বিশ্ববিহারী সৈয়দ মুজতবা আলী
সৈয়দ মুজতবা আলী [১৯০৪-১৯৭৪] বাংলা সাহিত্যের ব্যতিক্রমী লেখক ও ব্যক্তিত্ব। অপ্রিয় হলেও প্রচারণা হলো, তিনি রম্যলেখক। অনেকেই রিলে দৌড়ের মতো পরম্পরায় এ অভিধা প্রচার করে চলেছেন। এ-কথার চাদরে যেন হারাচ্ছি গদ্যশিল্পী সৈয়দ মুজতবা আলীকে। বস্তুত তিনি মনোজগতে ভবঘুরে হলেও খুব গাঠনিক ব্যক্তি ও লেখক ছিলেন। রম্যলেখক অভিধায় তাঁর গদ্যসত্তার প্রতি উদাসীনতাই প্রকাশ করা হচ্ছে। মূলত তিনি ছিলেন বৈশ্বিক-জ্ঞানপ্রাচুর্যের অনুসন্ধানী। তাঁর রচনাশৈলী, ভাষার কারুকাজ, প্রচুর তথ্যের সংযোজন ও বিস্তার রচনাসমূহকে অসামান্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। ভাষা, রম্য অনুষঙ্গ, বৈশ্বিক প্রসঙ্গের সংলগ্নতা থেকে সৈয়দ মুজতবা আলীকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যায়। তিনি লেখার মাধ্যমে আমাদের নিয়ে চলেন বিশ্বের বিভিন্ন স্থান, স্থাপনা, ভূগোল, জাদুঘর, চিরায়ত সভ্যতায়। ফলে সৈয়দ মুজতবা আলীর রচনা শুধু সাহিত্যপাঠ নয়; যেন বৈশ্বিক তথ্যের অনন্য আর্কাইভ। তাঁর রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : অবিশ্বাস্য, শবনম, শহর-ইয়ার , তুলনাহীনা, চাচাকাহিনী, পঞ্চতন্ত্র , ময়ূরকণ্ঠী, টুনিমেম, দ্বন্দ্বমধুর , চতুরঙ্গ ইত্যাদি। তিনি অর্জন করেছেন একুশে পদক (মরণোত্তর), নরসিংহ দাস ও আনন্দ পুরস্কার।
সৈয়দ মুজতবা আলীর শিক্ষাজীবন যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি পেশাগত পরিচিতিও বিচিত্র। তাঁর শিক্ষাক্ষেত্র ছিল– সিলেট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, শান্তিনিকেতন, আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। তারপর কর্মজীবন বিস্তৃত ছিল কাবুলের শিক্ষাদপ্তর, বরোদা কলেজ, বগুড়া আজিজুল হক কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বভারতীতে। শিক্ষা ও কর্ম থেকে সহজেই বোঝা যায় বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ তাঁর জীবন। তাঁর ব্যুৎপত্তি ছিল ১৫টি ভাষায়। সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো বহুবর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন সাধারণত মিলে না। বিশ্বভ্রমণ, পাঠ, পাঠদান, স্বীয় অভিজ্ঞতার মিশ্রণে অনন্য সৈয়দ মুজতবা আলী। তাঁর ব্যক্তিস্বভাব, মনন গড়ে উঠেছে– ভ্রমণ, অজ্ঞাত ভাষা, সংস্কৃতি ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ আবিষ্কারে।
