Published : 25 Apr 2026, 02:19 PM
বাংলা কবিতার ইতিহাসে ভূগোল কখনোই শুধু স্থান ছিল না, তা ছিল চেতনার নির্মাণক্ষেত্র। নদীমাতৃক গ্রাম থেকে ঔপনিবেশিক নগর, উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্র থেকে বৈশ্বিক মহানগর—এই যাত্রাপথে কবিতার ভাষা, ভঙ্গি ও আত্মপরিচয় বারবার বদলেছে। রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিকতার ভাঙন, জীবনানন্দীয় নিঃসঙ্গতার অন্তর্লোক, পঞ্চাশ-ষাটের নাগরিক অস্তিত্বসংকট, সত্তরের রাজনৈতিক উচ্চারণ কিংবা নব্বই-পরবর্তী বিশ্বায়িত চেতনা—প্রতিটি বাঁকেই কবিতা তার নিজস্ব ভঙ্গি পুনর্নির্মাণ করেছে। এই ধারাবাহিকতার ভেতরে তাপস গায়েন একটি লক্ষণীয় অবস্থান তৈরি করেন—নিঃশব্দ কিন্তু সুস্পষ্ট। জন্মসূত্রে বাংলাদেশের বরিশালের মানুষ, দীর্ঘদিন ধরে নিউইয়র্কে বসবাসকারী, পেশায় অধ্যাপক ও উত্তর আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য ও চিন্তার কাগজ 'অগ্রবীজ' পত্রিকার অন্যতম সম্পাদক। এই বহুভূগোলিক অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর কবিতার অন্তঃসার নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর কবিতায় বাংলাদেশ কেবল স্মৃতির দেশ নয়, আর নিউইয়র্ক কেবল প্রবাসের শহর নয়, বরং এই দুই ভূগোলের সংঘাতে তৈরি হয় এক নতুন সত্তা, যা একইসঙ্গে দৃশ্যমান এবং অপসৃয়মান। বাংলাদেশের সমকালীন কবিতায় যেখানে অনেকেই রাজনৈতিক উচ্চারণ, লোকায়ত স্মৃতি কিংবা ভাষাগত পরীক্ষায় মনোনিবেশ করেছেন, সেখানে তাপস গায়েনের বিশেষত্ব তাঁর কাঠামোগত ও দার্শনিক মননে। তাঁর কবিতা সরাসরি উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং তা ধীরে ধীরে এক বৌদ্ধিক পরিসর নির্মাণ করে। নগর, পাতাল ট্রেন, সময়ের ব্যূহ, সমুদ্র, পৌরাণিক রূপক—এসব তাঁর কবিতায় চিত্ররূপে উপস্থিত হলেও, গভীরে রয়েছে অস্তিত্বের প্রশ্ন। তিনি কোনো নির্দিষ্ট সাহিত্য-আন্দোলনের প্রচারক নন, তিনি যেন উত্তর-আধুনিক নাগরিক অভিজ্ঞতার এক অন্তর্মুখী ধারার কবি। জীবনানন্দীয় একাকিত্ব তাঁর কবিতায় নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরে আসে। তবে তা গ্রামবাংলার নিসর্গে নয়, আসে ইস্পাত-নির্মিত মহানগরের পাতালগহ্বরে। আবার পঞ্চাশ-পরবর্তী নাগরিক কবিতার উত্তরাধিকার থাকলেও তাঁর ভাষা আরও সংযত, দার্শনিক এবং স্তরবিন্যাসপূর্ণ। তাপস গায়েনকে তাই বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক প্রবাসী-নাগরিক আধুনিকতার কবি বলা যেতে পারে—যাঁর কাব্যভুবনে আত্মনির্মাণ, সময়সংকট এবং অবশেষে অপসৃয়মান সত্তার দর্শন পরস্পর সংযুক্ত হয়ে ওঠে। তাঁর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তিনটি কাব্যগ্রন্থ “একলব্য নিঃসীম নগরে” (২০১০), “সময়ব্যূহে অভিমন্যু” (২০১৭), এবং “অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা” (২০২১)—এই বিবর্তনের সুস্পষ্ট দলিল। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব, কীভাবে একলব্য-সত্তার আত্মনির্মাণ থেকে অভিমন্যুর সময়-ব্যূহে আটকে পড়া এবং সেখান থেকে অপসৃয়মান অস্তিত্বের দর্শনে পৌঁছনোর মধ্য দিয়ে তাপস গায়েন সমকালীন বাংলা কবিতায় একটি স্বতন্ত্র স্থান নির্মাণ করেছেন।
