Published : 20 Feb 2026, 04:58 PM
বার্ট্রান্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০) তাঁর কোনো এক প্রবন্ধে মন্তব্য করেছিলেন, যেকোনো মনুষ্য কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সময়ে সময়ে তার লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। কী লক্ষ্য নিয়ে কাজটি শুরু হয়েছিল, তখন কী আদর্শ সামনে ছিল, এখন কী অবস্থা, লক্ষ্য কি অবিচল আছে কিনা, আদর্শ বৃন্তচ্যুত হল কিনা, ইত্যাদি। শিক্ষা নিয়েও আমাদের তদ্রূপ প্রশ্ন আসে মনে। আমাদের শিক্ষা লাইনচ্যুত সেটা আমরা কবুল করছি। কিন্তু তবু তার কী আদর্শ ছিল, আদর্শ ছিল কি কোনো? লক্ষ্য ও আদর্শের খোঁজে শিক্ষাবিদরা আজ মাথা খুঁড়ে মরছেন। এ বলেন অমুক আদর্শে চলা উচিত, উনি বলছেন তমুক আদর্শে, কেউ বলছেন জাপান, তো অন্য কেউ বলছেন ফিনল্যান্ড। কিন্তু আমরা রবীন্দ্রনাথই বা নিতে পারি না কেন? শিক্ষা নিয়ে তাঁর তো গভীর চিন্তা ছিল।
রাসেলও বলেছেন শিক্ষা নিয়ে তাঁর বিস্তারিত ভাবনা। শিক্ষা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটা হল একরকমের মানসিক অবস্থা প্রাপ্তি কিংবা জীবন ও জগৎ সম্পর্কে একরকমের দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন বা নির্মিতি যা পাঠদানের মাধ্যমে অথবা কোনো জাতীয় নির্দেশের (যেমন বক্তৃতা) মাধ্যমে অর্জন করা যেতে পারে। জন ডিউই (১৮৫৯-১৯৫২) মনে করতেন শিক্ষা হল জীবনের একরকমের সামাজিক ধারাবাহিকতা। এরই ধারাবাহিকতায় অনেকেই মনে করেন শিক্ষা হল পূর্বসূরী থেকে উত্তরসূরীতে দক্ষতা, আর্ট ও বিজ্ঞানের বিষয়াদির একরকমের প্রবাহ বা সঞ্চালন। শিক্ষার মাধ্যমে সংস্কৃতির নির্বস্তুক অর্জনগুলোকে মুরুব্বী থেকে কিশোরে স্থানান্তর ঘটানো যায় - শিশু ও কিশোরকে পাঠদানের মাধ্যমে কিংবা তরুণদেরকে জ্ঞানদানের মাধ্যমে। যে প্রক্রিয়ায় এই স্থানান্তরটি সংঘটিত হয় সেটাই শিক্ষাদান বা পাঠদান পদ্ধতি, বিদ্যালয়ের সংবাহন এবং শিক্ষার্থীর প্রতিপালনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর তখনই আসে পাঠদানের স্তরায়ন ও বৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ (কোন শ্রেণিতে কতটুকু), শিক্ষার প্রশাসনিক বিষয় এবং গাইডেন্স / মেন্টরিং ইত্যাদি নানা শিক্ষাবর্গীয় ব্যাপারসমূহ। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, শিক্ষার একটা বড় অনুষঙ্গ হল ‘মনের মধ্যে ঘা দেওয়া’। তিনি আরও মনে করতেন, সুশিক্ষা মানুষকে অভিভূত করে না, বরং মুক্তিদান করে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “আমাদের শিক্ষার মধ্যে এমন একটি সম্পদ থাকা চাই যা কেবল আমাদের তথ্য দেয় না, সত্য দেয়; যা কেবল ইন্ধন দেয় না, অগ্নি দেয়।”
বোঝাই যাচ্ছে, মনীষীদের বাক্যবাণের এবং চিন্তারাশির কোনো শেষ নেই। বরং তাঁদের সামগ্রিক ও মিলিত জ্ঞান থেকে আধুনিক শিক্ষার গতিপ্রকৃতি বোঝা বেশ দুষ্কর। তবু কালের ওপার থেকে এই দেবদূত বা মনীষীদের কথাসার থেকে নির্যাস বের করা আমাদের কর্তব্য। এবং আমরা স্পষ্ট করতে চাই আমাদের আধুনিক শিক্ষার লক্ষ্য ও আদর্শ কী হতে পারে। প্রথমত, আধুনিক শিক্ষার একটি লক্ষ্য হল, হোমো সেপিয়েন্স শিশু যেন সেপিয়েন্সই হয়। অর্থাৎ তার জ্ঞানের জায়গাটুকু যেন অপূর্ণ না থাকে। তার মধ্যে যুগের অর্জিত দক্ষতা এবং সংবাদ যেন সঞ্চিত থাকে। কালচার যেন জারিত এবং চারিত হয়। “আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে”- আধুনিক প্রতিশব্দে এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, শিশু যখন বড় হবে, বয়সের সাথে সাথে আমরা তার মধ্যে বিশেষ এবং কিছু কিছু শিখনফল প্রত্যাশা করব - এর মধ্যে থাকবে কিছুটা জ্ঞান, কিছুটা দক্ষতা আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল বিশ্লেষণের ক্ষমতা। আমাদের অন্তিম লক্ষ্য চার কোটি শিক্ষার্থী যেন এমন শিক্ষা পায়, যার ফলে তার জ্ঞানের শূন্যতা পূরিত হয়, সে দক্ষ হয় এবং জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে মোটামুটি স্বাধীন বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে মুক্তি পেতে পারে। আরেকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ এক পর্যায়ে ঝরে পড়ে। এবং এই ঝরে পড়া অংশ অদক্ষ শ্রম-বাজারে প্রবেশ করে এবং নানাভাবে প্রতারিত হয়, অত্যাচারিত হয়, মানবপাচারের পাল্লায় পড়ে, এমনকি নিহত হয়। এই মানবীয় ট্রাজেডি থেকে মুক্তিও আমাদের শিক্ষার একটি লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের আদর্শ হবে একটি দক্ষ জনশক্তি যা দেশের কাজে আসবে। একইসাথে নাগরিক হিসেবে সে তার নিজের ও তার পরিবারের কাজে আসবে। আমরা চাই, আমাদের শিক্ষার্থী একটা মাঝারি মানের কিন্তু ভাল শিক্ষা পাক, সে বিদেশে গিয়েও যেন কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করে নিতে পারে, আবার ঝরে পড়ার বয়স-পরিসর যেন আমরা একটু বিলম্বিত করতে পারি। যাতে ঝরে পড়ার মুহূর্তেও শিক্ষার্থীর হাতে যথেষ্ট বেঁচে-থাকার-জন্য-প্রয়োজনীয় হাতিয়ার জড়ো হয়। ‘মাঝারি’ বললাম একারণে যে ঢাকা বা অন্য জেলা বা বিভাগীয় শহরের শিক্ষক ও স্কুল, আর গ্রামের ভেতরের শিক্ষক ও স্কুল কখনোই একই মানের নয়। এই সমতা আমরা আনতে পারিনি। ফলে শহরাঞ্চলে শিক্ষার যে-মান আমরা ধরে রাখতে পারি, পল্লী অঞ্চলে সেটা আমরা পারি না। একই কারণে ‘আন্তর্জাতিকমানের’ শিক্ষা আমরা ঢাকা বা চট্টগ্রামে যেভাবে দিতে পারি, ভুরুঙ্গামারিতে পারি না। এজন্য একটা গড় মানের কারিকুলামে আমাদের থিতু হতে হবে। ব্যাপারটা এমন হবে যে যে-শিক্ষার্থী ১২-বছরের স্কুলিং শেষ করল, সে যদি চায় তো বহির্বিশ্বের যেকোনো স্কুলে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, আবার পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী সে বৃত্তিমূলক কোনো কিছু শিখে বিদেশে কর্মের সন্ধানেও যেতে পারবে। মানের দিক দিয়ে খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলে আমরা টেকসই হতে পারব না, তখন সমাজে অহেতুক স্তরায়ন সৃষ্টি হবে। ঠিক এখন যেমন, যেটা আমরা চাই না।
আসুন এবার এই লক্ষ্যগুলিকে আমরা বয়সানুযায়ী বিশ্লেষণ করি।
নিম্ন-মাধ্যমিক পর্যায়
