Published : 16 Jul 2026, 04:06 PM
বছর বিশেক ধরে আমাদের এখানে প্রচুর কবিতা ছাপা হচ্ছে। বাজারে এখন অনেকগুলো দৈনিক কাগজ যাদের সাহিত্যসাময়িকী আছে। লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যাও কম নয়। এই-যে এত কবিতা এর বেশির ভাগের মধ্যে সাহিত্যগুণের বড় অভাব। এসব কবিতা রুচিশীল পাঠকের মনে সাড়া জাগাতে পারছে না। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে। তার সংখ্যা হতাশাদায়ক। বড় সমস্যা কোথায়? সাম্প্রতিকতার উর্ধ্বে উঠে চিরকালিক হতে না পারার? নাকি তা যোগাযোগের সমস্যা? কবিতার কম্যুনিকেশনের সমস্যাটিতে অবশ্য নতুন মাত্রা যোজিত হয়েছে যেহেতু একালের কাব্য অনেক বিচিত্র বিষয় আর সমস্যা নিয়েই কেবল ভাবিত নয় তার শিল্পমান নিয়েও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। কবিতার দশা, আপাতত, ঘুষঘুষে জ্বরে ভোগা রোগীর মতো। গোসল, খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা সবই চলছে কিন্তু স্বাস্থ্য ঠিক থাকছে না। ফলে মেজাজ সর্বদাই খিটখিটে। কবিতায় একটা প্রসন্নতার ভাব এবং ভাবনার লাবণ্যময় দীপ্তি থাকবে। কিন্তু কবিতা ইতিমধ্যে অনেকখানি লাবণ্য হারিয়ে নিষ্প্রাণ, খরখরে হয়ে উঠেছে। অপ্রাসঙ্গিক শব্দের বাহুল্য ও নীরসতা এজন্য দায়ী। বিতরণ, ঠাট্টা, মামুলি, থিতু, হাউকাউ, ড্রাকুলা, ফাটাফাটির মতো বেশ কিছু শব্দের সচ্ছন্দ প্রয়োগ লক্ষণীয় অনেকদিন ধরেই। অধুনা তাতে যুক্ত হয়েছে তৃণ, উড্ডয়ন, বৃক্ষ, তস্কর, কিঞ্চিত, প্রকার, বাস্তবিক, কদম্ব-এর মতো তৎসমঘেঁষা শব্দ। অতি ব্যবহারে জীর্ণ, প্রায় তাৎপর্যহারা থিমগুলো পুনরায় না কচলিয়ে কবিরা নতুন বিষয়ার্থ খুঁজছেন কিংবা অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। আবার অনেকেই, এরা বয়সে তরুণ; নিসর্গ, প্রেম, স্মৃতি, ভালোবাসা প্রভৃতি আবহমান বিষয়বস্তুকে পাশ কাটিয়ে অদ্ভুত এক ভাবপরিস্থিতি সৃষ্টি করতে তৎপর। এসবই নতুন কবিতা সৃষ্টির লক্ষে। কিন্তু মনে রাখা জরুরি, নতুন কবিতা কদাচিৎ নতুন ধরনের কবিতা। প্রসঙ্গত কবিতাকে ‘অন্যরকম’ করে তোলার ষাটদশকী প্রয়াসের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ষাটের দশকের কবিদের অধিকাংশের কবিতা প্রয়োজনীয় পরিমাণ পরিচর্যা পায়নি। আমাদের অব্যবহিত আগের প্রজন্মের কবিদের অদূরদর্শিতা আর ভাবলোকের দারিদ্র্য আমাদের বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, সহজ দার্শনিকতাময় অনুভব কিংবা সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের প্রতি সহমর্মিতা হৃদয়ে ধারণ করেও তাদের কবিতা অনন্য হয়ে উঠতে পারলো না। অথচ উপাদান ও আয়োজন ঠিকই ছিল। ছিল না প্রকাশরীতির অনবদ্যতা। ভাবনা-চিন্তা এবং কাব্যবিশ্বাস থেকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা কবিতার এক নিজস্ব পরিমণ্ডল (বহুজনগ্রাহী চমৎকার কাব্যভাষা যার অন্যতম চারিত্র) যে কোনো ভাষায় অল্প কয়েকজন কবির মধ্যেই দেখা যায়।
