লাজুকস্বভাব কবি, স্নেহময় পিতা

কবি তখন ছেলের কাঁধের উপরে একখানা হাত রেখে বললেন, ‘তোর মাকে ফাঁকি দিয়ে কোন কাজ করার ক্ষমতা তোর কেন, তোর বাবারও নেই।’

হাসান হাফিজহাসান হাফিজ
Published : 22 Oct 2023, 04:07 AM
Updated : 22 Oct 2023, 04:07 AM

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)। জন্মেছিলেন বরিশালে। মৃত্যু কলকাতায়। স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর স্বপ্নমেদুর, চিত্ররূপময়, দিগন্তবিস্তারী, অনন্যস্বাদু কবিতাবলির জন্যে। অসম্ভব জনপ্রিয়, পাঠকনন্দিত হয়েছে তাঁর কবিতাসম্ভার। গদ্যও বিস্তর লিখেছেন। কিন্তু কবি হিসেবেই সিদ্ধি, পরিচিতি ও খ্যাতি বেশি। তাঁকে বলা হয়, আধুনিক কবিদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও উল্লেখযোগ্য কবি। আধুনিক কাব্য আন্দোলনের ভাঙাগড়ায় কিছুমাত্র অংশগ্রহণ না করেও তিনি আধুনিক যুগের শ্রেষ্ঠ লিরিক কবিরূপে প্রতিপন্ন হয়েছেন। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় বলা যায় ‘তিনি প্রকৃতই কবি এবং প্রকৃত অর্থে নতুন।’

কবি জীবনানন্দ দাশ নিজেই ছিলেন একটি ইনস্টিটিউট। তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ ও কৌতূহল নিতান্ত কম নয়। ভীষণ লাজুক স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কোনো সভায় তাঁকে পারতপক্ষে নেওয়া যেত না। কবির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাণী রায় লিখেছেন,

“জীবনানন্দকে একদিন বলেছিলাম তাঁর কবিতা দুর্বোধ্য। তিনি তাঁর অভ্যস্ত রঙ্গ-ভঙ্গিমায় প্রতিবাদ জানালেন। আমি কিছু না বলে দ্বিতল থেকে তাঁর একটি নবতম প্রকাশিত কবিতা নিয়ে এসে ওঁর হাতে দিয়ে বিনীত অনুরোধ জানালাম,‘দয়া করে এটি একটু বুঝিয়ে দিন না।’ আমার পূর্ব থেকেই ইচ্ছা ছিল ওঁর কবিতার অংশবিশেষ ওঁর কাছ থেকে বুঝে নেব।

জীবনানন্দ লজ্জিত-অপ্রতিভ হলেন। নিজের কবিতা যেন গোপন বস্তু, কোন মতেই দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে আলোচ্য নয়। অত্যন্ত অপ্রস্তুত মুখে তিনি নাগপাশ মোচন প্রয়াসী ব্যক্তির আকুলতায় বলে উঠলেন.‘আজ থাক। পরে একদিন হবে।’

সেই মুহূর্তে তাঁর আত্মার একটি বিশেষ রূপ আমার চোখে পড়ল। আত্মগোপন। তিনি যে কবি, এই শোচনীয় ঘটনা বাইরের লোকের কাছে যেন তুলে ধরার নয়। সাহিত্য আলোচনা ও মনুষ্য চরিত্র দর্শন কাম্য হলেও নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কবিতা নিয়ে কবিরূপে জনতার সম্মুখে উপস্থিত হবার বাসনা তাঁর ছিল না। তাই সভা ও সভার ফুলের মালা তাঁকে খুঁজে পায় নি। তিনি লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। কখনও কোন সভায় নিয়ে যাওয়া যেত না তাঁকে। তাঁর কণ্ঠে তাঁর কবিতার আবৃত্তি অপূর্ব সুন্দর ছিল। কণ্ঠ তাঁর গম্ভীর পুরষোচিত, যুক্ত হয়েছিল আবেগ। রেডিওতে তাঁর কাব্যপাঠ যাঁরা শুনেছেন, তাঁরা জানেন কি অপরূপ মূর্ছনা ও আবেগে সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর স্পন্দিত হয়ে উঠত। তখন বোঝা যেত, মাত্র তখনই বোঝা যেত, জীবনানন্দ দাশ কত বড় কবি। সেনেট হলের কবি সম্মেলনে পঠিত ‘বনলতা সেনে’র শেষ লাইন দু’টি আজও কানে বাজছে:

‘সব পাখি ঘরে আসে-- সব নদী-- ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

শ্রোতার বারম্বার অুনরোধে বিশাল সেনেট হলের ব্যাপ্তি মন্থন করে গভীর আবেগধর্মী কণ্ঠ একটির পর একটি কবিতা আবৃত্তি করে যাচ্ছিল। জীবনানন্দ যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কবি, নিঃসন্দেহে সেদিন প্রমাণিত হয়েছিল।