প্রথমেই আমি আলোচনার পরিসরটুকু নিম্ন-মাধ্যমিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। ধরা যাক, প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা (অক্ষরজ্ঞান, বোলচাল শিক্ষা, গণিতের প্রতীক সম্পর্কে ধারণা, ছবি আঁকা ইত্যাদি) আলোচনার বাইরে রাখব। নিম্ন-মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পরিসর ও আদর্শ স্থির হলে আমরা বলে দিতে সক্ষম হব - প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে চতুর্থ শ্রেণিতে নির্দিষ্ট কিছু শিখন-ফল ও দক্ষতা যেন শিশু অর্জন করে নেয়। এই শিক্ষাসূত্রে আমরা প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শ্রেণি বর্তমান আলোচনার বাইরে রাখছি। পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি হবে বাধ্যতামূলক শিক্ষাস্তর। অষ্টম শ্রেণিতে একটি সার্বজনীন পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, ফলে শিক্ষার্থী দাবি করতে পারবে যে সে শিক্ষার বুনিয়াদ অর্জন করেছে। শিক্ষার্থীর জন্য বুনিয়াদি শিখনের মাইলফলক হিসেবে একটি সনদ জরুরি হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়েছে। আমাদের সমাজ-বাস্তবতায় এটার প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে হয়। কাজেই, অষ্টম শ্রেণি সমাপনান্তে একটি সনদ দেওয়া যেতে পারে।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত আমরা কিশোর-কিশোরীদের কী শেখাব? অষ্টম শ্রেণির পর শিক্ষার্থী যেহেতু জীবনের বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করবে, তাই অষ্টম শ্রেণি হউক সেই প্ল্যাটফর্ম যা শিক্ষার্থীকে জীবনের ক্ষুণ্নিবৃত্তির জন্য প্রস্তুত করবে। একইসাথে চিন্তার চ্যালেঞ্জ নেবার মত প্রয়োজনীয় দক্ষতাও সে রপ্ত করবে। আমরা ধরে নিচ্ছি, অষ্টম শ্রেণির পর একটা বড় অংশ ঝরে যাবে, এবং তারা কর্মজীবনের বৃহত্তর বাজারে প্রবেশ করবে। আমাদের সামাজিক বাস্তবতায় এটা বাস্তবানুগ পরিকল্পনা। শিক্ষার্থীদের বাকি ক্ষুদ্রতর অংশ, যারা বিদ্যালয়ে ফিরে যাবে, পরবর্তী দক্ষতার পর্যায়ে যেতে পারে, যদি তারা সেটা চায়। সেটাও আমাদের শিক্ষাদর্শনের পরিকল্পনামাফিক হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এই শিক্ষাসূত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রতিটি শিক্ষার্থী একইরকম শিক্ষা ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হবে, এবং জীবনজিজ্ঞাসা ভেদে আলাদা স্রোতে ভেসে যাবার পূর্বে তারা একটি সাধারণ শিক্ষসূত্রে একীভূত থাকবে। এটিই একমাত্র শিক্ষাব্যবস্থা হবে, অষ্টম শ্রেণি সমাপ্ত করে শিক্ষার্থী ইংরেজি লাইনে অথবা ধর্মীয় লাইনে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করতে পারবে।
অষ্টম শ্রেণি সমাপনান্তে আমরা চাইব শিক্ষার্থী বেশ কিছু বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করুক, কিছু কিছু বিষয়ে তার দক্ষতার প্রয়োজন হবে; বাকি বিষয়ের জন্য আমরা তার মধ্যে এমন বুনিয়াদি বিশ্লেষণী ক্ষমতা প্রবিষ্ট করতে চাই যা দিয়ে সে যেকোনো কর্মমুখী শিক্ষায় বা জীবনের মুক্ত পরিসরে করে খেতে পারবে, বা নিজে শিখে নিতে পারবে, বা এমন কর্মস্পৃহা তার মধ্যে সঞ্চারিত হবে। শিক্ষার্থী যেন জলবায়ু সম্পর্কে জানে, দেশের জ্বালানি ব্যবহার সম্পর্কে জানে, বিদ্যুৎ ও ডেটার ব্যবহার সম্পর্কে জানে; সাধারণ কমপিউটার ব্যবহার ও আইসিটি সাক্ষরতা এ সময়ে বিশেষ জরুরি, নির্ধারিত মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে জানা দরকার, তার যেন বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও দক্ষতা থাকে, ভাষার দক্ষতা, যোগাযোগের দক্ষতা, কোনো কিছু মাপার দক্ষতা (এক ইঞ্চি বা এক সেন্টিমিটার কিংবা এক লিটার কতখানি), প্রকৃতি সম্পর্কে জানার ক্ষমতা, কোনো কিছু হাতে বানানোর দক্ষতা, ইতিহাস সচেতনতা, এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা যেন তার থাকে। এগুলি বুনিয়াদি চাহিদা। শিক্ষার উচিত এই চাহিদাগুলি পূরণ করা।
কোন কোন বিষয়ে সে শিখতে পারে? বঙ্গ জনপদে জন্মহেতু আমরা চাইব শিক্ষার্থীর মধ্যে বাংলা ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা থাকবে। যোগাযোগের উপায় হিসেবে বাংলা লেখা ও পড়া যেমন তার দরকার, সাহিত্যের কিছু বুনিয়াদি নির্যাস যেন সে নিতে পারে। অষ্টম শ্রেণি সমাপনান্তে আমরা চাইব শিক্ষার্থী বাংলা ভাষা পড়তে, লিখতে ও শিখতে পারবে। যোগাযোগের উপায় হিসেবে চিঠি বা দরখাস্ত লিখতে পারবে, আখ্যান থেকে পড়ে মর্মার্থ করতে পারবে (কমপ্রিহেনশন), ব্যাকরণের কিছু নিয়ম-নীতি, বাক্যগঠন, শব্দার্থ, বাগ্বিধি, সন্ধি, সমাস, কারক ইত্যাদি জানবে। কিছু দেশাত্মবোধক ও পরিচিত ছড়া ও কবিতাংশ সে জানতে পারে, কিছু সরল রচনা ও ছোটগল্প তার পড়া থাকবে।
ইংরেজি ভাষা বৈশ্বিক যোগাযোগের ভাষা। অতএব, আধুনিক বিশ্বে করে খেতে হলে ইংরেজি জানতেই হবে। ফলে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে প্রাথমিক যোগাযোগ, প্রশ্ন করা, ইমেইল লেখা, দরখাস্ত লেখা, কথোপকথন করা, বাক্য লেখা, ইংরেজি ব্যাকরণের সামান্য কিছু ব্যাপার, কিছু রাইমস, বা ছোট গদ্য পড়ার অভ্যাস দেওয়া দরকার। ইংরেজি কমপ্রিহেনশন, ভোকাবুলারি, এবং দরকারি টুকটাক দক্ষতা তাদের দিতে হবে। ছোট সংবাদ পড়ে তার অর্থ করার ক্ষমতা বা চাকরির দরখাস্তে নিজেকে তুলে ধরার ভাষিক দক্ষতা ইংরেজিতে থাকতে হবে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ইংরেজি আমাদের জন্য দ্বিতীয় ভাষা, ফলে অসাধারণ নৈপুণ্য আমরা এতে চাচ্ছি না, কিন্তু দৈনন্দিন কাজ চলে যাবার মত দক্ষতা ও সক্ষমতা থাকতে হবে। আমাদের কারিকুলাম এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন এই দক্ষতাগুলি শিক্ষার্থী পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির মধ্যে অর্জন করে নেয়।
যোগাযোগ ও সাহিত্য-বোধের পর তাদেরকে গণিত শিক্ষা দিতে হবে। এক পত্র গণিত অত্যন্ত দরকার হবে। এ প্রসঙ্গে আমার জোর সুপারিশ থাকবে, সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পাটিগণিত রাখতেই হবে। এছাড়াও বীজগণিত, কিছুটা জ্যামিতি দেওয়া যেতে পারে। গণিত শিক্ষার বুনিয়াদ শুধু উচ্চমাধ্যমিক বা উচ্চ শিক্ষাস্তরে প্রয়োজন হবে এমন নয়, দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ গাণিতিক দক্ষতার বিশাল প্রয়োজন আছে। সংখ্যা বিষয়ে ধারণা, সরল অঙ্ক, জটিল ভগ্নাংশের যোগ-বিয়োগ, গরিষ্ঠ সাধারণ গুণনীয়ক, লঘিষ্ঠ সাধারণ গুণিতক, প্রাথমিক বিভাজ্যতার সূত্র, মুনাফার অঙ্ক, ঐকিক নিয়ম, সাধারণ বীজগণিত এবং সাধারণ জ্যামিতির ধারণা এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীর থাকা চাই। কেননা এই দক্ষতা থাকলে সে দোকানে সদাই কেনাবেচার সাধারণ হিসাব (যেমন, পাঁচশত টাকার নোট দিলে এক কিলো চাল ও ডাল কেনার পর তার কত বাকি থাকবে - এই জাতীয় দক্ষতা), ওজনের ব্যাপার, মজুরির হিসাব, মাসের সঞ্চয় ও বীমা জাতীয় গণনা সে করতে পারবে। তাছাড়া গণিত শিক্ষা হল ক্রিটিকাল অ্যানালিসিস বা বিশ্লেষণী চিন্তার অত্যন্ত বুনিয়াদি ধাপ। গাণিতিক ধারণা থাকলে মানুষ তার যাত্রাপথের বিভিন্ন অংশও জুড়ে নিতে পারবেঃ যেমন, আন্তর্জাতিক কানেকটিং ফ্লাইট বোঝা বা এয়ারপোর্টে কী করণীয় জানা আধুনিক নাগরিকের কর্তব্য।