শিল্পের নিয়তিই এমন যে, সুদীর্ঘকাল পর পর দু’একটি নতুন সূর্যের আবির্ভাব ঘটে। আমার এমনও মনে হয়েছে, কম্পিউটার যুগে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বিশ্বাস্য অগ্রগতির সঙ্গে কবিতা পেরে উঠছে না। যেন যন্ত্রসভ্যতার বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে সুস্থিরভাবে শ্বাস ফেলে বাঁচা কবিতার জন্য আজ বড় কঠিন। অথচ এটাই সত্য যে কবিতা বিজ্ঞানকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে না। বরং প্রয়োজনে বিজ্ঞানের বিশেষ জ্ঞানকে সঠিকভাবে ধারণ করে সে ফলায় আধুনিকতম কাব্যদর্শন যা বিজ্ঞানমনস্ক সাহিত্যরসিকের আনন্দের উৎস হতে পারে। এমন উৎসের সেরা নিদর্শন বোধ করি নিকানোর পাররা, পল ভালেরি, অনন্য রায়ের মতো কবিদের রচনা। কিন্তু মেধাউজ্জ্বল, মর্মস্পর্শী কোনো ভাবনাখণ্ড উপহার দিতে পারলেই সেই কবিতা স্মরণীয় হবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই। কারণ রহস্যবিমুখ নীরস হৃদয় থেকে গান উত্থিত হয় না; কদাচিৎ হলেও তা প্রাণ ছোঁয় না।
কবিতার নতুন শিল্পপ্রচেষ্টাকে আমি স্বাগত জানাই। তবে নতুনতাকামী নবীন কবিরা তাদের লেখকজীবনের একেবারে গোড়াতেই যেভাবে আলাদা হতে চান তা খুব বিপজ্জনক। এখানেই ঐতিহ্যের প্রশ্নটি চলে আসে। নবীন কবি অতীতের শ্রেষ্ঠ কাব্যসম্ভারের কথা মাথায় রেখেই আগামী কবিতার নতুন ধরন সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। টি এস এলিয়ট নতুন কবিতা সৃষ্টির প্রসঙ্গে ‘individual talent’-এর ওপর খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন কিন্তু ‘tradition’ ব্যাপারটাকেও ভুলে যান নি। অতীতের সঙ্গে সমস্ত যোগসূত্র ছিন্ন করে কোন শিল্পীর পক্ষেই নতুন কিছু সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। একটি শক্তিশালী লাটিম বৃত্তের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে এক সময় বৃত্তের বাইরে চলে আসে। নতুন ভাবনা-ভঙ্গির কবিতাও সেরকম। প্রতিভাবান নবীনদের মাথায় রাখা ভালো, বাংলা কবিতার নতুন পথ তৈরিতে এখন আর ইংরেজি, ফরাসি বা মার্কিনী কবিতা দিক নির্দেশনা দিতে পারবে না। এখন বরং পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশের; কোরিয়ার, চীনের, জাপানের এবং বাংলার বাইরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষার কবিতার দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার। একশ’বছর আগের বাংলা কবিতার উজ্জ্বল সরণি থেকেও সৃষ্টিশীলতার নতুন কিছু ইঙ্গিত মিলতে পারে।
