তৌফিক ভাইয়ের চারটি বাক্য, আমার সাংবাদিকতার পাঠ
“ঠিক আছে”, “করো”, “আমার রিপোর্টার তো কনফার্ম করে নাই” এবং “কয়টা পয়সার জন্য খবরটা দিলা না?”—তৌফিক ইমরোজ খালিদীর এই চার বাক্যে কীভাবে সাংবাদিকতার নীতি শিখেছিলেন জিয়াদ মুবাশ্বির ইসলাম?
একটা মানুষ চলে গেলে তার চেহারা কোনো না কোনো সময় গিয়ে মনের মাঝে ঝাপসা হয়ে আসে। গলার স্বরটাও হয়তো আর ঠিক মনে থাকে না। কিন্তু তার কিছু কথা থেকে যায়। কথাগুলো কীভাবে, কেন বলা হয়েছিল—তাও থেকে যায়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী, আমার জীবনের প্রথম সম্পাদক, যাকে সম্বোধন করতাম তৌফিক ভাই বলে। আমাকে বলা তার অনেক কথার মধ্যে চারটি বাক্য আমার দুই দশক হতে যাওয়া সাংবাদিকতার কেরিয়ারের লাইটহাউস।
সম্পাদক, সাংবাদিক কিংবা মানুষ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন, তার অনেক হিসাবই হয়তো অন্যরা দিয়েছেন, দেবেন। আমি শুধু বলব, তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কী শিখেছিলাম। তার কাছ থেকে শেখা অনেক কিছুর মধ্যে কেন এই চারটি কথাই আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।
“ঠিক আছে”
২০০৭ সালের একেবারে শুরুতে ধানমন্ডি ২৭-এর অফিসে যোগ দিয়েছিলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। বিভাগ ছিল নিউ মিডিয়া, পদ ব্রডকাস্টার। প্রথম দিনেই খবর এল, সম্পাদক আমাকে ডেকেছেন। নতুন চাকরি, তার ওপর সম্পাদক ডাকছেন—ভেবেছিলাম, নিশ্চয়ই কিছু একটা ভুল করেছি।
তখন নিউ মিডিয়া বলতে কী বোঝায়, সেটা এখনকার কাউকে বোঝানো কিছুটা কঠিনই বটে। মোবাইল ফোন নিউজ সার্ভিসের জন্য ইংরেজিতে এসএমএস লিখতাম। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় ভয়েস নিউজের স্ক্রিপ্ট লিখতাম, প্রযোজনাও করতাম। মোবাইল ইন্টারনেট তখনো সবার নাগালের বাইরে। বেশির ভাগ জায়গায় ফোনে খবর পাওয়া বলতে দিনে এক-দুবার ছোট ছোট সংবাদসংক্ষেপ আসা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর একটু অন্যভাবে কাজটা করছিল। নিয়মিত নিউজ এসএমএস, ব্রেকিং নিউজের এসএমএস, নির্দিষ্ট নম্বরে ডায়াল করলে শোনা যাবে ভয়েস হেডলাইন। নতুন খবর এলেই আপডেট। দেশের সংবাদমাধ্যমে এসব তখনো নতুন ব্যাপার—বাংলাদেশের প্রথম মোবাইল নিউজ সার্ভিস।
তৌফিক ভাইয়ের রুমে ঢুকলাম। শ্মশ্রুমণ্ডিত, পরিপাটি পোশাকের মানুষটার হাতে আমার লেখা স্ক্রিপ্টের একটা প্রিন্ট। সেখান থেকে একটা শব্দ দেখিয়ে বললেন সেই শব্দটা উচ্চারণ করতে। শুনে বললেন, “ঠিক আছে।”
তারপর আর কিছুক্ষণ সাধারণ কথাবার্তা বলে কাজে ফিরে যেতে বললেন। সব মিলিয়ে মিনিট দশেকও না বোধ হয়। সেদিন বিশেষ কিছু ঘটেছে বলে মনে হয়নি।
এখন বুঝি, একজন সম্পাদকের নিজে একটা শব্দও মিলিয়ে দেখার মধ্যে ব্যাপারটা আসলে কী। ভুল হলে সেটা শুধু আর আমার ভুল হয়ে থাকবে না, শ্রোতার কাছেও পৌঁছাবে। আর সেটা আটকানোর দায় সম্পাদকেরও। কাজের খুঁটিনাটি নিয়ে তিনি যে আপস করতেন না, সেটা শুরুতেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