অষ্টম শ্রেণি শেষ করে শিক্ষার্থীর সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস অর্জন করতে পারা উচিত। এর অর্থ সে কোন পরিবেশে আছে, কেন আছে, তার ব্যাখ্যা কী, তার চারপাশে সে যা দেখছে তার ব্যাখ্যা (কেবল ভৌত অবস্থার ব্যাখ্যা নয়, ইতিহাসের পারম্পর্য জানাও দরকার) সে জানতে চাইবে এবং ব্যাখ্যা করতে পারবে। শিক্ষার্থী যেন পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার সম্পর্কে জানে সেটা স্পষ্ট করতে হবে। এই পরিবেশগত সচেতনতার প্রথম অঙ্গ হল বিজ্ঞান। বিজ্ঞান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা-স্মারক বিষয় যা তাকে ভৌতজগৎ ও জৈব পরিবেশ সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে। অষ্টম শ্রেণি সমাপনান্তে শিক্ষার্থীর বিজ্ঞানের বুনিয়াদি দক্ষতা থাকতে হবে। এ পর্যায়ে পঞ্চম শ্রেণি থেকে ধারাবাহিকভাবে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং জীববিজ্ঞানের সাধারণ পর্যবেক্ষণ ও সূত্রসমূহ, সৌরজগতের সাধারণ পরিচয়, সূর্য ও চাঁদ সম্পর্কে জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে শেখানো যেতে পারে। এই চার বছরে খুব আলতোভাবে শিক্ষার্থীকে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করতে হবে। পরিবেশ সচেতনতা এই সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ শিখন-ফল। পঞ্চম শ্রেণি বাদে অপর তিনটি শ্রেণিতে হাতে-কলমে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে শিক্ষার্থীকে অভ্যাস করাতে হবে। এইসব ‘ল্যাবে’ মূলত শিক্ষার্থীদের গতির সাধারণ ব্যাপারসমূহ, মহাকর্ষের অধীনে পতন, ঋতু পরিবর্তন, গাছের পাতা, ফুল ও বীজ পর্যবেক্ষণ ও কেটে প্রস্থচ্ছেদ দেখা, রসায়নের সাধারণ মিশ্রণ ও দ্রবণ বানানো (যেমন চিনির সম্পৃক্ত দ্রবণ, বা লবণের দ্রবণের নানা পরীক্ষা) করে দেখানো যেতে পারে। ম্যাগনিফাইং গ্লাসের সাহায্যে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এই পর্যায়ের একটি বড় বিষয় হতে হবে। এই পর্যায়ে ‘ল্যাব’ আসলে প্রকৃতিকে দেখারই অন্য নাম হবে। বিজ্ঞানের বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে- আনন্দের সাথে যেন প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ হয়, শিক্ষার্থী যেন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ পরিচিতি ধারণ করে। জীবন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বোধের হাতেখড়ি হবে এই পর্যায়ে। পরিশিষ্টে ষষ্ঠ-সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পদার্থবিজ্ঞানে কীরকম বিষয়-বিন্যাস থাকতে পারে, তার সম্ভাব্য কারিকুলাম দেওয়া হয়েছে, বিদগ্ধ শিক্ষক পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন।
সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস বিষয়ক আরেকটি জ্ঞান হল সমাজ, ইতিহাস ও ভূগোল সম্পর্কে সচেতনতা। একযোগে এই তিনটি বিষয় শিক্ষার্থীকে জানাতে হবেঃ ধাপে ধাপে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। এর জন্য তাকে প্রতিটি শ্রেণিতে একটি পত্রের অধিক পড়ার দরকার নেই, কিন্তু চার বছরে এই তিনটি বিষয়কে সুষমভাবে পড়াতে হবে। বাংলাদেশ অঞ্চলের ভূমিরূপ ও ভৌগোলিক বিবরণ, তার নদনদী, প্রাকৃতিক সম্পদ, মাটির বিন্যাস ও প্রকৃতি যেমন শিক্ষার্থীর জানা দরকার; তেমনি জানা দরকার বিশ্ব সম্পর্কেও - কয়টি মহাদেশ বা মহাসাগর রয়েছে, পৃথিবী গোল তা কীরূপে জানা যায়, পৃথিবীর ব্যাস মাপে কীভাবে, বড় পার্বত্য অঞ্চল ও সমুদ্রের পরিচিতি ও প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ কাকে বলে এবং কীভাবে তারা বণ্টিত ইত্যাদি। ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং পৃথিবীর বয়স বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা থাকা প্রয়োজন। একইসাথে বাংলাদেশের প্রাগিতিহাস থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বঙ্গসমাজের গঠন, সামাজিক বিন্যাস, সমাজ গঠনের রূপরেখা, সভ্যতা কীভাবে তৈরি হয়, সভ্যতার ক্ষয় ও বিলোপে জলবায়ুর ভূমিকা, বৃহৎ বঙ্গের জনপদসমূহ, পাল বংশ, সুলতানী বংশ ও মোগল আমল, ইত্যাদি বিষয়গুলি গল্পের মত করে পড়ানো হয়ে যায়, কারণ এ অংশটি জ্ঞানমূলক। কিন্তু এই জ্ঞান দিয়ে সে ইতিহাসের প্রশ্নসমূহকে বিশ্লেষণ করতে পারবে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার ধারণা জন্মাবে।
আর্ট বা শিল্পকলা এমন একটি বিষয় যা আলাদা পত্র হিসেবে পড়তে হবে বলে মনে করি। কোনো শিক্ষার্থীর শিল্পকলা, বা আবৃতি বা সংগীত সম্পর্কে আগ্রহ সৃষ্টি সাধারণ শিক্ষার একটি অঙ্গ বলে বিশ্বে স্বীকৃত। অতএব, আর্ট নিয়ে শিক্ষার্থীকে ধারণা দিতে হবে এবং মস্তিষ্কের ডান-অর্ধের স্নায়ুকোষগুলিকে উদ্দীপিত করতে হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে একইসাথে মানবিক, হার্দিক ও সৃজনশীল ব্যাপারগুলির পরিস্ফূটন ঘটতে পারে। প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধ সমানভাবে ঋদ্ধ নয় - মস্তিষ্কের ডান-অর্ধ, আমরা জানি, সাধারণভাবে ছবি আঁকা, গান বা সৃজনীকলার সাথে যুক্ত; অপরদিকে বাম-অর্ধ গাণিতিক ও যুক্তি প্রক্রিয়া, নেভিগেশনের সাথে যুক্ত। তাই শিক্ষার্থীকে সার্বিকভাবে দুই-অর্ধকেই চর্চায় রাখতে হবে।
শিক্ষার্থীর মধ্যে ভালো-মন্দের জ্ঞান জাগাতে হবে। অন্যদেশের জন্য হয়ত এটা অদরকারী। কিন্তু আমাদের ধার্মিক ও সামাজিক মণ্ডলে এর আলাদা গুরুত্ব আমরা দিয়ে থাকি। প্রাচ্যের সব শিক্ষা আমরা ফেলে দেব না। ফলে ধর্ম চর্চা সম্পর্কে আমাদের শিক্ষার্থীদের যেমন জ্ঞান দেওয়া প্রয়োজন, চিন্তা কীভাবে করে, কোনো কিছু সম্পর্কে কীভাবে জানা যায়, জীবনের অর্থ কীভাবে জানা যায় অথবা কেন জানা যায় না - এইসব প্রশ্ন শিক্ষার্থীকে দিতে হবে। আমার মতে, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একটি পত্রে ধাপে ধাপে শিক্ষার্থীকে স্বীয় ধর্মশিক্ষা দিতে হবে। যে সম্প্রদায়ের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকু। মুসলিম শিক্ষার্থীর জন্য যেমন ইসলামের পরিচিতি, তৌহিদের শিক্ষা, নবীজীর জীবনী, চার খলিফা ও প্রধান কয়েকজন সাহাবাদের জীবনী, কুরআন এবং হাদিস পরিচিতি, নামায-রোযার বুনিয়াদি নিয়ম-কানুন, ইত্যাদি দিতে হবে। একই পত্রে আমরা তাকে সংক্ষেপে জানাবো চিন্তা কীভাবে করে, চিন্তার ইতিহাস কী, কীভাবে প্রশ্ন করে জ্ঞানের কথা জানতে হয়। দ্বন্দ্বের মুখে কীভাবে সমস্যাকে ভেঙ্গে ফেলে ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব শিক্ষার্থীকে সেটা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া যেতেই পারে। এটা শিক্ষার্থীকে বিশ্লেষণী দক্ষতা বা ক্রিটিকাল অ্যানালিসিসের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। এই দক্ষতা অত্যন্ত জরুরি-- কর্মে ও জীবনে জটিল ও সংক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিতে এটা শিক্ষার্থীকে নানাভাবে সাহায্য করবে। ধর্ম এবং দর্শন পড়ালে শিক্ষার্থীর মধ্যে ন্যায্যতাভিত্তিক কাণ্ডজ্ঞান এবং সুনীতির ধারণাবলি বেড়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন কূপমণ্ডুক না হয়। তবে, এতৎ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনায় মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আধুনিক জগতে কমপিউটার ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, অতি সাধারণ কোডিং এবং রোবট সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। এটা মূলত দক্ষতা ও বিশ্লেষণমূলক শিক্ষা। ফলে মাধ্যমিকের এই চার বছরে একটি আলাদা পত্রে আইসিটি বিষয়ক জ্ঞান শিক্ষার্থীকে দিতে হবে। কীভাবে সাধারণ কমপিউটার চালানো যায়, ডেটা সংযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ, ফর্ম ডাউনলোড ও চাকরি বা পাসপোর্টের জন্য অনলাইনে কীভাবে আবেদন করতে হবে, প্রিন্টার বা ফটোকপি কীভাবে করতে হবে, অনলাইন বুলিং কাকে বলে, এমন হলে সাইবার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, পাসওয়ার্ড কীভাবে বানাতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যাপগুলি কীভাবে ব্যবহার করা যায়, এআই শিক্ষার্থীর জীবনকে কীভাবে সহজ করে তুলতে পারে, সামাজিক মাধ্যমে কাঙ্খিত আচরণ কেমন, ইত্যাদি এই বয়সের জন্য অত্যন্ত কাম্য দক্ষতা।
শিক্ষার এই সাধারণ সূত্রগুলি যেকোনো শিক্ষানীতিতে আলোচিত হওয়া দরকার। শিক্ষানীতির এই মূলসূত্র অনুযায়ী সকল শিক্ষার্থী এই সিলেবাসে অধ্যয়ন করবে। প্রতিটি পত্র একশ নম্বরের পত্র - এই হিসাবে এখানে চিন্তা করা হয়েছে। সাধারণ হউক, ইংরাজি হউক, বা ধর্মীয় লাইনেই হউক, এক ও অভিন্ন সিলেবাস অনুসরণ করতে হবে। মাদ্রাসাতে যারা পড়বে, তাদের জন্যও এই ধারাই বলবত থাকবে, তবে কিছু সংযোজন বিয়োজনের প্রয়োজন হলে সেটা করে নেওয়া উচিত। সম্ভবত, তাদের জন্য ধর্মীয় পঠন-পাঠনের অংশে জোর বেশী থাকতে পারে, অথবা অতিরিক্ত পত্র নিতে পারে জ্ঞান বাড়ানোর জন্য। তাছাড়া আমাদের মাথায় রাখতে হবে, হেফয যারা করবে, তাদের ক্ষেত্রে পত্রবিন্যাস কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে। যেমন, তারা অতিরিক্ত আরও একটি বছর পাঠ সমাপনান্তে অষ্টম শ্রেণি সনদ পেতে পারে। তবে তাদের ক্ষেত্রে হেফযের পাগড়ি একটি অতিরিক্ত দক্ষতা হিসেবে গণ্য হবে। এটা তার জন্য অতিরিক্ত সুবিধা এনে দেবে। এভাবে অষ্টম শ্রেণি শেষে দেশ ও জাতি গঠনের জন্য আমরা একটা দক্ষ জনশক্তি পাব।
অষ্টম শ্রেণি সমাপনান্তে শিক্ষার্থী কোনদিকে যাবে তার একটি দিকনির্দেশনা থাকা দরকার। আমরা আশা করতে পারি, একটা বড় অংশ বিদ্যালয় থেকে এ পর্যায়ে ঝরে পড়বে। তারা জীবনের ব্যাপক ক্ষেত্রে ঢুকে পড়বে, অথবা ইচ্ছেমত তারা কিছু কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিতে পারে। অষ্টম শ্রেণির পর কারিগরি শিক্ষা হবে পাঁচ বছরের, বৃত্তিমূলক হতে পারে তিন বছরের। ফলে উভয় সিস্টেমেই শিক্ষার্থীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় অতিক্রম করবে। আরেকদল শিক্ষার্থী ধর্মীয় শিক্ষায় বেশি মনোযোগী হতে পারে এবং সেক্ষেত্রে তারা উপযুক্ত মাদ্রাসায় উপযুক্ত ও সমতুল্য দরস গ্রহণ করতে পারবে।
মূল শিক্ষা পলিসি দাঁড় করানোর পর কাজ শুরু হবে পাঠক্রম বিন্যাস বা কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টের, তারপর এই ব্যবস্থার ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন কেমন হবে, পরিচালনা বা ইমপ্লিমেন্টেশন কীভাবে হবে, ইত্যাদি আসবে। কীভাবে দক্ষতা মাপা হবে, শিক্ষক কীভাবে পড়াবেন এগুলো আসবে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক হবার পর।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়
শিক্ষাসূত্র নিয়ে নিম্ন-মাধ্যমিক পর্যায়ের ভাবনা এতক্ষণ বলেছি, অষ্টম শ্রেণি একটি প্রান্তসীমা নির্ধারিত হতে পারে, যার অন্তিমে শিক্ষার্থী একটি সনদ পেতে পারে। এই ভাবনার পেছনের যুক্তিটি এরকমঃ প্রাথমিকের পর অন্তত চার বছরের একটা ধারাবাহিকটা থাকলে, এবং সনদ প্রাপ্তির প্রথম ধাপ খানিকটা পিছিয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করলে ঝরে পড়ার বয়সসীমা একটু বাড়ানো যায়, এবং কিছু অতিরিক্ত দক্ষতা ও শিখন-ফল যোগ করা সম্ভব হয়। সনদ সমাপনী পরীক্ষা অষ্টম শ্রেণিতে থাকা দরকার।
এখন অষ্টম শ্রেণি শেষ করে শিক্ষার্থী কী করবে? সে যদি ধর্মীয় লাইনে যায় কিংবা ইংরেজি লাইনে যায়, তবে সেইমত সিস্টেম-স্ট্রিম সে অনুসরণ করবে। কিন্তু জাতীয় স্ট্রিমে আমার মতে, অষ্টম শ্রেণির শেষে প্রধান কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এবং এ পর্যন্ত আমরা শিক্ষার্থীকে যেহেতু কাণ্ডজ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও স্বাধীন চিন্তার দক্ষতা শিখিয়েছি, অতএব সে তার জীবনের পরবর্তী পদক্ষেপ নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সে তার ও পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, পারিবারিক প্রত্যাশা, নিজের প্রত্যাশা ও সামর্থ্য বিবেবচনা করে মাধ্যমিক স্তরে (নবম-দশম শ্রেণি) প্রবেশ করতে পারে। অথবা বৃহত্তর কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে, এবং কিছু বৃত্তিমূলক শিক্ষা বা কর্মজীবী শিক্ষা কার্যক্রমে ঢুকতে পারে। এসব শিক্ষা হাতে-কলমে হবে এবং ইন্টেন্সিটি বা প্রাবল্য কম হবে। তবে এগুলোর বিস্তার যথাক্রমে তিন ও পাঁচ বছর হবে। ফলে শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সমতুল্য একটি দশা অর্জন করে ফেলতে পারবে। অন্যদিকে, ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণে ইচ্ছুক শিক্ষার্থী এ পর্যায়ে দাখিল-আলিম ইত্যাদি পর্যায়ের শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে পারবে, সেইমতো আলাদা কারিকুলাম থাকবে মাদ্রাসা ব্যবস্থার জন্য।