একটা সময় ছিল যখন কবিতাকে সচেতনভাবেই পশ্চিমী ভাবধারায় আধুনিক করে তুলবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন লেখকরা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক এবং তার অব্যবহিত পরের অনেক কবি সমকালের সারমর্ম ভালো করে অনুধাবন করতে পারেন নি। সেজন্যই বোধ হয় মোহিতলাল মজুমদারের মতো লেখক কবিতায় অতীতাশ্রয়ী হয়েছেন কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো কবি মুখ্যত ছন্দ নিয়ে মেতেছেন। তাদের কবিতা সেকালের কতিপয় উজ্জ্বল অনুষঙ্গে আচ্ছন্ন ছিল। স্বযুগের নানা স্থূল লক্ষণে আক্রান্ত ছিল বলেই সেই অর্থেই তাদের কবিতা আধুনিক। মুশকিল হচ্ছে, এ ধরনের আধুনিকতা একটা বিশেষ সীমায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেই সময় অতিক্রান্ত হলেই আঙ্গিকের কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছাড়া তাতে অন্য কোনো তাৎপর্য অবশিষ্ট থাকে না। যে চিরভাস্বর অনুভবের ও উক্তির এবং সর্বযুগের মানুষের হৃদয়সম্মত বহুজনীন সত্যের উদ্ভাসের কারণে কীটস বা মধুসূদন আজও আধুনিক সেই ধরনের সুগভীর ভাবনার নানন্দিক উপস্থাপনা আজ কবিতার অস্তিত্ব জিইয়ে রাখার প্রশ্নে খুব প্রয়োজন।
কল্লোলপরবর্তী শব্দকোবিদগণ, বিশেষত পঞ্চাশের ও ষাটের অগ্রগণ্য কবিরা (শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, বিনয় মজুমদার, উৎপলকুমার বসু, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, ভাস্কর চক্রবর্তী প্রমুখ) কবিতার শরীর নির্মাণের ক্ষেত্রে যে ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করেছেন, কেউ কেউ এখনো করছেন, তা অনুসরণ করে যে কোনো তরুণ ভাবুকের পক্ষে দু’চারটি কবিতা লিখে ফেলা কঠিন কিছু নয়। এখন সত্যিই তার কাব্যপ্রতিভা আছে কিনা, সে কবিতার সঙ্গে সুদীর্ঘকাল জীবনযাপন করবে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে খেয়ালের বশে দু’চারটি কবিতাপ্রতিম রচনা লিখে ফেলে পরে কবিতার দিকে অগ্রসর হয়েছেন এবং এক পর্যায়ে শিল্পসচেতনও হয়েছেন এমন কবি খুঁজে পাওয়া খুব কষ্টকর হবে না। কিন্তু যিনি সত্যিই কবির প্রতিভা নিয়ে জন্মেছেন তাকেও আজ কোনো কিছু না ভেবে-চিন্তে সে যুগের স্বভাবকবিদের মতো লিখে যাওয়া চলবে না। বিচিত্র ভাবনা-কল্পনা,অভিজ্ঞতার আলো, নানা ঘটনার সংস্রব ইত্যাদি মিলিয়ে যে কবিতা রচিত হয় তা সেই ধরনের টেক্সট যার ভেতর লুকিয়ে থাকে সৃষ্টিমান, অনন্য চিন্তাবীজ। আজকের বাংলা কবিতায় এই চিন্তাবীজের বিরল উপস্থিতি উদ্বেগজনক। অসংখ্য লেখক আজও তেমন কিছু না ভেবেই, শিল্প-অশিল্পের তোয়াক্কা না করেই লিখে চলেছেন। এ অবস্থা রীতিমতো হতাশাব্যঞ্জক। এ তো গেল নবীন কিংবা একেবারে নতুন লিখতে আসা কবিদের কথা। কিন্তু যারা ৩০/৪০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে লিখছেন তাদের মধ্যেও অল্প কয়েকজন ব্যতিরেকে অন্যরা কবিতার ভেতর অনন্য ভাবনায় সমৃদ্ধ দর্শনভূমি রচনা করতে পারেন নি। একজন আবিদ আজাদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, মুস্তফা আনোয়ার কিংবা আলতাফ হোসেন জীবনঘনিষ্ঠ উচ্চারণের অমোঘতার দিকটির চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী ছিলেন বিশুদ্ধ শিল্প সৃষ্টির দিকে। অন্যদিকে আবুল হাসান, রফিক আজাদ, মোহাম্মদ রফিক, সিকদার আমিনুল হকরা জীবনবাস্তবতার স্বরুচিনির্ণীত ভাষ্য তৈরি করেছেন। উল্লিখিত কবিরা তাদের কাব্যদৃষ্টির ক্ষেত্রে মোটামুটি পরিচ্ছন্নতার ও স্বচ্ছতার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন। তো ভাবলোকের এই স্পষ্টতা আত্মরক্ষার স্বার্থেই জরুরি। দীর্ঘকালের অবিচ্ছিন্ন অনুশীলনের ভেতর দিয়েই একজন কবি এটা অর্জন করতে পারেন। সন্ধিৎসু মন নিয়ে সেই ভাবলোকে ইচ্ছে মতো বিচরণও করতে পারেন।
কবির জীবনদৃষ্টি কেমন সে প্রশ্নে না গিয়েও হাল ফ্যাশনের কাব্যভাষা, কলাকৌশল, চিত্রকল্প প্রভৃতির মোটামুটি সফল প্রয়োগের বিচারে একটি কবিতাকে আমরা আধুনিক বলতে পারি। চমৎকার ভাবনা, যুগচলতি কাব্যভাষা এবং উপস্থাপনার সারল্য-এ কালের আধুনিক কবিতায় কমপক্ষে এই তিনটি গুণ থাকলেই আমরা সন্তুষ্ট। কেননা যে অস্পষ্ট সময়ে আমরা বেঁচে আছি, তাতে শেক্সপিয়ারের বা হোমারের মতো বহুযুগজয়ী (এবং বৃহৎ অর্থে আধুনিক) কবিতা রচনা নানা কারণে অসম্ভব। মহাকাব্যের যুগ অবসিত হওয়ার পর বোধ হয় তার দরকারও নেই। এ মুহূর্তে বরং প্রয়োজন যুগোপযোগী মননশীলতার বেশি বেশি চর্চা। সচেতন ও নিয়মিত চর্চাই কেবল পারে কবিতাকে তার ভাবাবেগজনিত স্থূলতা থেকে মুক্তি দিতে। ওই জাতীয় মননশীলতা কিন্তু ভাষাকে কেন্দ্র করেও দেখা দিতে পারে, যেমন দেখা দিয়েছিল সীমাস হিনীর ক্ষেত্রে। নোবেল লরিয়েট আইরিশ এই কবি তার প্রথম দিকের বই ‘Death of a Naturalist’, ‘Wintering Out’--এ শব্দের বস্তগত আকার এবং ভাবনার অর্থ নিয়ে অনেক ভেবেছেন। বিমূর্ততার চেয়ে আকৃতি এখানে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে এমন মনে হয়। পরবর্তী সময়ে ‘‘Field Work’ (১৯৭৯) কাব্যগ্রন্থে দেখা যাচ্ছে, হিনী কথ্যভাষাঘেষাঁ নিজস্ব বাচনভঙ্গি খুঁজে পেয়েছেন এবং সুচিন্তিতভাবেই তা প্রয়োগ করেছেন। আর এ বইয়ে শব্দের আকৃতির চেয়ে ভাবনার ধরন আমাদেরকে বেশি ভাবায়। ভাষাগত এ উচ্চাভিলাষ উৎপলকুমার বসু, ফরহাদ মজহার, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল প্রভৃতি কবির ভেতরেও লক্ষযোগ্য, বিশেষভাবে উৎপলকুমার বসুর মধ্যে। তবে তাঁদের ভাষার পাশাপাশি কাব্যভাবনাও হৃদয় স্পর্শ করেছে এমন অভিজ্ঞতা খুব বেশি ঘটে নি। একটু আগে সময়োপযোগী মননশীলতার কথা বলা হয়েছে। তার একটা উদাহরণ সীমাস হিনীরই ‘Exposure’ কবিতার মাধ্যমে দেবো। এ কবিতায় লেখক বলছেন ‘I am neither internee nor informer/An inner emigre grown long haired/ and thoughtful’ উত্তর আয়ারল্যান্ড ছেড়ে আসার পরে হিনী কবিতাটি লিখেছেন। সেই সময়ের দাবি এ রচনায় পরিস্ফুট। উদ্ধৃত অংশের ‘inner emigre’ ফ্রেজটি লক্ষ্য করুন। কথাটা কবিতাটির শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। কেননা সব যুগে দেশত্যাগী ভাবুক মাত্রই ‘inner emigre’.
