Published : 07 May 2026, 11:17 PM
আস্তিক-নাস্তিকের মতো স্থূল দ্বিভাজন পৃথিবীতে আজও সত্য। জনপ্রিয় এবং মীমাংসাহীন। তবে একথাও সত্য, তারা নির্ভেজাল দুটি পক্ষ কিনা সে প্রশ্নটাও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। পক্ষ মানে আবার ডানাও যেহেতু। যেমন বাদুড়ের ডানা। পতঙ্গ বা পাখির দুটি ডানা যে পরস্পরের শত্রু সে কথা কোনো বালককেও বিশ্বাস করানো কঠিন।
কিন্তু নাইন ইলেভেনের পর, দ্বিপাক্ষিক খেলা খুব জমে ওঠে সারা বিশ্বে। যে কোনো ইস্যুতে দুই পক্ষ, আরও খোলাখুলি বললে, শত্রুপক্ষ এবং মিত্রপক্ষ বানিয়ে ফেলার চেষ্টাটা আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে মিশে গিয়েছে। অনেকে আবার তৃতীয় পক্ষ, নিরপেক্ষ এইসব ভাবের তাবে আলাদা একটা স্পেসের জন্য আওয়াজও তুলেছেন বেশ জোরেসোরে। আমরা কিন্তু আলাদা কোনো স্পেস চাইছি না। বলছি, স্পেস তো আছেই। দুপক্ষের মধ্যে যে একপক্ষতার চোরাগলি, তা থেকে বেরিয়ে যাবারই চেষ্টা করছি আমরা।
এজন্য আস্তিক কবি রবীন্দ্রনাথের কমপঠিত একটি কবিতাকে আজ সামনে নিয়ে আসা যাক। ঠাকুরকে আস্তিক কবি মানতে কারো অসুবিধা হবার কথা নয়। যদিও তিনি নিজে বলছেন : ‘আমি কোনো দেবতা সৃষ্টি করে প্রার্থনা করতে পারি নে, নিজের কাছ থেকে নিজের যে মুক্তি সেই দুর্লভ মুক্তির জন্য চেষ্টা করি। সে চেষ্টা প্রত্যহ করতে হয়, না হলে আবিল হয়ে ওঠে দিন [মৈত্রেয়ী দেবীকে লেখা চিঠি। উৎস : এ আমির আবরণ/ শঙ্খ ঘোষ]।’ আরও বলছেন : আমার মধ্যে এমন আমি আছে যে আমার চেয়ে ঢের বড়ো, আমার মধ্যে তাকে কুলাবে কী করে [অজিতকুমারকে লেখা চিঠি। উৎস পূর্বোক্ত]?’
দেবতাহীন এই পূজারি বা আমি-র উপাসক এই কবি যে দেবতাপূজারির সমালোচনা করবেন তা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সমালোচনাটা কী? কবিতাটা একবার পড়া যাক :
ধর্মমোহ
ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায়ে বিধাতার বর,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।
শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,
শাস্ত্রে মানে না, মানে মানুষের ভালো।
বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে,
নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,
পিতার নামেতে হানে তাঁর সন্তানে,
আচার লইয়া বিচার নাহিকো জানে,
পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা,—
দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা।
অনেক যুগের লজ্জা ও লাঞ্ছনা,
বর্বরতার বিকারবিড়ম্বনা
ধর্মের মাঝে আশ্রয় দিল যারা
আবর্জনায় রচে তারা নিজ কারা।—
প্রলয়ের ওই শুনি শৃঙ্গধ্বনি,
মহাকাল আসে লয়ে সম্মার্জনী।
যে দেবে মুক্তি তারে খুঁটিরূপে গাড়া,
যে মিলাবে তারে করিল ভেদের খাঁড়া,
যে আনিবে প্রেম অমৃত-উৎস হতে
তারি নামে ধরা ভাসায় বিষের স্রোতে,
তরী ফুঁটা করি পার হতে গিয়ে ডোবে—
তবু এরা কারে অপবাদ দেয় ক্ষোভে।
হে ধর্মরাজ, ধর্মবিকার নাশি
ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি।
