Published : 05 Apr 2026, 07:28 PM
১.
করোনাকালের সেই অদ্ভুত দিনগুলো - যেন পুরো পৃথিবী দম আটকে আছে। বাতাসে আতঙ্ক, মানুষের চোখে অনিশ্চয়তা, আর প্রতিটি দরজার ভেতরে জমে থাকা নীরব দুঃখের স্তূপ। তারপরও জীবন তার নিজ গতিতে চলে। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ - কোনোকিছুই থেমে থাকেনা।
গ্রামের বাড়ি থেকে জাকির নামের একজন ফোন দিলেন বারী সাহেবকে। তিনি সপরিবারে কানাডায় বসবাস করেন বহুবছর। তারপরও গ্রামের স্বজনদের সাথে তাঁর যোগাযোগ দেশে বসবাসরত অনেকের চেয়ে বেশি বৈ কম নয়। নিজ উদ্যোগে বারী সাহেব গত দুই দশকে কতো অভাবী ছাত্র আর আয়-উপার্জনে অক্ষম নারী-পুরুষকে মাসিক হিসেবে সহায়তা দিয়ে এসেছেন তার হিসেব নেই। তিনি খুব দয়ালু মানুষ। কোনো ঘোষণা নেই, কোনো প্রচার নেই - কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতা হতেই তিনি সাহায্যের হাত বরাবরই বাড়িয়ে দিয়েছেন অভাবগ্রস্তদের দিকে।
কন্যার বিয়েতে সাহায্য দরকার জাকিরের। সে কারণেই বারী সাহেবকে ফোন দেন তিনি। তবে, একই এলাকার বাসিন্দা হলেও জাকিরের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় নেই।
বিয়েতে খরচ কত হবে জানতে চাইলে জাকির জানালেন, বর পক্ষের দেড়শ মেহমান খাওয়াতে হবে।
- এই করোনায় এতো মানুষ জড়ো করলে পুলিশ সমস্যা করবে না? বারী সাহেব জানতে চান।
- না, কাউকে এক জায়গায় জড়ো করতে হবে না, দেড়শ মানুষের খাবারের জন্য দেড় লাখ টাকা দিয়ে দিলেই চলবে।
- কাকে দেবেন টাকাটা?
- বরপক্ষকে।
- কিন্তু, মেহমান তো খাওয়ানো হচ্ছে না, টাকা দিয়ে কাজ কি?
- তারা সুযোগমতো পরে খাইয়ে দেবে। এটা ওদের বিষয়; সেভাবেই কথা হয়েছে।
- বাহ্! আর কি খরচ?
- হাফ ফার্নিচার, আর, ক্যাশ দিতে হবে কিছু। ছেলে ব্যবসা করবে।
- ছেলের যোগ্যতা?
- আইএ। গার্মেন্টসে চাকুরী করে।
- টাকা পেলে কিসের ব্যবসা করবে সে?
- চাকুরীর পাশাপাশি ঝুটের ব্যবসা করতে চায়।
- ঝুট কাপড় কি কাজে লাগে?
- ওসব দিয়ে শীতের কাপড় বানায়।
- আচ্ছা, মেয়েটির কি পড়াশোনা?
- বিএ পরীক্ষা দেবে।
- কবে পরীক্ষা?
- তিন-চার মাস পর।
- তাহলে তিন-চার মাস পর বিয়ে দেন না কেন? মেয়েটির পরীক্ষার ফি তো খুব বেশি না, দরকার হলে আমি দেব।
- না, না, অপেক্ষা করা যাবে না; এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে।
- অপেক্ষা তো করলেনই, আর চার মাসে এতো আপত্তি কেন?
- বিএ পাশ করে ফেললে মানুষ বলবে মেয়ের অনেক বয়স হয়ে গেছে; তখন ভালো ছেলে পাওয়া কঠিন হবে।
- তাই নাকি? আর, বিএ ফেল করলে?
দীর্ঘদিন হলো, বারী সাহেব দেশ ছেড়েছেন। একপ্রকার ভুলতে বসেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের সেকেলে মনমানসিকতা। একটা মেয়ে বিএ-এমএ পাশ করে ফেললে তাঁকে বলে বয়স্কা, আর, ফেল করে উচ্চমাধ্যমিক বা তার নিচের পর্যায়ে সাঁতরাতে থাকলে সে হয়ে যায় কচি খুকি - যেন ভালো ছাত্রী হওয়াটাই এক বিপদ, অন্তত বৈবাহিক সম্পর্ক বিবেচনায়।
- ফেল তো এই মেয়ে করবে না, সে পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী।
- আপনি কি করেন?
