লালন ফকির : জীবন ও দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা
আঠারো শতকে লেখা লালনের গানে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় মুসলিম মৌলবাদীদের মানস জীবনের কুসংস্কার, গোঁড়া হিন্দুদের গোড়ামী, বৌদ্ধ ধর্মমতসহ এ অঞ্চলের সমাজে মানুষের পালনকৃত নানামতের অন্ধত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলা গান ও দর্শন জগতের অন্যতম প্রধান পুরুষ ফকির লালন সাঁই। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের চিন্তা দর্শনের রূপ পরিস্ফুটিত হয়েছে লালনের গানে। তাঁর গান ও দর্শন ব্যতীত বাংলার ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। বাংলার পথে প্রান্তরে মানুষের মুখে মুখে ফেরে লালনের গান। বাঙালির ইতিহাসে আর কোন বাউল সাধকের গান এত আলোড়ন ও সর্বব্যাাপী আবেদন রাখতে পারেনি। বাংলার সহজাত চিন্তা-চেতনা-দর্শন লালনের লেখায় ফুটে ওঠার কারণে তা সর্বজনীন হয়ে বাংলার ইতিহাসে চির বিরাজমান। মূলতঃ বাংলার জলবায়ু ধর্মীয় চেতনা সামাজিক সমস্যাসহ তৎকালীন সামগ্রিক বাংলার রূপ লালনের গান দর্শন চিন্তায় পাওয়া যায়। আর তাই এ অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা সামাজিক সমস্যার প্রসঙ্গ আসলে অনিবার্যভাবে এসে যায় লালন ফকিরের নাম।
লালন ফকির আঠারো শতকে জন্মগ্রহণ করেন। ধারণা করা হয় ১৭ অক্টোবর ১৭৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন ও ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় তার তিরোধান ঘটে। যে কোন ব্যক্তি, সাধক পুরুষ, দার্শনিকের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অবশ্যই তার সময়কে নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হয়। পৃথিবীর ইতিহাস বদলে দেয়া যুগনায়কগণ তাদের সময় থেকে অনেক বেশি প্রাগ্রসর থাকেন। লালনের জীবন ইতিহাস দর্শন ও চিন্তাকে আলোচনা করতে গেলেও আমরা একই বিষয় লক্ষ্য করি। যুগনায়কগণ তাদের কর্ম দিয়ে সময়কে পেছনে ফেলে সকল সময়ের সকল মানুষের আপনজনে পরিণত হন। লালন ছিলেন প্রতিভাবান এক বাঙালি; যিনি ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন শাহ, মহাত্মা লালন ইত্যাদি নামেও পরিচিত। তিনি একাধারে একজন আধ্যাত্মিক ফকির সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক।
লালনের জীবন দর্শন তার গানে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। গানের মধ্য দিয়ে লালন ফকির সে সময়ের সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, আধ্যাত্মিকতা, সমাজ জীবনের সমস্যাগুলোকে তুলে ধরেছিলেন। দর্শনের অন্যতম একটি পদ্ধতি হলো প্রশ্ন করে বাস্তবতাকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া। অ্যারিস্টেটল, সক্রেটিস, প্লেটোসহ দর্শনের বিশ্বখ্যাত মনীষীগণ এই পদ্ধতিতে মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। লালন ফকিরও তার গানে নানাবিধ প্রশ্ন ও জবাবের মাধ্যমে একই পদ্ধতিতে সামাজিক অসঙ্গতি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় গোঁড়ামির স্বরূপকে তুলে ধরেছিলেন। বলা যায়, লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী সাধক, যিনি ধর্ম, বর্ণ, গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে তিনি তার গান রচনা করেছেন। লালন নিজের গানে নিজে প্রশ্ন তুলেছিলেন-
সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন বলে জাতের কি রূপ/ দেখলাম না এই নজরে
কিংবা
সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/ নারীলোকের কি হয় বিধান
যেমন
বামন চিনি পৈতে প্রমাণ/ বামনী চিনি কি করে
অথবা