“করো”
সাংবাদিক হিসেবে আমার ফিল্ড রিপোর্টিং শুরু হওয়ার কিছুদিন পরের ঘটনা। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল, অর্থাৎ ওয়ান-ইলেভেনের সময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ঘটনার রেশ দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার পর কারফিউ জারি হয়ে গেল। এর মাঝেই খবর এল, শাহবাগ-আজিজ মার্কেট এলাকার মেসগুলোতে সেনা সদস্যরা ঢুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আইডি কার্ড দেখছেন, তারপর তাদের বের করে নিয়ে যাচ্ছেন।
খবরটা দিয়েছিল আমার এক বন্ধু, যে একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের ঢাকা অফিসে কাজ করত। সময়টা সকাল ১০টা-১১টার দিকে। তাদের খবর প্রকাশ হতে হতে সন্ধ্যা। ঢাকার অন্য কোনো সংবাদমাধ্যম খবরটা করবে কি না, সেটাও বোঝা যাচ্ছিল না। আমাকে বলল, “আপনারা এখন চালালে দেশের বাইরেও জানবে।”
পরিস্থিতি তখন এমন যে, খবর প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ ছিল না। লাইভ করার কারণে একটা চব্বিশ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেছে। ইন্টারনেট বন্ধ, দিনের একটা সময় মোবাইল নেটওয়ার্কও থাকে না।
তৌফিক ভাইকে ফোন করলাম। পুরো ঘটনা শুনলেন। জানতে চাইলেন, সূত্র কে? বললাম। তারপর বললেন, “করো।”
ব্যস, এইটুকুই।
খবরটা কোথা থেকে এসেছে, সেটা জেনে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। সেই রকম একটা সময়ে ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না। কারণ, খবরটা না করারও যথেষ্ট কারণ ছিল। কারফিউ চলছে, পরিস্থিতি অনিশ্চিত, আর আমি নিজেও তখন নতুন।
তিনি ঝুঁকি নিতে বলেছিলেন বলে নয়, যাচাইয়ের পর খবরটা করার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই ঘটনাটা আমার মনে দাগ কেটে আছে। ভয় পাওয়ার কারণ ছিল, কিন্তু সেই ভয় দিয়ে খবরের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না—অন্তত তার কাছ থেকে আমি সেটাই শিখেছিলাম।
“আমার রিপোর্টার তো কনফার্ম করে নাই”
২০১১ সালের শুরুর দিকে তার সঙ্গে একটা খবরভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলে যোগ দিই। তিনি তখন একই সঙ্গে সেই চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান। আমি কাজ করতাম চ্যানেলটির বিজনেস করেসপন্ডেন্ট হিসেবে। আর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের জন্য খবর লিখতাম, তবে সেটি একটা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল।
একদিন আর্থিক খাতের নীতি নিয়ে তৌফিক ভাইয়ের একটা খবর এল। সূত্র এমন একজন, যিনি ক্ষমতার বেশ কাছের মানুষ। আমাকে খবরটা যাচাই করতে বললেন।
আমি পরিচিতদের ফোন করলাম, নিজের নেটওয়ার্কে খোঁজ নিলাম। একাধিক সূত্র থেকে একই উত্তর পেলাম: এমন কিছু ঘটেনি। ফিরে এসে তাকে জানালাম। তিনি বললেন, “না, মনে হয়। তুমি ভালো করে খোঁজখবর নাও।”
ভালো করে খোঁজখবর নিয়েই আমি তাকে জানিয়েছিলাম! তাই বললাম, “হতেই পারে না। আমার সব সোর্স কনফার্ম করছেন, এই রকম কিছু হয় নাই।” নিজের অবস্থানে অনড় আমি।
