Published : 11 Jul 2026, 03:24 PM
পঞ্চাশের দশক। পূর্ব পাকিস্তান। পুলিশ এসেছে পুরান ঢাকার ৭৯ বেগমবাজারের বাড়িতে। জ্ঞানতাপস বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বলা হলো আপনার ছেলে দেশদ্রোহী। সে কমিউনিস্ট। সে কখনও জেল থেকে ছাড়া পাবে না। তাকে মুচলেকা দিতে বলুন, তার সহযোগী কমিউনিস্টদের নাম বলতে বলুন। তাহলে আপনার ছেলেকে মুক্তি দেয়া হবে। শহীদুল্লাহ বললেন, ‘আমার ছেলে দেশদ্রোহী নয়। সেটা হলে তাকে আমি নিজে হাতে গুলি করতাম। আমার ছেলে দেশপ্রেমিক। সে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে। তাকে আমি নতি স্বীকারের কথা বলতে পারবো না।’
ঘটনাটির উল্লেখ রয়েছে শহীদুল্লাহর পুত্র কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর আত্মস্মৃতিমূলক ‘পলাতক জীবনের বাঁকে বাঁকে’ বইতে।
ব্যক্তি জীবনে প্রবল ধর্মনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কতখানি প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধির মানুষ হলে এমন উত্তর দেয়া সম্ভব। কমরেড তকীয়ূল্লাহ যিনি পঞ্চাশের দশকে এদেশের বামপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সৈনিক ছিলেন, তার স্মৃতিচারণে বারে বারে উল্লেখ করেছেন বাবার কাছ থেকে প্রেরণা ও উৎসাহ পেয়েই তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
শহীদুল্লাহ চিরদিনই ছিলেন এদেশের প্রগতিশীল জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পক্ষে একজন চিন্তাশীল দার্শনিক। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। তাঁর সম্পর্কে অজস্র গল্প, কাহিনি। সেসবের ভিড়ে অনেক সময় হারিয়ে যায় আসল মানুষটির অবদান, তাঁর গভীর মনীষার কথা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম অনেক সময় জানেই না কে ছিলেন তিনি, আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে কী ছিল তাঁর ভূমিকা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দক্ষিণ এশিয়ার একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি এবং বাঙালি জাতির কৃতী সন্তান এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ছিলেন। তিনি ১৮টি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন (এই ভাষাগুলোতে তিনি রীতিমতো পণ্ডিত ছিলেন), ২৭টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন (তার মানে ২৭টি ভাষায় কথা বলতে, পড়তে, লিখতে জানতেন) এবং ৪০টি ভাষা সম্পর্কে তাঁর পড়াশোনা ছিল।
তিনি সংস্কৃত, প্রাচীন পাহ্লবী, আরবী, হিব্রু, খোতনি, তিব্বতি, পালি ইত্যাদি ভাষা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে এবং চর্যাপদ নিয়ে মূল গবেষণা করেছিলেন। তাঁর মতে বাংলাভাষার উৎপত্তি হলো মাগধী প্রাকৃত থেকে বা গৌড়ীয় প্রাকৃত থেকে। বাংলা ভাষা সংস্কৃতের কন্যা নয়, তবে নিকট আত্মীয়।
তিনি মনে করেন বাংলা ভাষার উৎপত্তি কাল সপ্তম শতাব্দি।
তাঁর পাণ্ডিত্যের মূল বিষয় ছিল তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব।

আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত ইত্যাদি তার অমর অবদান। তিনি উর্দু অভিধানও প্রণয়ন করেছেন এবং শ্রীলংকার ভাষার উৎপত্তিও নির্ধারণ করেছেন। তিনি প্রথম বাংলাভাষার ব্যাকরণ প্রণয়ন করেন। তিনি বাংলা বর্ষপঞ্জিও সংস্কার করেছেন।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ ও মধ্যযুগের কবি বিদ্যাপতির ‘বিদ্যাপতি শতক’ সম্পাদনা করেছেন শহীদুল্লাহ। আঞ্চলিক ভাষার অভিধান সম্পাদনা তার একটি বড় কাজ।
তিনি ১৮টি ভাষায় সুপণ্ডিত হলেও গভীরভাবে ভালোবাসতেন বাংলাভাষাকে। বাংলাভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই ছিলেন সোচ্চার।
তিনি ১৯৪৭ সাল থেকেই এ বিষয়ে তীব্র দাবী উত্থাপন করছিলেন বিভিন্ন প্রবন্ধে ও ভাষণে। তিনি বলেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হয়ে উর্দু বা আরবী হলে তা হবে গণহত্যার শামিল। তিনি পাকিস্তান সরকারের সকল প্রকার ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে বাংলা ভাষার পক্ষে তার সংগ্রাম চালিয়ে যান।
বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার এই মহান ভাষা আন্দোলনের রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। দুইশ বছরের ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে বিংশ শতাব্দিতে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম যতই দানা বাঁধছিল ততোই স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা কি হবে সে প্রশ্নটিও উত্থাপিত হচ্ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম সুনিশ্চিত হয়ে যায় তখন থেকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে সে নিয়ে পণ্ডিতমহলে ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে আলাপ আলোচনা চলতে থাকে।
১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বলেন হিন্দি যেমন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবে তেমনি উর্দুকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।
এর দাঁতভাঙা জবাব দেন বাঙালি ভাষাবিদ ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটি বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতি বিরোধী এবং স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতিরও পরিপন্থী। তিনি বলেন, ‘ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ের শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দুভাষার সপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি। ইহা কেবলমাত্র বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ও নীতি বিরোধীই নয়, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি বিগর্হিত বটে।’
১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমরেড পত্রিকায় ল্যাঙ্গুয়েজ প্রবলেম নামে এক প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ হিসেবে অনেক যুক্তি উপস্থাপন করেন। তাঁর এই প্রবন্ধটি ছাত্রজনতার মধ্যে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়।
সেসময়ই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে তিনি বলেন বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষা গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে।’ আরেকটি প্রবন্ধে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে বলেন ‘ইহা জ্যামিতির স্বীকৃত বিষয়ের ন্যয় স্বতঃসিদ্ধ। উন্মাদ ব্যতীত কেহই ইহার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিতে পারে না’।
শহীদুল্লাহ শুধু প্রবন্ধ লিখেই ক্ষান্ত হননি। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে গঠিত সংগঠন তমুদ্দুন মজলিসের তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় সদস্য।
তিনি ভাষাআন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের জন্য ছিলেন প্রধান প্রেরণা। একুশে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের পর তিনি প্রথম কালো ব্যাজ ধারণ করেন। তাঁর দুই পুত্র মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ (আমার বাবা) ও মুর্তজা বশীর দুজনেই ভাষা সৈনিক ছিলেন। কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ ছিলেন ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও কর্মী। আর মুর্তজা বশীর ছিলেন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের(তকীয়ূল্লাহ তখন জেলখানায় রাজবন্দী ছিলেন) অন্যতম প্রধান কর্মী।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একইসঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ এবং ব্যক্তি জীবনে নিষ্ঠাবান ধার্মিক। তিনি বলেছিলেন ‘হিন্দু মুসলমান মিলিত বাঙালি জাতি গড়িয়া তুলিতে বহু অন্তরায় আছে কিন্তু তাহা যে করিতেই হইবে।’ তার আশা ছিল ভবিষ্যতে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান মিলিত বাঙালি জাতি বিশ্বসভায় ফরাসি, জার্মান জাতির মতো আপন সম্মানজনক স্থান অধিকার করবে। ‘আশা কানে কানে গুঞ্জন করিয়া বলে পারিবে’। (বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মিলনীর দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণ, ১৯২৮) ।
