এম এন রায়: মেক্সিকো-প্রবাসের স্মৃতি-৩

তারা বাতাসে কিংবা ঘরের ছাদের দিকে তাক করে গুলি ছুড়ত, তারপর পরস্পরকে আলিঙ্গন ও চুম্বনের মধ্য দিয়ে লড়াইয়ের ইতি টানা হতো।

প্রিসিলা রাজপ্রিসিলা রাজ
Published : 3 Nov 2023, 08:38 PM
Updated : 3 Nov 2023, 08:38 PM

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার আরবেলিয়া গ্রামে শাক্ত ব্রাহ্মণ ভট্টাচার্য পরিবারে ১৮৮৭ সালে জন্ম নরেন্দ্রনাথের যিনি পরে এম এন রায় হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামী, কমিউনিস্ট বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সমধিক পরিচিতি উদার মানবতাবাদের (radical humanism) তাত্ত্বিক ও প্রবক্তা হিসেবে। বিপ্লবী জীবনে তাঁকে বহু ছদ্মনাম নিতে হয়েছিল। ১৯৫৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি প্রয়াত হন এই মনিষী।

মেক্সিকো সফর তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা। এক অর্থে তার রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি এই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও মানবেন্দ্রনাথের মেক্সিকো-সফর বড় ধরনের বাঁক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ইংরেজিতে লিখিত তাঁর স্মৃতিকথা Memoirs ১৯৬৪ সালে দিল্লী থেকে প্রকাশিত হয়। ৬২৮ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ স্মৃতিকথার শতাধিক পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মেক্সিকো বাসের রোমাঞ্চকর ও ঘটনাবহুল স্মৃতি। মূল গ্রন্থের ৫ম অধ্যায় থেকে ২৯ অধ্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সেই স্মৃতিচারণ। স্মৃতিকথার এই নির্বাচিত অংশ কলামিস্ট অনুবাদক প্রিসিলা রাজ-এর অনুবাদে ধারাবাহিকভাবে বাংলা ভাষায় প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। আজ থাকছে মেক্সিকো সফরের তৃতীয় পর্ব। এই অনুবাদে মূল বইয়ের পর্ব-বিন্যাস অনুসরণ ও উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘুমন্ত নগরী

মেক্সিকানদের সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা আছে যে এরা যোদ্ধাজাতি। ধারণাটি এসেছে অ্যাজটেকদের যুদ্ধদেবতা মেক্সাইটের নাম থেকে যিনি স্পেনীয়দের আগমনের আগে আনাহুয়াক উপত্যকা শাসন করতেন। মেক্সিকো উপত্যকার নাম ছিল ‘আনাহুয়াক’ যার অর্থ - জলবর্তী দেশ। প্রাকৃতিক দিক থেকে মেক্সিকো উপত্যকা চিত্তাকর্ষকই বটে। এখন থেকে মাত্র ৬০০ বছর আগে এই উপত্যকা ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০০০ ফুট উচ্চতায় একগুচ্ছ প্রাকৃতিক হ্রদের সমষ্টি। তারই মাঝে কয়েকটি দ্বীপ জুড়ে ছিল অ্যাজকেট সাম্রাজ্যের রাজধানী। পাথরে তৈরি বিপুল আয়তনের সব ইমারতের অধিকারী রাজধানীর লোকসংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। স্পেনীয়দের অভিযানে সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান মেক্সিকো সিটি অ্যাজটেক রাজধানীর সেই ধ্বংসাবশেষের ওপর তৈরি।