আমরা তখন টিভি চ্যানেলটার ক্যাম্প অফিসের একটা খোলা ঘরে বসে কথা বলছিলাম। আশপাশে আরও অনেকে ছিলেন। তৌফিক ভাই সম্পাদক, আমি রিপোর্টার—এই পরিচয়ের কারণে তার সঙ্গে তর্ক করতে হবে, এমন বিষয় মাথায় ছিল না। খবরটা নিয়ে আমার যা ফাইন্ডিং, তাই বলছিলাম।
এর মধ্যে ফোন এল সেই প্রভাবশালী মানুষটির। কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, খবরটা যাচ্ছে না কেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে, সেটাই জানতে চাইছেন তিনি।
তৌফিক ভাই তাকে বারবার একটা কথাই বলে গেলেন, “আমার রিপোর্টার তো কনফার্ম করে নাই।”
পরে সেখানে উপস্থিত একজন আমাকে বলেছিলেন, “সম্পাদকের সঙ্গে সবার সামনে ওইভাবে কথা বললেন! সাহস আছে আপনার।” তখন অবশ্য নিজের সাহস নিয়ে তেমন কিছু ভাবিনি। বরং পরে ঘটনাটা মনে করে বুঝেছি, সেদিন তিনি আমার যাচাইয়ের ওপর আস্থা রেখেছিলেন। নিজের ধারণার চেয়েও রিপোর্টারের খোঁজ নেওয়া তথ্যকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
সেদিন নিজের অনুমান আর আমার যাচাই করা তথ্যের মধ্যে তৌফিক ভাই বেছে নিয়েছিলেন তথ্যকে; ফোনের ওপাশের ক্ষমতার চাপ আর রিপোর্টার ‘কনফার্ম হয়নি’র মধ্যে বেছে নিয়েছিলেন রিপোর্টারকে। একজন রিপোর্টার এর চেয়ে বড় আশ্রয় আর কী চাইতে পারে?
তৌফিক ভাইয়ের একটা কথা ছিল, “সবার আগে, কিন্তু নির্ভুল।” কথাটা শুধু দ্রুত খবর প্রকাশ করার ব্যাপার ছিল না। ভুল হলে আগে প্রকাশ করার কোনো দাম নেই, এই বোধটাও ছিল। এ কারণেই সূত্রের নাম উল্লেখ করার ওপর তিনি জোর দিতেন। ‘সূত্র জানিয়েছে’ লিখে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কম ছিল।
অনেকে তাকে একরোখা বলতেন। কথাটা পুরোপুরি ভুলও নয়। তবে সেই একরোখা স্বভাবের একটা দিক আমি নিজের চোখে দেখেছি: তিনি নিজের ধারণার সঙ্গে মিলছে না বলে রিপোর্টারের যাচাই করা তথ্য সরিয়ে দিতে চাইতেন না। অন্তত সেদিন দেননি।
এতদিন পর এসে ভাবলে বুঝি সেদিনের ঘটনা আমাকে তিনটি জিনিস শিখিয়েছে। এক, যাচাই না হলে খবর নয়, যত ক্ষমতাবানের মুখ থেকেই আসুক। দুই, সম্পাদক নিজের ধারণাকেও যাচাইয়ের নিচে রাখেন। তিন, রিপোর্টারের যাচাই করা তথ্যের পক্ষে দাঁড়ানো সম্পাদকের কাজ।
“কয়টা পয়সার জন্য খবরটা দিলা না?”
একবার একটা মোবাইল ফোন কোম্পানির বিরুদ্ধে যায়, এমন খবর করেছিলাম। মোবাইল ফোন নিউজ সার্ভিসের কারণে তখন ওই কোম্পানিই ছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস।
অনলাইন বিজ্ঞাপনের বাজারও এখনকার মতো ছিল না। সেই খবরের প্রভাব প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপরও পড়ছিল। বেতন অনিয়মিত হয়ে গিয়েছিল। কথা প্রসঙ্গে তৌফিক ভাইকে একদিন বলেই ফেলেছিলাম, এ ধরনের খবর হয়তো তখন না করলেও চলত।
সবসময় প্রমিত উচ্চারণে আর মেপে কথা বলা তৌফিক ভাই শুধু বললেন, “অনেক বছর পর, যখন তুমি সিনিয়র হবা আর কোনো জুনিয়র জিজ্ঞেস করবে, কয়টা পয়সার জন্য খবরটা দিলা না—তখন কী উত্তর দিবা?”
