বোর্হেসের লেখা তিনটি চিঠি
জেনেভায়, আমি রহস্যজনকভাবে সুখী বোধ করি।
অনুবাদ: আলম খোরশেদ
সম্প্রতি হোর্হে লুইস বোর্হেস বিষয়ক একটি সংকলনের পাণ্ডুলিপি গোছানোর কাজ করতে গিয়ে, মূল ভাষা থেকেই তাঁর গোটা তিনেক চিঠি অনুবাদ করেছিলাম আমার যৎসামান্য স্প্যানিশ ভাষাজ্ঞান কাজে লাগিয়ে। চিঠি তিনটির প্রথমটি তিনি লিখেছিলেন একেবারে যুবাবয়সে, ১৯২১-২২ সালের দিকে, তাঁর তখনকার স্পেনীয় কবিবন্ধু আদ্রিয়ানো দেল বাইয়েকে, যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল তাঁর তৎকালীন উল্ত্রাইজম প্রভাবিত কবিতা ভাবনা। দ্বিতীয় চিঠিটি বিস্ময়কর হলেও সত্য, একটি নির্ভেজাল প্রেমের চিঠি, যেটি তিনি লিখেছিলেন, তাঁর প্রায় মাঝবয়সে, তখনকার আর্হেন্তিনার একজন সম্ভাবনাময় ও সপ্রতিভ সাহিত্যকর্মী এস্তেলা কান্তোকে। বোর্হেস একপর্যায়ে তাঁকে এমনকি বিয়েও করতে চেয়েছিলেন, যদিও এস্তেলা তাতে সায় দেননি। শেষ চিঠিটি তিনি লেখেন মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ১৯৮৬ সালের ৬ মে তারিখে, বুয়েনোস আইরেসের প্রখ্যাত নিউজ এজেন্সি Efe বরাবর, যেখানে তিনি অনুনয় করেছিলেন, আর্হেন্তিনার সাংবাদিকেরা যেন তাঁকে একটু শান্তিতে, একা একা থাকতে দেন তাঁর প্রিয় জেনেভা শহরে।
আজ ২৪শে আগস্ট, বোর্হেসের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর দিনে সেই তিনটি চিঠি বোর্হেসানুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম এখানে।
পত্র এক.
প্রিয় বন্ধু,
আমি কী আনন্দই না অনুভব করছি তোমার খবরাখবর এবং দারুণ কবিতাটি পেয়ে, যা তুমি আমাকে উৎসর্গ করেছ এবং মনে করে পাঠিয়েও দিয়েছ, আমাকে যা ভীষণ আপ্লুত করেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি Grecia ও Refloctor*-এ প্রকাশিত তোমার সর্বশেষ কবিতার প্রদর্শিত পথই অনুসরণ করছ: এটিই সৃষ্টিবাদ, গঙ্গোরা ও রুবেনের যৌক্তিক পরিণতি, যদিও তাঁরা যে কবিতা নির্মাণ করেছেন, সেখানে এমন অনেক শব্দ রয়েছে যাতে সৃষ্টিবাদী মূল্যমান নেই, অথচ তোমার কবিতায় রয়েছে অনেক বেশি বুদ্ধির ঝিলিক, সাংগীতিকতা এবং চিত্রকল্প অনুসন্ধানের দৃশ্যমান আনন্দ, প্রতিটি শব্দের বিস্ময়।
আমি সদ্য পাতাগোনিয়ার চুবুট থেকে ফিরেছি, যেখানকার পর্বতমালা ও অন্তহীন বালুময় বেলাভূমি এবং প্রায় সামান্যতম গাছপালারও সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির মধ্যে এক মাসের গ্রীষ্মাবকাশ কাটিয়ে। এ সপ্তাহে আমরা Prisma পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ করব, আর তাতে উল্ত্রাবাদের রমরমা ঘটবে:** বুয়েনোস আইরেস একাডেমিতে একটি বক্তৃতাসভা, সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকাসমূহের নিন্দামন্দ, এখানকার, চিলের ও পূর্ব প্রজাতন্ত্রের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা, আর আমাদের সম্পাদকীয় পরিষদের দশ যুবকের অফুরন্ত উৎসাহ।***
নোরা ও আমার পরিবারের বাকি সবাই ভালো আছে, কেবল বাবা ছাড়া, যিনি প্রায় অন্ধত্বের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। সম্ভবত সেপ্টেম্বরে আমরা ইউরোপ যাব এবং সেখানে তাঁর চোখের অপারেশন হবে।
আমরা তোমার আসন্ন বিয়ে উপলক্ষ্যে তোমাকে উষ্ণ অভিবাদন জানাই।
তোমার কবিতাসমেত Prisma সংখ্যাটি প্রকাশ পাওয়া মাত্রই আমি তোমাকে পাঠাব। মোসকেরা ও রোহেলিও বুয়েন্দিয়াকে আমার শুভেচ্ছা জানিও, যাঁদের সহযোগিতার তারিফ করি আমি সবসময় এবং যাঁরাও খুব দ্রুতই বুয়েনোস আইরেসের দেয়ালে আবির্ভূত হবেন।
