Published : 09 Apr 2026, 02:03 AM
আজ ৯ এপ্রিল, অধ্যাপক ড. ফজলুল হালিম চৌধুরীর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত হলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর তাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৯৮৩ সালে বিতর্কিত ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’র বিরোধিতাকারী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে পুলিশের অনুপ্রবেশের প্রতিবাদে তিনি উপাচার্যের পদ থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
আজীবন শিক্ষা, গবেষণা ও বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনে ব্রতী ছিলেন । তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি (১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত) ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, ইউকে, থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করে দেশে ফিরলে পদোন্নতি সংক্রান্ত সৃষ্ট জটিলতার প্রেক্ষিতে ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পদ থেকে ইস্তফা দেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬৪ সালে ফলিত রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।
কর্মজীবন ছিল বৈচিত্রময়। তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রথম বিজ্ঞান বিষয়ক সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি বাংলাদেশ রসায়ন কমিটির সভাপতি এবং ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত UNESCO -তে বিজ্ঞান বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে ভারতের নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯২ সালে (সম্ভবত) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই এসোসিয়েসন কর্তৃক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাবেক উপাচার্য হিসেবে একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। বক্তব্যের শিরোনাম দেন “উপাচার্যের দায়”। নামকরণের প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, অলিখিত হলেও এটা পরিস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিফ একাডেমিক এন্ড এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে এবং একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভূত যে কোন সমস্যা সমাধানে একজন উপাচার্যকে থাকতে হয় সদা প্রস্তুত। তেমনি ‘উপাচার্য’ বা ভাইস-চ্যান্সেলর শব্দটিও এক বিশেষ ও নির্বিশেষের মিশ্রণ। তবে সময়ের আবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা প্রতি দশকেই কিছু না কিছু বদলে যাচ্ছে। আর সে সাথে বদলে যাচ্ছে একই নামের আড়ালে যে ব্যক্তিটি কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁর দায়িত্ব, সমস্যা ও কর্মধারা।
অধ্যাপক ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৯২ সালে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার লিখিত রূপ এই প্রথমবার প্রকাশিত হলো। লেখাটি তাঁর পারিবারিক সংগহ থেকে উদ্ধার করে সংক্ষিপ্ত রূপে প্রকাশিত হলো। বি. স
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চরিত্রগতভাবে ৭৩ এর অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর--এ চারটি সাধারণ; প্রকৌশল ও কৃষি--এ দুটি বৃত্তিমূলক বা টেকনিকাল। সব তারতম্যকে অতিক্রম করে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে সমতার ক্ষেত্রে এক পংক্তিতে দাঁড়ায়, তা হল এরা সবাই সরকারি অর্থে বা করদাতার অর্থে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত। এগুলো মামুলি অর্থে সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ও শেষ বিশ্লেষণে তাই। এ উপমহাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ব্রিটিশের দেয়া দান খুব স্পষ্টভাবে অনপনেয়। এ ছাপের একটি দিক হল, প্রথম থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘অটোনমাস’ বা স্বায়ত্তশাসিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় সরকারের উপস্থিতি বরাবরই আছে। তবে প্রত্যক্ষভাবে নয়। একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে অভ্যন্তরীণ প্রায় সকল ব্যাপারেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। উপাচার্য নিয়োগেও একই কথা। যদিও চ্যান্সেলরই উপাচার্য নিয়োগ করেন, তবে যাকে খুশি তাকে নয়। এক সময়ে এ পদে হাইকোর্টের বিচারপতিরাও নিযুক্ত হয়েছেন; এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নন, বা ছিলেন না, এমন ব্যক্তিকে উপাচার্যের পদে কদাচিৎ দেখা যায়। উত্তর আমেরিকার সংজ্ঞায় আমাদের সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ই স্টেট ইউনিভার্সিটি বা সাদা কথায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। যেহেতু এ দেশে প্রাইভেট সেক্টরে বিশ্ববিদ্যালয় নেই - হয়তো শীঘ্রই সে সুযোগও সৃষ্টি হবে - তাই ওই কথাটা চালু হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে দেশের ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তর থেকে ছেলেমেয়ে - যারা বার বছর শিক্ষা পেয়েছে ও পরীক্ষায় মোটামুটি কৃতিত্ব দেখিয়েছে; সে সকল শিক্ষার্থীরা আসে। কী উদ্দেশ্যে আসে? প্রায় সকলেই আসে একটি বা দুটি (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি অর্জন করে একটি চাকুরির প্রত্যাশায়। ধনী ও অভিজাত ঘরের সন্তানের জন্য কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছরের অবস্থান রীতিসম্মত ও বাঞ্ছনীয় - কোনো কোনো দেশে অতীতে এ ধারণা চালু ছিল। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে তিন বছর অবস্থানই ছিল মূল কথা, ডিগ্রি নয়। এ ধারণাও সব দেশে এখন আর কার্যকর নেই। আমাদের দেশেও এ যাবৎ আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানের বিচরণক্ষেত্র হিসেবেই দেখে আসছি - সাথে কিছু উচ্চবিত্ত ও কিছু নিম্নবিত্ত। এ দেশের মধ্যবিত্ত-প্রভাবিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাই কোনোদিন শৌখিনতা বা আভিজাত্য দিয়ে চিহ্নিত হয়নি, যদিও আলীগড়ে তার কিছুটা ছাপ পড়েছিল। মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিড় জমিয়েছে, পরিশ্রম করে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হবে এবং পরীক্ষায় সফল হয়ে একটি উপার্জনের পথ ধরবে, এ আশায়। সাত পুরুষ ধরে আমরা এ চিন্তারই প্রভাব ও প্রাধান্য লক্ষ্য করছি। বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত আলোচনায় এর অর্থনীতির বিষয়টিও বিবেচ্য। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় নির্বাহ করেন। শিক্ষার্থীর ব্যয়-নির্বাহের দায়িত্ব তার নিজের, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের নয়। ছাত্র-বেতন ও অন্যান্য খাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মোট আয়ের পাঁচ বা দশ শতাংশ পায়। বেশি-সংখ্যক ছাত্র গ্রহণ করে এ খাতে আয় বাড়াবার যে তাগিদ পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা যায়, এ দেশে তা অনুপস্থিত। ছাত্র সংখ্যা বাড়লে সমস্যা বাড়ে, আয় বাড়ে না।

১৯৭৯ সালে ডাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠানে উপাচার্য ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী
বিগত দশকগুলোতে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব উপাচার্যকে এক বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং এসবের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবে যুবসমাজের ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য এ পরিস্থিতির অবয়ব রচনা করেছে। সমাজদেহের সবচেয়ে স্পর্শকাতর, সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ হল বিশ্ববিদ্যালয়। যে ভাবনা, যে অস্থিরতা, সমাজের অন্যত্র একটা ক্ষীণ স্পন্দন তোলে, তা-ই ঢেউয়ের মূর্তি গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে। পাকিস্তানি শাসনামলে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের উপর যে অন্যায় হয়েছিল, তার তীব্রতম প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ হয়েছে ছাত্রমহলে। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওই সময়ে উপাচার্যকে দুই কূল রক্ষা করতে প্রাণান্তকর পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়েছে। সরকার চেয়েছেন উপাচার্য শান্তিরক্ষা করবেন এবং সরকারের শর্তেই তা করবেন। যিনি তা করতে চেয়েছেন, তাঁর ভাগ্যে জুটেছে সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কার ও সমাজের পক্ষ থেকে নিন্দা ও তিরস্কার। যিনি ওইসময় টান টান দড়ির উপর দিয়ে কোনোদিকে না হেলে হেঁটে যেতে পেরেছেন - ইংরেজিতে যাকে tight rope walking বলে - তিনি প্রশংসা অর্জন করেছেন সকলের। আমি ওই সময়ের অভিনেতা নই, দর্শক মাত্র। একজন উপাচার্য, শোনা যায়, হামেশাই বলতেন, I was not born to be a martyr: শহিদ হওয়ার জন্য আমি জন্মগ্রহণ করিনি। তিনি দার্শনিক ছিলেন, আজ আমাদের মধ্যে নেই। সম্ভবত দর্শনের একটি শিক্ষা, pragmatism তাঁর রক্তমজ্জায় বাসা বেঁধেছিল। আত্মরক্ষা করব, না আত্মাকে - প্রশ্নটা তিনি নিশ্চিতভাবে নিজেকেই করেছিলেন, এবং শহিদ না হওয়ার সিদ্ধান্ত সে প্রশ্নেরই একটা জওয়াব।
বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের শীর্ষে উপাচার্যের অবস্থান; প্রশাসনের সকল ক্ষমতার তিনি কেন্দ্রবিন্দু। এ পরিস্থিতির যে প্রতীকী তাৎপর্য, সেটা যতদিন অক্ষুণ্ন ছিল, ততদিন উপাচার্য একই সাথে তাঁর প্রয়োজনীয় দূরত্ব ও কার্যকরতা রক্ষা করেছেন। প্রতীকী তাৎপর্য বলতে এই বুঝি যে, নীতি-নির্ধারণ, মতামত গ্রহণ ও দায়িত্ব-বণ্টনের একটা স্পষ্ট ও ন্যায়সঙ্গত কাঠামোর মধ্যে উপাচার্য কাজ করবেন। উপাচার্য একা নন, নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত-গ্রহণের একটা বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ধারায় আছে ফ্যাকাল্টি ও একাডেমিক কাউন্সিল। প্রশাসনিক ধারায় আছে স্থায়ী-প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর ও বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা। মূলনীতি পর্যালোচনা ও দিক-নির্দেশের জন্য আছে সিনেট এবং নির্বাহী পর্যায়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সিন্ডিকেট। পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটি হল সিন্ডিকেট, উপাচার্য যার সভাপতি। শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক সকল সিদ্ধান্তই সিন্ডিকেটের। উপাচার্য সিন্ডিকেটকে প্রভাবিত করতে পারেন, এবং সিন্ডিকেট দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। প্রচলিত আইনে তিনি সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে পারেন না এবং কোনো প্রশ্নে সিন্ডিকেটের সাথে তাঁর দ্বিমত হলে সিন্ডিকেটের কোনো সিদ্ধান্তকে তিনি বড়জোর কিছুদিন বিলম্বিত করতে পারেন। তবে শেষ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এ এক গণতন্ত্র-সম্মত ও নিশ্চিন্ত ধারণা। তবে এ ধারণার মধ্যে ছিদ্র নয়, রীতিমতো ফাটল দেখা দিয়েছে, এবং সেখানেই প্রশাসনিক বিপর্যয়ের উৎস।
প্রশাসনের ক্ষমতার উৎস সিন্ডিকেটের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত-গ্রহণের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এটা শুধু আমার ব্যক্তিগত ধারণা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়-মহলে এ ধারণাই এখন প্রতিষ্ঠিত। সিন্ডিকেটের শিক্ষক-প্রতিনিধিরা সবাই নির্বাচিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এদের নির্বাচন করেন। যখন থেকে এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে, তখন থেকেই সিন্ডিকেটের এ শিক্ষক-সদস্যরা তাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মুখপাত্র। তাদের নিরপেক্ষতা তখন থেকেই বাধাগ্রস্ত। নিরপেক্ষতা নষ্ট হলে সে শূন্যস্থান পূরণ করে যে বস্তুটি তার নাম পক্ষপাতিত্ব। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগমুক্ত সিন্ডিকেট ক্রমেই দুর্লভ ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যেত যদি উপাচার্যের নিরপেক্ষতা ও ছয়জন শিক্ষকের বাইরে অন্য সদস্যদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যেত। উপাচার্য নিয়োগের মধ্যে এখন মনোনয়ন ও নির্বাচন দুটি ধারাই এসে মিশেছে। ৭৩ এর অধ্যাদেশ মোতাবেক উপাচার্য সিনেট কর্তৃক নির্বাচিত হবে। সিনেট যেহেতু পুরোপুরি না হলেও বহুলাংশে নির্বাচিত, সুতরাং শুরুতেই উপাচার্যের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। উপাচার্য মনোনয়নের এ ব্যবস্থায় উপাচার্যসহ সিন্ডিকেট, যা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সর্বোচ্চ কমিটি, তার নিরপেক্ষতা যে কতদূর ক্ষুণ্ন হতে পারে, তা কল্পনার বিষয় নয়, বাস্তবের কথা। ক্ষমতার খেলায় সিন্ডিকেটের সাথে হাত মিলিয়ে উপাচার্য খুশি থাকতে পারেন, বা সিন্ডিকেটের সাথে এক অসম দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে তাঁর কার্যকরতা হারাতে পারেন। এর কোনোটাতেই তিনি উপাচার্যের সেই দায় পালন করতে পারবেন না, যেভাবে পালন করা তাঁর কর্তব্য। বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনে নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি আমার বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় তার আদর্শকে রূপায়িত করতে পারে শিক্ষকদের সহায়তায়। শিক্ষকরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত চালিকাশক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ। ছাত্ররা আসে স্বল্প কয়েকটি বছরের জন্য। শিক্ষকেরা অনেকেই তাঁদের পুরো কর্মজীবন কাটিয়ে দেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। দীর্ঘকাল একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করায় কিছু কায়েমি স্বার্থের সৃষ্টি হয়, বা হতে পারে; এবং স্থায়ী বন্ধুত্ব ও শত্রুতার, বা বিরোধের জন্ম হতে পারে। এদেশে এ পর্যায়ে স্থান-পরিবর্তনের সুযোগ বেশি নেই, ফলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জটিলতা থেকে পালাবার পথও প্রায় বন্ধ। উপাচার্যকে যদি পরিবেশ ও পরিস্থিতির সুস্থতা বিধান করতে হয়, তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন তাঁর নিজের অবস্থানকে সন্দেহমুক্ত রাখা। এটা একজন বহিরাগতের পক্ষে যত সহজ, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়-সমাজের সদস্য হয়ে ততটা সম্ভব নয়।

২১ শে ফেব্রুয়ারির দিনে উপাচার্য ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী
আমার মনে হয়, যারা ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয়-আইন তৈরি করেছিলেন, তাঁরা সদিচ্ছার বশবর্তী হয়েই বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। কিন্ত তা সময়ের এবং আবর্তে ক্ষেত্র বিশেষে এই অধ্যাদেশটির অপব্যবহার হয়েছে। পদোন্নতির প্রতিযোগিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং উপাচার্যের বড় দায় হয়ে পড়েছে তাঁর শিক্ষক-সমাজ। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মতো তিনি গলবস্ত্র হয়ে প্রায়শই নির্বাচকমণ্ডলীর সামনে করজোড়ে উপস্থিত হচ্ছেন। পরমুখাপেক্ষিতার এ মূল্য তাঁকে, ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক, দিতে হচ্ছে। যিনি এ দায়িত্ব স্বীকার করেন না, অর্থাৎ যিনি কোনো মহলের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন, যিনি পদোন্নতির প্রশ্নকে বিচারকের দৃষ্টিতে দেখবেন, উকিলের দৃষ্টিতে নয়, তিনি শিক্ষক-সমাজের বন্ধু নন - এ অপবাদ তাঁকে মেনে নিতে হবে। 