এ পরিসরে আমরা তাঁর ভ্রমণসাহিত্যে মনযোগ নিবদ্ধ রাখতে চাই। বস্তুত তাঁর রচনা প্রথাগত ভ্রমণসাহিত্য নয়, বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও স্বনির্বাচিত শৈলীর গদ্যরূপ। তিনি যেখানে গিয়েছেন বা যা-কিছু পড়েছেন, পর্যবেক্ষণে তা সব সঞ্চয় করেছেন। অন্যদিকে সাহিত্যের প্রথা রীতি মেনে তিনি গদ্য লিখেননি। তাঁর ভ্রমণবিষয়ক রচনা হলো : দেশে বিদেশে , জলে ডাঙ্গায়, ভবঘুরে ও অন্যান্য, এবং মুসাফির । বলে রাখা ভালো যে, তাঁর অন্য রচনায়ও ভ্রমণাভিজ্ঞতার ইঙ্গিত, কখনো অভিজ্ঞানশৈলীর প্রকাশও রয়েছে।
সৈয়দ মুজতবা আলীর আকর্ষণ তাঁর ভাষাশৈলীতে। তাঁর গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মজলিশি, বৈঠকী ভঙ্গি। এটা ঠিক সেটা অন্য লেখকদের মতো নয়। তিনি নিজে যেন কথা বলেন সরাসরি পাঠকের সাথে। কথোপকথনের ভাষায় এগিয়ে চলে গদ্যভাষার স্রোত। ওই স্রোতই তাঁর ভাষার শক্তি। এর মধ্যে তাঁর পাঠকৃতির বাক্যে কথ্য, আঞ্চলিক, ঔপভাষিক শব্দ ব্যবহারে প্রয়োগসাফল্য লক্ষ করি। এ ছাড়াও স্পষ্ট তাঁর লেখা অভিধান থেকে বাছাইকৃত শব্দে সাজানো কষ্টসাধ্য রচনা নয়। তিনি দূরবর্তী কোনো রাশভারী লেখকও নন। রচনার অন্যতম এক বৈশিষ্ট্য হলো তথ্যের সমাবেশ। বস্তুত প্রয়োজনীয় জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ, প্রচুর পঠন-পাঠন না থাকলে কেউ এমন ভাষা নির্মাণ করতে পারবেন না। তাঁর রচনায় বিশ্বসাহিত্য, তথ্যভাণ্ডার, মিথ-পুরাণ, লোকগল্প, ভূগোল, ইতিহাস, মহাফেজখানা, প্রকৃতি-পরিবেশ ইত্যাদি থেকে স্বতঃস্ফূর্ত স্বভাবে তথ্য উদ্ধৃত করছেন, জোর করে নয়। তাঁর আরও একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো গল্প যোজনা বা গল্প বলা। যেমন তিনি সহজ কথ্যভঙ্গিতে পাঠ নির্মাণ করেছেন, তেমনি গল্পের পর গল্প জুড়ে দিয়েছেন মূল বিষয়ের সঙ্গে। অবশেষে মনে হয় তাঁর রচনা ভাষা-সাহিত্য, দর্শন, প্রত্নঐতিহ্যের সমন্বিত এক মহাফেজখানা। সৈয়দ মুজতবা আলী এর দ্বার খুলে দিচ্ছেন পাঠকের জন্য।
উল্লেখযোগ্য যে, তাঁকে বোঝার জন্য মিত্র এন্ড ঘোষ প্রকাশিত রচনাবলি ৭ম খণ্ডের ভূমিকা পাঠ জরুরি। সেখানে অরুণ বসু লিখেছেন, ‘সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্যিক জীবন দীর্ঘকালের নয়, গ্রন্থসংখ্যা খুব একটা কম না হলেও বেশি নয়, আর সেগুলো না গল্প, না উপন্যাস। … ভ্রমণসাহিত্য হিসেবে তাঁর কিছুকিছু গ্রন্থের পরিচিতি হয়ত বেমানান নয়, যদিও তার জাত আলাদা… অথচ এই আলী সাহেবের জীবনকথা, তাঁরই নিজেরই অভিজ্ঞতার ঝুলিঝাড়া সম্পদ। আত্মজীবনের বাইরে গিয়ে তিনি কোন গল্প ফাঁদেননি। দু-চারটে কেতাব ছাড়া, আলীসাহিত্য সবটাই তাঁর নিজের জীবনের বর্ণালী, বানিয়ে বলার চতুরালী নয়। … আলী সাহেবের সঙ্গী হয়ে তাই ভিনদেশের পাবে-শরাবখানায়-কাফে-রেস্তোরাঁয় ঢুকে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়, তা পুরো একটা দেশ আবিষ্কারেরই সমতুল। কেনসিংটন গির্জার পাশে ছোট্ট