কিন্তু ষোড়শ শতাব্দী থেকে অনেকগুলো হ্রদে প্রাকৃতিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। এগুলোর তলদেশ উঁচু হয়ে উপত্যকায় পরিণত হয়। আর সেই উপত্যকাতেই অবস্থিত আজকের পৃথিবীর অন্যতম রূপবতী শহরটি। শুকিয়ে আসা হ্রদগুলোর জল টিঁকে থাকা সোচিমিলকো ও চালকো হ্রদ দুটিতে জমা হয়। এদেরই বুকে শহর থেকে প্রায় দশ মাইল দূরে বিখ্যাত ‘ভাসমান বাগিচা’ গড়ে উঠেছে।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোববার ও অন্যান্য ছুটির দিনে ‘লাস চিনামপাস’ নামের এই বাগান উৎসবে-আনন্দে সেজে ওঠে। হাজার হাজার শহরবাসী ভিড়ে ভরা ইলেকট্রিক ট্রামে চড়ে হ্রদে এসে পৌঁছায়। হ্রদের বুকে প্যাডেলবোটে চেপে হ্রদের বুকে ভেসে বেড়ায়। আশেপাশের গ্রামের বাগানগুলো থেকে তুলে আনা রঙবেরঙের থরে-বিথরে ফুল দিয়ে সাজানো হয় পা দিয়ে ঠেলা নৌকাগুলোকে। যথেচ্ছ বৃক্ষবহুল এই এলাকা। অত্যধিক ঊষ্ণ-শুষ্ক অঞ্চলের উত্তরপ্রান্তে অবস্থান মেক্সিকো উপত্যকার। হ্রদের তীরবর্তী জলও এমনকী সবুজে আচ্ছাদিত। গাঢ় সবুজের বিপুল বিস্তারের মাঝে মাঝে পুষ্পের বর্ণচ্ছটা পরিবেশকে রঙীন করে।

চিনামপাসের বুকে এই জলভ্রমণ মেক্সিকানদের আনন্দ-গান-উৎসবের সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্য। আনন্দমুখর তরুণ-তরুণীর লাস্যতারল্য, বন্ধুত্বের উদযাপন, পুরুষ বন্ধুদের গিটারের ঝংকারের সঙ্গে তরুণীদের সঙ্গীত-উচ্ছ্বাসে হ্রদের জল নেচে ওঠে। কেউ কেউ নৌকা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও নেচে ওঠার লোভ সামলাতে পারে না। মাঝে মাঝে নৌকা উল্টেও যায়। কপট ক্রোধের চীৎকার করে ওঠে জলে হাবুডুবু খেতে থাকা সেনঞরিতাগণ। সবাই মিলে ভিজে কাক তরুণীদের জল থেকে তুলে আনা হয়।

চিনামপাসকে ‘নয়াবিশ্বের ভেনিস’ বলা হয়ে থাকে। দু’টোর মধ্যে তফাৎ হচ্ছে একটা সবদিক থেকেই খুব গতানুগতিক, আরেকটা একেবারে প্রাকৃতিক। চিনামপার আশেপাশের পাড়াবসতিগুলো এবং মানুষকেন্দ্রিক পরিপার্শ্ব আমার এত ভাল লাগত যে, প্রায়ই মেক্সিকান বন্ধুদের নিয়ে ওখানে বেড়াতে যেতাম। এই হল্লামুখর ফুর্তিবাজিতে অংশ নিতে স্বভাবগতভাবেই অপারগ ছিলাম বলে তারা আমার নাম দিয়েছিল “ভারতের বিষণ্ন অধ্যাপক”।

মেক্সিকোয় পৌঁছানোর কিছুদিনের মধ্যেই এদেশের মানুষকে কেন যুদ্ধপ্রিয় জাতি বলা হয় তার আরো একটা সম্ভাব্য কারণ খুঁজে পেলাম। কারণটা হচ্ছে, সামরিক পোশাক পরতে এবং আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরতে এরা খুবই ভালবাসে। এই ভালবাসার সঙ্গে বাচ্চাদের খেলনার প্রতি ভালবাসা তুলনীয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিষয়টা সম্পর্কে আমার জানা হয়েছিল। এক সামরিক অফিসারের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল যিনি কিনা প্রায় সময়ই কোমরের খাপ থেকে পিস্তল বের করে গুলি করতেন। মানুষ মারার জন্য না। তিনি ওটা করতেন বন্ধুদের সঙ্গে তর্কাতর্কির মাঝখানে অনেকটা যতিচিহ্ন হিসেবে, তা সেই তর্ক ব্যারাকের মেসে, রাস্তার ধারে কিংবা বৈঠকখানা যেখানেই হোক না কেন।