'প্রেশার গ্রুপ' (pressure group) শব্দটির সঙ্গে প্রশাসক মাত্রই পরিচিত। হাল আমলে যাঁরা উপাচার্যের কাজ করেছেন, তারা সম্ভবতঃ একটি বা দুটি নয়। চারটি প্রেশার গ্রুপ-কে মোকাবিলা করেছেন, তারা হলো শিক্ষক, ছাত্র, অফিসার, ও কর্মচারী। সিন্ডিকেটে এদের মধ্যে কেবল মাত্র প্রথম দলের প্রতিনিধিত্ব আাছে। শুধু আছে নয়, একটু বেশী আছে। বাকী তিনটি দলের নেই। সিনেটে শিক্ষক সদস্যরাই সবচেয়ে দলে ভারী, এর বাইরে ছাত্রদেরও একটুখানি প্রতিনিধিত্ব আছে। অফিসার ও কর্মচারীদের কোথাও কোনো জায়গা নেই। বিদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম নির্বাহী পরিষদে কোনো কোনো ছাত্র-প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা আছে। একাডেমিক কাউন্সিল নামে যে পরিষদকে আমরা চিনি, সব দেশ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুরূপ পরিষদ আছে। এবং কোনো কোনো সেখানেও ছাত্র প্রতিনিধি দেখা যায়। এদেশে বাকি তিনটির প্রেশার গ্রুপ যখনই আন্দোলনের পথে নামে, তখনই অন্যান্য দাবীর মধ্যে প্রতিনিধিত্বের দাবীও উঠে থাকে। একটা ধারণা অন্যদের মনে সংগতভাবেই দানা বেঁধেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মাত্র দলের স্বার্থ সর্বদাই সংরক্ষিত এবং তা হলো শিক্ষক সমাজের। শিক্ষকেরা সিন্ডিকেটে অন্যদের প্রতিনিধিত্বের দাবীকে বরাবর উপেক্ষা করে আসছেন।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক সমাজকে প্রশাসনে যতোটা বড়ো ভূমিকা দেয়া হয়েছে আমার জ্ঞানে আর কোনো দেশের বিশ্ববিদ্যালয় সিস্টেমে তা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে শিক্ষকদেরও ভূমিকায় আপত্তি থাকার কথা নয়। আপত্তি এখানেই যে নির্বাচন পদ্ধতি এই ভূমিকার সুস্থতা মারাত্বকভাবে ক্ষুন্ন করেছে। দলীয় স্বার্থ ও দলীয় চাপ থেকে মুক্ত হয়ে ভূমিকা পালনের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জরুরী সমস্যা এবং সেই দিক থেকে, কিছুটা উপাচার্যের দায়ও বটে। শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যক্তিগত, পেশাগত, দলগত আশা-আকাঙ্ক্ষা বিশেষতঃ উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো উপাচার্যই বা কোনো সিন্ডিকেটই পুরোপুরি মেটাতে পারেন না। তবে এগুলিকে উপেক্ষা করাও উপাচার্যের পক্ষে সম্ভব নয়। এর পর প্রতিষ্ঠানের দাবী মেটানোর জন্য কতোটুকু সময় তিনি পান? যতোটা পাওয়া উচিত, ততোটা পান না। উপাচার্যের হাতে কি বড়ো বেশী দায়িত্ব ও ক্ষমতা কেন্দ্রিভূত হয়ে আছে এবং সে জন্যই কি তিনি সময়ের অভাবে কার উচ্চতর দায়িত্ব পালনে অপারগ হয়েছেন? আপাতঃদৃষ্টে তাই মনে হতে পারে। অন্যান্য দেশে অনেক ছোটোখাটো দায়িত্ব থেকে উপাচার্য একেবারেই মুক্ত। এই ছোট খাটো দায়িত্বগুলো এদেশেও ইতিপূর্বে উপাচার্যের সময়ের উপর এমনভাবে চড়াও হয়নি। এগুলি থেকে মুক্ত হতে না পারলে, উপাচার্যের যেটা আসল দায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বাঙ্গীন বিকাশে ও উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া, সেটা পালন করা সম্ভব নয়।
প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা, গ্রন্থ রচনা, জ্ঞানের সীমানা বৃদ্ধি, শিক্ষকের পেশাগত যোগ্যতা বৃদ্ধি, এবং সমস্ত কিছুর নিয়মিত পরিমাণ ও পর্যালোচনা। সেই পরিমাণ ও পর্যালোচনার আলোয় পুরস্কার ও পদোন্নতি- এই সবকিছু নিয়ে যে বিস্তারিত কার্যক্রম, উপাচার্যের দায়িত্ব তাকে সচল রাখা ও তার উপর পৌরোহিত্য করা। দেশের ও বিদেশের শীর্ষস্থানীয় গুণীজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ করা এই প্রক্রিয়ারই অংশ। একজন অধ্যাপক যিনি একটি বিভাগের নিষ্প্রাণ দেহে প্রাণসঞ্চার করতে পারেন, তাঁকে খুঁজে বের করা, ঐ বিভাগে তাকে ডেকে আনা এবং ডেকে আনার পথে ভিতরের বাধা ও আপত্তিকে জয় করতে পারা, উপাচার্যের দায় বলে আমি মনে করি। এসব করতে গেলে আজকাল অনেক ক্ষুদ্রচিন্তার, অনেক কায়েমী স্বার্থের সঙ্গে, উপাচার্যকে লড়াই করতে হয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কার্যরত শিক্ষকমন্ডলির পৈত্রিক সম্পত্তির মতো ব্যবহৃত হচ্ছে বেশ কিছু দিন থেকেই। এবং আমরা, যারা উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেছি, এই প্রবণতাকে রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছি, অনেকে