যে পূজার বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে
ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে—
ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।
পরিশেষ কাব্যের কবিতা এটি। ১৯২৬ সালের বৈশাখ মাসের শেষ দিনে রেলপথে যেতে যেতে লেখা। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত এই লেখা শিল্পরস আস্বাদনের জন্য খুব উপভোগ্য নয়। কিন্তু জীবনের ইউটিলিটি ও পলিটিক্যাল ক্যালামিটি পর্যালোচনার জন্য বেশ উপাদেয়।
খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রায়-অসফল অবসানের পর যখন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অনৈক্যের দেয়াল ধীরে ধীরে মজবুত হয়ে উঠছে, রাষ্ট্রিক দাবি-দাওয়ায় ধর্মের নোক্তা যখন নিক্তিতে পরিণত হচ্ছে, সেই উপদ্রুত উপক্রমণিকায় এই কবিতা দুই পক্ষের বোঝাপড়া বা রেষারেষি ফয়সালা করবার জন্যই এ কবিতা—আপাতদৃষ্টে এমনটা মনে হলেও তা নয় প্রকৃতপক্ষে। বরং এর আবেদন আরও গভীরে, একেবারে মূলের কাছে। অর্থাৎ মামলাটা মানুষের ধর্মবোধের।
২
মানুষের ধর্মবোধের প্রকাশ আমরা দেখি দুটি ধারায় : ধর্মপনা ও ধর্মমনায়। প্রথমটা জাহিরি, দ্বিতীয়টা বাতেনি। প্রথমটায় আমরা ধার্মিককে দেখতে পাই বিশেষ মতাদর্শের এজেন্টরূপে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, ধার্মিককে আমরা দেখি না, দেখি তার কাজ, যাতে জড়িয়ে থাকে আদর্শের এসেন্স।
ধর্মপনা জিনিসটা কী, তা উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করা যাক। কবিতায় বলা হচ্ছে : পিতার নামেতে হানে তাঁর সন্তানে, / আচার লইয়া বিচার নাহিকো জানে, / পূজাগৃহে তোলে রক্তমাখানো ধ্বজা,— / দেবতার নামে এ যে শয়তান ভজা।
২৩ অক্টোবর ২০২৫-এ এক দৈনিক পত্রিকায় একটা মর্মঘাতী সংবাদ প্রকাশিত হয়—‘তোমার রব কে?’ প্রশ্নের উত্তর না পারায় দাদির শিরশ্ছেদ—এই শিরোনামে।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা ও সলঙ্গা থানার রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চকবরুভেংড়ী গ্রামে ঘটনাটি ঘটে। দাদি মোছা. সন্দেশ বেগমের বয়স পঁচাশি। নাতি সজিব আলী মোল্লার বয়স বাইশ। বিবরণে প্রকাশ : রাত সাড়ে ১২টার দিকে সজিব গরু জবাই করার ধারালো ছুরি হাতে দাদির কক্ষে প্রবেশ করে। এরপর তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জানতে চায়, ‘তোমার রব কে’। সন্দেশ বেগম এর উত্তর দিতে না পারায় ক্ষুব্ধ হয়ে সে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘তাহলে তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না’। এরপর হাতে থাকা ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে দেহ থেকে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এই হত্যার আগে ও পরের ছবি তুলে একাধিক ব্যক্তির ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে সজিব লিখেছে : ‘দেখ আমি পারি কি না দেখিয়ে দিলাম’। এ বিষয়ে পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, সজিব তার ফেসবুক আইডিতে ‘আল্লাহু আকবার’ লিখে একটি স্ট্যাটাস দেয়। কিছুক্ষণ পর আবারও সে লেখে, ‘ইনশাআল্লাহ একটাও ছাড় পাবে না’।
