Published : 12 Jun 2026, 10:48 PM
ডেভিড হকনি ৮৮ বছর বয়সে আজ চলে গেলেন রংয়ের জগত থেকে বর্ণহীন লোকান্তরে। পাবলো পিকাসো বা সালবাদর দালির পর জীবদ্দশায় বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে ডেভিড হকনি সেই শিল্পী যার চিত্রকর্ম সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রি হয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁর একটি চিত্রকর্ম ৭০ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি হয়েছিল, জীবিত কোনো শিল্পীর জন্য এটাই ছিল সর্বাধিক মূল্যে বিক্রি হওয়া শিল্পকর্ম। ষাটের দশকে পপ আর্ট আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন ডেভিড হকনি। পপ আর্টে শিল্পীরা স্বেচ্ছাকৃত লঘুতাকে বিষয় করলেও হকনির কাজগুলো লঘুতা পেরিয়ে শৈল্পিক এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছিল যা তাঁকে একই সঙ্গে জনমুখিতার জন্য সমাদৃত যেমন করেছে, তেমনি রসজ্ঞদের কাছেও করে তুলেছে গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্স বা স্পেনের মতো যুক্তরাজ্যও অসংখ্য শিল্পীর জন্মভূমি হলেও ডেভিড হকনির মতো এতটা জনপ্রিয়তা আর কোনো ইংরেজ শিল্পীই অর্জন করতে পারেননি। তাঁর বহু চিত্রকর্মের বিষয় সুইমিং পুল। সেগুলোয় রংয়ের বিন্যাস, ঔজ্জ্বল্য আর মুনশিয়ানা রীতিমত চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার মতো। কোনো এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার আলো ও রংয়ের আলাদা বৈশিষ্ট্য দেখার জন্য সেখানে এসেছিলেন। তাঁর চিত্রকর্মে ক্যালিফোর্নিয়ার শহরতলির দৃশ্যপট প্রশান্তি ও অতিচাঞ্চল্যের এক অদ্ভূত মিশ্রণ লক্ষ্য করা যাবে।

ডেভিড হকনির আঁকা Garrowby Hill
১৯৬০-এর দশকে আঁকা তাঁর অ্যাক্রিলিক ক্যানভাসগুলো থেকে ছায়া যেন উধাও হয়ে গেছে। মসৃণ তলগুলো পাশাপাশি প্যাচওয়ার্কের মতো জায়গা করে নিয়েছে, এর ফলে আমাদের মধ্যে দূরত্বের যে-ধারণা রয়েছে সেটাকে তিনি গুলিয়ে দেন। হকনির চিত্রকর্ম দেখলেই এর স্বাতন্ত্র্য যে-কারোর নজরে পড়বে। বারোক রীতি যেমন তাঁর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে, তেমনি আছে কিউবিজমের উপস্থিতি। তিনি নিজেকে কোনো এক রীতিতে আবদ্ধ রাখেননি। পিকাসোর মতো নানা শৈলীতে তিনি ভ্রমণ করেছেন। প্রথা ভাঙা ছিল তাঁর স্বভাবের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর এক দুঃসাহসী উদাহরণ হচ্ছে ৬০এর দশকে সমকামিতাকে বিষয় করে তাঁর বেশ কিছু চিত্রকর্মের সৃষ্টি যখন কিনা এই বিষয়ে সমাজ অতটা উদার ছিল না।
তাঁর এই চিত্রকর্মের হদিস পেয়েছিলাম আমি যখন ৯০/৯১ সালে গ্রিক কবি সি. পি. কাভাফির কবিতা অনুবাদ করছিলাম। কাভাফি সংক্রান্ত কোনো এক লেখায় জেনেছিলাম যে তাঁর সমকামী কিছু কবিতা অবলম্বনে ইংরেজ এই শিল্পী কিছু ছবি এঁকেছিলেন। সত্যি বলতে কি, কাভাফির সূত্রেই আমার হকনি আবিষ্কার। ঢাকার ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে গিয়ে ডেভিড হকনির চিত্রকর্মের বেশ কিছু বই পেয়ে গেলাম। সেখানেই দেখতে পেলাম সমকামীদের নিয়ে তাঁর সেই চিত্রকর্মগুলো। তবে তিনি কেবল কাভাফির সমকামবিষয়ক চিত্রকর্মই আঁকেন নি, গ্রিক এই কবির অন্য কিছু কবিতাকেও বিষয় করে ছবি এঁকেছিলেন। আমি যখন কাভাফির নির্বাচিত কবিতার বাংলা তর্জমা গ্রন্থাকারে ১৯৯২ সালে প্রকাশ করি তখন হকনির একটি চিত্রকর্ম দিয়েই তার প্রচ্ছদ করেছিলাম। আর গ্রন্থের শেষে পরিশিষ্ট হিসেবে কাভাফি ও হকনির যুগলবন্দী শিরোনামে একটি ছোট্ট লেখা তাতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। সম্ভবত হকনি নিয়ে ওটাই বাংলায় প্রথম লেখা।