মধ্যযুগীয় ডুয়েল লড়াই এখানে তখনও প্রচলিত ছিল। কিন্তু বিধি অনুসারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরস্পরের দিকে বন্দুক তাক করার এখতিয়ার ছিল না। তারা বাতাসে কিংবা ঘরের ছাদের দিকে তাক করে গুলি ছুড়ত, তারপর পরস্পরকে আলিঙ্গন ও চুম্বনের মধ্য দিয়ে লড়াইয়ের ইতি টানা হতো। রাজধানীর রাস্তাগুলোতে সামরিক পোশাকে সজ্জিত লোকজনের প্রচুর ভিড় হতো। সেটা অবশ্য দশ বছর ধরে গৃহযুদ্ধের ডামাডোলে অস্থির একটা দেশের জন্য খুব স্বাভাবিক বিষয়। আর রাজধানী থেকে কয়েক মাইল দূরেই যুদ্ধের দামামা তখনও বেজেই চলেছে। সামরিক পোশাক পরা অস্ত্রসজ্জিত এইসব মেক্সিকানদের অধিকাংশ অবশ্য অ্যাজটেকদের যুদ্ধদেবতা ম্যাক্সটেলের পূজারী ছিল না। ম্যাক্সটেল সকলের বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। তবে “শ্বেতবরণ নিদ্রিত কন্যা” তাদের সকলের হৃদয়ে জাগরুক। শান্তির প্রতীক তিনি। আনাহুয়াকের দেশে যুদ্ধ এনেছিল স্পেনীয় হানাদারের দল।

মেক্সিকো সিটি বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম রাজধানী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত হাজার চারশ ফুট উঁচুতে এর অবস্থান। উপত্যকার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে দুই পর্বতমালা সিয়েররা দে গুয়াদালুপে ও সিয়েররা নেভাদা দ্বারা বেষ্টিত এই উপত্যকা। সিয়েররা দে গুয়াদালুপে পর্বতমালার উচ্চতা মেক্সিকো সিটি থেকে হাজার ফুটেরও কম। সেখানে রয়েছে ক্যাথলিক মেক্সিকোর রক্ষাকর্ত্রী সাধু “আওয়ার লেডি অব গুয়াডালুপ”-এর মন্দির। শহরের প্রান্তে আছে জ্যোতির্ময় স্মৃতিসমৃদ্ধ একটি পুরানো ক্যাথেড্রাল। মানুষের বিশ্বাস এখানেই তিনি ঊষর পাথরের বুক ফাটিয়ে জল নিঃসরণ করেছিলেন। আর সেই অলৌকিকের উপকারভোগী যারা, অর্থাৎ গরিব মানুষ যাদের অধিকাংশই আবার খাঁটি আদিবাসী রক্তের উত্তরাধিকারী, তারাই সাধু গুয়াদালুপের পূজারী। মেক্সিকো সিটির আরো একজন রক্ষাকর্তা আছেন। তিনি অ্যাজটেকদের আদিধর্মের দেবতা।

পূবদক্ষিণ প্রান্তে আরো উঁচু, বরফঢাকা সিয়েররা নেভাদা পর্বতমালা। তার শীর্ষে দুই আগ্নেয়শৃঙ্গ পোপোকাতেপেত্ল্ এবং ইসতাসিউয়াত্ল্। অ্যাজটেকদের রাজত্বকালে শৃঙ্গদুটি আনাহুয়াকের সিংহদুয়ারের স্বর্গীয় দ্বাররক্ষী হিসেবে বিরাজিত ছিল। সেই অ্যাজটেক নেই, সেই আনাহুয়াকও আর নেই আজ। কিন্তু পোপোকাতেপেত্ল্ নামটি (যার অর্থ ধোঁয়ার পাহাড়) থেকে বোঝা যায় ছয় শতাব্দী আগে এটা ছিল একটা সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। কিংবদন্তী ও মিথ পাহাড়টির ওপর স্বর্গীয় দ্বাররক্ষীর যে ভূমিকা অর্পণ করেছে সেদিক থেকে পোপোকাতেপেত্ল্ সার্থকনামা। কিন্তু ইসতাসিউয়াত্ল্ পাহাড়টির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্বন্ধ অনেকটাই রোমান্স, কাব্য ও আদরের। শব্দটির অর্থ “শ্বেত” অথবা “নিদ্রিতা নারী”। ভাষা ঐতিহাসিকদের মধ্যে সঠিক অর্থটি কী হবে তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অ্যাজটেকদের চিত্রলিপি বা হিয়েরোগ্লিফে লেখা শব্দটির মধ্যে নারী প্রতীকটিকে স্পষ্টভাবেই চেনা যায় কিন্তু এর সংলগ্ন বিশেষণটির সঠিক অর্থ এখনও জল্পনাকল্পনার বিষয় থেকে গেছে। বিশেষজ্ঞের মতামত যা-ই হোক, এক্ষেত্রে “শ্বেত” শব্দটিই নিঃসন্দের অধিকতর যৌক্তিক। তাছাড়া, “নিদ্রিতা” ও “শ্বেত” শব্দ দু’টো দিয়ে পরিষ্কারভাবে চিত্রটিকে আঁকা যায়।