প্রসঙ্গত আমাদের মনে পড়ে যাবে, ‘বিসর্জন’ নাটকের রাজা গোবিন্দ্যমাণিক্যের সংলাপ : ‘তবে আর নক্ষত্রের/ নাই দোষ। জানিয়াছি, দেবতার নামে/ মনুষ্যত্ব হারায় মানুষ।’ রাজার ছোট ভাই নক্ষত্র রায় তাকে হত্যা করার শপথ নিয়েছিল দেবীর আজ্ঞা সত্য ভেবে।
শেষ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই, রাজা কোনোরকম প্রতিরোধ বা প্রতিশোধের ব্যবস্থা না নিয়ে নিজেই দেবীর চরণে রক্তজবা ফুল এনে দেয় রক্তের বদলে। এখানেই ধর্মপনা ঘুচিয়ে ধর্মমনার উন্মেষ। দেবমূর্তি উৎখাত না করে বরং দেবত্বের স্বরূপ পাল্টে দেয়া। অর্থাৎ মূর্তি বা কাঠামোর ভিতরে ভিন্নতর এক অমূর্ত অরূপ আদর্শের প্রতিষ্ঠা। ফিরে আসি কবিতার শেষ কটি লাইনে :
হে ধর্মরাজ, ধর্মবিকার নাশি
ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি।
যে পূজার বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে
ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে—
ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।
কবিতা রচনার প্রায় একশ বছর পর, এই ২০২৬ সালে এর প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণের জন্য ভূরি ভূরি উদাহরণ হাজির করা যেতেই পারে। অজস্র মাজার-ধ্বংস, কবর থেকে উঠিয়ে লাশ-পোড়ানো, জীবন্ত মানুষের ঝুলন্ত দেহ ঘিরে বহ্ন্যুৎসব—এমন নৃশংসতার দগদগে স্মৃতি আর জাগিয়ে তুলতে চাই না। বরং আমরা একটা তর্কে প্রবেশ করতে চাই। এই যে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো’, তবে কি এই জ্ঞানালোক ধর্মালোকের ঊর্ধ্বে? এ আবার আফ্রো-এশীয় খড়ের ঘরে আগুন লাগানো এনলাইটেনমেন্টের ধোঁয়া নয়তো? তা যে নয়, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় বছর দশেক পরে লেখা ‘কালান্তর’ প্রবন্ধে ঔপনিবেশিকতার সমালোচনা করতে গিয়ে যখন তিনি বলেন, ‘ক্রমে ক্রমে দেখা গেল য়ুরোপের বাইরে অনাত্মীয়মণ্ডলে য়ুরোপীয় সভ্যতার মশালটি আলো দেখাবার জন্যে নয়, আগুন লাগাবার জন্যে।’
৩
স্কুলবয়সে কোরানের দুটি আয়াত পড়ে বেশ ভাবনার মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম। আয়াত-দুটি উল্লেখ করছি :
• ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।’ (আর রুম : ২২)
• ‘নিশ্চয়ই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টিতে এবং দিন ও রাতের পরিবর্তনে জ্ঞানবানদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (আল ইমরান : ১৯০)
বিভিন্ন অনুবাদে ‘জ্ঞানী’ বা ‘জ্ঞানবান’ কথাটার জায়গায় এসেছে ‘বিবেকবান’ ‘বোধসম্পন্ন’ ‘চিন্তাশীল’ ইত্যাদি শব্দান্তর। আরবি ‘আল-বাব’ এবং ‘আলিম’ শব্দদুটিকে ‘মুক্তমনা’ বা ‘বুঝদার’ হিশেবেও অনুবাদ করা যেতে পারে। ঘুরে ফিরে সব ঐ ‘জ্ঞানী’ শব্দটার পাশে এসেই দাঁড়ায়।