আরও বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালীত্বের এমন ছাপ এঁকে দিয়েছেন যে মালা তিলক টিকিতে বা টুপি লুঙ্গি দাঁড়িতে তা ঢাকবার জো -টি নেই’। (পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন,মূল সভাপতির ভাষণ, ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৪৮)
১৯৫০ সালের যখন পাকিস্তান সরকারের মদদে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় তখন তিনি নিজের বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষকে আশ্রয় দেন। শুধু তাই নয়, তিনি চক বাজারের জামে মসজিদে জুম্মার দিন বক্তব্যে বলেন যদি কেউ কোরান শরীফ থেকে প্রমাণ করতে পারে যে, নিরাপরাধ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যার বিধান রয়েছে তাহলে তিনি নিজের নাম পাল্টে ফেলবেন। তিনি তার বাড়িতে আশ্রয় কেন্দ্র খোলার ঘোষণা দিয়ে বলেন পারলে আমাকে প্রতিরোধ কর। তাঁর এই বলিষ্ঠ বক্তব্যের পর চকবাজারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেমে যায়।
ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবেও কিন্তু তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম। জীবনে নামাজ কাজা করতেন না। আমৃত্যু রোজা রেখেছেন। হজ করেছেন। অনেক ধর্মীয় সম্মেলনে বক্তব্য রাখতেন। এখানে তাঁর পারিবারিক পরিচয় একটু দিই।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ঊর্ধতন ১৪তম পুরুষের নাম শেখ দারা মালিক। কেউ বলে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির আমলে আবার কেউ বলে মোগল বাদশাহ শাহজাহানের সময় এক দরবেশ এসেছিলেন আরব থেকে দিল্লিতে। নাম তার আব্বাস মক্কী। সঙ্গে ছিলেন তার শিষ্য দরবেশ শেখ দারা মালিক।
বাংলার অবিভক্ত ২৪ পরগণার দেগঙ্গা, বেড়াচাঁপা, চন্দ্রকেতু রাজার গড়সহ বসিরহাটের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা ইসলাম ধর্ম প্রচারের অনুমতি চান। দরবেশরা যখন শাহী মহলে পৌঁছান তখন নাকি বাদশাহ ভোজনে বসেছিলেন। দরবেশদের আগমন সংবাদ পেয়ে ভোজন কক্ষেই তাদের স্বাগত জানান। তারপর চব্বিশ পরগনার অন্যতম হারোয়া অঞ্চলের বালান্ডা পরগনা লাখেরাজ(করমুক্ত) সম্পত্তি হিসেবে লিখে দেন। বাদশাহ তার আংটি ঝোলের বাটিতে ডুবিয়ে সিলমোহর দেন শাহী ফরমানে। এসবই কতটা মিথ, কতটা ইতিহাস তা বলা কঠিন।
সেই ফরমান নিয়ে দুই দরবেশ চলে আসেন চব্বিশ পরগনার চন্দ্রকেতু রাজার গড় রাজ্যে। স্থানীয় ভাষায় হযরত আব্বাস মক্কীর নাম হয় পীর গোরাচাঁদ। ফরসা রঙকে ওই অঞ্চলে বলা হয় ‘গোরা’। গৌরবর্ণের অপভ্রংশ হলো গোরা শব্দটি।

পীর গোরাচাঁদ ও তার শিষ্য শেখ দারা মালিক বালান্ডা পরগনা অঞ্চলে ধর্ম প্রচার করতে থাকেন।
পীর গোরাচাঁদের মৃত্যুর পর তার সমাধি হয় বিদ্যাধরী নদীর তীরে। মাজার ও খানকা শরীফের দেখভাল করতে থাকেন শেখ দারা মালিক।
শেখ দারা মালিক বসিরহাটের পিয়ারা গ্রামে থিতু হন। শহীদুল্লাহর একজন পূর্ব পুরুষ ছিলেন মুন্সী শেখ গোলাম আবেদ। তিনি লর্ড অকল্যান্ডের মুন্সী ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় এই পরিবারটিতে বিদ্যাচর্চা ছিল। কারণ না হলে মুন্সীর চাকরি পেতেন না। শহীদুল্লার বাবা মুন্সী মফিজুদ্দিনও ছিলেন শিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি আদালতে চাকরি করতেন। মুন্সি মফিজুদ্দিন বাংলা, ইংরেজি, ফার্সি, আরবি, ও উর্দু( উর্দু হিন্দি মিশ্রিত হিন্দুস্থানী ভাষা) জানতেন। শহীদুল্লাহর নাম জন্মের সময় রাখা হয়েছিল শেখ মুহম্মদ ইব্রাহিম(মতান্তরে মুহম্মদ ইব্রাহিম)। কিন্তু তার মা হুরুন্নেসা ছেলের নাম রাখেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সেই নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত হন।