মেক্সিকো সিটি থেকে ইসতাসিউয়াত্ল্ পাহাড়টির দিকে তাকালে মনে হয় এক নারী চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। পাহাড়টি সবসময় বরফঢাকা বলে শায়িতা সেই নারীকে শুভ্র বলে মনে হয়। আর তার স্থিরতাই বলে দেয় নারীটি নিদ্রামগ্ন। যমজ চূড়াদু’টি শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে মিথ ও কিংবদন্তীর জন্ম দিয়েছে। কবিকুলের রোমান্টিক কাব্যরচনার পাথেয় হয়েছে আর মেক্সিকো উপত্যকার সৌন্দর্য্যে আরো ঐশ্বর্য্য যোগ করেছে।

আওয়ার লেডি অব গুয়াডালুপের মন্দিরটি এখানকার আদিধর্মের দেবীর কাছে সম্পূর্ণ পরাভূত হয়েছে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে অলৌকিক চিরকালীন তুষারের দেবী তিনি। চিত্রটি আধুনিক মেক্সিকোর সংস্কৃতির পরিচায়ক। স্পেনীয় বিজেতাদের দ্বারা ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তারই বিরুদ্ধে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আদি বহু ঈশ্বরবাদী ধর্ম বিদ্রোহ করেছে। এভাবে খ্রিস্টান পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো মেক্সিকোর বিপ্লবের এক ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য সেই ইদালগো ও মোরেলোসের সময় থেকেই। নিজেরা গ্রামভিত্তিক ক্যাথলিক সমাজের পুরোহিত হয়েও পুরোহিততন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তাঁরা দু’জনেই।

ডিয়াসের শাসনের পুরাতন সুখের দিনগুলোতে সিয়েররা নেভাদা মেক্সিকোর জাতীয় উদ্যানের মতো ছিল। ইউরোপের আনন্দশিকারীরা দলে দলে সেখানে ভিড় জমাত বিলাসে ব্যাসনে গা ডুবিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য। পাহাড়ের ওপর সরকারি রেস্টহাউজ আর ব্যক্তিমালিকানাধীন হোটেলের অভাব ছিল না। বিপ্লবের পর বদলে গেছে সবই। “ধোঁয়ার পাহাড়” তার প্রহরায় রেখে “শুভ্রনারী” শান্তিতে নিদ্রামগ্ন হয়েছে। দেবপূজারী ঐতিহ্যের প্রতি অনুগত মেক্সিকোর অবচেতন মানস এতে করে সম্ভবত খুশিই হয়েছিল। নিজেদের জাতীয় উদ্যান নিয়ে তাদের গর্ব যেমন ছিল, তেমনি একইসঙ্গে কিংবদন্তীর দেবদেবীর অধিষ্ঠানের প্রতিও তাদের মধ্যে মর্যাদাবোধের কমতি ছিল না। হোটেল রেস্টহাউস বন্ধ হওয়ার ফলে বিলাসী বিদেশীদের ছ্যাবলামির কলুষস্পর্শ থেকে তাঁরা মুক্ত হলেন। বিপ্লব অন্তত সেটি সম্ভব করেছিল। মেক্সিকোয় আমার অবস্থানকালীন জাতীয় দেবদেবীর অধিষ্ঠানমুখী পথের প্রহরায় ছিল খাঁটি আদিবাসী রক্তের সাপাতিস্তারা। আমি বরফঢাকা চূড়ার দিকে যেতে চাইলে তারা আমাকে বারবার সতর্ক করত এই বলে যে, পর্বতমালার ঢাল জুড়ে ডাকাতের ছড়াছড়ি। অথচ জায়গাটি রাজধানী থেকে কুড়ি মাইলের বেশি পথ নয়। বেশ কয়েকবারই ওই পথে রওনা দিয়েছিলাম আমি কিন্তু বেশিদূর আর এগোনো হয়নি। দেবপূজার প্রতি আমার সহজাত সংবেদনশীতা “নিদ্রিতা নারীর” প্রতি গভীর মোহ অনুভবের মাধ্যমে প্রকাশ পেল। চিত্রকল্পটি এক প্রাচীন সংস্কৃতির ঐতিহ্যের কথা বলে। সে সংস্কৃতি নির্মল, খাঁটি, কিন্তু মৃত।