শরাবখানায় সেই বুড়ির সঙ্গে আলাপের কথা কি ভুলে যাচ্ছেন? সেই সঙ্গে কত খুঁটিনাটি, রান্নাঘরের মেনু, পানভোজনের ফিরিস্তি, গাছপালা-গাড়িঘোড়ার ছবি, কত প্রবাদপ্রবচন, আবহাওয়াতত্ত্ব, সাহিত্যের খবর, রাজনীতি-সমাজনীতি, মামলা ও হামলার বিবরণ, পথঘাটের নকশা, কত বয়েৎ ও কটুবাক্য ঝরে তাঁর কলমে। মুজতবা আলীর সাহিত্যকে তাই বলতে ইচ্ছে করে এনসাইক্লোপিডিয়া আলীয়ানা।’ বস্তুত গদ্য সাহিত্যের চরিত্রই পালটে দিয়েছেন তিনি। পাঠকমন আকৃষ্ট করতে রম্যগল্প, চুটকি, বিশ্বসাহিত্যের আর্কাইভ থেকে তথ্য আর আঞ্চলিক শব্দ ইচ্ছেমতো ব্যবহার করেছেন। আর তাঁর রচনার এই ব্যতিক্রম আঙ্গিকশৈলী একেবারে নিজস্ব। এতে তিনি আনন্দময় পাঠ নিশ্চিত করেছেন। একইসাথে প্রেমকাহিনী থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি হাফিজ, ওমর খৈয়ামের কবিতা, নদ নদীর বর্ণনা, জোছনারাতে নদীভ্রমণ, পানশালায় বসে আড্ডা সবই রয়েছে তাঁর রচনায়। কখনো প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সঙ্গীতের উপকরণে সুরের বন্ধন সৃষ্টি করেছেন। বিভিন্ন দেশের নারী ও প্রকৃতির সমান্তরাল সৌন্দর্য বর্ণন ইত্যাদি বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। যেক্ষেত্রে চারপাশের তুচ্ছ বিষয়ও তিনি খেয়াল রাখতেন।
২.
এখানে জলে ডাঙায়- প্রেক্ষিতে হলেও তাঁর অভিজ্ঞতাজাত বার্তাটি আমরা পাঠ করি। একইসঙ্গে তাঁর ভাষাও পর্যবেক্ষণ করব। ‘দেশভ্রমণ আমি বিস্তর করেছি। সামান্য কিছু ঘটতেই আমি বিচলিত হয়ে পড়িনে। রিফ্রেশমেন্ট রুমে চা খেতে গিয়েছি, ওদিকে গাড়ি আমার বাক্স- তোরঙ্গ বিছানা-বালিশ নিয়ে চলে গিয়েছে, বিদেশ বিভুঁইয়ে মানিব্যাগ চুরি যাওয়াতে আমি কপর্দকহীন, ইতালির এক রেস্তোঁরায় দুই দলে ছোরা-ছুরি হচ্ছে– আমি নিরীহ বাঙালি এক কোণে দেয়ালের চুনকামের মতো হয়ে গিয়ে আত্মগোপন করার চেষ্টা করছি– এসব ঘটনা আমার জীবনে একাধিকবার ঘটেছে। কিন্তু এবার সুয়েজ বন্দরে, আবুল আসফিয়ার পাল্লায় পড়ে যে বিপদে পড়লুম তার সঙ্গে অন্য কোনও গর্দিশের তুলনা হয় না।’ [জলে ডাঙায় ২০১৭; ৭ : ৬২]
দেশে বিদেশে রচনায় সৈয়দ মুজতবা আলীর আফগানিস্তান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। অনেকে বলেন, এ-গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ভ্রমণসাহিত্য। লেখক ভ্রমণযাত্রা শুরু করেই নিসর্গের বর্ণনা দিয়েছেন। তবে তাঁর বর্ণনা আফগানিস্তান ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। রচনার কেন্দ্রে আফগানিস্তান রেখে ভাবনা ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বময়। সকলেই জানেন, বহু জাতি, উপজাতি গোত্রে বিভাজিত দেশ আফগানিস্তান। অতএব সেখানে বৈচিত্র্য থাকবেই। তিনি