১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই চব্বিশ পরগণার বসিরহাটে তার জন্ম।
শহীদুল্লাহ গ্রামের মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন এবং পরে হাওড়া জেলা স্কুলের ভর্তি হন। তিনি ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে বাংলা, উর্দু, ফারসি ও আরবি শেখেন এবং স্কুলে সংস্কৃত পড়েন। তিনি কলকাতায় হাওড়া জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা(১৯০৪) এবং প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ এ(১৯০৬) পাশ করেন। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে বি এ ডিগ্রির(১৯১০) পর সংস্কৃতে এম এ ক্লাসে ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কিন্তু সেখানে বেদ পড়াতেন অধ্যাপক সত্যব্রত সামশ্রমী। তিনি অব্রাহ্মণকে(তদুপরি মুসলমান) বেদ পড়াতে রাজি হন না। এ নিয়ে তখন প্রচুর বাদ প্রতিবাদ ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিষয়টির সুরাহা করেন। তাঁর নির্দেশে শহীদুল্লাহ তুলনামূলক ভাষাত্ত্ত্ব বিভাগের প্রথম ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই এম এ ডিগ্রি পান(১৯১২)। দুবছর পর তিনি বি.এল (১৯১৪) ডিগ্রিও অর্জন করেন। তিনি বসিরহাট মহকুমায় আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস করেন। কিন্তু আইনপেশা তাঁর ভালো লাগেনি। বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী মরগুবা খাতুন আপত্তি তোলেন। মরগুবা খাতুন বলতেন, আইনপেশায় সত্যমিথ্যা মিশিয়ে কথা বলতে হয়। তিনি স্বামীকে বলেন ‘অত সত্যমিথ্যার ঘোরপ্যাচের চেয়ে শিক্ষকের জীবন অনেক ভালো, টাকা কম থাকলেও ভালো।’ শহীদুল্লাহ তাই ফিরে যান বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের তত্ত্বাবধানে শরৎচন্দ্র লাহিড়ী গবেষণা-সহকারী (১৯১৯-২১) হিসেবে কাজ করেন।
১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। আইন বিভাগেও খণ্ডকালীন অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরাগী। তিনি কাজী নজরুল ইসলামকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম শহীদুল্লাহর বন্ধু ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে শান্তি নিকেতনে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকারের রবীন্দ্র বিরোধিতার প্রবল প্রতিবাদীও ছিলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
তিনি ১৯২৬ সালে ইউরোপে যান। প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ও ডিপ্লোফোন ডিগ্রি পান। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিমদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট। তার গবেষণার বিষয় ছিল চর্যাপদ ও বৌদ্ধ দোহা গান। গবেষণাপত্রের নাম ছিল Buddhist mystic song’। তিনি জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাচ্যভাষা বিষয়ে গবেষণা করেন।
সোরবোনে বাংলাভাষার ধ্বনি সম্পর্কে গবেষণা করেন শহদিুল্লাহ। তাঁর গবেষণাপত্রের নাম ছিল লে শঁদ বঙ্গালী বা বাংলা ভাষার ধ্বনি।
১৯২৮ সালে তিনি দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কাজ চালিয়ে যান। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত ও বাংলাবিভাগ আলাদা হয়ে গেলে তিনি বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হন।
১৯৪৪ সালে অবসর নিয়ে বগুড়ায় আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হন। দেশ বিভাগের পর আবার ফিরে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হন। তিনি ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেও শিক্ষকতা করেছেন।
লোকসাহিত্য সংরক্ষণ ও প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহের কাজেও তিনি ছিলেন আগ্রহী। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত বাংলা একাডেমিতে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়নে কাজ করেন। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রথম চিন্তক।