প্রশ্ন হলো, জ্ঞানী সত্তাটা কি ইমানের শর্তাধীন, নাকি ইমান ব্যাপারটাই জ্ঞানীর বিবেচনাধীন। প্রশ্নটাকে অন্যভাবেও তোলা যায় : জ্ঞান কি যুক্তি, বিশ্বাস, মতাদর্শ ইত্যাদিকে আঁকড়ে ধরার বা নাকচ করার শক্তি-সক্ষমতা নাকি সেসবের দ্বারা বশীভূত বা অভিভূত হয়ে থাকার ভক্তি-বিমূঢ়তা? আয়াতদুটির দিকে লক্ষ করলে সহজেই অনুমান করা যায়, এখানে জ্ঞানী মানে নতুন প্রস্তাব ও পরিস্থিতি পর্যালোচনায় পারঙ্গম ব্যক্তি।
সেক্ষেত্রে গুরুতর আরেকটি প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। তা হলো, এই পারঙ্গমতাকে কিভাবে আমরা শনাক্ত করি? হাজার বছর আগে যে মানুষটিকে জ্ঞানী বলে ঠাউরেছিল তার সমাজ, আজকে তার সব কথা সব চিন্তা কি গ্রহণযোগ্য বা সমাদৃত? আমরা তো স্পষ্টতই দেখি, তিনি অনেক কুসংস্কার বা ভুল বিশ্বাসেরও পাবন্দ সেবক ছিলেন। সমাজের কিছু নিষ্ঠুর প্রথার প্রতিও যথেষ্ট আনুগত্য ছিল তার। কথাটা বলছি গ্রিক ও ভারতীয় জ্ঞানতাপসদের নাম স্মরণ ক’রে। তবে গভীর অভিনিবেশসহ বিচার করলে আমরা বুঝতে পারব, প্রতিটি সমাজে এবং প্রতিটি কালে যে আচার ও বিশ্বাসের দিকে তারা হেলে ছিলেন, তা ছিল অপেক্ষাকৃত কম নিষ্ঠুর ও অধিকতর গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।
কারণ তারা ‘শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,/ শাস্ত্রে মানে না, মানে মানুষের ভালো।’
মানুষের ভালো আসলে কী বা কিসে? আপাতদৃষ্টে কথাটা লিবারেল হিউম্যানিস্টের জবানে জুতসই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে পশ্চিমা সে খোপে পুরোপুরি ঢুকিয়ে ফেলা যে যায় না, তা একটু পরেই দেখতে পাব। প্রকৃতপক্ষে, এসব হচ্ছে অতিনশ্বর শাশ্বত জিজ্ঞাসা। মানে যে জিজ্ঞাসা বারবার উচ্চারিত হয়, কিন্তু জবাব পাল্টায় যুগে যুগে। ভালোর সংজ্ঞা বদলে বদলে যায়। কিন্তু সেই ভালোর জন্য আকাঙ্ক্ষা টিকে থাকে সর্বদাই। জীবনানন্দ যেমন বলেন: ‘মানুষ কাউকে চায়—তার সেই নিহত উজ্জ্বল/ ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল।’ অর্থাৎ মানুষ কাকে চায় সেটি বড় কথা নয়, কাউকে যে চায়, এটাই চিরসত্য। চিরসত্য কথাটাও আবার ভীষণ গোলমেলে।
এই সত্যের সুলুক সন্ধানে নেমে ‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন : ‘যে মানুষ আপনার আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে ও অন্যের আত্মার মধ্যে আপনার আত্মাকে জানে সেই জানে সত্যকে।’
এই আত্মা সম্পর্কে গৌতমীয় (অনাত্মবাদ) তর্কে লিপ্ত না হয়ে একে বরং ‘সত্তা’ হিশেবে ধরে নেয়া যাক। নিজের জীবনে অন্যকে এবং অন্যের জীবনে নিজেকে স্থাপন করার প্রস্তাবটা সমাজে যে অপরায়নের তৎপরতা বিরাজমান তাকে খারিজ করার একটা নিবিড় উদ্যোগ। অপরায়ন অনেকখানিই ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর ক্ষমতা আধুনিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠেরই বাসনার রূপান্তর মাত্র। তাদেরই বাসনার বিষবাষ্পে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলি অপরায়নের শিকার হতে থাকে। সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায়টি হলো অনীশ্বর বা নাস্তিক। ঠাকুর বলছেন, ‘নাস্তিক সেও পায়ে বিধাতার বর’, কেননা ‘ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর’। অর্থাৎ তার মধ্যে ধর্মপনা সেই, বরং সে-ই ধর্মমনা। প্রথানুগত্যের বাইরে তার অবস্থান। সেই পারে নতুনকে বরণ করতে। এমনকি নতুনের প্রস্তাবনা আনতে।