তাপস গায়েনের কবিতায় প্রবেশ করতে গেলে আমাদের প্রথমেই ফিরে যেতে হয় “একলব্য নিঃসীম নগরে”-তে। আধুনিক নগরসভ্যতার ভিতরে দাঁড়িয়ে আত্মপরিচয়, প্রেম, প্রবাসবোধ ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের যে জটিল মানচিত্র একজন কবি আঁকতে পারেন, “একলব্য নিঃসীম নগরে” তার এক তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। এই কাব্যগ্রন্থে শহর পটভূমির পরিবর্তে যেন এক জীবন্ত সত্তা, আর কবি সেই নগরের ভিতরে একাকী শিক্ষার্থী—এক “একলব্য”। যে দূর থেকে, নিঃশব্দে, তীব্র মনোযোগে জীবন ও জগতকে অনুশীলন করে চলেছে। “ম্যানহাটন” কবিতায় কবি লিখছেন—“আমি তো ফেরারি নই পৃথিবীর কোন জনপদে, তবু এই বাতাস কেনো আমার জামার আস্তিন ধরে টানে?” এখানে “বাতাস” যেন নগরের অদৃশ্য টান এবং এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে যাত্রা সত্ত্বেও কবি যেন নিজের ভিতরের স্থানচ্যুতি থেকে মুক্ত নন। তাইতো তিনি বলেন—“উত্তাল বাতাসে কতোবার ডুবে গেছে জেলে-নৌকা দূর সমুদ্রে, কিন্তু আমিতো দাঁড়িয়ে আছি এই নগরীর জনসমুদ্রে।” এই পংক্তিতে সমুদ্র ও জনসমুদ্রের দ্বৈত রূপক আধুনিক নগর-অস্তিত্বের গভীর সংকটকে প্রকাশ করে। নগর মানে ভিড়, অথচ সেই ভিড়েই তীব্র নিঃসঙ্গতা। “পানশালা : ইস্ট ভিলেজ” কবিতায় কবি লিখছেন—“কোথায় পোড়াই এই নিঃসঙ্গ ডানা?” এই প্রশ্নও হয়ে ওঠে অস্তিত্বগত। কবি দেখেন—“বদলে গেছে মানুষের সম্ভাষণ, সর্বত্রই জেগেছে মানুষের মুখাবয়ব, কিন্তু হৃদয় জাগেনি। শুধু জেগেছে পানশালা।” এখানে আধুনিক সভ্যতার এক তীক্ষ্ণ সমালোচনা আছে। বাহ্যিক আলো, ভিড়, বাজার, রাস্তাঘাট—সব আছে কিন্তু হৃদয়ের জাগরণ অনুপস্থিত। শহর যেন আত্মাহীন যন্ত্রসভ্যতা। প্রেম এখানে ব্যক্তিগত থেকে মহাজাগতিক। “খোদা নিরঞ্জনের ছায়া”- তে বলেন —“হৃদয়ে আমার জাগে নি প্রেম; আমি পাই নি খুঁজে 'সিধা পথ'।" এই স্বীকারোক্তি যেন আত্মসমালোচনামূলক। প্রেম এখানে সরল রোমান্টিকতার পরিবর্তে এক দীর্ঘ অন্তর্জিজ্ঞাসা। কবি আরও বলেন—“আল্লাহর নবী, আমি নই সীমা লঙ্ঘনকারী…” এখানে প্রেম আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মিশে গেছে। আর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এক সময় বিশ্ব-সত্তার সঙ্গে মিলিত হতে চায়। “দৃশ্যহীনতায় জেগেছে কদম” কবিতায় বর্ষা, নদী, জলাভূমি, ফুল—সব মিলিয়ে এক গ্রামীণ স্মৃতির পুনরাগমন ঘটে। কবি বলেন—“বৃষ্টি যা নামে আমার দেহের ধমনীতে, হৃৎযন্ত্রে আর মহাকালে, তাকে আমি কিভাবে দেখি?” এখানে বৃষ্টি ঋতুর পাশাপাশি সময়, শরীর ও মহাকালের