০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মুহাম্মাদ মাখজানজি’র দুটি গল্প

সোহরাব সুমন সোহরাব সুমন

Published : 01 Oct 2026, 07:02 PM

Updated : 01 Oct 2026, 07:02 PM

মুহাম্মাদ মাখজানজি ( জন্ম-১৯৫০)

মাখজানজি একজন মিশরীয় চিকিৎসক ও লেখক। নীল নদের বদ্বীপ অঞ্চলের মানসুরা শহরে তাঁর জন্ম। মনসুরা কলেজ অব ম্যাডিসিন থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি শহরটির একজন ডাক্তার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নে অবস্থান কালে তিনি মনোবিজ্ঞান ও বিকল্প চিকিৎসাপদ্ধতিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। চেরেনোবিল বিপর্যয়ের সময় তিনি স্নায়ু-মনোরোগবিদ্যা বিষয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় ইউক্রেনের কিয়েভ শহরে অবস্থান করছিলেন। ১৯৮৬ সালে ঘটে যাওয়া দুঃখজনক এই ঘটনাটিই তার প্রথম গল্পগ্রন্থ মেমোরিজ অব আ মেল্ট ডাওন— Memories Of A Meltdown’ এর মূল অনুপ্রেরণা। এ ঘটনার পর, তিনি চিকিৎসা পেশা ছেড়ে সাংবাদিক ও লেখক হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার পতন প্রত্যক্ষ করেন এবং এ ঘটনাগুলো নিজস্ব শৈলীতে গল্পসংঙ্কলনে তুলে ধরেন। কায়রোয় ফিরে আসার আগে তিনি কুয়েতের শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকী ‘আল-আরাবি’তে বেশ কিছুদিন কাজ করেন। প্রথমে বিজ্ঞান বিষয়ক সম্পাদক ও পরে সম্পাদকীয় পরামর্শকের দায়িত্ব পালনের ভূমিকার সুবাদে আফ্রিকা, এশিয়াসহ আরও অনেক অঞ্চলের বিচিত্র সব স্থানে ভ্রমণের সুযোগ পান। এই অভিজ্ঞতাগুলো তার লেখায় এবং গ্রন্থে গভীর ছাপ ফেলে।

মিশরের ছোট গল্পকার মুহাম্মদ মাখজানজি দেশটির সত্তর ও আশির দশকের ফিকসন চিত্রায়ণের একজন সত্যিকার প্রতিভা। মিশরের বিগত প্রজন্মের মাঝে তার এই নব্য ধারার শৈল্পিক সংবেদনশীলতার প্রতিফলন খুবই স্পষ্ট। অসহনীয় প্রতিকূলতার মাঝে পরিত্রাণের সব পথ কখনও কখনও রুদ্ধ হয়ে যায়, এমনই সব ঘটনা প্রবাহের আবর্তে জীবনের নানা মুখী সঙ্কট তার কাহিনীসমূহের পরতে পরতে চিত্রিত হয়েছে। দেশটির মূলধারার কল্পকাহিনী লেখক ইউসুফ ইদ্রিসের মতোই পরীক্ষামূলক কথাসাহিত্য রচনার মধ্যদিয়ে মাখজানজি নিজ পেশাজীবন শুরু করেন। কিন্তু সেই একই আঙ্গিকের সঙ্গে তিনি বাহুল্যবর্জিত, আর্থিক কার্যকারণ, এবং উচ্চাঙ্গের কার্যকর শৈলীর সংযোজন করেছেন। তার দ্বিতীয় গল্প সংগ্রহ— পিপল ইন কেজেস-এ তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে নিজস্ব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। তার অন্যান্য গল্প সংগ্রহগুলো হলো— আল-আতি— الآتي, দ্যাট হুইচ ইজ কামিং (১৯৮৩), ডেথ লাফস (১৯৮৮), এবং আল-বুস্তান— البُستان, দ্য গার্ডেন (১৯৯২), তিমি দ্বীপের তলিয়ে যাবার মুহূর্ত— لحظات غرق جزيرة الحوت (১৯৯৬) এখনকার পশুপাখি— حيوانات أيامنا (২০০৬)। ১৯৯২ সালে তিনি মিশরে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ গল্পগ্রন্থের জন্য পুরস্কার এবং ২০০৫ সালে গল্প বিভাগে প্রবীণ লেখকদের জন্য প্রবর্তিত ‘সাউইরিস কালচারাল এওয়ার্ড— Sawiris Cultural Award— লাভ করেন। এখানে তার গল্প দুটি ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে বাংলা তর্জমা করা হয়েছে। অনুবাদ করেছেন সোহরাব সুমন।

