Published : 26 Mar 2026, 11:52 PM
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে আমার বয়স ছিল এক দিন কম ৮ বছর। ওই সময়ে আমরা থাকতাম মিরপুর ১২ নম্বর- পল্লবীতে, তখনকার ইপিআরটিসি বাস ডিপোর কাছাকাছি। পরিষ্কার মনে আছে, বাসা থেকে বেরিয়ে বামদিকে কিছুটা গেলেই রাস্তার মাথায় পৌঁছা যেত। ওখানে দাঁড়িয়ে বামদিকে তাকালে দেখা যেত ঢাকাগামী বাস দাঁড়িয়ে থাকতে। মনে পড়ে, ওখান থেকে গুলিস্তান আসতে মোটামুটি ১ ঘণ্টা লাগত। সে সময়ের স্মৃতি যতটা মনে আছে তা নিয়ে, বিশেষ করে ২৫শে মার্চের রাতের কথা আমি আগেও কিছুটা লিখেছি, তাই এখানে তার বিস্তার ঘটাচ্ছি না। শুধু এটুকু বলি, ২৫শে মার্চের সন্ধ্যায় বাড়িতে পুরুষ অভিভাবকবিহীন আম্মা আর মামি তাঁদের দুই পুত্র ও দুই কন্যাসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন আমরা যে বাসায় থাকতাম তার থেকে কয়েকটা বাসা পরের একটি বাসায়। ২৫শে মার্চ সকালে ছোটমামা তাঁর ভেসপা মোটরসাইকেল নিয়ে অফিসে গিয়ে আর ফিরতে পারেননি। টেলিফোন বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন বলে বাসায় টেলিফোন ছিল, সেটাও ডেড। ফলে তিনি একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। আব্বা থাকতেন পুরোনো ঢাকায় তাঁর ছোটচাচার বাসায়। সাধারণত শনিবারে আসতেন, সোমবার সকালে চলে যেতেন। সেদিন আমাদের সঙ্গে থাকার কথা ছিল না।
ছোটমামা ফিরতে না পারায় এবং মামির ভাই বড়মিয়া মামা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় আত্মগোপনে যাওয়ায় আমরা ছিলাম পুরুষ অভিভাবকশূন্য। যে বাসায় আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম সেখানে ছোটদের স্থান হয়েছিল রান্নাঘরের ঢালাও বিছানায়। তখন অনেক বাড়িতেই রান্নাঘর থাকত আলাদা, থাকার ঘর থেকে একটু দূরে। কিচিরমিচির থামাতে মামি ধমকে দিয়েছিলেন—জোরে কথা বলা যাবে না। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। ঘুমিয়ে পড়ায় সে রাতের ভয়াবহতা পুরোটা বুঝিনি। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বুঝতে পারি ২৬শে মার্চ সকাল থেকে। বড়দের কথায় শুনেছি, রাতে দূরে অনেক গোলাগুলি হয়েছে। অনেক মানুষ মরেছে—এমন কথাও ভেসে আসছিল। কারফিউ চলছে, বাইরে যাওয়া যাবে না। সারাটা দিন কেটেছে অস্বস্তি আর চুপচাপ অপেক্ষায়। বাড়ির রাস্তার দিকের জানালাগুলো টেবিল কাত করে, কোথাও ক্যারামবোর্ড ঠেস দিয়ে ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়েছিল। যে বাড়িতে আমরা ছিলাম তাঁদের একটা দো-নলা বন্দুক ছিল। দোনলা বন্দুক আর কয়েকটা কার্তুজ দেখে মনে হয়েছিল আমাদের কাছে প্রতিরোধের অস্ত্র আছে। কিন্তু একজন বললেন, একটা দোনলা বন্দুক দিয়ে কী হবে! ২৬ তারিখ সারা দিনই কারফিউ ছিল। আমরা বের হতে পারিনি। গোলাগুলির কথা শুনেছি, কিন্তু এর ব্যাপ্তি কতটা তা বোঝার উপায় ছিল না। আমাদের একটা প্রায় নতুন রেডিও ছিল—কেউ শুনতে চেয়েছিল কি না আজ আর মনে নেই।
আমরা ছোটরা দুশ্চিন্তার মধ্যেও ঘুমিয়েছি, বড়দের রাত কেটেছে জেগে। ছোটমামা ২৬ তারিখেও ফিরতে পারেননি। আব্বার কোনো খোঁজ নেই। শেখ মুজিব কোথায়—এ নিয়েও কেউ নিশ্চিত কিছু জানত বলে মনে পড়ে না। একই অনিশ্চয়তায় কেটেছে পুরো দিন ও রাত। ২৭শে মার্চ সকালে ঘুম ভাঙল। বড়দের মুখে একই রকম টানটান ভাব। আমাদের কথাবার্তাও যেন আটকে ছিল। আব্বা কি ২৫ তারিখে মিরপুরে আসার চেষ্টা করেছিলেন? যে হারে গোলাগুলি হয়েছে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না—কে জানে! আম্মা আর মামির দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখটাই কেবল মনে পড়ে। সকাল ১০টায় কারফিউ শিথিল হলো। ছোটমামা ভেসপা নিয়ে ফিরলেন। তিনি শুনেছেন, পাকিস্তানি আর্মি বহু মানুষ মেরেছে। আব্বার এখনো কোনো খবর নেই। বড়দের কথায় বুঝলাম, আশেপাশে বিহারিদের বসবাস—এখানে থাকা নিরাপদ নয়। অল্প সময়ের জন্য কারফিউ উঠেছে, বিকেল ৪টায় আবার শুরু হবে। মামা ফিরে আসায় কিছুটা স্বস্তি এলো। আমরা বাসায় ফিরলাম। এখন সবার ভাবনা—কীভাবে মিরপুর থেকে বের হওয়া যায়। পরেরবার কারফিউ উঠলে কি আমরা বের হতে পারব?