একাত্ম। আবার শেষদিকে—“মহাকালের দৃশ্যহীনতার মাঝে দেখি জেগেছে কদম—আমার বিষণ্ণ ফুল, আমার অসংজ্ঞায়িত নারী।” কদমফুল এখানে স্মৃতি, প্রেম, দেশ ও চিরন্তনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই কাব্যগ্রন্থের ভাষা গদ্যকবিতার ঢঙে প্রবাহমান। দীর্ঘ বাক্য, চিত্রকল্পের স্তরায়ন, ভৌগোলিক নামের ব্যবহার, ধর্মীয় ও দার্শনিক ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে কবি একটি ঘন ভাষিক পরিসর নির্মাণ করেছেন। প্রচলিত ছন্দ নেই, কিন্তু ভাব-ছন্দ আছে; অন্ত্যমিল নেই, কিন্তু অনুরণন আছে। কখনো কখনো বাক্যের ঘনত্ব এত বেশি যে পাঠককে ধীর হয়ে পড়তে হয়। তবে এই ধীরতা কবিতারই দাবি—এটি দ্রুত ভোগের সাহিত্য নয়; ধ্যানের সাহিত্য। “একলব্য” তো একাকী শিক্ষার্থী—যে প্রান্তে দাঁড়িয়ে থেকেও নিজের সাধনা চালিয়ে যায়। এই কাব্যগ্রন্থে কবি নিজেই সেই একলব্য—নগরের ভিতরে, প্রবাসের ভিতরে, স্মৃতির ভিতরে, প্রেমের ভিতরে এক নিঃশব্দ অনুশীলনে রত। নিঃসীম নগর তাঁকে গ্রাস করেনি বরং তিনি নগরকে আত্মস্থ করেছেন। “একলব্য নিঃসীম নগরে” আধুনিক বাংলা কবিতার এমন এক ধারা উপস্থাপন করে, যেখান—নগরচেতনা আছে, আছে প্রবাসের মনস্তত্ত্ব। আছে প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার সংলাপ, আছে মহাকাল ও ব্যক্তিসত্তার সংঘাত। এটি সহজ আবেগের কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি গভীর পাঠের দাবি রাখে। এখানে কবি আমাদের শেখান—নগরের অগণিত আলো-ছায়ার মাঝেও একাকী দাঁড়িয়ে থাকা যায়, প্রশ্ন করা যায়, ভালোবাসা যায়, আর নিজের ভিতরের নদীকে অনুসরণ করা যায়। এই কাব্যগ্রন্থে সেই একলব্যের সাধনা অব্যাহত—নিঃসীম নগরের অন্তহীন পরিসরে।
কিন্তু “একলব্য নিঃসীম নগরে”-র এই আত্মনির্মাণ স্থিতিশীল কোনো আশ্রয়ে পৌঁছায় না। নগরের ভেতরে দাঁড়িয়ে যে সত্তা নিজেকে নির্মাণ করতে চেয়েছিল, সে খুব দ্রুত উপলব্ধি করে যে এই নগর আসলে সময়ের একটি জটিল বিন্যাস। ভিড়ের মধ্যে অচেনা হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে রূপ নেয় সময়ের ভেতরে আটকে পড়ার অনুভূতিতে। এখানেই “একলব্য”-সত্তা ক্রমে “অভিমন্যু”-সত্তায় রূপান্তরিত হতে শুরু করে। যে অভিমন্যু প্রবেশ করেন এক ব্যূহে এবং সেই ব্যূহের ভেতরে প্রবেশের কৌশল জানা থাকলেও, বেরিয়ে আসার পথ অনিশ্চিত।
“একলব্য নিঃসীম নগরে” থেকে “সময়ব্যূহে অভিমন্যু”-তে আসা মানে যেন এক স্তর গভীরে নেমে যাওয়া। “একলব্য”-তে আমরা যে মানুষটিকে দেখি, সে একা—নগরের ভিড়ে দাঁড়িয়ে, অচেনা, স্বীকৃতিহীন। তার মধ্যে এক ধরনের নীরব সাধনা আছে, আছে এক ধরনের আত্মগঠন। সে নিজের মতো করে শেখে, দেখে, অনুভব করে। সেখানে নিঃসঙ্গতা প্রধান সুর। কিন্তু “অভিমন্যু”-তে এসে সেই নিঃসঙ্গতা আরও জটিল হয়ে ওঠে। এখানে শুধু একা থাকা নয়, এখানে আটকে পড়া আছে। একলব্য ছিল প্রান্তে দাঁড়ানো মানুষ,অভিমন্যু হল ভেতরে ঢুকে পড়া মানুষ—যে আর বেরোতে পারছে না। এই পরিবর্তনটা ভাষাতেও ধরা পড়ে। এখানে ভাষা আরও ভাঙাচোরা, আরও চলমান, যেন স্থির হতে চায় না। চিত্রকল্পগুলোও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। রেললাইন, করিডোর, ভাঙা কাচ, পানশালা—সবই অস্থায়ী, চলমান, ক্ষণস্থায়ী। যেমন—“পানশালায় গড়ে ওঠা বন্ধুত্বের মতো এখন আমাদের সম্পর্ক অতি ক্ষীয়মাণ কাল।”