রোধ করার কথা চিন্তাই করিনি। এতে বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় জগতে আমাদের সুনাম বাড়েনি। যে দুটি মারাত্বক ব্যাধি বর্তমানে প্রায় সব কটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেতর থেকে ক্ষয় করছে, তার একটি মানের বিপর্যয় আর একটি উচ্চতর নিয়োগের ক্ষেত্রে "দরজা বন্ধ নীতি"। বিশ্বের ও তিরিশের দশকে যদি এই নীতি চালু থাকতো, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কি রুপ আমরা দেখতাম, একবার ভেবে দেখুন। যে-দুর্গতির কিছুটা আভাস দেয়া হ'ল অনেক সময় একজন উপাচার্য এ-নিয়ে চিন্তা করার অবকাশই হয়তো পান না। চিন্তা করলেও, কার সঙ্গে তিনি তাঁর চিন্তাকে ভাগ করে নেবেন? দেশের যে অংশেই স্থাপিত হোকনা কেন, বিশ্ববিদ্যালয় মাত্রই একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। অঞ্চল বিশেষের অধিবাসীরা সেটা সব সময় মনে রাখেন না, যদি উপাচার্যও সেটা ভুলে যান, বিশ্ববিদ্যালয় যদি তার জাতীয় চরিত্র হারায়, তবে তার কাছে আন্তার্জাতিক চরিত্র আশা করা যায় না।

সিনেট মিটিং-এ উপাচার্য ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী
উপাচার্যের দায়িত্ব, সব প্রতিকুলতার মধ্যেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়কে রক্ষা করা। তাকে গ্রাম্যতা, সংকীর্ণতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের আগ্রাসন থেকে দূরে রাখা। আমরা অনেকেই এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছি। তার একটি কারণ আমাদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা, আর একটি কারণ দেশের সরকারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রকৃত বোঝাপড়া ও আদান-প্রদানের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা অনেক দিন থেকেই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং একে অপরকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা উভয় পক্ষেই আছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে উভয় পক্ষই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি এখানেই যে বিশ্ববিদ্যালয় তার যথার্থ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলেও এবং উপাচার্য তাঁর ভিতরের ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সমস্যার আবর্তে তলিয়ে গেলেও, সঙ্কটের মুহূর্তে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কেউ নেই। উপাচার্যের সুনাম নষ্ট হলে দেশের কিছু যায় আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনির্দিষ্ট সরকারী আদেশে বন্ধ থাকলেও উপাচার্যের স্বস্থি নেই। বন্ধ করার মালিক তিনি নন, তবে খুলে দেওয়ার দায় তিনি এড়িয়ে যেতে পারেন না। এটা তাঁরই দায়।
সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সাতচল্লিশের পর থেকেই আমাদের নিত্যসঙ্গী। আমাদের রাজনৈতিক জীবন এখনও অসংগঠিত। এবং আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সম্প্রতি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত-বেকারের সমস্যা। এদের সংখ্যা এতো বেশি যে কোনো পরিসংখ্যানেই তার হিসেব মেলে না। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নৈরাশ্য। এই নৈরাশ্যের প্রত্যক্ষ শিকার যদিও যুব সমাজ তবে তা অনিবার্যভাবেই পুরো সমাজের মনের উপর তার কালো ছায়া বিস্তার করেছে। প্রয়োজনে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, হতাশাগ্রস্থ যুবকের হাতে ছুরি-পিস্তল মলোটভ ককটেল তুলে দিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করা যায় এবং তা করা হয়েছে। এটা কোনো নতুন পরিস্থিতি নয়। ষাটের দশকেই এর সূচনা। আশির দখলে তা আরও ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা অর্জন বলেছে। পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায়ান্তর থাকে না। গত দশ বছরে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে দশ থেকে বিশ বার