এভাবেই ইমান ও ইলম, আস্তিক ও নাস্তিক একটা নির্দিষ্ট কালপরিসরে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়ে। তখন এই দ্বৈততাকে বিপরীত যুগল আর বলা চলে না। কথাটা আরেকটু বিশদ করা দরকার।
৪
‘মানুষ ভাবতে ভালোবাসে, কোনো এক কালে তার শ্রেষ্ঠতার আদর্শ পূর্বেই বিষয়ীকৃত। তাই প্রায় সকলজাতীয় মানুষের পুরাণে দেখা যায় সত্যযুগের কল্পনা অতীতকালে। সে মনে করে, যে আদর্শের উপলব্ধি অসম্পূর্ণ কোনো-এক দূরকালে তা পরিপূর্ণ অখণ্ড বিশুদ্ধ আকারে। সেই পুরাণের বৃত্তান্তে মানুষের এই আকাঙ্খাটি প্রকাশ পায় যে, অনাদিতে যা প্রতিষ্ঠিত অসীমে তাই প্রমাণিত হতে থাকবে। যে গানটি পূর্বেই সম্পূর্ণ রচিত গাওয়ার দ্বারাই সেটা ক্রমশ প্রকাশমান, এও তেমনি। মনুষ্যত্বের আদর্শ এক কোটিতে সমাপ্ত, আর-এক কোটিতে উপলভ্যমান। এখনকার দিনে মানুষ অতীতকালে সত্যযুগকে মানে না, তবু তার সকলপ্রকার শ্রেয়োনুষ্ঠানের মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকে অনাগতকালে সত্যযুগের প্রত্যাশা। কোনো ব্যক্তি নাস্তিক হতে পারে কিন্তু সেই নাস্তিক যাকে সত্য ব'লে জানে দূরদেশে ভাবীকালে সেও তাকে সার্থক করবার জন্যে প্রাণ দিতে পারে, এমন দৃষ্টান্তের অভাব নেই। অগোচর ভবিষ্যতেই নিজেকে সত্যতররূপে অনুভব করে বলেই তার প্রত্যক্ষ বর্তমানকে বিসর্জন দেওয়া সে ক্ষতি মনে করে না।...পূর্ণ পুরুষের অধিকাংশ এখনো আছে অব্যক্ত। তাঁকেই ব্যক্ত করবার প্রত্যাশা নিয়ত চলেছে ভবিষ্যতের দিকে। পূর্ণপুরুষ আগন্তুক। তাঁর রথ ধাবমান, কিন্তু তিনি এখনো এসে পৌঁছন নি। বরযাত্রীরা আসছে, যুগের পর যুগ অপেক্ষা করছে, বরের বাজনা আসছে দূর থেকে। তাঁকে এগিয়ে নিয়ে আসবার জন্যে দূতেরা চলেছে দুর্গম পথে। এই-যে অনিশ্চিত আগামীর দিকে মানুষের এত প্রাণপণ আগ্রহ—এই-যে অনিশ্চিতের মধ্যে, অনাগতের মধ্যে তার চিরনিশ্চিতের সন্ধান অক্লান্ত—তারই সংকটসংকুল পথে মানুষ বারবার বাধা পেয়ে ব্যর্থ হয়েও যাত্রা বন্ধ করতে পারলে না। এই অধ্যবসায়কে বলা যেতে পারত পাগলামি, কিন্তু মানুষ তাকেই বলেছে মহত্ত্ব।’
‘মানুষের ধর্ম’ প্রবন্ধ থেকে একটা বড় অংশই তুলে ধরলাম। এর ভাষান্তর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। পাশাপাশি স্মরণ করা যাক জীবনদাশের ‘সুচেতনা’কে : সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে—এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;/ সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ;/ এ বাতাস কী পরম সূর্যকরোজ্জ্বল;—/ প্রায় তত দূর ভালো মানবসমাজ/ আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে/ গড়ে দেব আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।