এই এক লাইনের মধ্যেই সম্পর্কের ভঙ্গুরতা, নগরের একাকিত্ব, আর সাময়িক আশ্রয়ের অনুভূতি এসে যায়। “একলব্য”-তে শহর ছিল অভিজ্ঞতার জায়গা,
কিন্তু “অভিমন্যু”-তে শহর যেন এক গোলকধাঁধা।
আর একটা বড় পার্থক্য— “একলব্য”-তে একটি ‘আমি’ ছিল, যে নিজেকে খুঁজছে। কিন্তু “অভিমন্যু”-তে এসে সেই ‘আমি’ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যেতে দেখা যায়। এখানে ব্যক্তি সত্তা যেন সময়ের ভেতর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাপস গায়েনের ভাষা এই গ্রন্থে আরও দার্শনিক, কিন্তু তা জটিল করে তোলার জন্য নয়, তা যেন অনুভূতির গভীরতাকে ধরার জন্য। তাঁর বাক্য কখনো দীর্ঘ, কখনো ভাঙা। সব মিলিয়ে বলা যায়— “একলব্য” ছিল একাকী সত্তার নির্মাণ, আর “অভিমন্যু” হল সেই সত্তার সংকট ও বন্দিত্বের অভিজ্ঞতা। এখানে কবি শুধু নিঃসঙ্গতার কথা বলেন না, পাশাপাশি তিনি দেখান মানুষ কীভাবে নিজেরই জীবনের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং তারপর সেই জীবনই তার কাছে এক অজানা ব্যূহ হয়ে ওঠে।
আসলে তাপস গায়েনের “সময়ব্যূহে অভিমন্যু” কাব্যগ্রন্থে আধুনিক মানুষের জীবন এক গভীর অনিশ্চয়তা ও অন্তর্গত সংকটের ভেতর উন্মোচিত হয়। এখানে মানুষ নিজের ভেতরের শূন্যতা, অপূর্ণতা ও পরিচয়হীনতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হচ্ছে। চারপাশে সভ্যতার কোলাহল, ভাঙন, সহিংসতা ও সম্পর্কের ক্ষয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠলেও, মানুষের অনুভূতি যেন ধীরে ধীরে অসাড় হয়ে যাচ্ছে অর্থাৎ দেখছে, জেনে যাচ্ছে, তবু গভীরভাবে আর স্পর্শিত হচ্ছে না। এই বাস্তবতার মধ্যে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে। ভিড়ের মধ্যে থেকেও সে একা, উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত। জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো এখানে স্থির নয়, মানে সবকিছুই যেন এক অন্তর্বর্তী অবস্থায় রয়েছে, যেখানে কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নেই, আছে শুধু চলমানতা ও অপেক্ষা। সম্পর্কগুলো ক্ষণস্থায়ী, স্মৃতিগুলো ভঙ্গুর, আর সময় এক অনিবার্য শক্তি হিসেবে সবকিছুকে গ্রাস করে চলেছে। তবু এই অস্থিরতার মাঝেও মানুষ থেমে থাকে না, সে ক্রমাগত খুঁজে বেড়ায়—নিজেকে, ভালোবাসাকে, কোনো এক স্থিতিকে। কিন্তু সেই অনুসন্ধানের শেষ নেই, কারণ পূর্ণতা এখানে কোনো প্রাপ্ত অবস্থা নয়, পূর্ণতা এক চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। এইভাবেই মানুষের জীবন এক ব্যূহের মতো হয়ে ওঠে, যেখানে সে প্রবেশ করেছে, কিন্তু বেরিয়ে আসার পথ জানে না। এই কাব্যগ্রন্থ তাই আধুনিক মানুষের সময় কমে আসা, অস্তিত্বের ভাঙন, সম্পর্কের ক্ষয় এবং অন্তহীন অনুসন্ধানের এক গভীর ও মর্মস্পর্শী কাব্যিক ভাষ্য।