এভাবে বন্ধ করা হয়েছে আনুমানিক হিসেবে স্বভাবতঃই সমাজের চোখে বিশ্ববিদ্যালয় তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে বসেছে। সেশন-জট এই অবিশ্বাসের দ্বিতীয় শক্তিশালী কারণ। সব মিলিয়ে যে পরিস্থিতি, তাকে আস্থার সঙ্কট বলা যায়। এ-মুহূর্তে যিনি উপাচার্যের দায়িত্বে আছেন তাঁর কাজ, তাঁর দায়িত্ব কোনো দিক দিয়েই ঈর্ষণীয়তা নয়। এই আস্থার সঙ্কটে সমাজ ও সরকারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তাকে অতিক্রম করা উপাচার্যের দায়। এটা তাঁর একার দায় হতে পারেনা। তবে তিনি তাঁর নিজস্ব আঙ্গিনায় তার কর্তব্য পালন করবেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানকে তিনি নৈরাজ্য ও নৈরাশ্য থেকে বাঁচাবার জন্য তাঁর সকল চিন্তা ও সকল উদ্যোগ নিয়োজিত করবেন। বিগত প্রায় চল্লিশ বৎসর ধরে তাঁর পূর্বসূরীগণ যা করেছেন এবং যা করতে গিয়ে কখনো সামান্যভাবে সফল হয়েছেন, কখনো বা ব্যর্থ হয়েছেন। সেই একই দায় তাঁকেও বহন করতে হবে। এ দায় থেকে তাঁর মুক্তি নেই।
মনে হতে পারে, এ এক বিষম দায়, এ এক অসম্ভব দায়িত্ব। সঙ্কটের গভীরতা, যাকে আমি আস্থার সঙ্কট বলেছি, আমি মোটেও খাটো করছি না। তবে আমি, একই সঙ্গে এর অন্য একটি দিক তুলে ধরব। যার তাৎপর্য বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাড়িয়া যায়, যা সমগ্র দেশের জাতির ভবিষ্যৎকে স্পর্শ করে। সংক্ষেপে কথাটা নিবেদন করছি।

সমাজের গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো একটি জাতিকে সংহতি দেয়, তাকে শক্তি জোগায়, তার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎকে এক অব্যাহত প্রবাহমানতার সূতোয় গেঁথে রাখে। এই জাতীয় প্রতিষ্ঠান, যার মধ্যে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের বীজ কাজ করে যাচ্ছে, আমরা বড়ো একটা গড়ে তুলতে পারিনি। সম্ভবতঃ এর একমাত্র ব্যতিক্রম আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি। এর অর্থের জোগান যেখান থেকেই আসুক, একে জন্ম দিয়েছে এবং শত ব্যর্থতার মধ্যেও একে টিকিয়ে রেখেছে, এবং এর উপরে তার আস্থা এখনও প্রত্যাহার করে নেয়নি সমাজ। সমাজের এই গভীর আকাঙ্ক্ষা, একদিক থেকে সভ্যতার সঙ্গে এই আমাদের প্রায় একমাত্র যোগাযোগের সেতু। 'হয়তো এ-মুহূর্তে একটু দুর্বল, একটু নড়বড়ে, তবুও একমাত্র সেতু। একজন উপাচার্য যখন তাঁর দায় মেনে নেন এবং তাঁর দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি এই সেতুটিকেই রক্ষা করেন, স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে।
আস্থার এই গভীর সঙ্কটের দিনে অনেকেই আজ উপাচার্যের দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। বিশেষতঃ এই দায়িত্ব-পালনের যোগ্যতা যাঁদের বেশী, তারাই সরে আসবেন, যাঁদের যোগ্যতা কম, তারাই এগিয়ে আসবেন। এই পরিস্থিতি সঙ্কটকে গভীরতর করবে। আশা করি আমি সঙ্কটের গুরুত্বকে অন্যাবশ্যকভাবে অতিরঞ্জিত করছি না। আমার ভয় ভিত্তিহীন হলেই খুশি হব। আত্মপ্রবঞ্চণা শেষ পর্যন্ত কারো কোনো কাজে লাগে না। জনসাধারণের চোখেই শুধু নয়, শিক্ষিত সমাজের চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি এ-মুহূর্তে কী? কোনো জরিপের সাহায্য ছাড়াই আমরা তা অনুমান করতে পারি। অস্বীকার করা যায় না এই ভাবমূর্তিতে আজ কলঙ্কের পোঁচ লেগেছে। এক সময় এবং অন্যায়ভাবে সব বিশৃঙ্খলার জন্য কেবল ছাত্র-সমাজকেই দায়ী করা হতো, এখন সরকার ও শিক্ষক সমাজও সমপরিমানেই সমালোচনার বিষয়। সব দোষ নন্দঘোষের দিন চলে গেছে। বিচারের কাঠগড়ায় যে-কেউ দাঁড়াতে পারে এবং উপাচার্যও এর ব্যতিক্রম নন। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মতো বহু প্রশংসিত উপাচার্যও মৃত্যুর ছয় দশক চলে যাওয়ার পর, কঠিন অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, উপাচার্য হিসেবেই। তিনি নিজে ছিলেন বিচারপতি, কিন্তু পারেননি সমকালের ও পরবর্তী কালের বিচার এড়িয়ে যেতে। ইতিহাসের এই শিক্ষা মনে রাখাও উপাচার্যের দায়িত্ব।