এই যে শ্রেয়ের আকাঙ্ক্ষা বা সুচেতনার আবাহন—এইখানে এসে সবাই মিলে যায়, একাকার হয়ে পড়ে। সেই একীভূত মানবসত্তাই প্রকৃতপক্ষে একটি আদর্শ রাষ্ট্রের নিয়ামক। জীবনানন্দের আবেদনটা মনীষীর কাছে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় : ‘শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো’। শ্রদ্ধাটা কার প্রতি? বিশেষ কোনো মতাদর্শ বা মতাদর্শীর প্রতি নয়। নিজের অন্তরে উদ্বোধিত শ্রেয়োবোধের প্রতি : তোমার জ্যোতিষ্ক তারে/ যে পথ দেখায়/ সে যে তার অন্তরের পথ,/ সে যে চিরস্বচ্ছ,/ সহজ বিশ্বাসে সে যে/ করে তারে চিরসমুজ্জল।/ বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,/ এই নিয়ে তাহার গৌরব।
বলছেন, ‘বাহিরে কুটিল হোক’, সেই কুটিলতা কী? এই কুটিলতাকেই শাস্ত্রীয় পরিভাষায় বলতে পারি ‘ডিসকোর্স’।
আমরা তর্কটা শুরু করেছিলাম ‘জ্ঞানী’ কে, কিভাবে তাকে শনাক্ত করব—এই প্রশ্ন তুলে। এ পর্যায়ে এসে আমরা মূলত জ্ঞান-ক্ষমতা-নৈতিকতা—এই ত্রিমুখী লড়াইয়ের মাঝখানে অথবা ত্রিভুজ প্রেমের ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়েছি।
‘দি আর্কিওলজি অব নলেজ’ এবং ‘ফিলোসফিকাল ডিসকোর্স অব মডার্নিটি’ গ্রন্থের প্রণেতা ফুকো ও হাবারমাসকে এখানে আমরা টেনে আনতেই পারি। কিন্তু সেদিকে যাচ্ছি না। ধুন্ধুমার তর্ক তুলে চারদিক ধুলায় অন্ধকার না করে আমরা বরং দাদাঠাকুরের শরণাপন্ন হই: ‘ভয় নেই পঞ্চক। অচলায়তনে আর সেই শান্তি দেখতে পাবে না। তার দ্বার ফুটো করে দিয়ে আমি তার মধ্যেই লড়াইয়ের ঝোড়ো হাওয়া এনে দিয়েছি। নিজের নাসাগ্রভাগের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে থাকবার দিন এখন চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দিয়েছি’ (অচলায়তন)।
সংক্ষেপে ব্যাপারখানা খোলাসা করা যাক। নতুন জ্ঞান পুরনো ধ্যান-ধারণাকে যদিবা নাকচ করে, সেই জ্ঞান নতুন একটা ক্ষমতাকাঠামো তৈরি ক’রে তা দিয়ে ফের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। ‘নতুন যুগের ভোরে’ সেই নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরোতে গেলে ভেঙে ফেলতে হয় বিরাজমান ক্ষমতাকাঠামো। আর তা ভাঙতে লাগে বহুজনগ্রাহ্য ভিন্ন এক নৈতিকতার ভিত্তি। সেই নৈতিকতা রচিত হয় নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় পাল্টে যাওয়া পরিস্থিতির চাপে। এটা চক্রের মতো ঘুরতেই থাকে। এ হলো ‘নিরন্তর অনন্ত রূপান্তর-ধারা’, মানে অব্যাহত এক প্রক্রিয়া, যে কারণে দাদাঠাকুর বলছেন—‘অচলায়তনে আর সেই শান্তি দেখতে পাবে না’।
কাজেই রবীন্দ্রনাথের ‘জ্ঞানের আলোক’ সূর্যালোকের মতো স্থির-নির্দিষ্ট কোনো বিষয় নয়। নয় ধর্মীয় অনুশাসনের বিপরীতে বিজ্ঞান বা যুক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা। এ হলো ‘শাস্ত্রবাক্যে বাঁধা’ নিশ্চলতার বুকে চপলতাসঞ্চারী সুরের আঘাত। স্থবিরকের রক্তের সঙ্গে শোণপাংশুর রক্ত মিলিয়ে দেয়ার যুদ্ধ।