নীল মাছি

মাছি আমি ভীষণ ঘৃণা করি। আর ওদের বিরক্তিকর ভনভন শব্দও। ইদানিং আমি এক ইমারজেন্সি কক্ষের বাসিন্দা। কামরাটার সাদা চার দেয়ালের বিষাদময় শূন্যতার মাঝে আমাকে রাতের পর রাত অজানা অপেক্ষায় বসে একাকী কাটাতে হচ্ছে।

ঘরটার ভেতরে নীল মাছিদের ভীড় লেগেই আছে। এই বিশেষ ধরনের নীল মাছিদের শ’খানেক একসঙ্গে দলবেধে বিরক্তিকর শব্দ করতে শুরু করলে, আমার ভয়ানক জেদ হয়। রাগে আমি আমার গায়ের সাদা কোর্টটা খুলে ফেলি। আর ওটা দিয়ে ওগুলোকে সমানে আঘাত করতে শুরু করি। সেই আঘাতে কোনোটা আবার উল্টে পড়ে সমানে পাখা ঝাঁপটাতে থাকে। একবার আমি ওর একটাকে পা দিয়ে পিষে ধরে খুব কাছ থেকে দেখি। আমার বুঝতে বাকি থাকে না, পতঙ্গটা আসলে কতটা ঢাউস আর বর্ণিল। বেচারাকে সুস্থ করে ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেই। যাতে আবারও সে আগের মতো ভনভনিয়ে উড়ে বেড়াতে পারে। পাশে থাকা ফাঁকা একটা কাচের গ্লাস তুলে নিলাম। তারপর কোর্টের ভাঁজ করা একটা অংশ দিয়ে ঠেলে ওটাকে গ্লাসের ভেতরে ফেললাম। এভাবে বেচারা গ্লাসের ভেতরে গিয়ে পড়ল। তারপর গ্লাসটা উল্টো করে রেখে, ওর ভেতরে তাকালাম। এবার ওর আকার-আকৃতি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আগের চেয়ে ওকে অনেক বড় বলে মনে হচ্ছে। হতভাগার মাথায় আঠালো দু’টা আধখানা স্বচ্ছ কাচের গোলা। নচ্ছারটার নড়াচড়াতে গ্লাসের ভেতর থেকে রঙবেরঙের বর্ণিল আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। দাবার ঘরের মতো ওর শরীরের খোপগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আর সেলোফেন সদৃশ ডানার নীচ থেকে চক্ চক্ করে ধাতব নীলচে আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে।

বন্দী মাছিটা পালাতে গিয়ে বারবার ফাঁকা গ্লাসটার ভেতরের কাচের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। তারপরও, সে বারবার অন্যদিকে ঘুরে অবিরাম পালাবার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আমি ক্রমাগত ওর এমন একই ধাঁচের কাজকারবার দেখতে দেখতে খুব শীঘ্র ক্লান্ত হয়ে পড়ি।

এবার কী ভেবে যেন, লোকাল এনেস্থেসিয়ার শিশিটা তুলে নিলাম। তারপর গ্লাসটা আলতো কাত করলাম। ওর ভেতরে গাঢ় ধোয়াশার মতো স্প্রে করে, বেচারাকে পালাবার সুযোগ না দিয়ে, দ্রুত গ্লাসটা নামিয়ে রাখলাম। এবার দেখছি, মাছিটা পালাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারপর একসময় নড়াচড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ মরার মতো পড়ে রইল। হঠাৎ-ই ওটা উল্টে পাশ ফিরে শুলো। আর গোলাকার বৃত্ত তৈরি করে ঘুরতে ঘুরতে, শুয়ে থেকেই, শরীর কাত করে, পিনের মাথা আকৃতির ননী রঙা পুঁচকে একটা ডিম পাড়ল। এভাবে একে একে একটা, দুইটা, তিনটা, চারটা, পাঁচটা, ছয়টা ডিম পাড়ল। এতগুলো ডিম পাড়া শেষে মক্ষিকাটা ওখানেই মরে পড়ে রইল।