বিজ্ঞান বা মানবিকের বিভাগ সেভাবে মোটাদাগে না করে আমরা কিছু অতিরিক্ত পত্র অধ্যয়নের পক্ষপাতী। একেকটি পত্র হল ১০০ নম্বরের সমমানের পাঠশিক্ষা। এখন যেমন বাংলা ১ম পত্র - ১০০ নম্বর, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র - ১০০ নম্বর ইত্যাদি। ফলে শিক্ষার্থী যদি বিজ্ঞানের দিকে ঝুঁকতে চায় তবে সে বিজ্ঞানের একাধিক পত্র বা গণিতের একাধিক পত্র অধ্যয়ন করবে। উচ্চমাধ্যমিকে আরো বিশেষায়নের সুযোগ থাকবে, এবং তদনুযায়ী শিক্ষার্থী নিজেকে তৈরি করে নিতে পারবে। এমনকি মিশ্রিত বিশেষায়নেরও সুযোগ রাখা চাই। উল্লেখ্য, সাবেকি পদ্ধতিতে প্রথম পত্র দ্বিতীয় পত্র ইত্যাদি বর্গীকরণের বিপরীতে আমরা একাদশ বা দ্বাদশ ইত্যাদি নামে রাখতে চাই। ফলে বাংলা ১ম পত্র বা ইতিহাস ২য় পত্রের স্থলে আমরা বলব, বাংলা একাদশ বা ইতিহাস দ্বাদশ ইত্যাদি। অবশ্য কয়েকটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই এমনটি হবে, যেমন কোর বিষয়গুলি সব একাদশ শ্রেণির হবে, আর সমাবেশের অধীনে থাকবে দ্বাদশ শ্রেণির পত্র।
পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণিতে প্রতিটি শ্রেণিতে উত্তরণের জন্য পাঠ্যবই যেমন শিক্ষার্থী-বান্ধব হবে এবং নিম্ন শ্রেণি থেকে উচ্চ শ্রেণিতে উত্তরণের সময়ে পরিবর্তনটা আরও মসৃণ হবে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর সে তুলনায় চ্যালেঞ্জিং থাকবে। অর্থাৎ এক শ্রেণি থেকে পরের শ্রেণিতে উত্তরণ অত মসৃণ প্রত্যাশা করা যাবেনা। প্রতিটি শ্রেণিতে চিন্তার চ্যালেঞ্জ একটু একটু করে বাড়াতে হবে। মাধ্যমিকের দশম শ্রেণির শেষে আমাদের দেশে আবহমান কাল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। এখন যাকে আমরা এসএসসি বা মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা বলি। আমি এটি উঠিয়ে দিতে চাই। ফলে পরবর্তী ঝরে পড়াকে আমি উচ্চমাধ্যমিকে ঠেলে দিতে চাই। ফলে উচ্চমাধ্যমিক শেষে একজন শিক্ষার্থী পরিপূর্ণ ১২-ক্লাসের স্কুল অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এবং স্কুল জীবনের শেষ সনদ পরীক্ষা আমরা এখানে রাখতে চাই। এই উচ্চমাধ্যমিক সনদ কলেজ পাশ বা ১২-ক্লাস শেষের একটা সনদ হবে।
এখন দেখা যাক, মাধ্যমিকে কী হবে। মাধ্যমিকের গণিত অর্থাৎ নবম-দশম শ্রেণির গণিতে সংখ্যার জ্ঞান ও ধারণা, বিভাজ্যতা, মৌলিক সংখ্যার ধর্ম, রিয়েল অ্যানালিসিসের প্রাথমিক বিষয়াদি, সেটের ধারণা, গ্রাফ, ফাংশনের ধারণা, বীজগাণিতিক পদ্ধতিসমূহ, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, অসমতা, সূচক, লগের ধারণা, অসীম সংখ্যার ধারণা, ধারা ও অনুক্রম, স্থানাঙ্ক জ্যামিতি, ঘনজ্যামিতি, পরিসংখ্যান ও জনমিতি, গণিতের ইতিহাস ও প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আমরা প্রায়শই শুনি রান্নাঘরে ত্রিকোণমিতির কী দরকার? ত্রিকোণমিতি জানা থাকায় দুই হাজার বছর আগে এরাটোস্থেনিস পৃথিবীর ব্যাস মেপেছিলেন, কেবল দুটি শহরে ছায়ার দৈর্ঘ্য মেপে। ফলে কেউ যদি বলে রন্ধনে ত্রিকোণমিতির কোনো কাজ নেই, তারা রন্ধনেও পাকা হতে পারবেন না। সত্যি বলতে কি, এসব কুযুক্তি শোনারই কোনো দরকার নেই। ফিনল্যান্ডের শিক্ষার্থীদের গাণিতিক দক্ষতা আর কোরিয়ার শিক্ষার্থীর গাণিতিক দক্ষতায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। সেটা তাদের স্টেম-শিক্ষার মান ও দক্ষতায় স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের র্যাঙ্কিঙে এবং স্নাতকদের প্লেসমেন্ট থেকে বোঝা যায়। আমাদের দরকার এগিয়ে যাওয়া, যারা ইতিমধ্যে এগিয়ে আছে তাদের দরকার স্থিতি ও মননশীলতা। ফলে দরকার বুঝেই নিজের শিক্ষা ডিজাইন করা উচিত। দক্ষিণ এশিয়া কিংবা বৃহত্তর এশিয়ায়, বিশেষ করে ইরান, ভারত, কোরিয়া, জাপান ও চীনের শিক্ষার্থীরা গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষায় এগিয়ে। কেন তারা এগিয়ে সেটা ভাবা দরকার। এর পেছনে আছে এশীয় সংস্কৃতির পড়াশোনার ধরন, বাবা-মার নিরন্তর প্রেরণা, গণিতচর্চার প্রতি আগ্রহ। এসব সাংস্কৃতিক সম্পদকে ফেলে দেবার কোনো যুক্তি নেই।
নবম-দশম বিজ্ঞানের জন্যও একটি করে পত্র রাখার পক্ষপাতী আমি। অর্থাৎ প্রতি শ্রেণিতে একটিই বিজ্ঞানের বই - নবম বিজ্ঞান এবং দশম বিজ্ঞান। বই একটি হলেও এর গভীরতা থাকবে, এবং একটি বাধ্যতামূলক ল্যাব থাকবে। আমাদের তরুণ-তরুণীদের একটা বড় অংশের জন্য ভাল বুনিয়াদি বিজ্ঞানশিক্ষার প্রয়োজন আছে। নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞানে বিজ্ঞানের ইতিহাস, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, বিজ্ঞানের কার্যক্রমের উদাহরণ, গতির সূত্র, মহাকর্ষ, কাজ-ক্ষমতা-শক্তি, জ্বালানির ধারণা, বিশ্বজগতের গঠন ও পরিচিতি, সূর্য ও নক্ষত্র, চাঁদের গঠন, মঙ্গল-শুক্র ও বৃহস্পতি গ্রহের বর্ণনা, আলো, বিদ্যুৎ ও চুম্বকের নানা ধর্ম, তরঙ্গের ধর্ম, তাপশক্তির ব্যাখ্যা, গলনাঙ্ক-স্ফুটনাঙ্ক, প্রাথমিক ইলেকট্রনিকস; পদার্থের রাসায়নিক গঠন, পর্যায়সারণি, রাসায়নিক বন্ধন ও বিক্রিয়া, মোলের ধারণা, অ্যাসিড-ক্ষার সমতা, গ্যাসীয় পদার্থের ধর্ম, ধাতুর নিষ্কাশন, জৈব যৌগের প্রাথমিক পরিচিতি; কোষ পরিচিতি, টিস্যু, নানা জৈবিক ধর্ম (পরিবহন, রেচন, সংবহন, গ্যাসীয় বিনিময়), উদ্ভিদের জাইলেম-ফ্লোয়েম, প্রাণীর ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য, জীববৈচিত্র্য, জেনেটিকস ও প্রাকৃতিক পরিবর্তন, ইত্যাদি থাকা দরকার। এই বিজ্ঞানের ভিত্তিতে যে ল্যাবরেটরিটি ডিজাইন করা হবে, তার মূল লক্ষ্য হবে অনুসন্ধিৎসা - অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ও ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতি অভিনিবেশ, এবং পর্যবেক্ষণকে সংবিধিবদ্ধ রাখা (অর্থাৎ কী দেখলাম কী শিখলাম কী পর্যবেক্ষণ করলাম তা লিপিবদ্ধ রাখা, প্লট করা) শিক্ষা করা দরকার। এভাবে নবম শ্রেণি এবং দশম শ্রেণিতে আলাদা করে দুটি বইয়ে এই বিষয়গুলি ধারাবাহিকভাবে রাখা হবে। অর্থাৎ নবম শ্রেণির গণিত ও নবম শ্রেণির বিজ্ঞান, আবার দশম শ্রেণির গণিত ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞান - এভাবে বিষয়বস্তু সজ্জিত হবে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নবম-দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান ও গণিতকে এইভাবে সবার জন্য রাখার পক্ষপাতী হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্নরকম হতে পারে। অর্থাৎ এই লেভেলের বিজ্ঞান ও গণিত অনেকের জন্যই ভারবহ ও কঠিন মনে হতে পারে, এবং তারা বিজ্ঞান ও গণিতের পরিবর্তে সহজ বিষয় অধ্যয়ন করতে চাইতেই পারে। একথা ঠিক যে বিজ্ঞান ও গণিতকে চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, যদিও আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞান ও গণিতের দক্ষতা প্রয়োজন হবে। এমতাবস্থায়, দুটি বিকল্প থাকতে পারে। আমরা অধিকতর সহজ বিজ্ঞান ও গণিতের বই রচনা করতে পারি। যেমন, একটি সাধারণ বিজ্ঞান, আরেকটি হতে পারে সরল বিজ্ঞান। অথবা নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান ও গণিত বাধ্যতামূলক রাখলেও, দশম শ্রেণিতে বিকল্প বিষয় অধিভুক্ত করতে পারি। সেক্ষেত্রে ঐচ্ছিক বিষয় থেকে দুটি বিষয়কে দশম শ্রেণিতে গণিত ও বিজ্ঞানের বিকল্প হিসেবে নিয়ে আসতে হবে। যেমন, নগর ও রাষ্ট্র, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, হিসাব ও খতিয়ান, অথবা অর্থনীতি, আর্টের ইতিহাস, ব্যবস্থাপনা বিষয়গুলির যেকোনো দুটি তখন আবশ্যিক বিষয় হতে পারে।