যমজ চূড়াদুটোকে সমগ্র উপত্যকা থেকে দেখা যায়। কিন্তু মেক্সিকো বাসের অধিকাংশ সময় যে বাসাটিতে আমি ছিলাম তার ব্যালকনির ঠিক সামনেই চূড়াদুটি ফুটে থাকত। বাসাটা একটা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র ছিল যার অংশভাগী ছিলেন প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি স্বয়ং। ওখানে বসেই প্রথম রুশ বলশেভিকের সঙ্গে বন্ধুত্বের কর্ষণ করেছিলাম যিনি আমাকে বিপ্লবী পথের সূক্ষ্ণ অলিগলির খোঁজ দিয়েছিলেন। রাশিয়ার বাইরে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির জন্মও এই গৃহে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অসংখ্যবার চেষ্টা করেছি কুড়ি মাইল দূরের “নিদ্রিতা নারী”কে ক্যামেরাবন্দী করার। একবার কীভাবে যেন সফলও হয়ে গেলাম। তখন আমি কাঁচা হাতের শৌখিন আলোকচিত্রী। সেই বিরল আলোকচিত্রের বিরাট এক কপি আবেনিদা ফ্রান্সিসকো মাদেরো সড়কের ওপর এক ছবির দোকানে দেয়ালের এ মাথা থেকে ও মাথা জুড়ে টাঙানো ছিল পরবর্তী বেশ ক’বছর।

নিদ্রিতা নারীর শহর আমার স্মৃতিতে কতটা অংশ জুড়ে আছে তা পাঠকমাত্রই বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই। আমি জাতীয়তাবাদী নই। সব দেশই আমরা কাছে যতটা ভাল ততটাই মন্দ। বস্তুত, পৃথিবীর বহু প্রান্ত ঘুরে আমার এটাই প্রতীতী জন্মেছে যে, মানুষ বিনে যে কোনো দেশই ভাল। সব দেশের অধিবাসীরাই কুসংস্কার আর সঙ্কীর্ণতায় জর্জরিত। তবে এসবের মধ্যে মেক্সিকোকেই আমার একমাত্র ব্যতিক্রম মনে হয়েছে। কেন তা স্পষ্ট করে বলতে পারব না। হতে পারে “নিদ্রিতা নারী”র প্রতি গভীর মুগ্ধতাজাত “অতীন্দ্রীয় অভিজ্ঞতা”র ফল এই বোধ।

কবি নই আমি। তার সৌন্দর্য্য বর্ণনায় একটি লাইনও লেখা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। প্রকৃতপক্ষে সৌন্দর্য্য বস্তুটা কী সেটাই আমি এ জীবনে বুঝে উঠতে পারিনি। আমি শুনেছি যে, সৌন্দর্য্য বোঝার অতীত একটি বিষয়। এটা মূলত অনুভবের বিষয়, কল্পনার মধ্য দিয়ে অনুভবের বিষয়। অথবা, কল্পনায় সৃজনের বিষয় তারপর সৃজিত বস্তুকে অঞ্জলিদানের বিষয়। আমার কাছে এসবই গ্রীক ও লাতিনের মতো দুর্বোধ্য। কিন্তু সবকিছুর পরও “নিদ্রিতা নারী”র প্রতি আমার গভীর মুগ্ধতাবোধ রয়ে গেছে এবং এখনও আমি মেক্সিকো ও সেখানকার মানুষের সারল্য, বন্যতা, বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা ও করুণার প্রতি এক প্রবল আকর্ষণ বোধ করি। গত তিরিশ বছরে হয়তো দুইয়েরই অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু আমার মনে হয় এত পাল্টে যাবে না যে একেবারেই অচেনা হয়ে যাবে সবকিছু। ফলে যদি আমি অন্য কোথাও থাকি তো মেক্সিকোতেই যাব। সবকিছু পাল্টে যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু “নিদ্রিতা নারী” তো পাল্টাবে না। আর ধোঁয়ার পাহাড়ও এতটাই মৃত যে তার ঈর্ষান্বিত হওয়ার ক্ষমতাও নেই আর।