লেখা বন্ধ কোরো না। আমরা সবাই তোমাকে আমাদের ভালোবাসা জানাচ্ছি।
অলিঙ্গনান্তে,
হোর্হে-লুইস বোর্হেস
* Riflector সাময়িকীটি প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসে এবং সেটি সেবিয়ার Grecia সাময়িকীর স্থলাভিষিক্ত হয়।
** সুরেদাকে লেখা এক চিঠিতে (বুয়েনোস আইরেস, জুন, ১৯২২) বোর্হেস লেখেন যে, তাঁরা Prisma-এর দুটো সংখ্যা নিয়ে গিয়েছিলেন লিওপোল্দো লুগোনেসের জন্য, যিনি দেয়ালপত্রিকার ভাবনাটির খুব প্রশংসা করেছিলেন, এবং তোমার কবিতা আঙ্গুস্তিয়া, আমার আলদিয়া এবং গার্ফিয়াস ও আদ্রিয়ানের কবিতাগুলো খুব পছন্দ করেছিলেন। (হোর্হে লুইস বোর্হেস, কার্তাস দে হোবেনতুদ, পৃষ্ঠা ৭৫)
*** পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন হুয়ান গনসালেস লানুসা, ফ্রান্সিসকো পিনিয়েরো, নোরা লাঙ্গ ও বোরহেসের তুতুভ্রাতা গিয়েরমো হুয়ান।
পত্র দুই.
প্রিয় এস্তেলা,
আমি জানি না বুয়েনোস আইরেসের কী হয়েছে। সে আর কিছুই করে না, কেবল তোমার দিকে অনিঃশেষ ইঙ্গিত করা ছাড়া। কররিয়েন্তেস, লাবাইয়ে, সান তেলমো, এইসব সাবওয়ের প্রবেশমুখসমূহ (যেখানে, আমি আশায় আছি, কোনো এক বিকেলে তোমার জন্য অপেক্ষা করব বলে; যেখানে, আমি তোমাকে ভয়ে ভয়ে বলব, যে আমি আশায় আশায় অপেক্ষা করে আছি তোমার জন্য অপেক্ষা করব বলে) বিশেষ অনুরাগের সঙ্গে তোমার কথাই মনে করিয়ে দেয়। Contrapunto পত্রিকায় আমার ‘মৃত্যু ও কম্পাস’ গল্পটি নিয়ে সাবাতো একটি অত্যন্ত উদার ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলোচনা ছেপেছেন, যে গল্পটি তুমি একদা পছন্দ করেছিলে। তিনি এর শিরোনাম দিয়েছেন: ‘উপন্যাসের জ্যামিতিকরণ’। আমার মনে হয় তিনি ঠিক করেননি। তুমি কী লিখছ, কী পরিকল্পনা করছ, এস্তেলা?
অনুরাগসহ,
অধৈর্য
জর্জি
পত্র তিন.
জেনেভা
৬ মে ১৯৮৬
এজেন্সি এফ এর প্রিয় বন্ধুরা,
আমি আপনাদেরকে এই পংক্তি ক’খানা পাঠাচ্ছি যেন আপনারা আপনাদের ইচ্ছামতো কোথাও প্রকাশ করতে পারেন। আমি এটা করছি, যাতে করে আমি চিরদিনের মতো আমার ওপর সাংবাদিকবৃন্দের কৌতূহল ও প্রশ্নবাণের আগ্রাসনের সমাপ্তি টানতে পারি। আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি।
আমি একজন স্বাধীন মানুষ। আমি জেনেভায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কেননা জেনেভা আমার জীবনের সবচেয়ে সুখী বছরগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। আমার কাছে বুয়েনোস আইরেস এখনও তার গিটার, মিলোঙ্গা, জলাধার ও চত্বরসমূহ নিয়ে সমুপস্থিত। এসবের কোনো কিছুই আর অস্তিত্বশীল নয় এখন। এটি এখন অন্য বিখ্যাত শহরগুলোরই একটি মাত্র। জেনেভায়, আমি রহস্যজনকভাবে সুখী বোধ করি। তার সঙ্গে আমার পূর্বপুরুষদের প্রতি ভক্তি কিংবা পিতৃভূমির জন্য অনিবার্য ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার কাছে অদ্ভুত লাগে, যখন কেউ, একজন মানুষের এই সিদ্ধান্তকে বুঝতে ও তাকে শ্রদ্ধা করতে অপারগ, যে কি-না অদৃশ্য থাকতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক ওয়েল্সীয় চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
যথাযথ এবং পরিপূর্ণ শ্রদ্ধাসহ আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি আমি,
হোর্হে লুইস বোর্হেস