কেউ মালা কেউ তসবিহ গলে/ তাইতে কি জাত ভিন্ন বলে/ আসা কিংবা যাওয়ার কালে/ জাতের চিহ্ন রয় কারে
এবং
জগৎ জুড়ে জাতের কথা/ লোকে গল্প করে যথাতথা/ লালন বলে জাতের ফাতা/ ডুবাইছি সাধবাজারে।
লালনকে বাউল সাধক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বলা হয়ে থাকে বাউল দর্শন মূলত একটি দেহ-কেন্দ্রিক অধ্যাত্ম সাধনা ও প্রেমাত্মক দর্শন, যা মানুষের দেহের ভেতরে পরম সত্তা বা ‘মনের মানুষ’-এর সন্ধান করে। এটি মানুষের আত্মিক মুক্তি ও পরমাত্মার সাথে মিলনের এক সহজ ও স্বাভাবিক জীবনপথ। লালনের গানে অসংখ্যবার মনের মানুষের বিষয়টি এসেছে। ইতিহাসবিদদের মতে, সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে বাউল মতের প্রাতিষ্ঠানিক ও সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরি হয়। তবে এর মূল আদর্শ ও শিকড় প্রোথিত রয়েছে বহু পুরোনো ভারতীয় ও বাংলার লোকায়ত দর্শনে।
‘বাউল’ শব্দটি সংস্কৃত ‘বাতুল’ (উন্মত্ত বা বাতাসযুক্ত) থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়, যার অর্থ যিনি ভবসংসার কিংবা প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের প্রতি উদাসীন বা পাগলাটে। বাউল দর্শনে বিশ্বাসীরা বাউল হিসেবে দীক্ষা নেয়ার পরে জীবনের আগের অধ্যায়কে মুছে ফেলেন। আর তাই বাউল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পরে তাদের আগের জীবনের অনেক বিষয়গুলো অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। লালনের জীবনের ইতিহাসও তাই অনেকাংশে অস্পষ্ট। লালনের গানের নানা বাণীর মধ্য দিয়ে গবেষকগণ সেটি তুলে ধরার চেষ্টা করেন মাত্র। বাউল দর্শন এক ধরনের গুরুবাদী দর্শন। একজন গুরু একজন বাউলকে সৃষ্টি করেন। লালনের গানে তার গুরু হিসেবে সিরাজ সাঁই-এর নাম পাওয়া যায়। বাংলার হাজার বছরের বাউল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ লালন সাঁই। তার গানের মধ্য দিয়ে এই বাংলায় বাউল দর্শন ও মতবাদ এক ধরনের পূর্ণতা লাভ করেছে। ২০০৮ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) বাংলাদেশের বাউল গানকে ‘মানবতার অপ্রকাশিত ও অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ (Masterpieces of the Oral and Intangible Heritage of Humanity) অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বদরবারে স্বীকৃতি দেয়।
ফকির লালন সাঁই-এর দর্শন নিয়ে নানারকম মতবাদ রয়েছে। গুগল ড্রাইভের মতে (মোটাদাগে)- ফকির লালন সাঁইয়ের দর্শন মূলত মানবতাবাদ, আত্মশুদ্ধি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তাঁর দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১. মানবতাবাদ ও মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব: লালন দর্শনে মানুষই সর্বেসর্বা। তার মতে, মানুষের মাঝেই ঈশ্বর বা ‘মনের মানুষ’ বসবাস করেন। ভিনগ্রহে বা দূরে কাউকে খোঁজার চেয়ে নিজেকে চেনা এবং মানুষকে ভালোবাসা বড় সাধনা।
২. জাত-ধর্মের ভেদাভেদ প্রত্যাখ্যান: তিনি হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান- কোনো ধরনের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, গোঁড়ামি ও জাতপাতের বিভেদ স্বীকার করতেন না। তিনি গেয়েছেন- ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে / লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম এই নজরে’।
৩. দেহকেন্দ্রিক সাধনা: লালন বিশ্বাস করতেন, এই নশ্বর দেহটিই হলো ব্রহ্মার ক্ষুদ্র সংস্করণ। দেহের ভেতরেই নদ-নদী, তীর্থস্থান ও ঈশ্বর নিহিত রয়েছেন। দেহের সাধনার মাধ্যমেই পরম সত্তাকে লাভ করা সম্ভব।
৪. গুরুবাদ: লালন দর্শনে গুরুর স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গুরুর নির্দেশনা ছাড়া প্রকৃত জ্ঞান বা ‘অচিন পাখি'’ সন্ধান পাওয়া যায় না। তাঁর নিজস্ব গুরু ছিলেন সিরাজ সাঁই।