কিন্তু “সময়ব্যূহে অভিমন্যু”-র এই বন্দিত্ব চূড়ান্ত নয়, আমাদের মনে হয় তা এক গভীরতর সংকটের পূর্বাভাস। সময়ের ব্যূহে আটকে পড়া মানে শুধু ইতিহাসের বা প্রবাসী জীবনের জটিলতায় জড়িয়ে পড়া নয়, তা ধীরে ধীরে কবির সত্তার ভেতরেই ক্ষয়কেই ডেকে আনে। আর সময় যখন ঘিরে ধরে, তখন মানুষ কেবল চলমান থাকে, তা স্থিত হতে পারে না। প্রতিদিনের যাতায়াত, নগরের আলোকোজ্জ্বল ভিড়, ভাষার ভেতরে-বাইরে থাকা—সব মিলিয়ে মানুষ এক অদ্ভুত অবস্থায় পৌঁছায় অর্থাৎ সে উপস্থিত, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত নয়। সে দৃশ্যমান, কিন্তু ক্রমে ভিতর থেকে ফাঁপা হয়ে উঠছে। অভিমন্যুর ব্যূহ তাই বহির্জগতের গোলকধাঁধার পরিবর্তে হয়ে ওঠে অস্তিত্বের ভেতরকার ঘূর্ণিপাক। সময়ের স্তর ভেদ করতে করতে কবি উপলব্ধি করেন যে ব্যূহ থেকে বেরিয়ে আসার চেয়ে কঠিন হল নিজের ভেতরকার ক্ষয়কে চেনা। এই উপলব্ধিই তাপস গায়েনকে নিয়ে যায় তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের দিকে—যেখানে সময় আর প্রধান চরিত্র নয়। সময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে অপসৃয়মানতা। সেখানে মানুষ সময়ে আবদ্ধ না হয়ে ক্রমশ দৃশ্যমানতা হারাতে থাকা এক সত্তা। এই কারণেই “অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা” কেবল পরবর্তী বই নয়, তা যেন পূর্ববর্তী সময়-সংকটের এক অস্তিত্বগত পরিণতি।

আধুনিক নগরসভ্যতার ভেতরে দাঁড়িয়ে মানুষ ক্রমশ দৃশ্যমান হলেও অন্তর্গতভাবে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে—এই গভীর বোধ থেকেই হয়তো 'অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা '–এর কবিতাগুলো কবি নির্মাণ করেছেন। এখানে প্রেম, সময়, সভ্যতা, পৌরাণিক স্মৃতি ও ব্যক্তিসত্তা মিলিত হয়ে এক অস্তিত্ববাদী ভাষ্য রচনা করেছেন। কবির উপলব্ধি এখানে ধাপে ধাপে আত্মবীক্ষণের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয়। বইয়ের প্রথমেই আসে আত্মহারানোর অনুভব—“তোমাকে হারাবার আগে / হারিয়ে ফেলছি নিজেকে…” এই উচ্চারণে বিচ্ছেদের আগেই সত্তার ভাঙন ঘটে। এই ‘তুমি’ বোধ হতে পারে বিশ্বাস, আদর্শ, দেশ কিংবা নিজস্ব স্বপ্ন। ফলে হারানোর যে কথা কবি বলছেন তা একটি সম্পর্কের নয়, একটি পরিচয়ের। নগরীর উদ্যান, ক্যাফে, নদীর তীর দীপ্যমান হলেও সেই দীপ্তি বাহ্যিক, ভেতরে আছে শূন্যতা। তাই— “পানশালা ভরে উঠছে সন্ত্রস্ত মানুষদের ভিড়ে / জনারণ্যে হারিয়ে দেখছি দৃশ্যান্তর।” এখানে পানশালা আশ্রয়ের প্রতীক হলেও