কথাটা শুনে খুব একটা জবাব দিতে পারিনি।
বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়া খবরকে ‘না করলেও চলত’ বলে সরিয়ে রাখা সবচেয়ে সহজ আর সবচেয়ে ভদ্র আপস। তিনি সেই আপসের নামটা আমাকে চিনিয়ে দিলেন।
তিনি যে টাকার গুরুত্ব বুঝতেন না, তা নয়। একটা সংবাদমাধ্যম চালাতে টাকা লাগে, বিজ্ঞাপন লাগে। কিন্তু বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থের সঙ্গে খবরের সংঘাত হলে কোনটা আগে আসবে, সেই প্রশ্নটা তিনি আমার সামনে রেখেছিলেন।
আমি তখন হয়তো পরিস্থিতির বাস্তবতা ভেবেই কথাটা বলেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতার কথা বলতে বলতে কখন যে আপসকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে শুরু করি, সেটা সব সময় ধরা যায় না।
এখনো কোনো খবরের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত দেখলে কথাটা মনে পড়ে। সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল কি না, সেটা নিয়ে নিজের কাছে একটা জবাবদিহি থাকে।
২০১৩ সালের শেষে আবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে ফিরে যাই, বার্তাকক্ষেই—তবে এবার অন্য দায়িত্বে। নিউজ কপি কীভাবে মেকআপ হয়, কোন তথ্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য, কোন খবরের গুরুত্ব কতখানি, নিউজরুম কীভাবে চালাতে হয়, এসব আরও কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়েছিল। একজন নিউজ ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে গিয়েও তার কাছ থেকে শেখা অনেক কিছু কাজে লেগেছে।
পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর যখন মামলা আর ওয়েবসাইট বন্ধের চাপের মুখে পড়েছে, তখন সেই ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়েছে। সেই সময়ের সিদ্ধান্তগুলো আলাদা আলাদা মনে হলেও, সব জায়গায় একটা মিল ছিল—খবরের প্রশ্নে সুবিধাজনক পথটা সব সময় বেছে না নেওয়া।
তৌফিক ভাই, অক্টোবরের দুই তারিখে আপনি চলে গেলেন। তার ঠিক একুশ দিন পর, ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ২০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।
দুই দশক আগে এই অক্টোবর মাসেই আপনি নিউজরুম চালু করেছিলেন। এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছিলেন, “আমরা কখনো ঘুমাই না।” আরেকবার বলেছিলেন, “আমরা মাথা নত করিনি।” তরুণদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথাও অনেক বছর ধরে বলছিলেন। সেই সময়টা আপনি দেখে যেতে পারলেন না।
এই কথাটা আমি এর আগেও বহুবার অনেকের কাছে বলেছি, লিখেছি। আপনাকে সরাসরি কোনোদিন বলা হয়নি।
আমার কাছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর কখনোই শুধুমাত্র অফিস ছিল না, ছিল পাঠশালা—যার প্রধান শিক্ষক ছিলেন আপনি। সেখানে কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকতা শিখেছি, ভুল করেছি, আবার শিখেছি।
আপনি শিখিয়েছেন, সাংবাদিকতার নৈতিকতা মাপা হয় সবচেয়ে অসুবিধাজনক সময়ে: কারফিউয়ের সময়ে, ক্ষমতাবানদের ফোনকল এলে, বিজ্ঞাপনের টাকার সামনে।
এখন নিজে এরকম পরিস্থিতির সামনে পড়লে আপনার ওই প্রশ্নটাই কানে বাজে: “কী উত্তর দিবা?”
সত্যি বলতে কী, তৌফিক ভাই, সব সময় যে উত্তরটা জানা থাকে, তা নয়। কিন্তু প্রশ্নটা মাথায় আসে।
জিয়াদ মুবাশ্বির ইসলাম (রোহান): ডেপুটি এডিটর, আলাপ । বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কর্মী।