ডেভিড হকনির আঁকা A bigger Splash
৯০/৯১ সালে তাঁকে আবিষ্কারের পর থেকেই তিনি আমার কাছে জীবিত শিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রধানত প্রাকৃতিক জগত থেকেই তিনি আঁকার বিষয় আহরণ করেছেন, কখনো কখনো শহরের বিষয়বন্তুও এসেছে তাঁর ক্যানভাসে। ইয়র্কশায়ারের ঝকঝকে ভূদৃশ্য থেকে শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়ার বিস্তৃত দৃশ্যপটের উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ রং হকনির কাজে যে-সৌন্দর্যে ও জটিল বিন্যাসে ধরা পরেছে তা একই সাথে যেমন পরিচিত বলে মনে হবে, আবার তা একই সাথে নতুন। তিনি বহু মাধ্যমে ও শৈলীতে কাজ করেছেন। তাঁর ভূদৃশ্য বা ল্যান্ডস্ক্যাপগুলো অসম্ভব চক্ষু জুড়ানো রংয়ের প্রলেপ ও বিন্যাসে অভিনব। কখনো কখনো তাঁকে ভ্যান গঘের সাথে তুলনা করা হয়। এবং তা যথার্থ কারণেই, যদিও হকনি বিনয়ের সাথেই সেই তুলনাকে আতিশয্য বলে মনে করতেন। কিন্তু তাঁর ভূদৃশ্যগুলো প্রাকৃতিক জগতের সারাৎসারকে এমন এক উপায়ে স্পর্শ করেছে যা একই সাথে যেমন তীব্র, তেমনি তা বিমূর্তও। তাঁর রংয়ের ব্যবহার ভীষণভাবে নজরে পড়ার মতো।
তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর একটি হচ্ছে ‘আ বিগার স্প্ল্যাশ’(১৯৬৭), যেখানে হকনি এক ব্যক্তির সুইমিং পুলে ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তটি তুলে ধরেছেন, যা জলের শান্ত উপরিভাগকে আলোড়িত করে একটি ঢেউ তৈরি করে। চিত্রকর্মটি বিন্যাসের এক অনবদ্য নিদর্শন, যেখানে ঢেউয়ের আছড়ে পড়া অংশটিই প্রধান আকর্ষণ এবং এটি পটভূমির নিখুঁত জ্যামিতিক শৃঙ্খলার সাথে একটি বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে। তাঁর এই ধারার আরেকটি চিত্রকর্ম হচ্ছে Portrait of an Artist (Pool with Two Figures)। এই ছবিতে হকনি গভীরতা এবং জলের উপরিভাগ নিয়ে নিজের বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণকে তুলে ধরেছেন। নিউইয়র্কে একটি প্রদর্শনীর পরিকল্পিত উদ্বোধনের আগে হকনি টানা ৪ সপ্তাহ ধরে দিনে ১৮ ঘণ্টা করে এই চিত্রকর্মটির ওপর কাজ করেছিলেন। এতে দেখা যায়, এক লোক সুইমিং পুলের ধারে দাঁড়িয়ে জলে সাঁতার কাটতে থাকা অন্য একটি প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে আছে। রঙ এবং বিন্যাসের ব্যবহারে এর গঠনশৈলী এমনভাবে তৈরি হয়েছে যা পুরুষ আকৃতিটিকে ধারণ করার দুটি ভিন্ন পদ্ধতির প্রতি দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ডেভিড হকনির আঁকা Portrait of an Artist (Pool with Two Figures)
হকনি তাঁর ৮৮ বছরের দীর্ঘ জীবনে প্রায় আট হাজারের মতো শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন। কাজ করেছেন শিল্পের নানান মাধ্যমে, এর মধ্যে ফটোগ্রাফি যেমন আছে, তেমনি আছে প্রিন্ট ম্যাকিং, মঞ্চ সজ্জা, এমনকি ডিজিটাল শিল্পকর্মও। জীবিত শিল্পীদের মধ্যে এত বৈচিত্র ও বিপুলতা খুব কমই দেখা যাবে। ইংরেজ শিল্পীদের মধ্যে ডেভিড হকনি চিত্রকলার জগতে চিরস্মরণীয় হবে থাকবেন তাঁর সৃষ্টিশীলতা ও স্বাতন্ত্র্যের জন্য।