জনপ্রিয়তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ বহুল পঠিত রচনা। আজ তরুণ কবিদের মধ্যে শতকরা আশিজন জীবনানন্দের অননুকরণীয় ভঙ্গিতে কবিতা লিখবার চেষ্টা করছেন। তাঁর পুস্তকগুলির বহু সংস্করণ হয়েছে। যখন সাধারণ তাঁকে চিনতে শুরু করেছে, ও তাঁর সম্পর্কে সর্বাপেক্ষা উৎসুক হয়ে উঠেছে, তখনি তাঁর ঘটলো অকালমৃত্যু।”

বাবা হিসেবে কেমন ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ? এ ব্যাপারে জানবার কৌতূহল হওয়া স্বাভাবিক। এই অনুসন্ধিৎসা মেটানোর জন্যে আমরা আশ্রয় নিতে পারি কবির জীবনসঙ্গিনী লাবণ্য দাশের স্মৃতিকথনের উপর। লাবণ্য দাশের লেখা ‘মানুষ জীবনানন্দ’-এ চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

“...মঞ্জুশ্রী ও সমরের কাছে কবি শুধু বাবাই ছিলেন না, তাদের বন্ধুও ছিলেন। তাই তাদের যত কথা যত গল্প সবই ছিল তাঁর সঙ্গে। লেখক শ্রী সুবোধ রায় আমাদের ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ির খুব কাছেই থাকতেন। তিনি প্রায় রোজই আমাদের বাড়িতে এসে কবির সঙ্গে নানারকম গল্প করতেন। সে গল্পে বাবার সঙ্গী হিসেবে সমরও নিয়মিতভাবেই যোগ দিতো। খেয়ে দেয়ে তাঁরা গল্প করতে বসতেন। সুবোধবাবুও সে পাট চুকিয়েই আসতেন। কোন কোন দিন রাত প্রায় একটা বেজে যেত, তবুও তাঁদের গল্প শেষ হত না। আমি এক ঘুম দিয়ে উঠে ছেলেকে তাড়া দিয়ে শুতে পাঠাবার চেষ্টা করলে সে দু-হাতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকত। আমি রাগ করলে সুবোধবাবু ও কবি দুজনেই হাসতেন।

...ছোট ছেলের সিনেমা দেখা পছন্দ করতাম না বলে আমি সমরকে বিশেষ সিনেমায় যেতে দিতাম না। তবে, তার যেদিন যেতে ইচ্ছে হত, বাবাকে দিয়েই ব্যবস্থা করিয়ে নিত। বাবা ও ছেলে বুঝুক আর নাই বুঝুক, ব্যাপারটা কিন্তু আমার নজর এড়িয়ে যেতে পারত না। কোন এক রবিবারের দুপুর হঠাৎ আমার চোখে পড়ল, সমর তার বাবার কানে কানে ফিসফিস করে কি যেন বলছে। তিনি মাথা নাড়ছেন আর আমি যে ঘরে ছিলাম, সেদিকে আড়চোখে তাকাচ্ছেন। পর মুহূর্তে সমর বেরিয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পরে আমি যেন কিছুই জানি না-- এইরকম ভাব দেখিয়ে কবিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘খোকন কোথায়, তাকে দেখছি না যে?’

তিনি আর একদিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন-- ‘যাবে আবার কোথায়, কেন তোমার কি দরকার? চাকরকে পাঠাও না।’

তাঁর কথার ধরনে আমি হেসে বললাম,‘ তাকে তো কোথাও পাঠাতে চাইছি না। শুধু জানতে চাইছি সে কোথায় গেল।'

তখন তিনিও হেসে ফেলেছেন। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘বাবা, তোমাকে কি ফাঁকি দেবার যো আছে? সে যেখানেই যাক, আমাকে বলেই গেছে। তুমি আবার তাকে বকাবকি করতে যেও না।’

সন্ধ্যেবেলা দেখি কবি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাকে যেন ইশারায় কি বলছেন। বুঝতে পারলাম ছেলে এসেছে। যাতে আমার চোখে না পড়ে তাই এই সতর্কতা। তখন আমি ঘর থেকে বেরিয়ে খোকনকে জিগ্যেস করলাম, ‘কি বই দেখলি?’ ছেলে বুঝল যে আমি রাগ করিনি। তখন হাসিমুখে আমার কাছে এসে দাঁড়াল।

‘আচ্ছা মা, তুমি কি করে জানলে যে আমি সিনেমা দেখেছি?’

আমি হেসে উত্তর দিলাম--‘আমার মন বলেছে।’

কবি তখন ছেলের কাঁধের উপরে একখানা হাত রেখে বললেন, ‘তোর মাকে ফাঁকি দিয়ে কোন কাজ করার ক্ষমতা তোর কেন, তোর বাবারও নেই।’

তথ্যসূত্র: জীবনানন্দঃ জীবন আর সৃষ্টি, সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত, নাথ পাবলিশিং কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৯