Published : 31 Oct 2025, 03:21 PM
বিলীয়মানতার গান
আমি থাকবো না, চামেলীও চলে যাবে বাতাসে কর্পুর,
গন্ধ ছিল কিনা এ প্রশ্নে লোকেরা মাতুক
সে মাতমও থাকবে না কিছুকাল পর
লোকেরা সমস্ত ভোলে, সত্য থাকে
প্রত্যেহের প্রভাতের থলি
ইলিশে ভরাতে যায় দিন
কোমলগন্ধার অজস্র চাঁদমুখ আকাশের ছবি হয়ে যায়।
আমি থাকবো না, চামেলীও মিশে যাবে মাটিতে পটাশ
কিছু ঘটেছিল কিনা, এ মীমাংসায় আগ্রহ কার?
সে ফিসফিস মিলিয়ে যাবে কিছুকাল গুনগুন শেষে
লোকেরা সমস্ত ভোলে, সত্য থাকে
দিবসের সকল সজ্জায়
রাত্রির নীরব বজরায়
অনন্তপারের যাত্রী মুহূর্তের কড়ি হাতে সঙ্গোপনে ধায় ।
কৈবল্যধাম থেকে বিষাদসিন্ধুর
সেই তো আলো, তুমি নিয়ে গেলে দূরে
মুখশ্রী অপরূপ, তারপর অন্ধকার, তারপর দূরতর পথ
কৈবল্যধাম থেকে বিষাদসিন্ধুর রেখায়িত জল
তারপর নচিকেতা, তারপর অনন্ত বিধূর।
অন্ধতো ছিলাম ভালো, চক্ষুষ্মান হতে গিয়ে পুনরায়
আলোর বাগানে হোঁচট খেলাম
আলোকের বর্শা খুব তেজীরূপে মর্মে এসে বিঁধে
বলে, বল তুই হবি কি জ্যোতিষ্মান?
আমার অপারগতা বুঝে বলেছি আঁধার ভালো
তুমি নিয়ে এসেছিলে রূপা তুমিই ফেরালে
আলোকষষ্ঠির দণ্ডি ঐ ঘূর্ণিপাত্রে অবিরত চিত্রিত
ছায়াপথ জুড়ে অজস্র আলোকপিণ্ড দানা বেঁধে আছে।
দূরতম কোন এক নক্ষত্রজগৎ ঐ মুখাবয়বে চিত্রিত
অতিলৌকিক প্রেম এনেছিলে লৌকিক বস্তুনিচয়ে
এখন তাদের দেহে অতিনীল অভিনব তেজস্ক্রিয় ফোটে
তারপর অনন্তলোক, তারপর নক্ষত্র সুদূর।
মহাপ্রলয়ের আগে
বৃষ্টি থেকে এইমাত্র তোমাকে বাঁচালাম
কিন্তু মহাজাগতিক বিষ্ফোরণ থেকে তোমার (দৌহিত্রী)n-কে
বাঁচাবে কে?
তোমার জন্য গাঁথা এই গান তুলে রাখলাম
পাতায়, বনমর্মরের অবিনাশী অক্ষরে মুদ্রিত করে,
যা প্রাণসঞ্চালনের nth ধারা পর্যন্ত ধ্বনিত হবে।
কিন্তু মহাপ্রলয়ের দিনে সবই তো যাবে ভেসে
ঠাকুরের গান, দাশের কবিতা সবই তো যাবে
ধ্বংসযজ্ঞের পেটে
তাই বলে আমি কি এখন বাড়িয়ে ধরবো না ছাতা
আর বাধবো না গান?
এই তো মূর্ত ছবি, ঐ তো বিমূর্ত ভগবান!
প্রেম ও জীবন
কী এক ঝট্কায় বুড়ো হয়ে গেলাম,
ভাবি কখন যে যুবক ছিলাম;
কখন পদ্মপাতার মত চোখ তুলে দেখতো যুবতীরা
সে কোন যুগে, তাপবাহে, সে কোন বরফঅঞ্চলে?
পিপড়ের মূহুর্তগুলো যদি পাওয়া যেত
পতঙ্গের পাখার কম্পন
একেকটি মূহুর্ত হত কয়েকটি যুগের সমান।
তোমাকে যে ভালবাসি-- সে তো এক শতাব্দীর গান!
শতাব্দী শতাব্দী জুড়ে পুড়ে পুড়ে মরি;
ভাবি এ সহস্রাব্দে পাবনা তাকে, পাব অন্য কোন আধাঁর-খিলানে।
যদি সে এ গ্রহের নয়, নক্ষত্রের বিন্দু কিছু হবে;
অপার মুহূর্তসব ডানার ফোটনকণারূপে পাড়ি দেব নক্ষত্রপরিধি!
আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে তবেই তো ভিড়ি ঐ উপল বন্দরে
আমার আলোকযান উচাটন অন্ধকার পাড়ি দিতে থাকে।
আমার প্রেমিকা
আমার প্রেমিকা এই সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট রয়েছে
কখনো এসেছিল কাছে ভেবে খুব মনোবেদনায়
নিজেকে ধিক্কার দেয়, স্নানঘরে ভিজে বারবার
আর স্বগত বলে, গতজন্মে ঘটেছিল ঐসব পাপ
এখনো পাপের মূর্তি রয়ে গেছে, দূরবার্তা ছোঁড়ে
জীবন্ত পথে-পথে ঘোরে স্মৃতি, ছবি, চিঠির অক্ষর।
সে সব বিলায় যদি, বৃক্ষদের সবুজ ফটোকপিয়ারে
কেবল ছাপাতে থাকে, ছেড়ে আসে দূর পোস্টাপিসে
কিংবা কাহিনী সব সবিস্তারে মুদ্রিত করে পত্রিকায়
দুহিতা হচ্ছে বড়, যদি জেনে যায়, আড়ষ্ট হয়ে
থাকে খুব স্বামীর সমুখে, দর্পণে তাকাতে ভয়
যদি প্রাসাদে ঝিমুনি ধরে, লৌহবাসরে ঢুকে পড়ে সাপ
তবে তো উদ্যান ছেড়ে ভাসতে হবে গাঙুরের জলে
ভাবে সে আপদ সরে গেলে স্বস্তি পাবে খুব, একদা
বলেছিল, ‘দীর্ঘায়ু হও’; আজ প্রাণপন মৃত্যু যাঞ্চা করে।
আলস্য সংবাদ
এখন আলস্য লাগে, ও আমার আলস্য কুমকুম
প্রভাত হাঁটার পথে ডেকে আনো এন্তার ঘুম
স্বপ্ন গড়িয়া চলে নীলবর্ণ মার্বেলের মত--
পালে কত হাওয়া লাগে, নৌকা ভাসে শত শত
অনিন্দিতা বধূ হয়ে চলে আসে শোকমগ্ন ঘরে,
কত যে সার্কাস আর মুগ্ধরেণু সাজানো বিথরে
কল্পনার বল্গাঘোড়া পঙ্খীরাজ উড়েছে আকাশে
উত্তুঙ্গ শৃঙ্গে চড়ে আনচান প্রাণের সকাশে
গোপন বধূটি আসে, আলস্যের বেহাগ বাতাসে
চুমকুড়ি, জড়াজড়ি এসে পড়ে পৃথিবীর ঘাসে।
কুসুম কুমুর ঘ্রাণ, কুমকুম আলস্যে আসে বিস্তারিত ঢঙ্গে
ও আমার অকাতর পদ্মপাতা, পদ্যখাতা দিই রণভঙ্গে।
প্রকাশিল ওগো প্রেম, ওগো কল্পছবি, ভাবি কী বিচ্ছিরি
পনিরের মত প্রাণে একটানা চালিয়ে গেল মিছরির ছুরি।
বৈভবপ্রেম ও হিমালয়দর্শন
আমার প্রতিভা আর তোমার প্রণয় কিছুকাল পথ হেঁটেছিল, অতঃপর
যে যার বৃত্তে ফিরে গেছে - তোমার প্রতিভা আর আমার প্রণয়।
প্রতিভার সাথে চিরকাল সৌন্দর্যের গভীর প্রণয়, কিছুকাল তারা পথ হাঁটে
অতঃপর যে যার বৃত্তে ফিরে যায় প্রতিভার মত শুদ্ধ, উচ্ছ্বসিত প্রেম।
মেধাশূন্য প্রণয়ের পাশাপাশি ভালবাসাহীন প্রতিভার দেহ
প্রতিমার প্রতি তারা কোনদিন করে না বিদ্রোহ, ছেলেমানুষের মত
ভালবাসাবাসি করে ফিরে যায় ঘরে
প্রতিমাকে প্রতিভার যাদুতে জড়াতে
প্রতিমার উৎকৃষ্ট প্রতিচিত্র গড়ে তোলে প্রতিভার নিজস্ব প্রণয়
পরিধি ছাড়িয়ে তার অর্ন্তগত বিষাদের ছাপচিত্র আঁকে,
পথে পথে প্রণয়ের ফুলমাল্য দিতে গিয়ে অবাক সংগ্রহ
প্রতিমার মত তারা একদিন গড়ে তোলে নতুন বিগ্রহ;
প্রণয়ের ধুলিকণা মাথা পেতে নিতে তাহাদের গভীর আগ্রহ।
আমার কবিতা আর তোমার প্রতারণা কিছুকাল পথ হেঁটেছিল,
অতঃপর যে যার বৃত্তে ফিরে গেছে
তোমার বৈভবপ্রেম আর
আমার হিমালয়দর্শন।
অনেকদিন পর চামেলী কবিতা
চলে গেছ, ক্ষতি নেই, অজস্র কবিতার প্রেরণা হয়েছ
বাংলার রাধাপ্রিয় পাঠকের কৃতজ্ঞতা জেনো।
তোমার রূঢ়তা থেকে বালিকারা নম্রতার দীক্ষা নিক
দীক্ষা নিয়ে নরোম আলোর কণা ছড়াক চতুর্দিক!