নবম ও দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞান ও গণিত ছাড়া আরও আবশ্যিক থাকতে পারে বাংলা দুই পত্র (অর্থাৎ বাংলা-নবম ও বাংলা-দশম), ইংরেজি দুই পত্র, বাংলাদেশের ইতিহাস, চিন্তা ও দর্শন, ভূগোল, সভ্যতা ও সমাজ, আইসিটি। প্রতিটি শ্রেণিতে একটি করে অতিরিক্ত ঐচ্ছিক পত্র থাকতে পারে। ফলে নবম এবং দশম দুটি শ্রেণিতেই ঐচ্ছিক পত্র থাকতে পারে। এরকম ঐচ্ছিক বিষয় হতে পারে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, নগর ও রাষ্ট্র, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, চারু ও কারুকলা, উচ্চতর গণিত, ধর্ম ও নীতিশিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, হিসাব ও খতিয়ান, মৃত্তিকা ও কৃষিবিজ্ঞান, আর্টের ইতিহাস, জ্যোতির্বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, ব্যবসায় গণিত, ব্যবসায় উদ্যোগ, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং, শারিরীক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য পরিচিতি অথবা পরিবেশ বিজ্ঞান। এই প্রতিটি ঐচ্ছিক বিষয় এমনভাবে নিতে হবে যেন তা শিক্ষার্থীর একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির অধীতব্য বিষয়ের অনুগামী হয়। শিক্ষার্থী নিজে, বাবা-মা অথবা শিক্ষকের সাথে পরামর্শ করে ঐচ্ছিক বিষয় নির্বাচন করতে পারবে। এগুলির প্রতিটি একটি মাত্র পত্র হিসেবে বিবেচিত হবে।
এবার উচ্চমাধ্যমিক তথা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি নিয়ে ভাবা যাক। উচ্চমাধ্যমিক শেষে আমরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কী দেখতে চাই? ১২-ক্লাস শেষ করেছে এমন তরুণ-তরুণীদেরকে আমরা চিন্তার যেকোনো চ্যালেঞ্জ নেবার উপযোগী দক্ষ মানবশক্তি হিসেবে কল্পনা করতে চাই। ফলে এই স্তরে শিক্ষার গভীরতা বাড়বে, কাঠিন্য বাড়বে, চ্যালেঞ্জও বাড়বে। জ্ঞানমূলক, দক্ষতামূলক ও বিশ্লেষণী দক্ষতামূলক শিক্ষালাভের পর ক্রিটিকাল চিন্তার উপযোগী শিক্ষার্থী আমরা পাব। উচ্চমাধ্যমিকের পর আরেকটি ঝরে-পড়ার ঘটনা ঘটবে। যারা বৃহত্তর জীবনে প্রবেশ করবেন তারাও কর্মজীবী শিক্ষা বা বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যেতে পারবেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর এই শিক্ষা যথাক্রমে ৩ বছর ও দেড় বছর হবে। কারণ এই পর্যায়ের ইনটেকে শিক্ষার্থী অনেকটাই দক্ষ হয়ে এসেছে। আরেক দল শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করবে। উচ্চশিক্ষা সীমিত থাকা উচিত, স্নাতকোত্তর শিক্ষা আরও সীমিত থাকা উচিত। হাজার হাজার মাস্টার্স বা পিএইচডি শিক্ষিত মানুষের জন্য আমাদের সমাজে কর্মসংস্থানের সুযোগ নাই। সমাজে ও রাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের বিন্যাস এমনভাবে থাকতে হবে, যেন উচ্চমাধ্যমিক শেষে সামান্য কিছু দক্ষতার্জনের পরই কর্মের সুযোগ থাকে। অফিসার লেভেলের জন্য যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক-শিক্ষা থাকতে হবে। কিন্তু স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি শিক্ষা তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা শিক্ষাদানের পেশায় থাকবেন, বা উচ্চতর গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা করবেন অথবা বিশেষভাবে বিদ্যোৎসাহী হবেন।
উচ্চমাধ্যমিকে ঐতিহ্যগতভাবে বাংলা বিষয়ে দুটি পত্র, ইংরেজি বিষয়ে দুটি পত্র থাকে। বিজ্ঞান বিষয়ে পদার্থবিজ্ঞানে, গণিতে, জীববিজ্ঞান ও রসায়নে দুটি করে পত্র থাকে। এছাড়া একটি অতিরিক্ত পত্র থাকতে পারে। আমরা এখানে পত্রের সংখ্যায় বৈচিত্র্য আনতে চাই। তাছাড়া ‘১ম পত্র, ২য় পত্রে’র স্থলে আমরা ‘একাদশ শ্রেণি, দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্য’ -এভাবে বলতে চাই। আমাদের পরিকল্পনা হল - বাংলা ও ইংরেজিতে দুটি করে পত্র থাকলেও গণিত, উচ্চতর বিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, মানবিক বিদ্যায় একটি করে পত্র থাকবে। অর্থাৎ একাদশ শ্রেণির উপযোগী বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ইত্যাদি। আবার দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, বিজ্ঞান ইত্যাদি থাকবে। তবে ক্যালকুলাস, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও সভ্যতা, পরিসংখ্যান, আইসিটি নামে দ্বাদশ শ্রেণির জন্য একটি করে পত্র থাকবে। শিক্ষার্থী বিন্যাস ও সমাবেশ করে এখান থেকে বিষয় বা পত্র বেছে নিতে পারবে। এমনভাবে নেবে যেন মোট ১২০০ নম্বরের পরীক্ষা দিতে পারে। এর মধ্যে অবশ্যই কোর সাব্জেক্ট থাকবে যা ৬০০ নম্বরের। বাকিটুকু শিক্ষার্থী আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঠিক করে নিতে পারবে। কলেজে যদি কোনো পত্র পড়ানোর মত সুবিধা না থাকে তবে শিক্ষার্থী নিজে থেকেই সিলেবাস অনুসরণ করে বই পড়ে নিতে পারবে। নিচে কয়েকটি সমাবেশ (প্রতিটি কোর একাদশ শ্রেণির জন্য, প্রতিটি সমাবেশ দ্বাদশ শ্রেণির জন্য; কোর-১ অথবা কোর-২ এবং সেইসাথে যেকোনো একটি সমাবেশ নিতে হবে) দেখানো হল, অন্যান্য সমাবেশও সম্ভবঃ

উল্লেখ্য, এরকম আরও কয়েকটি সমাবেশ হতে পারে, যা পরবর্তীতে কলেজ শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রীদের সাথে বসে ঠিক করা যাবে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্র যেভাবে বিন্যস্ত হত সেভাবে না করে, বিষয়বস্তু বিন্যাসে নতুন কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, কোর সাবজেক্টের বিষয়গুলি একাদশ শ্রেণির উপযোগী করে এবং বাকি (বিকল্প সমাবেশের অধীনস্থ) বিষয়গুলি দ্বাদশ শ্রেণির উপযোগী এবং গভীরতর আলোচনায় ঋদ্ধ করে প্রণয়ন করতে হবে।
