথে যাত্রার প্রথম ধাপ এই ঘুম। আল মুজাহিদী প্রশান্তির ঘুমে নিস্তব্ধ হয়ে আছেন।
উনত্রিশ বছর আগে এক ট্রান্ক ভর্তি লিটল ম্যাগাজিন ও কবিতার বই নিয়ে গাবতলী বাস টার্মিনালে বাস থেকে নেমেই প্রথম মনে হয়েছিল এ শহর আমার। আমি মিরপুর সাড়ে এগারোতে একটা মেস জীবন শুরু করি। লিটল ম্যাগাজিন সূত্রে সমগ্র বাংলাদেশেই নব্বই দশকের কবিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল। ঢাকায় প্রথম আলাপ হলো কবি বন্ধু শাকিল রিয়াজের মাধ্যমে কবি শান্তা মারিয়ার সঙ্গে। শান্তা মারিয়া পরিচয় করিয়ে দিলেন কবি ফাতিমা তামান্না আপার সঙ্গে। জনকণ্ঠ থেকে দৈনিক বাংলার বাণী, এরপর দৈনিক ইনকিলাব। সেখানে কবি জামালউদ্দীন বারী, কবি মুহম্মদ আবদুল বাতেন ও কবি ফাহিম ফিরোজের সঙ্গে পরিচয়। জনকণ্ঠ, বাংলার বাণী ও ইনকিলাবে ধুমাইয়া লিখতে শুরু করলাম। তরুণ লেখক সংখ্যা বের করতো দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকা। মাসে একবার। সেখানে ঢাউস ঢাউস প্রবন্ধ ছাপতে লাগলেন বন্ধু কবি শাকিল রিয়াজ। দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন ষাট দশকের ভাইসাবখ্যাত কবি শামসুল ইসলাম। সেখানেও লেখা ছাপা হতে লাগলো। শাহবাগে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আড্ডা। আজিজ মার্কেট থেকে পিজির কড়ইতলা পর্যন্ত আড্ডা কবিতা নিয়ে। একদিন শুনলাম আমাদের সমসাময়িক নব্বইয়ের কবিরা ইত্তেফাক সাময়িকীতে লেখা ছাপাতে আগ্রহী কিন্তু সেখানে যান না। কারণ, দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদকের সামনে কবিতা নিয়ে গেলে তিনি ছন্দ নিয়ে প্রশ্ন করেন।
একদিন দৈনিক ইত্তেফাকে :
দৈনিক পত্রিকায় লেখার সাহস ও স্পৃহা প্রথম জাগিয়ে তোলেন আশির দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি ও অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিন ভাই। " মফস্বল থেকে লিখছি " শিরোনামে আমার একটা বিশাল গদ্য দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় প্রকাশ করলেন কবি রাজু আলাউদ্দিন ভাই। সেই সাহসের সিঁড়ি বেয়ে দৈনিক ইত্তেফাকের পাঁচ তলায় সাহিত্য সম্পাদক ও ষাট দশকের গুরুত্বপূর্ণ কবি আল মুজাহিদী ভাইয়ের দরবারে হাজির হলাম। ফর্সা, লম্বা একটা মানুষ। আমাকে আকর্ষণ করলো তাঁর বিশুদ্ধ বাংলায় কথা বলার স্টাইল দেখে। কোথা থেকে আসছি? জিজ্ঞেস করলেন। বগুড়ায় থাকি। এক বছর আগে ঢাকায় এসেছি। তিনি জানতে চাইলেন কী লিখি? বললাম কবিতা ও প্রবন্ধ। এবার তাঁর চশমার পুরু কাঁচ দিয়ে আমার চোখে সরাসরি তাকালেন। প্রবন্ধ নিয়ে কথা বলা শুরু করলেন। কার কার প্রবন্ধ গ্রন্থ পাঠ করেছি। জানতে চাইলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান, হাসান হাফিজুর রহমান, আহমদ ছফা, আবদুস সাত্তার, রফিকুল ইসলাম, আল মাহমুদ নামগুলো গড়গড় করে বললাম। দেখলাম, তিনি হাসছেন। আমাকে বইমেলা নিয়ে একটা গদ্য লিখতে বললেন। সময়টা ছিলো ফেব্রুয়ারী মাস। তিনি আমাকে কিছু আইডিয়া