৫. অসাম্প্রদায়িক ও লোকায়ত দর্শন: বৈষ্ণব সহজিয়া, নাথধর্ম এবং সুফিবাদের মেলবন্ধনে লালন তার নিজস্ব এক জীবনদর্শন তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বিশ্বজুড়ে বহু মনীষীকে অনুপ্রাণিত করেছে।
লালন সাঁইয়ের এই মানবতাবাদী দর্শন ২০০৫ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ‘মানবিক ও অধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের’ স্বীকৃতি লাভ করে।
মানুষ লালনকে চিন্তা করলে সৌম্য দর্শন সংসারবিরাগী হিংসা বিদ্বেষহীন একজন বাউলের চেহারা ভেসে উঠে। যার মধ্যে ইহজাগতিক লোভ লালসার কোন স্থান নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর কুষ্টিয়া জমিদারি পরিদর্শন করতে আসলে অনেককে বোটে বসিয়ে ছবি আঁকতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালনের মৃত্যুর অনেক পরে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের খাতায় একটি স্কেচ পাওয়া যায়। সেখানে লালনের নাম দেখা যায়। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তার বোটে বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন- যা ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যদিও অনেকের দাবি এই স্কেচটিতে লালনের আসল চেহারা ফুটে ওঠেনি। এটি লালনের একমাত্র স্কেচ, যেটিকে অবলম্বন করে লালনের মুখাবয়বকে চিন্তা করা হয়।
আমাদের সমাজে একজন মানুষ খ্যাতিমান হয়ে উঠলে তার জাত, ধর্মের পরিচয় নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের কাড়াকাড়ি শুরু হয়। লালনের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে গবেষকদের মাঝে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে, যা তার জীবদ্দশায়ও বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রবাসী পত্রিকায় মহাত্মা লালন নিবন্ধে প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল বলেছেন, ‘সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।’ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় লালনের জীবদ্দশায় তাকে কোনো ধরনের ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করতেও দেখা যায়নি। লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দুধর্ম এবং ইসলামধর্ম উভয় শাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেন। তার রচিত গানে এর পরিচয় পাওয়া যায়। প্রবাসী পত্রিকার নিবন্ধে বলা হয়, লালনের সকল ধর্মের লোকের সাথেই সুসম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের সাথে তার সুসম্পর্কের কারণে অনেকে তাকে মুসলমান বলে মনে করতেন। আবার বৈষ্ণবধর্মের আলোচনা করতে দেখে হিন্দুরা তাকে বৈষ্ণব মনে করতেন। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন মানবতাবাদী এবং তিনি ধর্ম, জাত, কূল, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদি অনুসারে মানুষের ভেদাভেদ বিশ্বাস করতেন না। লালন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন- আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন, কাঙাল হরিনাথ তাঁকে জানতেন, মীর মশাররফ চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক জলধর সেন বা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তাঁকে সামনাসামনি দেখেছেন কতবার, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেননি লালনের জাতপরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম। বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। আবার ভিন্ন তথ্যসূত্রে