কোর সাবজেক্টে একাদশ গণিত, একাদশ বিজ্ঞানে কী থাকবে এবং এদেরকে কোর সাবজেক্ট করা হল কেন? কোর বিষয় হিসেবে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আইসিটি ও বাংলাদেশের ইতিহাস রাখা হয়েছে। একাদশ শ্রেণির বাংলায় (সাবেক উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বাংলা প্রথম পত্র) বাংলা সাহিত্যের রসাস্বাদনের প্রতিনিধিত্ব করে এমন গদ্য, কবিতা ও উপন্যাসিকা রাখতে হবে। আমরা চাই, উচ্চমাধ্যমিক পার হয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার কদর করতে জানবে, সাহিত্য হিসেবে একে পাঠ করতে শিখবে, নিজে লিখে হাত মকশো করবে। বাংলার দ্বাদশ পত্রে থাকবে ভাষার ইতিহাস, ব্যুৎপত্তি ও গঠন, ব্যাকরণ, আখ্যান রচনা ইত্যাদি। যারা বাংলা ভাষাকে আরও গভীরে জানতে চাইবে, তাদের জন্য বাংলা-দ্বাদশ (দ্বিতীয় পত্র), সেইজন্য এটি কোর বিষয় নয়। একইভাবে একাদশ ইংরেজি হবে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজির ব্যবহার, ইংরেজি ব্যাকরণের খুঁটিনাটি, ইংরেজি কমপ্রিহেনশন, ইংরেজিতে মনের ভাব প্রকাশ ইত্যাদি। তবে ইংরেজি-দ্বাদশে আমরা রেখেছি সাহিত্য হিসেবে ইংরেজি ভাষার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, ছোটগল্প, ছোট কবিতা ইত্যাদি। তাই এটি কোর সাব্জেক্ট নয়।
কোর সাবজেক্ট হিসেবে একাদশ বিজ্ঞানে কী থাকবে? আগে আমরা দেখেছি, সাবেক উচ্চমাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান ১ম পত্রে গতির সূত্রাবলি, তাপ, পদার্থের ধর্ম, শব্দ ইত্যাদি থাকত। দ্বিতীয় পত্রে থাকত আলো, চুম্বক ও বিদ্যুৎ। আমরা এই বিন্যাস ভেঙ্গে দিতে চাইঃ

একাদশ গণিতে আমরা হায়ার ম্যাথমেটিক্সের বিষয়াদি রাখতে চাই এবং প্রত্যাশা করি অধিকাংশ উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রছাত্রী এই গণিত অধ্যয়ন করুক। এই গণিত আয়ত্ত করলে তারা ভবিষ্যতের যেকোনো কর্মজীবী শিক্ষায় কিংবা যেকোনো ধরনের গাণিতিক চ্যালেঞ্জ নিতে সিদ্ধহস্ত হবে। তাছাড়া উচ্চমাধ্যমিকের স্তরটি (একাদশ) আগের মতই কিছুটা কঠিন রাখা হয়েছে, যাতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মান ছুঁতে পারা যায়। তবু একরোখা তিন শাখা (বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক) না রেখে এমনভাবে কোর বিষয় ও আনুষঙ্গিক সমাবেশ রাখা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থী ইচ্ছেমত শিখতে পারে। এই সমাবেশ ও কোর পছন্দের বিষয়গুলি নিয়ে আরও কাজ করার আছে। এই আলোচনায় কেবল মূল বিষয়ের নির্যাসটিই রাখা হল।
শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আমরা কী আশা করি? আমাদের আশা, শিক্ষার্থীরা কোর-১ ও কোর-২ থেকে একটা সুষম বা ব্যালান্সড শিক্ষা পাবে। কোর-১ ও সমাবেশ-১ মূলত বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য। এই কম্বোটি বাদ দিলে কোর-২ এর সাথে অন্য তিনটি সমাবেশ থেকে বাণিজ্য বা মানবিকের শিক্ষার্থীরা ভাল শিক্ষা পাবে, বা ভাল প্রস্তুতি নিতে পারবে এবং স্বীয় ক্ষেত্রে চিন্তার চ্যালেঞ্জ নিতে পারবে। সার্বিকভাবে, তারা সাধারণ ঐতিহ্যগত মানবিক বা বাণিজ্য শাখার তুলনায় এই ব্যবস্থায় উন্নতমানের শিক্ষা ও দক্ষতা পাবে। একটি মিশ্র সমাবেশ রাখা হল (সমাবেশ -৫)। সিস্টেমে আমরা সবসময়েই কিছু ব্যতিক্রমী শিক্ষার্থী পাব। তাদের স্বাদের ভিন্নতার জন্য একটু ব্যতিক্রমী একটি ট্র্যাক এখানে থাকল। ট্রায়াল ও এরর বা পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর বোঝা যাবে কোন ধরনের সমাবেশ বেশী উপযোগী, বা জনপ্রিয় অথবা প্র্যাকটিকাল। পূর্বের একরোখা পত্র-ব্যবস্থা (যেমন, যুক্তিবিদ্যা ১ম পত্র ২য় পত্র, মনোবিজ্ঞান ১ম পত্র ২য় পত্র) এটা ভেঙ্গে দিয়ে আমরা একই বিষয়ের মধ্যে বৈচিত্র্য এনেছি যাতে অন্য শিক্ষার্থীরাও অন্যরকম কম্বো ব্যবহার করে শিক্ষায় বৈচিত্র আনতে পারে। মূল যে আশা আমরা রেখেছিলাম, উচ্চমাধ্যমিকের পর শিক্ষার্থীরা দেশে এবং বিদেশে উচ্চ দক্ষতায় ছড়িয়ে পড়বে, এমনকি উচ্চশিক্ষা যাদের লক্ষ্য, তাদের প্রস্তুতিও ভাল হবে, সেই মূল আদর্শ রক্ষিত থাকছে। বলে রাখা ভাল, এই কোর বিষয় ও বিকল্প সমাবেশ নিয়ে কলেজ শিক্ষকদের সাথে বিস্তর আলোচনা করতে হবে। শ্রেণিকক্ষের পরিস্থিতি খুব ভাল ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তবেই না আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি। প্রচুর ভাবনা ও গবেষণার পর আমরা এ-বিষয়টিকে স্ট্রিমলাইন করতে পারি।
১২-ক্লাস সমাপনান্তে একটি সনদ পরীক্ষার আয়োজন বাঞ্ছনীয়। এই সনদ অত্যন্ত জরুরি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য। এটাই তার উচ্চশিক্ষার সোপান হবে, আবার এটাই তার বৃহত্তর জীবনে প্রবেশের চাবিকাঠি হবে। এজন্য নবম-দ্বাদশ এই চার বছরের শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই কারণে এখানে আমরা বিজ্ঞান, মানবিক বা বাণিজ্য শাখা বলে আলাদা কোনো ফ্রেম রাখছি না। শিক্ষার্থী কোর বিষয় ও অতিরিক্ত সমাবেশ থেকে তার পছন্দের বিষয় অধ্যয়ন করুক। তবে একটা সুপ্ত ধারা তবু থেকে যাবে, যাতে কোর কম্পিটেন্সি বলে আমরা একটা কার্যকর কিছুকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচিত এই চার বছরের শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে যথার্থ শিক্ষাদান নিশ্চিত করা। এরজন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম নিয়ে বিশেষ ট্রেনিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত।
স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালে কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। ১৯৭৪ সালে এই কমিশন তাঁদের রিপোর্ট পেশ করেন। সেই রিপোর্টে বিজ্ঞান শিক্ষার উদ্দেশ্য বলতে লেখা হয়েছিল, “বিজ্ঞানের মুখ্য উদ্দেশ্য হল সমাজের উন্নতি সাধন করা”, এবং প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষার শেষ ধাপ পর্যন্ত এই লক্ষ্যে কারিকুলামকে সাজানোর কথা বলা হয়েছিল। সত্যি বলতে কি, এর পর আরো কত শিক্ষা কমিশন বাংলাদেশ পেয়েছে, কিন্তু কুদরাত-ই-খুদা কমিশনের মত জনমুখী শিক্ষা কমিশন আমরা দ্বিতীয়টি পাইনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সরকারের আমলে ও নানা সময়ে বিচিত্র পর্যালোচনা, আইন, কমিশন, রিভিউ কমিটি রিপোর্ট ইত্যাদি নানা নামে নানা ছন্দে বহুরকমের ন্যারেটিভ প্রসব করেছেন। কিন্তু বাংলার শিক্ষার আলো যেই তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। এর মূল কারণ হিসেবে আমরা চিহ্নিত করতে পারি কয়েকটি বিষয় -- ১) কমিটিতে এমন সব মানুষ রাখা দেশীয় শিক্ষা সম্পর্কে তাঁদের কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ বা ধারণা নেই, ২) বিদেশী পরামর্শক রাখা যাঁরা বিদেশী ধাঁচে শিক্ষা সাজিয়েছেন, ৩) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের চিন্তাসমূহকে অবজ্ঞা করা 2 , ৪) শ্রেণিকক্ষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাবান ব্যক্তিদের এবং সেইসব অভিজ্ঞতার সার্বিক অবমূল্যায়ন, ৫) উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া শিক্ষা-দর্শন, ৬) কর্ম বা বৃত্তিমুখী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং সময়োপযোগী শিক্ষা-দর্শনের অভাব, ৭) এক দশক পর বাংলাদেশকে আমরা কোথায় দেখতে চাই -- এ-সংক্রান্ত কোনো ধারণা না-রাখা কিংবা সুস্পষ্ট গবেষণার অভাব, 8) বৈশ্বিক প্রবণতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অভাব কিংবা ভুল পাঠ। ফলে অধিকাংশ শিক্ষা-প্রপঞ্চই স্বখাত সলিলে পতিত হয়েছে।