দিলেন। সারা বিকেল বইমেলা ঘুরে ঘুরে আমি নতুন কিছু বইয়ের তালিকা তৈরি করলাম। এরপর রাতে বসে লিখে ফেললাম প্রথম একটা প্রবন্ধ ইত্তেফাকের জন্য। শিরোনাম দিলাম, " বইমেলা প্রাণের মেলা"....। লেখা জমা দিলাম। আমার সামনে আশ্চর্য এক জগৎ তৈরি হলো। শুক্রবারের ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় মুজাহিদী ভাই লেখাটা লিড করলেন। আমি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। শুক্রবার সারাদিন বহুবার লেখাটা দেখলাম। সন্ধ্যায় শাহবাগ গেলাম, সেখান থেকে বইমেলায়। অনেক বন্ধুর সাথে দেখা হলো। জানলাম লেখাটা সবাই পড়েছেন। সেই শুরু। ধীরে ধীরে মুজাহিদী ভাইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগলো। মিরপুর সাড়ে এগারোর মেস থেকে চলে এলাম আরামবাগের মেসে। নব্বই দশকের কবি জামালউদ্দীন বারীর সঙ্গে দুই বছর একই বিছানায় পাশাপাশি। রাত জেগে বইপড়া। আড্ডা। সেই মেসে মাঝেমধ্যে আসতো কবি বন্ধু রথো রাফি।
কবি ফজল শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের অফিসে আড্ডা :
বিকেলটা আমরা তরুণরা হাজির হতাম কবি ফজল শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের দৈনিক বাংলার হারূন ডায়েরির অফিসে। সেখানে কবি আল মাহমুদ, কবি ও কথাশিল্পী আলাউদ্দিন আল আজাদ, আল মুজাহিদীভাই, ত্রিদিব দস্তিদার, ড. মাহবুব হাসান, মাহাবুব বারী, শাকিল রিয়াজ, শান্তা মারিয়া, শাহীন রেজা, জামালউদ্দীন বারী, শাহীন রিজভী, জাকির আবু জাফরসহ অনেক অগ্রজ অনুজদের বৈকালিক কবিতা আড্ডা হতো। আল মুজাহিদী ভাই থাকতেন, কথা বলতেন। তবে অগ্রজরা ছন্দ নিয়ে বয়ান দিতেন। বাংলা কবিতার শিকড় কত গভীরে তা ঐসব আড্ডায় উপস্থিত থেকে বুঝতে পেরেছি।
আল মুজাহিদী ভাই যখন কলিগ:
সাংবাদিকতা করতে গিয়ে একসময় ইত্তেফাক হাউজের সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করতে লাগলাম। তখন কবি আল মুজাহিদী ভাইকে আরো কাছ থেকে দেখার ও বোঝার সুযোগ তৈরি হলো। তিনি প্রতিদিন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় একটা ‘কবি-ব্যাগ’ সঙ্গে আনতেন। বেশ ভারী ঐ ব্যাগে থাকতো নতুন বই, গদ্য লেখা, কবিতা লেখা। মাঝেমধ্যে পাঁচ তলায় তাঁর রুমে যেতাম, তিনি লেখা পড়ছেন গভীর মনোযোগ সহকারে। আমাকে দেখেই বললেন, জহুর এই লেখাটি পড়ে জানাও এখখুনি। কিংবা একটা বই দিয়ে বলতেন নিজের টেবিলে গিয়ে আজকেই এটা পড়ে শেষ করে রিভিউ লিখে দিও। অসংখ্য কিতাবের রিভিউ আমি এই তরিকায় লিখেছি দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকীর পাতায়। তবে আল মুজাহিদী ভাই আমাকে সব সময় গদ্য লিখতে উৎসাহ দিতেন। ২০০৩ সালে আমার প্রবন্ধ গ্রন্থ " আল মাহমুদ এবং অন্যান্য " বের হয়। দুইশ পৃষ্ঠার এই প্রবন্ধ গ্রন্থের অধিকাংশ গদ্য দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত।
ব্যক্তি আল মুজাহিদী, কবি আল মুজাহিদী:
ইহলৌকিক জীবন ত্যাগ করার পর একজন মানুষের এ পৃথিবীতে থাকে তাঁর মহৎকর্ম। ব্যক্তি আল মুজাহিদী ভাই অত্যন্ত সজ্জন ও পরোপকারী মানুষ ছিলেন। কবি আল মুজাহিদী ছিলেন সমসাময়িক কবিদের থেকে আলাদা। তাঁর মুখে কখনো ব্যাক বাইটিং শুনিনি। দৈনিক ইত্তেফাকের টিকাটুলির মোড় থেকে দৈনিক বাংলার ফজল শাহাবুদ্দীন ভাইয়ের অফিস পর্যন্ত বহুদিন একসঙ্গে রিকশায় এসেছি। আমি শুনেছি তিনি তরুণ কবিদের দিয়ে তাঁর ব্যাগ বহন করান। কিন্তু আমাকে কোনোদিন বলেননি। আমিও দেখিনি ইত্তেফাক ভবনে কোনো তরুণ কবি যশপ্রার্থী ব্যাগ বহন করছেন। রিকশায় বসে তিনি কবিতা নিয়ে কথা বলতেন। জীবনানন্দ দাশ থেকে আল মাহমুদ, কখনো শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে শামসুর রাহমান। তিনি কথা বলতেন অত্যন্ত বিশুদ্ধ বাংলায়। ধীরে ধীরে উচ্চারণ করতেন শব্দ। মানুষকে ভালোবাসতেন। কবিতার জন্য তিনি ছিলেন অন্তপ্রাণ। দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় তাঁর হাত দিয়ে যে কবির কবিতা বা গদ্য প্রকাশিত হতো, তাঁরা নিজেদের নিয়ে গর্ব অনুভব করতো। কারণ, সমসাময়িক সাহিত্য সম্পাদকদের মধ্যে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা ও বৈচিত্র্যময়। ছন্দ না জানা কবি তাঁর দফতরে পৌঁছালে ঝামেলায় পড়তো। গদ্য ঢঙে কবিতা লেখার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন না। তিনি চাইতেন একজন তরুণ কবি যেন ছন্দটা ঠিকঠাক জেনে নেয়। অঙ্কুরেই যদি বুনিয়াদ মজবুত না হয় তাহলে বৃক্ষের পতন হতে পারে। এটা তিনি ভাবতেন। তিনি কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, সৈয়দ শামসুল হককে সমীহ করতেন। গদ্য চর্চা যাঁরা করতেন তাঁদের তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন।
মহাকালের দরোজায় কবি:
"হেমলকের পেয়ালা "খ্যাত কবি আল মুজাহিদী একশ গ্রন্থের জনক। একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত তিনি। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় তিনি সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা। বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন শত্রুর সঙ্গে। ছাত্র জীবনে রাজনীতি করতেন। তুখোড় ছাত্র নেতা ছিলেন। কিন্তু কবিতার মায়ায় আক্রান্ত হয়ে তিনি রাজনীতির প্রদীপের উজ্জ্বল তারকা হয়েও কবিতার মতো অবৈষয়িক এক মোহের পেছনে চিরটাকাল কাটিয়ে গেলেন। কি পেলেন কবিতায়! তাঁর কবিতা জাতি রাষ্ট্র গঠনে আগামীর সময়ে কতোটা ভূমিকা রাখবে তা তরুণ প্রজন্ম তাঁর কবিতা পাঠ করলে জেনে যাবেন। তিনি কবিতার মধ্যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। দেশ কাল ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে চিত্র নির্মাণ করেছেন কবিতায়। যা বহুকাল এ সমাজ বিনির্মাণে পথ দেখাবে। তাঁকে নিয়ে আমার আরো অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে। লেখাটি শেষ করছি তাঁর কবিতার কিছু অংশ উদ্বৃত্ত করে।
"উঠুন বসুন দেখুন জাগুন
আপনার চারিদিকে
সারা পৃথিবীর কেউ ভালো নেই
স্বাস্থ্যে ও শারীরিকে"