মেক্সিকোর প্রতি আমার মুগ্ধতাকে ‘রক্ত পানির চেয়ে গাঢ়’ এই প্রবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। আমার শিক্ষা তখনও নিদারুণভাবে অসম্পূর্ণ। তারপরও অর্জুন দিগ্বিজয়কালে মেক্সিকোতে এসে ব্রহ্মচর্যের ব্রত ভেঙে এদেশকে সন্তানসন্ততিতে ভরিয়ে দিয়ে গেছেন--এই কিংবদন্তী আমার তখনও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। বস্তুত, এরকম কিম্ভূত একটা গল্পকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়াটাই সম্ভব না। এর চেয়ে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা হলেও যৌক্তিক তত্ত্ব যেখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভারত থেকে মানুষের এখানে আসার কথা বলা হয়ে থাকে সেটাকেও একইরকম অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে আমার কাছে। এ ধরনের কষ্টকল্পিত তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছিল বা দরকার হয়েছিল সেই কালে যখন নৃতাত্ত্বিকরা একটি যুগল থেকেই বিশ্বের সব মানুষের সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন। এ ধরনের একক-আদিপুরুষের তত্ত্ব জন্ম নিয়েছে সেই অবচেতন থেকে যেখানে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস ক্রিয়াশীল। বিজ্ঞানের বিপুল অগ্রগতি স্রষ্টার অস্তিত্বের বিষয়টি নির্মূল করেছে এবং প্রাগৈতিহাসিক যুগের অন্ধকারতম কোণগুলোতে আলোকপাত করতে পেরেছে। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানে বহু-আদিপুরুষের ধারণাটি অধিকতর যুক্তিযুক্ত, যা একইসঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য প্রমাণের জন্য কষ্টকল্পিত অভিবাসন তত্ত্বকে অযৌক্তিক বলে প্রমাণ করেছে। মানবসমাজের সাংস্কৃতিক ক্রমবিকাশের যে পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি যা যাদু, প্রকৃতিপূজা, দেবপূজা ও বহু ঈশ্বরবাদের ধারাবাহিক স্তরে সজ্জিত সাধারণভাবে তাকে মানুষের আদিম যুক্তিচিন্তার ক্রমঅভিব্যক্তির নিরিখে ভাবা যেতে পারে। এই আদিম যুক্তিচিন্তা (primitive rationality) প্রজাতি হিসেবে মানুষের জৈবিক উত্তরাধিকার। জৈবিক উত্তরাধিকারের ধরন একই বলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আদি মানুষ কমবেশি একইভাবে চিন্তা করত, একই ধরনের কাজ করত। প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি মানবসংস্কৃতির সাধারণ ভিত্তির প্রতি নির্দেশ করে এবং এক বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন কোনো একদিন ঠিকই বাস্তবের মুখ দেখবে এই আশা জাগায়।

মেক্সিকোতে আসার পর দেশটিকে আবিষ্কার করতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল আমার। আমারই মতো ব্রিটিশরাজের প্রজা কানাডীয় বন্ধুর বদান্যতায় হোটেল জেনেভা নামের যে আবাসিকে আমার ঠাঁই হয়েছিল সেটা ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক। মেক্সিকোর কোনো কিছুর সঙ্গেই হোটেলটির সংস্পর্শ ছিল না। একদিন থেকে অবশ্য হোটেলটা আকাঙ্ক্ষা উসকে দেওয়ার মতোই। স্থানীয় ধূলাবালি আর দুর্গন্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা হতো। কিন্তু এখানে ইং-মার্কিনদের যে ক্ষুদ্র উপনিবেশটি গড়ে উঠেছিল তার অধিবাসীদের উদ্ধত বিচ্ছিন্নতা ছিল চূড়ান্ত আপত্তিকর। হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং তাদের অতিথিসকল উভয়েরই ভাবখানা ছিল এমন যেন তারা শুধু যে একটা যুদ্ধাক্রান্ত দূর্গে বসবাস করছে তা-ই নয়, তাদেরকে চারদিকে থিকথিক করা জীবাণুসঙ্কুল পরিবেশের থেকেও আত্মরক্ষা করতে হবে। এদের অধিকাংশের মধ্যে মেক্সিকোর বিপ্লবের ভাইরাস প্রতিরোধী শক্তিশালী ব্যবস্থা বিদ্যমান। তাদের ভীতি ছিল আক্ষরিক অর্থেই সংক্রমণজনিত রোগের জীবাণুর ব্যাপারে। কিছুদিন আগে পর্যন্তও যুদ্ধের থাবায় বিক্ষত এত বড় শহরের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রোগজীবাণুর অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। দিয়াসের একনায়ক সরকারের স্বর্ণালী দিনগুলোর স্মৃতি তাদের সকলের হৃদয়ে ব্যথার সঞ্চার করত এবং সেইসব দিন ফিরে পেতে সকলেই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনাও করত।