শুধু ঘুরে দেখেননি, সেখানের জীবনযাত্রা, সমাজকাঠামো, উৎপাদনব্যবস্থা ও কৃষি, নবজাতকের জন্ম, উৎসব, বিভিন্ন সংস্কার, বিশ্বাস, পরিবহন ব্যবস্থা, প্রকৃতি, হাটবাজার, সরাইখানা, খাদ্যসংস্কৃতিসহ বিবিধ বিষয় পর্যবেক্ষণ করেছেন। যেমন ‘কাবুলের সামাজিক জীবন তিন হিস্যায় বিভক্ত। তিন শরিকে মুখ দেখাদেখি নেই। পয়লা শরিক খাস কাবুলি; সেও আবার দুভাগে বিভক্ত- জানানা, মর্দনা, কাবুলি, মেয়েরা কট্টর পর্দার আড়ালে থাকেন, তাঁদের সঙ্গে নিকট-আত্মীয় ছাড়া, দেশি-বিদেশি আলাপ হওয়ার জো নেই। পুরুষের আবার দু ভাগ- একদিকে প্রাচীন ঐতিহ্যের মোল্লা সম্প্রদায়, আর অন্যদিকে প্যারিস-বার্লিন-মস্কো ফেরতা এবং তাঁদের ইয়ার-বক্সিতে মেশানো ইউরোপীয় ছাঁচে ঢালা তরুণ সম্প্রদায়।’ [দেশে বিদেশে ২০১৯; ৯ : ৮৮]
আফগানিম্তানের জনসমাজ ছিল অংশত রক্ষণশীল এবং এখনও যা চলমান। তবে আফগানদের সরল জীবনাচার ও অতিথি আপ্যায়নের কমতি ছিল না। আলসে হলেও তারা খুব আড্ডাপছন্দ জাতি। গল্প করতে করতে তারা সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে। তা দেখে তিনি অবাক হয়েছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী স্বভাবজাত ভাষায় আফগানিস্তানের সৌন্দর্য উপস্থাপনে যেখানে যা প্রয়োজন তাই উল্লেখ করেছেন। গল্প, রম্যগল্প, রাজনীতি, গান, কবিতা জুড়ে দিয়েছেন। আবার কখনো নিয়ে এসেছেন আমাদের সবুজ প্রকৃতির গ্রামে। লেখকের উপস্থাপনযোগ্যতায় ছবির মতো মস্তিষ্কের স্নায়ুকে যা আন্দোলিত করে। দেশেবিদেশে এর উপযুক্ত সাক্ষ্য। পাঠবিহীন এ বিবরণের রসাস্বাদন করা যাবে না। তিনি বলেছেন, ‘‘সেদিন গল্পের প্লাবনে রৌদ্র আর গ্রীষ্ম দুই-ই ডুবে গিয়েছিল। আর কী খানাপিনা! প্রতি স্টেশনে আড্ডার কেউ না কেউ কিছু না কিছু কিনবেই।… সর্দারজি বললেন, … যদি পাঠানের আত্মীয়তা-মেহমানদারি বাদ দিয়ে এদেশে ভ্রমণ করতে চান, তবে তার একমাত্র উপায় কোনও পাঠানের সঙ্গে একদম একটি কথাও না বলা। তাতেও সবসময় ফল হয় না।’’ [দেশে বিদেশে ২০১৯; ৯ : ১৯]
তিনি আফগানিস্তানের ভূপ্রাকৃতিক বিবরণ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। একসময় ঋদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ছিল সেখানে। একইসাথে উল্লেখ করেছেন আফগানদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনযাপন। আফগানরা বারবার আক্রান্ত হয়েছে; এসব বাস্তবতায় গরিব হলেও তারা স্বাধীন ছিল। মরু, পাথর, পাহাড় আবৃত এক ভূখন্ডের ভেতরের সৌন্দর্য সৈয়দ মুজতবা আলী আবিষ্কার করেছেন। তিনি দেখালেন ভারতবর্ষ ও আফগানিস্তানের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যবিন্দু কোথায়। এ প্রসঙ্গে কুষাণ বংশ, কনিষ্ক রাজ্য, গুপ্তবংশের