- আগে রিকশা চালাতাম, তিন বছর ধরে সিএনজি চালাই। অনেকদিন টাকা জমিয়ে একটা সিএনজি কিনেছি।
- বাচ্চা-কাচ্চা কয়জন?
- তিন জন। দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলেটা ছোট। এই মেয়েটাই সবার বড়ো ।
অতঃপর বারী সাহেব দেশে বসবাসরত তাঁর এক নিকটাত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ করে তাকে বললেন কন্যার বিয়েতে জাকিরকে কয়েক হাজার টাকা দিতে। সেই আত্মীয়ের সাথে বারী সাহেবের আর্থিক লেনদেন রয়েছে। বলা বাহুল্য, তিনিই জাকিরকে বারী সাহেবের ফোন নম্বর দিয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে বলেছিলেন।
২.
জাকিরের সাথে আলাপের পরদিন নিজ এলাকার এক কোটিপতি ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিনের কথা মনে পড়লো বারী সাহেবের। ওই কোটিপতি কিছুদিন আগে কানাডা ভ্রমণের আগ্রহ প্রকাশ করে বারী সাহেবের সাথে কথা বলেছিলেন। উল্লেখ্য, বারী সাহেব কানাডার রেজিস্টার্ড ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট।
কানাডা ভিজিটের ব্যাপারে আলাপকালে বারী সাহেব কোটিপতি নিজাম উদ্দিনের আর্থিক অবস্থা কেমন জানতে চেয়েছিলেন। কেননা, আর্থিক অবস্থা মজবুত না হলে কানাডার ভিসা পাওয়া কঠিন।
উত্তরে কোটিপতি জানিয়েছিলেন, তিনি রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা করেন, একটি নিজস্ব ডুপ্লেক্স বাসায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন, আঠারো ফ্ল্যাটের ছয় তলা একটা ভবনের মালিক, এবং ঢাকার উত্তরায় বারো তলার একটা নতুন ভবন তৈরিতে হাত দেবেন দু'তিন মাসের মধ্যেই। তাছাড়া, ফিক্সড ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র, ইত্যাদিও আছে প্রায় প্রায় দশ কোটি টাকার। বলা চলে, তিনি বেশ সচ্ছলই। আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় তাকে কানাডার ভিসা পাবার বেশ উপযুক্ত মনে করলেন বারী সাহেব।
নিজাম উদ্দিনের কথা মনে পড়ায় বারী সাহেব ভাবলেন, তাঁর নিজের দেয়া দশ-পনেরো হাজার টাকায় আর কি হবে, জাকিরকে বরং ওই কোটিপতির সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিলে মন্দ হয় না - যদি মোটাদাগের অর্থ সহায়তা তাঁর ভাগ্যে জুটে যায়!
টেলিফোনে নিজাম সাহেবের কথা জাকিরকে বলতেই জানা গেল কোটিপতি নিজাম আসলে জাকিরের ফুফাতো ভাই, এবং জাকির ইতিমধ্যেই তাঁর সাথে কথা বলেছেন।
কৌতূহলী হয়ে বারী সাহেব কোটিপতির সাথে জাকিরের কি কথা হয়েছে জানতে চাইলেন।
- নিজাম সাহেবের সাথে আপনার কি কথা হলো?
- তাঁকে মেয়ের বিয়ের কথা জানালাম। শুনে খুশি হলেন মেয়ের জন্য ভালো পাত্র পেয়েছি দেখে।
- তারপর?
- তারপর বললেন, করোনার কারণে তাঁর ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। ঠিকমতো মালের অর্ডার শিপিং করতে না পারায় মাত্র কিছুদিন আগেও নাকি তিন কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তাঁর। ব্যাংক-লোনের সুদও নাকি করোনা ভাইরাসের গতিতে হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, তাঁর তিন মেয়েই অবিবাহিত। এভাবে নানা সমস্যায় উনি হাবুডুবু খাচ্ছেন বলে জানান।
- আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির সমস্যা বুঝলাম, কিন্তু, তাঁর মেয়ের কথা কেন আপনাকে বলতে গেলেন?