হোটেলে পা রাখার প্রথম দিনই মেক্সিকোতে আসা বিদেশীদের এতটা কৃত্রিম পরিবেশে বাস করতে দেখে অত্যন্ত বিরক্ত লেগেছিল আমার। দারুণ আরামদায়ক ঘর আর ধোঁয়া ওঠা গরম পানির সাহচর্য কার না ভাল লাগে? দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে শরীরে জমা হওয়া ক্লেদ ধূলা মাটি সবকিছু দূর করে দেয়। ওই সময় এর চেয়ে আকাঙ্ক্ষিত আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু মার্কিনি এসব আরাম-আয়েশ যে বিষয়টা আমাকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি তা হলো এমন একটি দেশে আমি এসেছি যার আছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য যা আর সবার চেয়ে আলাদা। আমি বিশ্বাস করতাম মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি অনেকটাই আসলে রান্নাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। সেই বিশ্বাস এখনও আমার আছে কিন্তু রান্নার সেই সারল্য অনেকটাই ধ্বংস হয়েছে চৌকসকরণের মধ্য দিয়ে। যাই হোক, রোমে গিয়ে রোমানের মতো আচরণ করো সেই আপ্তবাক্য প্রয়োগও করলাম। মেক্সিকোয় বসে মেক্সিকানের মতো আচরণ করতে চাইলাম। সেটা করতে গিয়ে ধ্রুপদী মেক্সিকান পদের অর্ডার করলাম। নুয়েভা লোরেদোর দয়ালু গৃহকর্তা আমাকে তাঁদের নিজস্ব একটি পদ খাইয়েছিলেন। হোটেল জেনেভায় বসে আমার জানা বাকি দুটো মেক্সিকান খাবার তামালেস এবং চিলে কন কার্নে দিতে বললাম। মেক্সিকান ওয়েটারটি আমার দিকে অবাক হয়ে চাইল। তারপর বলল, খাবার দুটো সে দিতে পারে তবে সেটা হবে মার্কিন দেশে তৈরি টিনের খাদ্য। বিখ্যাত লিবি বা হেইনজ কোম্পানির সাতান্ন ধরনের খাদ্যপণ্যের মধ্যে ও দু’টোও আছে। আমি তো অবাক। মেক্সিকান খাবার কেন মার্কিনি টিনফুড থেকে করতে হবে জানতে চাইলে সে বলল, “কারণ আমাদের কোনো অতিথি নেটিভ ফুড খান না।” অর্ডার বাতিল করে বিফস্টেক দিতে বললাম।