শাসনামলে গান্ধার রাজ্যের প্রত্ননিদর্শনের উদাহরণ তিনি উল্লেখ করেছেন। গান্ধারের শিল্প, বৌদ্ধ ধর্ম, সংস্কৃতির বিস্তারে যে ঐক্য ঐতিহাসিক। যেখানে নিহিত রয়েছে চারু ও কারুকলার নিদর্শন। তবে সৈয়দ মুজতবা আলীর আফগানিস্তানে সেসবের অবশেষ এখন আছে কিনা সন্দেহ। এক্ষেত্রে তিনি আর্য, বৈদিক, আবেস্তা ও বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তারের ঐতিহাসিক সত্য তুলে ধরেছেন। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য হলো সংস্কৃতির দিক থেকে আফগানিস্তান ভারতবর্ষের বাইরের কোনো ভূগোল নয়।
এর বাইরে তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো, সম্রাট বাবরের আত্মজীবনীতেও আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ঐতিহ্য ভুলে যাবার মূল কারণ হলো আফগানদের দারিদ্র্য। অন্যদিকে পানির অভাবে এখানে চাষাবাদ খুবই কষ্টের। তারপর শীত মৌসুমে বরফ ঝরার দৃশ্য সুন্দর হলেও বাঙালির জন্য তা বেমানান। তাঁর বর্ণনা থেকেই আমরা জানতে পারি আফগানরা শাসক আমানউল্লাকে পছন্দ করত না। ফলত এক সময় শাসক আমানউল্লা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তারপর শাসন করতে এলেন তার ভাই ইনায়েতউল্লা। এক সময় ইনায়েতউল্লাও আফগান ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।
কাবুলে অবস্থানকালে সৈয়দ মুজতবা আলীর সহায়ক ছিলেন আবদুর রহমান। বিভিন্ন সময় বিপদে আপদে সঙ্গী ছিলেন এই রহমান। খুব মমতায় তাঁর কথা লিখেছেন সৈয়দ আলী। ফলে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে আর কিছু না এলেও বারবার স্মরিত হন কাবুলের আবদুর রহমান।
জলে ডাঙায় তো জলভ্রমণ। পুরোটাই জাহাজে বিশ্বভ্রমণ। জাহাজের সীমাবদ্ধতা হলো পরিসরের। তবে বিভিন্ন বন্দর, জেটি, ঘাটে নামার পর মাটি বা স্থলের অনুভূতি পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত কয়েকটি বন্দরের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি। যেমন, কলম্বো, জিবুতি, মালদ্বীপ, আদন, সোকোত্রা দ্বীপ, পোর্ট সঈদ, সুয়েজ বন্দর। জাহাজের ইতিবাচক দিক হলো, ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় জাহাজের কলাকৌশল, সমুদ্রের চালচিত্র। সৈয়দ আলীর বর্ণনা শুধু জলে ডাঙায় থাকেনি, অনায়াসে চলে গিয়েছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনাচারে। তাঁর আগ্রহ ছিল পর্যবেক্ষণ করা- জাহাজভ্রমণে যাত্রীরা কী করে সময় কাটায়। স্বৈচ্ছিক প্রতিস্থাপনের ফলে মানুষের আচরণিক কোনো পরিবর্তন ঘটে কিনা। তিনি দেখেন ‘নিষ্কৃতির জন্য মানুষ ডাঙায় যা করে, জলে অর্থাৎ জাহাজেও তা-ই।’ তিনি লিখেছেন, কেউ কেউ খাওয়া-দাওয়া ও গরম-ঠান্ডা ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাস খেলে, কেউ আবার গরম-ঠান্ডায় বিরক্তি প্রকাশ করে, দাবা খেলে, আরেকদল বই পড়ে। একদলের আবশ্যিক আলোচ্যবিষয়– পরনিন্দা, পরচর্চা। এখানে দাবা খেলা প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ দিয়েছেন, ‘‘দাবাখেলায় যে মানুষ কী করে বাহ্যজ্ঞানসম্পন্ন হতে পারে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ‘পরশুরাম’ লিখেছেন এক দাবাড়ুকে যখন চাকর এসে বলল, ‘চা দেব কী করে?- দুধ ছিঁড়ে গেছে’ তখন দাবাড়ু খেলার নেশায় বললে, ‘কী জ্বালা, সেলাই করে নে না!’’ [জলে ডাঙায় ২০১৭; ৭: ৪৯] আমরা তাঁর বিচিত্রভাবনা ও বৈচিত্র্যময় লেখার বিষয়ে আগেই উল্লেখ করেছি। যাতে তাঁকে স্পষ্ট শনাক্ত করা যায়। ফলে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা নিয়ে পাঠক পুনর্বার ভাবে, খোলে দেখে।
পরিসর বিবেচনায় জাহাজে বিভিন্ন যাত্রীদের পরস্পর সাক্ষাৎ খুব স্বাভাবিক বিষয়। এর মধ্যে যারা ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্বে নয়, আচরণে; তাদের সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। তাঁর ভাষায় অনেক বিষয়ই রসাত্মক হয়ে উঠেছে। এ-যাত্রায় তাঁর প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত অনেক বন্দরেই নোঙর করতে হয়েছে। বিভিন্ন বন্দর, স্থান-নাম ও ইতিহাসসহ সংক্ষিপ্ত পরিচিতি উল্লেখের চেষ্টা রয়েছে। যেমন জিবুতি বন্দরে নামার পর তাঁর পর্যবেক্ষণ খুবই নিবিষ্ট। অংশত সভ্যতার কলঙ্কময় ইতিহাসজাত। এসূত্রে ওঠে আসে এশিয়া-আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের গতিপ্রকৃতি ও পরিণাম। পর্তুগিজ, ফরাসি, ব্রিটিশ, বেলজিয়ামের উপনিবেশকের উপনিবেশ স্থাপন ও বর্বরতার চিহ্ন। তিনি লিখেছেন, ‘‘এই ইউরোপীয়রা এসে ছেঁকে ধরল সোমালি, নিগ্রো, বান্টু, হটেনটটদের। তাদের হাতে পায়ে বেঁধে মুরগিলাদাই ঝাঁকার মতো জাহাজভর্তি করে নিয়ে গেল আমেরিকায়। কত লক্ষ নিগ্রো দাস যে তখন অসহ্য যন্ত্রণায় মারা গেল তার নিদারুণ করুণ বর্ণনা পাবে ‘আঙ্কল টমস ক্যাবিন’ পুস্তকে’’ [জলে ডাঙায় ২০১৭; ৭ : ৪০] মিশরে নীল নদ, পিরামিড দেখে নতুন অভিজ্ঞতা হলো তাঁর। একইসাথে গ্রহণ করেন বিচিত্র খাবারের স্বাদ। বলাবাহুল্য যে, তিনি ছিলেন ভোজনরসিক। ওই আগ্রহ থেকেই তিনি ভ্রমণের সাথে রকমারি খাবার নিয়ে রসালাপও করেছেন। আবিষ্কার করেছেন মিশরীয় ও ভারতীয় খাবারের মিল-অমিল। যে খাদ্যবৈচিত্র্য ছড়িয়ে পড়েছিল আফ্রিকা-ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এ ছাড়াও কায়রোর মানুষ যে ক্যাফে সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত এ সম্পর্কে অন্যত্র লিখেছেন ‘দুনিয়ার যত ফেরিওলা কাইরোর কাফেতে চক্কর মেরে যায়। টুথব্রাশ, সাবান, মোজা, আরশি, চিরুনি, নোটবুক, পেন্সিল, তালাচাবি, ফাউন্টেন পেন, ঘড়ি- হেন বস্তু নেই যা ফেরিওলা নিয়ে আসে না! আমি জানি, আপনি সহজে বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু ধর্মসাক্ষী, দর্জি পর্যন্ত বস্তা বস্তা কাপড় মুটের ঘাড়ে চাপিয়ে কাফের ভিতর চক্কর মেরে যায়।’ [পঞ্চতন্ত্র ২০১৮; ১ : ২১]
স্মরণীয় অপেক্ষাকৃত অধিক গরম বা শীতের দেশগুলোতে ভ্রমণে তফাৎ রয়েছে। এজন্য তিনি নিজে ভবঘুরে হওয়া সত্ত্বেও সতর্ক করেছেন। বৈরি আবহাওয়াতে অবশ্যই এমন ভবঘুরে জীবন যাপন করা সম্ভব হয় না। অতি শীতে তিনি লক্ষ করেছেন পাশ্চাত্যে কখনো ট্র্যাম্প ছেলেমেয়েরা উষ্ণতার আশায় পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। আবার কখনো এসব ট্যাম্পজোড়া মারাও যায়। তাদের মৃত্যু ঘটে কেবলই চড়ুই পাখির মতো। আবার ‘রাস্তায় ট্র্যাম্পকে অনেকেই লিফট দেয়, জোড়া পাখি যদি হয় তবে লিফট্ পাওয়া আরও সোজা, একটু কৌশল করলেই। ছেলেটা দাঁড়ায় গাছের আড়ালে। মেয়েটা ফ্রক হাঁটু পর্যন্ত তুলে গার্টার ফিট করার ভান করে সুডৌল পা-টি দেখায়। রসিক নটবর গাড়ি থামিয়ে মধুর হেসে দরজা খোলেন। ছোকরা তখন আড়াল থেকে আস্তে আস্তে এসে পিছনে দাঁড়ায়, নটবর তখন ব্যাক-আউট করেন কী করে? করলেও দৈবাৎ। যে উড়ুক্কু পক্ষিণী আমাকে গল্পটি বলেছিল তার পা-টি ছিল সত্যই সুন্দর।’ [ভবঘুরে ও অন্যান্য ২০১৭; ৭ : ১৮৫]
বস্তুত যা বাস্তবেই তাঁর জীবনে ঘটেছে, বিশ্বকে যেভাবে তিনি অনুসন্ধান করেছেন বা উপভোগ করেছেন, তার সামান্যই তিনি বলেছেন। অন্তত তাঁর ভাষা থেকে তা সহজেই অনুমেয়। তবে তিনি নিরর্থক কথামালা সংযোজন করেছেন কিনা; তাঁর নিজের কথা থেকে এমন প্রশ্ন হতেই পারে। কিন্তু তাঁর সাহিত্য পাঠে এমন মনে হয় না। যে বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘ভ্রমণকাহিনী লিখতে লিখতে মানুষ আশকথা পাশকথা উত্থাপন করে। গুণীরা বলেন এটা কিছু দুষ্কর্ম নয়। সদর রাস্তা ছেড়ে পথিক যদি পথের ভুলে আশপথ পাশপথ না যায় তবে অচেনা ফুলের নয়া নয়া পাখির সঙ্গে তার পরিচয় হবে কী প্রকারে? কবিগুরুও বলেছেন, ‘যে পথিক পথের ভুলে,/এল আমার প্রাণের কূলে’- অর্থাৎ প্রণয় পর্যন্ত হতে পারে। তাই আমি যদি মাঝে-মধ্যে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ি তবে সহৃদয় পাঠক অপরাধ নেবেন না।’’ [মুসাফির ২০১৭; ৭ : ৩৬৫]
ভ্রমণের সুযোগে সৈয়দ মুজতবা আলী বৈশ্বিক ভাষা, সংস্কৃতির সাথে আত্ম-সংযোগ স্থাপন করেছিলেন। ফলত তিনি ভ্রমণবিষয়ক লেখাগুলোতে শুধু বিবরণ দেননি; দৃষ্টি দিয়েছেন মানুষের জীবন, সমাজ-সংস্কৃতির ওপর। ফলে তাঁর সাহিত্যের আবেদন, সংবেদনা কালান্তরেও সমাদৃত।