আমাদের একটি বা একগুচ্ছ সূত্র প্রয়োজন যার প্রয়োগে আমরা একটি যুগোপযোগী শিক্ষা-পথরেখা প্রণয়ন করতে পারব, এবং কিছু সময় বিরতিতে সেটা পুনর্মূল্যায়ন করব। এর জন্য আদর্শ হল এমন একগুচ্ছ দেশপ্রেমিক মানুষ যাঁরা দেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চেনেন, ক্লাসরুম দেখেছেন, তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া যে ভেবে-চিন্তে, আরও দুয়েকটি দেশ (যেমন, ফিনল্যান্ড, কোরিয়া, জাপান, ভারত ইত্যাদি) ভ্রমণ করে, তাদের শিক্ষা নীতি-পথরেখা-সূত্র নিরীক্ষা করে, ক্লাসরুম পর্যবেক্ষণ করে, বিদেশে দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমবাজারের ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে, আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে, অন্য উন্নত দেশের শিক্ষা ও দক্ষতার মানদণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে, আমাদের দেশের শিক্ষার দশা গবেষণা করে, শিক্ষা ও দক্ষতার মানদণ্ডে আমাদের অবস্থান গবেষণা করে তবেই আমাদের জন্য নীতি প্রণয়ন করতে।
এটা এক-দুই দিনের পরিশ্রম কিংবা বিদেশাগত পণ্ডিতদের কাজ নয়। এটা আমদের ভূমিপুত্রকন্যাদের কাজ। আমরাই এটা করতে পারি। পারবও। হয়ত করবও।
তথ্যসূত্র
১/ মাহমুদা ১৯৯৪।। সিদ্দিকা মাহমুদা, “রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা”, সাহিত্য পত্রিকা, ৩৮ বর্ষ, সংখ্যা ১, পৃষ্ঠা ৭৫-৯৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ, ঢাকা। প্রবেশঃ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, URL: https://doi.org/10.62328/sp.v38i1.5; ২/ রাসেল ১৯৫৪।। Bertrand Russell, Mysticism and Logic, UK: Penguin Books.। ৩/ প্রাইস ১৯৬৩।। Kingsley Price, Education and Philosophical Thought, Boston: Allyn and Bacon, Inc. ৪/ বাংলাদেশ শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড ওয়েবসাইট ‘শিক্ষাক্রম,’ প্রবেশঃ ৫/৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, https://nctb.gov.bd/ । ৫/ মোহাম্মদী ২০২৫।। ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, বিজ্ঞান সাক্ষরতা ও চর্চা, ঢাকা; জ্ঞানকোষ প্রকাশনী। ৬/ সেন ২০০৭।। প্রবোধ চন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা, কলকাতাঃ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ।
2. আমাদের শিক্ষানীতিতে আইইআরের বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা কী? - এই প্রশ্নের অনুসন্ধানে গৌতম রায় (সহযোগী অধ্যাপক, আইইআর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) ব্যক্তিগত যোগাযোগে জানিয়েছেনঃ “দেখা যাক, সরকার যাদেরকে শিক্ষানীতি প্রণয়নের দায়িত্ব দেন, তাঁদের মধ্যে আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের উপস্থিতির হার কেমন। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইআর স্থাপিত হয় ১৯৫৯ সালে। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সব কমিশনেই ঢাবি আইইআরের শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ছিলো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইইআর প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০০ সালে। ২০০৩ ও ২০০৯ সালে গঠিত শিক্ষা কমিশন বা কমিটিতে রাবি আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ ছিলো। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইআর বা শিক্ষা অনুষদ চালু হয়েছে ২০১০ সালের পর। সুতরাং, এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের কোনো শিক্ষা কমিশন বা কমিটিতে রাখার সুযোগ ছিলো না। আমি সর্বশেষ বা ২০১০ সালের শিক্ষানীতির সদস্যদের দিয়ে হিসাব শুরু করে সর্বপ্রথম অর্থাৎ ১৯৭৪-এর শিক্ষা কমিশন পর্যন্ত হিসাব তুলে ধরছিঃ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ [মোট সদস্য: ১৮ জন, আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: ১ জন, শতকরা: ৫.৫৬%], জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩ [মোট সদস্য: ২৪ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: নেই। শতকরা: ০%, ১৩টি উপকমিটিতে: মোট সদস্য: ৯৬ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: ১ জন। শতকরা: ১.০৪%, ১২টি উপকমিটিতে আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ কেউ ছিলেন না।], জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি ১৯৯৭ [মোট সদস্য: ৫৬ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: নেই। শতকরা: ০%। ১৯টি উপকমিটিতে: মোট সদস্য: ১১১ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: ৬ জন। শতকরা: ৫.৪১%, ১৬টি উপকমিটিতে আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ কেউ ছিলেন না।], বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন ১৯৮৮ [মোট সদস্য: ২৮ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: নেই। শতকরা: ০%। ১২টি উপকমিটিতে: মোট সদস্য: ১৯০ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: ৬ জন। শতকরা: ৩.১৬%। ৭টি উপকমিটিতে আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ কেউ ছিলেন না।], বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন ১৯৭৪ [মোট সদস্য: ২৩ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: নেই। শতকরা: ০%। ৩০টি উপকমিটিতে: মোট সদস্য: ৩৯০ জন। আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ: ১৭ জন। শতকরা: ৪.৩৬%। ১৯টি উপকমিটিতে আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞ কেউ ছিলেন না।]। উল্লেখ্য, যেসব শিক্ষা কমিশন বা কমিটিতে উপকমিটি রয়েছে, সেগুলো (সম্ভবত) পদাধিকার বলে ঢাবি আইইআরের পরিচালকের নাম একাধিকবার এসেছে। আলাদাভাবে ব্যক্তি হিসাব করলে শতকরা হার আরও কমবে। শিক্ষানীতিতে আইইআরের শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের ভূমিকা কতোটুকু তা হয়তোবা এই উপস্থিতির হারের হিসাব থেকে অনুমান করা যাবে”।