ধূম্রজাল দিগন্তের যশোধারা মুগ্ধ করে রাখে
তুমিও কি হও নি বিবশ; কবিতা সেই মূর্তি ধরে
ঘ্রাণহীন, ক্ষুদ্র ফুল কবিতায় এতটা বর্ণিল
যেন ময়ূরীর সখী তুমি, পেখমে-রূপান্ধ পাখিটি
যখনি তর্জনী তোল, সপ্তসমুদ্র ভয়ে হয় নীল
আকাশ তো বেদনায় চিরকাল বিবশ বধির।
ধরা দাও নাই, ক্ষতি নাই, মুখচ্ছবির মশাল জ্বেলে
ঘুমাতে গিয়াছি কবরের মত ঠাণ্ডা নির্জন সেলে,
বাংলার কৃষ্ণময় পাঠকের নির্ঘুম হৃদয়ে জ্বলিছ।
যে ছবি সঙ্গে আমরণ
ভুলতে ভুলতে যাই ঐ ভুলের মন্দিরে--
যেখানে সত্যের প্রথাগত সূর্য ফুটে আছে;
আমাদের প্রেম তুমি কবেই ভুলেছ!
বন্ধুদের মুখ ভুলতে ভুলতে যাই সন্তানসভায়--
দেখি কাকস্য পরিবেদনা, হা হতোম্মি, বিদায়!
আমরা বিস্মৃতজাতি, ডাইনোসর বিদায়
ভুলেছি মায়ের কোল, পিতার উদার জীবনের
হিসাব-না-মেলা অঙ্কের আঁক, বান্ধবীর রূপছায়া
সহধর্মিণীর সংসারক্লান্ত ছবি, ইন্দ্রিয়জ মায়া।
একাকী নির্জনে মেতেছি যে সুখরতিউৎক্ষেপণ খেলায়
তার অজস্র দৃশ্যছবি ভুলে আছি অসংখ্য পর্বতের চূড়োয়
সূর্যের সদর্প ফটো, নীল বারিধির রূপ, নীলোৎপল শত
হে মাধবী, তোমার গোলাপ মুখ, জুই, চাঁপা, চামেলীর ব্রত।
সংখ্যাতীত মুহূর্তের ছাপচিত্র, সেলুলয়েড, ছবি
অজস্র ভ্রমণের সুখ, পথে দেখা অযুত-নিযুত মুখ
মানবের সুঠাম গম্বুজ, মানবীর সুনন্দ অঞ্চল,
শিশুর বিজয় মিছিল, অনবদ্য থির-বিদ্যুতের রেখা
নম্র-তীব্র রোদেলা দুপুর, শান্তশ্রীর অগুণিত ভোর
ভুলেছি সামন্ত দিন, অতিকায় রাত্রির লোমশ শরীর ...
কেবল আমাদের প্রথম দর্শনের দিন, চুম্বন, এখনো ভুলিনি!
প্রেম বা জ্যামিতির কবিতা
শহর এক আশ্চর্য জ্যামিতি;
ত্রিভূজ সম্পর্ক কত গোলাকার পার্কে ঝরে পড়ে।
ঘন হয়ে উঠেছে ঐ দালান ধ্রুপদ
ধূর্তের তীব্র, সুতীব্র পিরামিড
ব্যাসার্ধ ছাড়িয়ে বাড়ে শহর প্রাচীর।
গোলাকার বল হাতে বালকেরা চলেছে সব
আয়তাকার মাঠ লক্ষ্য করে
ঝাঁপায় কাঁপায় ওদের সন্ত্রাস
বালখিল্য চতুষ্কোন ঘিরে বিপুল উল্লাসধ্বনি
ত্রিভূজের বিষম বাহুর শেষে সন্নিহিত কোনে।
আনুভূমিক ঐ সরল পথখানি ধরে
পরিবর্তনশীল রাশির মত গাড়ি ছুটে যায়
অভিলম্ব ধরে গেলে নীলাদের বাড়ি
চাঁদখানি ঝুলে আছে ত্রিমাত্রিক ভরে।
সকালে আমি (৪,৮), নীলা ছিল (৬,৩)-এ
বিকেলে ক্যাফেতে দুজনেই (৫,৫)
স্থানাঙ্কের নিয়ম মেনে কফিতে দিই চুমুক
নীলা চলে গেলে সকল স্থানাঙ্কের মূল্য হয় (০,০)।
নীলাদের পাশের বাড়ির ছাদ তৃতীয় অক্ষ
আমি যে মাঠে অস্থির হাঁটি তার দুই বাহু এবং
দুই মাত্রা থেকে নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকি
তৃতীয় মাত্রার দিকে, নীলা আজ ছাদে ওঠে কি না!
দারুণ এক ঘনকের ঘরে আমাদের আনন্দমেলা
নিখুঁত গোলকের বাঁকা পিঠে ক্লান্তিহীন খেলা!