স্থায়ী নয়। মানুষ দৃশ্যমান, কিন্তু তার স্থিতি নেই, বাস্তব নিজেই পরিবর্তনশীল। পরবর্তী স্তরে কবি সভ্যতার গভীর অবক্ষয় চিহ্নিত করে—“মানুষের অবয়বে মানুষ যেন শ্মশানযাত্রী।” অর্থাৎ মানুষ জীবিত, কিন্তু চেতনা মৃত। সন্তান-সন্ততি নিয়ে মানুষ “নেশাতুর” অর্থাৎ বেঁচে থাকাটা যেন যান্ত্রিক অভ্যাস, যেন যান্ত্রিক প্রজননচক্র। স্বপ্নও ভঙ্গুর—“ফড়িঙের স্বপ্নে স্বপ্নভারাতুর।”
লক্ষ করার বিষয় হল, আধুনিক জীবনের এই অনিশ্চিত ভঙ্গুরতা মানবিক স্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সময়ের ধারণা এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ—“একদিন সময় এসে নিয়ে যাবে / সময় নির্মিত সময়ের মুখ…” এই সময় কেবল জীবনকে নয়, নিজেকেও গ্রাস করে। কবি জানেন যে সব অর্জন, সব ব্যস্ততা, সব কর্ম একদিন বিলীয়মান হবে। তবু তিনি বলেন—“আমাদের থেকে যেতে হয় / আলোর অনতিক্রম্য কোন এক অলোক দূরত্বে।” অর্থাৎ মানুষ বিলীন হলেও অস্তিত্বের সাক্ষ্য রেখে যেতে চায়। এই দ্বৈততা অর্থাৎ ক্ষয় ও চিহ্ন রেখে যাওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা তা পুরো কাব্যগ্রন্থের কেন্দ্রীয় টানাপোড়েন। এই আকাঙ্ক্ষা আরও স্পষ্ট হয় যখন তিনি বলেন— “জেনেছি অপস্রিয়মানতাই শ্রেয়, / তবু আমাদের সাক্ষ্য দিতে হয়…” এই অপসৃয়মানতা এখানে চূড়ান্ত সত্য। পৃথিবীর রঙও স্থায়ী নয়, তাইতো কবি বলেন— “রঙের পৃথিবী প্রেমের মতোই ভ্রান্তিতে পূর্ণ…” হলুদ, ক্ষয়েরি, লাল—এই শরৎরঙ ক্ষয় ও পতনের প্রতীক। সৌন্দর্যও অনিত্য। সবশেষে কবি এক গভীর অসমাপ্ততার বোধে পৌঁছান— “অনেক কাজের ভিড়ে সকল কর্মই / শেষাবধি রয়ে গেল প্রায় অসমাপ্ত…” অর্থাৎ আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা কবিকে পূর্ণতার নিশ্চয়তা দেয় না। জীবন যেন—“পুরীর জগন্নাথের অর্ধদগ্ধ মুখ।” এই চিত্রে অসম্পূর্ণতা, দহন ও স্থিতির একসঙ্গে অবস্থান।
যেমন জগন্নাথ মন্দিরের ঐতিহ্যে কাঠের মূর্তি পুনর্নির্মিত হয়, তেমনি জীবনও বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে, কিন্তু পূর্ণতা অধরাই থেকে যায়। তাই হয়তো কবিকে দেখা যায় এক ধরনের পৌরাণিক বোধের আশ্রয় নিতে—যেখানে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৃহত্তর ইতিহাস ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে যায়। এখানে যুদ্ধ শেষ হলেও তার ক্ষত মুছে যায় না বরং সময়ের ভেতরে তা থেকে যায় স্মৃতি হয়ে, ইতিহাস হয়ে। এই কারণেই কবি দেখেন—“সকল কোলাহলে থেকে যাই শ্রুতিহীন”। অর্থাৎ মানুষ দৃশ্যমান, কিন্তু অন্তরে আহত; উপস্থিত, কিন্তু অনুচ্চারিত। আর এই বোধ থেকেই উঠে আসে এক চূড়ান্ত স্বীকারোক্তি—“আজ অপসৃয়মাণতায় বিদ্ধ আমি।” আসলে এটা কোনো পরাজয় নয়, এটা এক ধরনের উপলব্ধি। মানুষ, প্রেম, সময় সবই ক্ষণস্থায়ী, তবুও এই অনিত্যতার মধ্যেই আমাদের বেঁচে থাকা।