অনেকবছর ধরে দেখছি আমাদের অধিকাংশ কবিতা সাম্প্রতিকতাচিহ্নিত। পুলিশী নির্যাতনে হাজতে কোনো যুবতীর মৃত্যু কিংবা টুইন টাওয়ার ধসে পড়া কিংবা সুনামীর ধাক্কায় অনেক মানুষের সলিল সমাধির মতো টাটকা ঘটনায় আপ্লুত হয়ে কবিরা দ্রুত টেবিলে বসে যান। মর্মন্তুদ ঘটনায় আপ্লুত হওয়া মানবিকতার পরিচায়ক। আপ্লুত কবিতা কিন্তু মেধাবী কবির পরিচায়ক নয়। একজন যুগচেতন কবি স্বর্ণক্যাপসুল, হেরোয়িন বা কম্পিউটার নিয়ে কবিতা লিখতে পারেন। বাংলাদেশের আশির প্রজন্মের অগ্রগণ্য তিনজন কবি এগুলো নিয়ে লিখেছেনও। সাম্প্রতিকতাচিহ্নিত এই আধুনিকতা সমীচীন স্মরণযোগ্যতা দাবি করতেই পারে। হেরোয়িন সেবন-উত্তর অনুভূতির বিহ্বল বয়ানও উৎকৃষ্ট কবিতার উপজীব্য হতে পারে তা দেখিয়েছেন কাজল শাহনেওয়াজ।
উন্নত সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সুরুচি অক্ষুণ্ন রাখার কোনো বিকল্প নেই। শুধু রুচি থাকলেই চলবে না। শিল্পসচেতনতা ও আত্মসমালোচনার খুঁতখুঁতে চোখও থাকতে হবে। আসলে একটি রচনাকে যথাসম্ভব কবিতা করে তোলার জন্য সবকটি ইন্দ্রিয়কে খুব সজাগ রাখা চাই। তার কারণ এর সঙ্গে অবলোকনের, অনুভবের এবং নির্বাচনের প্রশ্নটি জড়িত। অবলোকনের চোখ ছাড়াও গন্ধ বা ধ্বনি বা নিরাকার অন্য কোনো কিছু দেখতে সক্ষম আরেকটি চোখ যদি তৈরি করে নেয়া সম্ভব না হয়, তাহলে কবিতার এক বিশাল ভূখণ্ড অনাবিষ্কৃতই থেকে যাবে ।
ওদিকে কোলরিজ থেকে ক্রেগ রেইন, এদিকে মধুসূদন থেকে ময়ূখ চৌধুরী যার কথাই বলি না কেন গভীর জীবনচেতনা এবং শৃঙ্খলাবোধ তাদেরকে এ পর্যায়ে এনেছে। ভাবনা-কল্পনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার অভাব গড়পড়তা বাংলা কবিতায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। আইরিশরা কিংবা ফরাসিরাও কম আবেগী নয়, কিন্তু দেখুন তাদের কবিতায় হৃদয়াবেগ অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত। ফলে সেসব কবিতা সংযত ভাবের ও দৃষ্টি-কল্পনার ভালো নিদর্শন।