তার জন্ম হিন্দু পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। কিছু লালন অনুসারী যেমন মন্টু শাহের মতে, তিনি হিন্দু বা মুসলমান কোনোটিই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ওহেদানিয়াত নামক একটি নতুন ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী। ওহেদানিয়াতের মাঝে বৌদ্ধধর্ম এবং বৈষ্ণব ধর্মের সহজিয়া মতবাদ, সুফিবাদসহ আরও অনেক ধর্মীয় মতবাদ বিদ্যমান। অথচ লালন নিজে এই বিষয়ে তার গানে নিজেকে কোন নির্দিষ্ট ধর্মের বা মতের অনুসারী বলেননি। লালন একটি গানে বলেছেন-
এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান/ জাতি গোত্র নাহি রবে।
আঠারো শতকে লেখা লালনের গানে তৎকালীন সমাজ বাস্তবতায় মুসলিম মৌলবাদীদের মানস জীবনের কুসংস্কার, গোঁড়া হিন্দুদের গোড়ামী, বৌদ্ধ ধর্মমতসহ এ অঞ্চলের সমাজে মানুষের পালনকৃত নানামতের অন্ধত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একইসাথে এই অন্ধকারগুলো দূর করার জন্য নানা প্রশ্ন তুলে জবাবের মধ্য দিয়ে দূর করার প্রচেষ্টা। একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে লালনের এই ভূমিকা যে কোন বিচারে প্রণিধানযোগ্য।
লালনের গানের সমাজ বাস্তবতা ভারতবর্ষের বিশেষ করে বাংলার হলেও তার দর্শনের বাস্তবতা বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন। লালনের মতবাদের যে সর্বজনীন মানবতা এবং সম্প্রীতির বাণী এটি বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস। মধ্যযুগের বাঙালি কবি বড়ু চন্ডীদাস তার কবিতায় বলেছিলেন- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য/ তাহার উপরে নাই’- একই দর্শনের উৎসারিত বাণী। তাই বলা যায়, লালনের দর্শন বাঙালির বাংলার হাজার বছরের সামাজিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতা। লালনের গান ও দর্শন যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের মতো বহু খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে। ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম তাকে মহাত্মা উপাধি দেয়া হয়।
লালনের জীবন দর্শন আজকের পৃথিবীর জন্য খুব বেশি প্রয়োজন। মানুষে মানুষে হানাহানি, ধর্মে ধর্মে মারামারি, হিংসা বিদ্বেষে আজ জর্জরিত পৃথিবী। পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির জন্য লালন চর্চা অত্যন্ত জরুরী। এখানে নানা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের বসবাস। নানা মত ও পথের মানুষেরও অভাব নেই। মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা গির্জার পাশাপাশি অবস্থান সুদৃঢ় হয় তখনি যখন ধর্মীয় গোঁড়ামী অপব্যাখ্যার অবসান ঘটে। আর এক্ষেত্রে দর্শন ও চিন্তার ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের লালনের কোন বিকল্প নেই।
আজ থেকে ১৩৬ বছর আগে লালনের তিরোধান ঘটেছে। দৈহিকভাবে লালনের তিরোধান হলেও তার মতাদর্শ দর্শন আজো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আর তাই লালনের তিরোধান দিবস জাতীয় পর্যায়ে সমান তাৎপর্য ও গুরুত্ব দিয়ে পালিত হয়। বাংলার জলবায়ু, বাংলার পথে ঘাটে শহুরে নাগরিক জীবন থেকে শুরু করে গ্রামীণ জীবন সর্বত্র লালনকে স্মরণ করা হয়। তার গানের মধ্য দিয়ে তার জীবন দর্শনের বাস্তবতা সর্বজনীনতা ধর্মমত পথ সকল মানুষের মধ্যে বিরাজ করে। সমাজের সর্বত্র লালনের দর্শনের প্রয়োগ ঘটলে বাংলায় একটি স্থায়ী পারস্পরিক সম্প্রীতির শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়। হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর শান্তির জন্য বাংলার লালনের দর্শন বিশ্ব শান্তির অন্যতম সম্পদ হতে পারে।