এই সব পংক্তি মিলিয়ে যে দর্শন দাঁড়ায় তা হল, আধুনিক নগরজীবনে মানুষ আত্মপরিচয় হারাচ্ছে। সভ্যতা বাহ্যিকভাবে উজ্জ্বল, কিন্তু অন্তরে শূন্য। অর্থাৎ সময় সবকিছু গ্রাস করে। মানুষের জীবন অসমাপ্ত ও অনির্দিষ্ট। প্রেম ও রঙও স্থায়ী নয়। তবু মানুষ সাক্ষ্য দিতে চায়, চিহ্ন রেখে যেতে চায়—নিজের অস্তিত্বের।
অর্থাৎ এই কাব্যগ্রন্থ এক অস্তিত্ববাদী, অনিত্যতাবাদী ও গভীর মানবিক বোধের কবিতা-চেতনা। এখানে চূড়ান্ত সত্য কোনো স্থির বিশ্বাস নয়, বরং অপসৃয়মানতার মধ্যেই মানুষের দাঁড়িয়ে থাকা।
ভাষার ক্ষেত্রে যেটা লক্ষ করা যায় তা হল প্রথম কাব্যগ্রন্থের ভাষা দীর্ঘশ্বাসের মতো প্রবাহমান। পংক্তিগুলো তুলনামূলক দীর্ঘ, বাক্যগুলো গদ্যঘন এবং দৃশ্যনির্মাণে এক ধরনের বর্ণনামূলক স্বাচ্ছন্দ্য আছে। সমুদ্র, বাতাস, ধুলিকণা, গাঙচিল—এসব চিত্রকল্পে প্রকৃতি ও নগর পাশাপাশি অবস্থান করে। ভাষা তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত, বর্ণনামূলক, আত্মসচেতন কিন্তু সরল উচ্চারণে
গদ্যকবিতার প্রবাহে নির্মিত। এখানে কবি দৃশ্য নির্মাণ করেন, তারপর সেই দৃশ্যের মধ্যে নিজেকে স্থাপন করেন। ভাষা সম্পূর্ণ বিমূর্ত নয় বরং দৃশ্য থেকে দর্শনের দিকে অগ্রসরমান। “সময়ব্যূহে অভিমন্যু” ভাষার ক্ষেত্রে সংকুচিত ও কাঠামোগত। এই কাব্যগ্রন্থে এসে ভাষার প্রকৃতি স্পষ্টত বদলে যায়। বাক্য ছোট হতে দেখা যায়, চিত্রকল্প ঘনীভূত হয় এবং “সময়” একটি কেন্দ্রীয় স্থাপত্যে পরিণত হয়। এখানে ভাষা আর শুধু প্রবাহ নয় বরং স্তরবিন্যস্ত। প্রথম পৃষ্ঠার কবিতাতেই দেখা যায় নগরের নির্দিষ্ট চিহ্ন পাতাল ট্রেন, টাইমস স্কয়ার, ভূগর্ভ—যা বাস্তবতাকে সরাসরি টেনে আনে। কিন্তু এই বাস্তবতা সরল বর্ণনা নয়, তা কাঠামোগত। যেন প্রতিটি চিত্র একটি বৃহত্তর বিন্যাসের অংশ। এই বইয়ে ভাষা সংক্ষিপ্ততর, ঘনীভূত, রূপক-কেন্দ্রিক এবং দার্শনিকভাবে প্রস্তুত। এখানে কবি দৃশ্য নির্মাণের চেয়ে বিন্যাস নির্মাণে বেশি আগ্রহী। ভাষা আরও সংযত, আরও তীক্ষ্ণ। “ব্যূহ” ধারণা কেবল বিষয় নয়, তা ভাষার ভেতরেও এক ধরনের জ্যামিতিক সংগঠন তৈরি করে। “অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা” গ্রন্থের ভাষা বিমূর্ত ও দর্শনঘন। এই কাব্যগ্রন্থে এসে ভাষা আরও এক ধাপ রূপান্তরিত হয়। এখানে দৃশ্য কম, প্রতীক বেশি। পৌরাণিক উল্লেখ, আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত, অনিত্যতার ভাব—সব মিলিয়ে ভাষা ধ্যানমগ্ন। প্রথম পৃষ্ঠাতেই লক্ষ করলে দেখা যায়—বাক্য আরও সংক্ষিপ্ত, ভাব আরও বিমূর্ত,
চিত্রের বদলে ধারণা প্রধান এবং অস্তিত্বের প্রশ্ন এখানে সরাসরি। কবি নগর বা সময়ের দৃশ্য নির্মাণে থেমে না থেকে দৃশ্যকে অতিক্রম করে এক দার্শনিক স্তরে পৌঁছান। ফলে ভাষা হয়ে ওঠে উপলব্ধির মাধ্যম। প্রথম আলোচ্য বইতে যেখানে ভাষা বহির্জগতের সঙ্গে কথোপকথনে প্রবৃত্ত, দ্বিতীয় আলোচ্য বইয়ে তা কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ, আর তৃতীয় বইয়ে তা প্রায় ধ্যানমগ্ন এক অন্তর্জাগতিক উচ্চারণে রূপ নেয়। অতএব, তাপস গায়েনের কবিতার ভাষাগত পরিবর্তন তাঁর বিষয়গত বিবর্তনের সমান্তরাল। ভাষাই এখানে দর্শনের পথ তৈরি করেছে।