বিদেশি কবিতা যেখানে-যেখানে সৃজনশীলতার শিখর স্পর্শ করেছে সেই জায়গাগুলোর সঙ্গে আমাদের কবিতার শক্তি ও দুর্বলতার তুলনামূলক বিচার জরুরি হয়ে পড়েছে। আমি কবিতায় বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। বাঙালি অনেক হঠকারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মতো কবিতার ক্ষেত্রেও হৃদয়াবেগের ভুল প্রয়োগ ঘটিয়েছে অসংখ্যবার। এবার আমরা বুদ্ধিমত্তার সঠিক প্রয়োগ দেখতে চাই কবিতায়। কিন্তু না-হৃদয়াবেগ না বুদ্ধিবৃত্তি কোনটাই অধুনাতন কাব্যপরিমণ্ডলে উল্লেখ্য প্রভাব ফেলতে পারছে না। প্রতীকের ইশারা, রূপকের আলোছায়া, উপমার অভিনবত্ব, আঙ্গিকের রদবদল, অভিজ্ঞতার প্রাতিস্বিক রূপরেখা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কবিতা এখন কদাচিৎ স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর হয়ে উঠতে পারছে। কারণ স্বভাবপ্রতিভার এবং আত্মনিবেদনের ঐকান্তিক অভাব এখন চারদিকে। সার্থক কবিতা সৃষ্টির জন্য একটি বিশেষ ভাবনাকে অর্থময় করে তোলে এই স্বভাবপ্রতিভা। তা একেক জনের বেলায় একেকভাবে ঘটে। কিন্তু একটা জায়গায় ঐক্য আছে; তা হলো উপলব্ধির খাঁটিত্ব এবং আকর্ষণী কাব্যভাষার আনন্দপ্রদ অভিব্যক্তি। আক্ষেপের কথা, এ দু’টি জিনিস আজকাল বাংলাদেশের কবিতায় বড় দুর্লভ।
এখন যারা লিখছেন তাদের মধ্যে শতকরা ৫/৭ জন কবি জানেন কীভাবে একটি পংক্তি লিখতে হয়, কীভাবেই বা তাকে বক্তব্যের অর্থসঙ্গতির সঙ্গে মেলাতে হয়। বাকিদের লেখা স্রেফ বিরক্তিউদ্রেককর। নবীনদের অনেকেরই কবিতা যেন বিন্যস্ত গদ্য, এক ধরনের ছাঁচে ফেলা রচনা। স্য ঝন পার্স, অরুণ মিত্র, সিকদার আমিনুল হকরা এরকম টানা গদ্যে কবিতা লিখতেন। অগ্রজ কবিদের এই ফেলে আসা সরণিটি এ কালের অল্প বয়সী কবিরা কী ভেবে চর্চাযোগ্য মনে করছেন আমার জানা নেই। টানা গদ্যের এই ফর্মে নতুন কিছু যোজিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। গদ্যে আমার মোটেই আপত্তি নেই, আপত্তি গদ্যে লেখা পঙ্ক্তিনিচয়ের ভেতর কবিতার বর্ণচ্ছটার অনুপস্থিতিতে।
কবিতা-যে অনেক রকমের সে কথা অনেক লেখকেরই মাথায় থাকে না। এজরা পাউন্ড প্রমাণ করেছিলেন রবার্ট ফ্রস্টের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে উৎকৃষ্ট কবিতা লেখা সম্ভব। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বা শহীদ কাদরীর ঘরানার বাইরে নতুন ভঙ্গির ভালো কবিতা লেখা হয়েছে উভয় বঙ্গেই। তাই আজ চিত্রকল্পদীপ্ত, প্রতীকভাস্বর ও চিন্তাঋদ্ধ নতুন কবিতার স্বার্থে সন্ধিৎসু অনুশীলন জোরদার করা বাঞ্ছনীয়।