গালর্স ওয়ার্ড

লাল রঙের চিহ্ন: ‘সেকসন থ্রি— যক্ষ্মা— গালর্স ওয়ার্ড,’ আর আমি সেই লাল চিহ্নের তীর দেখে এগোতে থাকি। করিডোরের পাশের একটা দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় এক নার্সের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যায়। ওর মাথায় একটা বাক্স, কাপড়ে ঠাসা সেই বাক্স থেকে একগোছা কাপড় বাইরে বেরিয়ে আছে। কুশল জিজ্ঞেস করার পর তার কাছে জানতে চাইলাম আসলেই বাক্সের ভেতরে কী আছে। কথাটা শোনার পর সে মাথা থেকে বাক্সটা নামিয়ে রাখে। তারপর আমাকে বলে, এটাতে করে গালর্স ওয়াডের নোংড়া সব কাপড়চোপড় ধোয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি বিছানার চাদর আর বালিশের কভারগুলো মেলে ধরি। দেখি সাদা চাদরগুলোর সবটাই প্রায় সূচিনকশা করা— শত শত সূচিনকশা আর লেখা। আমি পড়তে থাকি, ‘মনে রেখ,’ লেখাটার নীচে আরো অনেক মেয়েদের নামের সঙ্গে নানান ধরনের ফুল, স্রোতের ওপর দিয়ে ভেসে চলা পালতোলা নৌকা, উদীয়মান সূর্য আর উড়ন্ত পাখির ছবি সূচিকর্মের সাহায্যে নকশি করে আঁকা।

‘সেকশন থ্রি— যক্ষ্মা।’

আমি দরজার ওপরকার নির্দেশনাগুলো পড়ে ভেতরে ঢুকি। অন্ধকারে প্রথমে কাউকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধু দেখতে পাচ্ছিলাম সারি সারি ফাঁকা বিছানা পড়ে আছে। তার পরপরই ওকে দেখতে পেলাম। ওয়ার্ডের একেবারে শেষ মাথায় একা একটা বিছানার এক কোণে চুপচাপ বসে আছে। পাশে থাকা একমাত্র খোলা জানালা দিয়ে নিঃসঙ্গ একটা আলোকরশ্মি ওর বিছানার নীচে এসে পড়েছে। মেয়েটা কুঁজো হয়ে বসে আছে, যেন কোলের ওপর ঝুঁকে কিছু একটা দেখছে। আমার দিকে ফিরে তাকানোর পর আমি সরাসরি ওর দিকে এগিয়ে যাই। অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে কোল থেকে ওগুলো ঝেড়ে ফেলে দিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। হালকা পাতলা দুর্বল একটা শরীর, মুখে জড়তা আর স্পর্শকাতর মলিন একটা ভাব।

কাছাকাছি হতেই, আমি ওকে বললাম, আমি এখানকার নতুন ডাক্তার। কথাটা শুনে মেয়েটা খানিকটা আশ্বস্ত হলো। এরপর আমি ওর কাছে এই ওয়ার্ডের অন্য মেয়েদের কথা জানতে চাইলাম, এমনকি হাতে থাকা ফাইলে চোখ বুলিয়ে গরগর করে ওদের কজনার নামও বলে ফেললাম। আমার মুখে পরিচিত নামগুলো শুনে মেয়েটা নিঃসন্দেহে বিচলিত বোধ করছিল বলেই বুঝলাম। তবে ভাবলেশহীনভাবে সে শুধু বলল, ওরা সবাই চলে গেছে। তারপর, বিষয়টি যে আমি তখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি তা আঁচ করতে পেরে, চটজলদি করে বলে উঠল, ‘আপনি দীর্ঘজীবী হোন।’ আমি ওর পোশাকের সেলাই করা পাড়ের দিকে তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরেই মেয়েটা মৃদু একটা লাজুক হাসি হেসে বলল, ‘সব লিনেন ওরা সঙ্গে করে নিয়ে গেছে, এখন নকশা করার জন্য আমার কাছে শুধু এটাই আছে।’

ওর পোশাকের সেই প্রান্তে আমি আকাশী-নীল সুতোয় সেলাই করা ‘মনোমুকুরে— في الذاكرة’ কথাটি লিখা দেখতে পেলাম, লেখাটি ঘিরে ছিল দুপাশ থেকে দুটি সবুজ ফুল। ওর মাঝ থেকে গোলাপি সুতোয় গাঁথা একখানা সুঁই দোদুল্যমান ঝুলছিল, সুতোটি যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছিল ওখানটায়— অবশ্য পরে জেনেছিলাম— আঁকা ছিল ওর নামের প্রথম অক্ষর।

(মোনা এন. মিখাইল ও ক্রিস্টোফার টিংলে’র ইংরেজি অনুবাদ অবলম্বনে)