তাপস গায়েনের কবিতাকে সমগ্রভাবে দেখলে স্পষ্ট হয়, তিনি উচ্চকণ্ঠ বা আন্দোলনমুখী কবি নন, তিনি আসলে অন্তর্মুখী নির্মাতা। তাঁর বিশেষত্ব বিষয়বস্তুর বিচিত্রতায় নয়, বরং ধারাবাহিক রূপান্তরে। “একলব্য নিঃসীম নগরে”-তে আত্মনির্মাণ, “সময়ব্যূহে অভিমন্যু”-তে সময়ের কাঠামোগত বন্দিত্ব, এবং “অদৃশ্যতায় দৃশ্যমান আমরা”-তে অপসৃয়মান অস্তিত্ব—এই তিন পর্বে আমরা এক সত্তার পরিণতিকে প্রত্যক্ষ করি। বাংলাদেশের সমকালীন কবিতায় গত কয়েক দশকে যে প্রবণতাগুলি লক্ষ করা যায়—রাজনৈতিক উচ্চারণ, ভাষার ভাঙন-পরীক্ষা, লোকায়ত পুনরাবিষ্কার, কিংবা নগর-বাস্তবতার সরাসরি প্রতিবেদনধর্মিতা—তাপস গায়েন সেই স্রোতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধী নন, কিন্তু একইসঙ্গে তার অনুকারীও নন। তাঁর নগর অভিজ্ঞতা মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্বগত। আবার তাঁর রাজনৈতিকতা উচ্চারণে নয়, তা সময়-সংকটের নির্মাণে। তাঁর ভাষা পরীক্ষামূলক হলেও তা কৃত্রিম ভাঙনের দিকে না গিয়ে স্তরবিন্যাসের দিকে অগ্রসর হয়। প্রবাসী কবি হিসেবে তাঁর অবস্থানও আলাদা। অনেক প্রবাসী লেখায় যেখানে নস্টালজিয়া প্রধান হয়ে ওঠে, সেখানে তাপস গায়েনের কবিতায় স্মৃতি অনুষঙ্গ মাত্র, তা কিন্তু কেন্দ্র নয়। নিউইয়র্ক তাঁর কাছে স্মৃতির বিপরীত ভূগোল না হয়ে একটি জটিল সময়-স্থাপত্য হয়ে উঠেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সমকালীন বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র নাগরিক-দার্শনিক কণ্ঠে পরিণত করেছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে তিনি কি নতুন কোনো ট্রেন্ড নির্মাণ করছেন? এর উত্তরে বলা যায় যে প্রচলিত অর্থে কোনো আন্দোলন বা ধারার সূচনা হয়তো নয়। কিন্তু তিনি যে পথ তৈরি করছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ—কারণ সেখানে প্রবাস, নগর, সময় ও অস্তিত্ব একত্রে দার্শনিক ঘনত্বে বিন্যস্ত। তাঁর কবিতা দেখায়, নাগরিক অভিজ্ঞতা কেবল দৃশ্যমানতার নয়; তা ক্রমশ অপসৃয়মানতারও।
এই কারণেই তাপস গায়েনকে সমকালীন বাংলা কবিতায় এক নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি বলা যায়। কারণ তিনি উচ্চারণের নয়, নির্মাণের কবি; তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার নয়, দীর্ঘস্থায়ী মননের কবি। একলব্য থেকে অভিমন্যু হয়ে অপসৃয়মান সত্তায় পৌঁছানোর এই যাত্রাই তাঁর কাব্যভুবনের স্বাতন্ত্র্য—যা বাংলা কবিতার বৃহত্তর ধারায় একটি সংযত, কিন্তু গভীর ও ভিন্ন উচ্চারণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।