এবার তাঁর পারিবারিক জীবন বিষয়ে বলি।
শহীদুল্লাহর ছিল ৯ সন্তান। দুই কন্যা এবং সাত পুত্র। আমার বাবা ছিলেন ষষ্ঠ সন্তান। সন্তানদের প্রতি তিনি ছিলেন স্নেহশীল। নিজের ছাত্রদেরও তিনি সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। অনেক দরিদ্র ছাত্রের শিক্ষার ব্যয়ভারও বহন করতেন।

মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয় কর্মী ছিলেন। তার এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোন বিরোধিতা শহীদুল্লাহ করেননি। বরং তকীয়ূল্লাহ যখন জেলে কারাবন্দী তখন পাকিস্তান সরকার তাকে বলে, ‘দেশদ্রোহী পুত্রকে’ রাজনীতি ছাড়তে অনুরোধ জানাতে এবং মুচলেকা দিয়ে তার মুক্তির ব্যবস্থা করতে। জবাবে শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমার ছেলে দেশদ্রোহী নয়। দেশদ্রোহী হলে তাকে আমি নিজের হাতে গুলি করতাম। কিন্তু সে দেশপ্রেমিক। সে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করছে। তাকে আমি অন্যায় অনুরোধ করতে পারবো না।’ এই ঘটনায় তার রাজনৈতিক উদার মনোভাব বোঝা যায়। তিনি তার কনিষ্ঠ সন্তান মুর্তজা বশীরের শিল্প চর্চাকেও উৎসাহিত করেছেন। এমনকি তাঁকে ফ্রান্স থেকে আনা লুভরের ফরাসী শিল্পীদের ছবি সম্বলিত বই উপহার দেন।
শহীদুল্লাহ তাঁর মাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। মা হুরুন্নেসা নিজের গ্রাম ত্যাগ করে সারাজীবন তার এই ছেলের কাছেই ছিলেন।
শহীদুল্লাহ তাঁর স্ত্রী মরগুবা খাতুনকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। বাবার কাছে শুনেছি সংসারে আমার দাদীর মতামতই ছিল প্রধান। ব্যক্তি জীবনে ছিলেন খুব সুরসিক। প্রায়ই বলতেন বই এবং বউ তার সবচেয়ে প্রিয়্। স্ত্রীর প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। নাতি নাতনিদের খুব স্নেহ করতেন।
তাঁর চকবাজারের বাড়িতে ছিল বিশাল লাইব্রেরি। বাড়িতে যতক্ষণ থাকতেন এই ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারেই পাঠে নিমগ্ন থাকতেন। পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে বলা হতো চলন্ত অভিধান। চলিষ্ণু বিদ্যাকল্পদ্রুম। তাঁকে জ্ঞানতাপস অভিধায় ভূষিত করেন তাঁর ছাত্র ও সহকর্মীরা। তিনি অবশ্য নিজের নামকরণ করেছিলেন জ্ঞানানন্দ স্বামী। কারণ জ্ঞানলাভ ছিল তার জীবনের আনন্দের উৎস ও ব্রত।
তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানচর্চা ছিল প্রবাদপ্রতীম। কর্মক্ষমতাও ছিল প্রবল। ১৯৬৮ সালে মস্তিষ্কের রক্ষক্ষরণে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন।
শহীদুল্লাহ তাঁর সমগ্র জীবনে প্রমাণ করেছিলেন নিজ ধর্মে নিষ্ঠাবান হয়েও সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া যায়, জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থেকেও সমাজ সচেতন হওয়া যায় এবং অনেক ভাষায় সুপণ্ডিত হয়েও মাতৃভাষাকে সর্বাধিক ভালোবাসা যায়। তিনি মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিলেন।
১৯৬৯ সালে ১৩ জুলাই ঢাকায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মৃত্যু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কাছে মুসা খান মসজিদ সংলগ্ন প্রাঙ্গণ তার অন্তিম শয্যার স্থান। এর পাশের ছাত্রাবাসটির নামকরণও হয় তাঁর নামে। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাঁর প্রিয় কর্মস্থল, যেখানে ছিলেন তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীরা, যার অদূরে রয়েছে তাঁর মানস প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি এবং যার কাছেই রয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার, সেই প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণেই পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন বাঙালি জাতির এই কৃতী সন্তান।
মুহম্মদ শহীদুল্লাহর অমর উক্তি, মাতা মাতৃভাষা মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার। মাতৃভাষার প্রতি এই প্রবল অনুরাগই তাঁকে অমর করেছে।