- এটা বুঝাতে যে আমি তাঁর চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় আছি। কারণ, এই মেয়ের বিয়ে হলে আর মাত্র একটি মেয়ে আমার, যেখানে উনার তিনটি মেয়েই এখনো অবিবাহিত। তাই, তার সামনে অনেক খরচ পড়ে আছে।
- তো, আপনি বললেন না, আপনার তো অনেক টাকা পয়সা, মেয়ের বিয়ে নিয়ে চিন্তা কিসের?
- না, না, অত্তোবড়ো কোটিপতির সাথে তর্ক করা আমার মানায় না, উনি কি আজকের বড়োলোক? তবে কথা বলে বুঝলাম, টাকাপয়সা মনে হয় আগের মতো নাই, করোনা সব শেষ করে দিয়েছে। তিন মেয়ের বিবাহ নিয়ে খুব চিন্তায় আছেন তিনি। তিনি নিজেই আমাকে বললেন, আমি নাকি তাঁর চেয়ে অনেক ভাগ্যবান। তার কথাটা কিন্তু একেবারে ভুলও না। তিনটা মেয়ের বিয়ে দিতে মেলা টাকা লাগে এ জমানায়। ওদিকে তাঁর ব্যবসায় তো কেবলই লস আর লস। বড়লোকদের বাইর থেকে যতোটা বড়ো মনে হয় বাস্তবে মনে হয় তারা ততোটা না।… এভাবে, অনেক তথ্য জাকির এক সাথে দিলেন।
- সে যাক, তাঁর কাছ থেকে শেষমেশ কিছু পেলেন?
- না না; তবে, উনি বলেছেন, বছরখানেক অপেক্ষা করলে উনি আমাকে হাফ ফার্নিচারের টাকাটা দিতে পারবেন; তাও আবার ব্যবসার আয় উন্নতি হলে।
- বছরখানেকের অপেক্ষা? তাও আবার ব্যবসায় আয় উন্নতি হলে?… আর কি বললেন?
- তিনি আমাকে এও বলেছেন, গরিব বলে আমি নাকি তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে পেরেছি, কিন্তু, তিনি কার কাছে সাহায্য চাইবেন - তাঁকে যে বড়োলোক বলে সবাই জানে? সত্যি বলতে কি, নিজাম ভাই আমার চেয়েও বেশি বেকায়দায় আছেন মনে হলো। ব্যবসাবাণিজ্য মনে হয় আসলেই খুব খারাপ যাচ্ছে বেচারার। আল্লাহ এই ভাইটিকে বিপদমুক্ত করুন। আমার এই একটিই ফুফাতো ভাই।
- তাহলে কি ঠিক করলেন, নিজাম সাহেবের সাহায্য পেতে বছরখানেক অপেক্ষা করবেন?
- আরে না! বিবাহের কথাবার্তা ফাইনাল, তারিখ ফাইনাল, সবই ফাইনাল, অপেক্ষার কোন সুযোগ আর নাই। বেশিদিন অপেক্ষা করলে এই পাত্র অন্যদিকে চলে যাবে - দেশে অবিবাহিতা মেয়ের কি অভাব? …(খানিক বিরতি নিয়ে) .. বেশি ঠেকায় পড়লে সিএনজি বেঁচে দিয়ে আবার রিকশায় নামবো। আল্লাহ চাহে তো সিএনজি কেনার তৌফিক আবারো দিতে পারেন আমাকে। আগে মেয়েটার বিয়ে দেই। এটা ফরজ হয়ে পড়েছে। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।
বারী সাহেব কোটিপতি নিজামুদ্দিনের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা কেমন রমরমা তা বেশ ভালোই জানেন। কারন, কানাডা ভিসার আবেদনের জন্য সব ফাইনান্সিয়াল ডকুমেন্ট নিজামুদ্দিন তাঁর কাছে জমা দিয়েছেন। কিন্তু, তারপরও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সে সম্পর্কে জাকিরের কাছে মুখ খুললেন না বারী সাহেব। তবে, তিনি জাকিরের দৈন্যদশা দেখে সেই হাফ ফার্নিচার নিজেই উপহার দেবার দায়িত্ব নিলেন।