পাদটীকা

১. ইদালগো (Miguel Hidalgo y Costilla)। জন্ম ১৭৫৩ মৃত্যু ১৮১১। তাঁকে মেক্সিকোর জাতির পিতা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ছিলেন ল্যাটিন ব্যকরণ, শিল্প ও ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক এবং রোমান ক্যাথলিক পুরোহিত। তিনি অভিজাত ক্রিয়োলো গোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম নিয়েছিলেন। মেক্সিকোর ক্রিয়োলো জনগোষ্ঠী তাদের বলা হয় যারা শুধু ঔপনিবেশিক স্পেনীয় অথবা স্থানীয় ও স্পেনীয়দের মিশ্ররক্তজাত বংশধর। নিজে ক্রিয়োলো হলেও হিদালগো মেক্সিকোর আদিবাসী ও দরিদ্র জনসাধারণকে সমদৃষ্টিতে দেখতেন। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতামতের দিক থেকেও তিনি ছিলেন উদার দৃষ্টিভঙ্গির। ক্যাথলিক যাজক হিসেবে বিয়ে বা নারীসঙ্গ লাভের অধিকার না থাকলেও তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে বাস করেন এবং আটটি সন্তানের জনকও হন। তিনি দরিদ্র মানুষের জীবিকা সংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন এবং এ নিয়ে প্রচুর কাজও করেন। কিন্তু স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদের নীতি ছিল স্থানীয় মানুষকে কৃষি ও শিল্প উৎপাদনে কঠোরভাবে বাধা প্রদান যাতে স্পেনে উৎপাদিত পণ্য মেক্সিকোতে চড়াদামে বিক্রি করা যায়। ইদালগো এই নীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৮০৩ সালে মেক্সিকোর দোলোরেস এলাকায় যাজকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সেখানে পরিবারবর্গসহ আসেন। এখানেও একইভাবে দরিদ্র ও আদিবাসী কৃষিজীবী ও বেকারদের স্বকর্মসংস্থানের কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং মেক্সিকোর অভিজাতদের বিরোধিতার মুখে পড়েন এবং গ্রেপ্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়। ১৮১০ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর তিনি গীর্জায় সমবেত প্রার্থনার ডাক দেন। এতে প্রায় ৩০০ জন যোগ দেন। এখানে তিনি যে বক্তৃতা দেন তা ইতিহাসে “দোলোরেসের ডাক” হিসেবে খ্যাত হয়ে আছে। এখানে তিনি স্পেনের রাজার পক্ষে মেক্সিকোর তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন। ইদালগো মেক্সিকোর স্বাধীনতার ডাক দেননি। মেক্সিকোর সরকারের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক উদারপন্থী পুরোহিত, বুদ্ধিজীবী, আদিবাসী, মিশ্ররক্তের সাধারণ মানুষ ইদালগোর সঙ্গে যোগ দেয়। ক্রমে তাঁর বাহিনীতে অংশগ্রহণীকারীর সংখ্যা প্রায় লাখের ওপরে পৌঁছায়। অপ্রশিক্ষিত এই বিপুল বাহিনী নিয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একাধিক যুদ্ধে জিতলেও শেষ পর্যন্ত শত্রুর চাপে তাঁকে পশ্চাদপসরণ করতে হয়। অবশেষে ১৮১১ সালের মার্চ মাসে ইদালগো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সহযোদ্ধাসহ আটক হন। নির্মম নির্যাতন ও বিচারের পর সে বছরের ৩০শে জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর পর তাঁর ও সহযোদ্ধাদের দেহ মাথা থেকে বিচ্ছিন্ন করে জনসম্মুখে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পরে চিহুয়াহুয়ার চার্চ অব সেন্ট ফ্রান্সিসের আঙিনায় সমাধিস্থ করা হয়। ১৮২৪ সালে তাঁর দেহাবশেষ মেক্সিকো সিটিতে নিয়ে আসা হয়।

সূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Miguel_Hidalgo_y_Costilla

২. মোরেলোস (José María Morelos)। জন্ম ১৭৬৫, মৃত্যু ১৮১৫। খ্রিস্টান পুরোহিত এবং বিপ্লবী নেতা। বাইয়্যাদোলিদ শহরে ছুতোর বাবার ঘরে দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোরেলোস। স্কুলে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত কৃষিমজুরসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁর স্কুলের পরিচালক ছিলেন মিগেল ইদালগো। ইদালগোর বাহিনীতে যোগ দেন মোরেলোস, তবে নিজের বাহিনী সঙ্গে নিয়ে। নিয়মানুবর্তী মোরেলোস ছোট কিন্তু প্রশিক্ষিত সশ্রস্ত্র বাহিনীর পক্ষপাতী ছিলেন। ১৮১১ সালে ইদালগো ও অন্যতম অধিনায়ক আইয়্যেন্দের আটকের সংবাদে মোরেলোস ভীষণভাবে আঘাত পেলেও লড়াই অব্যাহত রাখেন। ১৮১৪ সালে তাঁর বাহিনী পরাজিত হয়, তিনি আটক হন, এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। মেক্সিকোর স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম অগ্রনায়ক হিসেবে মোরেলোসের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি একজন খ্রীস্টধর্মে গভীরভাবে বিশ্বাসী যাজক ছিলেন। মেক্সিকোর স্বাধীনতা ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে বিশ্বাস করতেন। বলা হয়ে থাকে, তিনিই প্রথম ঐক্যবদ্ধ এক মেক্সিকোর স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে অন্যদের মধ্যে আঞ্চলিকতার প্রবণতা বিদ্যমান ছিল। এছাড়া তিনি লড়াই চলাকালে সবসময় মেক্সিকোর উচ্চবিত্ত ক্রেওল জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করে গেছেন যা ছিল ইদালগোর কৌশলের বিপরীত।

সূত্র: https://www.thoughtco.com/jose-maria-morelos-2136464

৩. হোসে দে লা ক্রুস পোরফিরিও দিয়াস মোরি (Jose de la Cruz Porfirio Diaz Mori)। বিস্তারিত জানতে আগের অধ্যায়ের তথ্যসূত্র দেখুন।