সায়েমের সঙ্গে চমৎকার সম্পর্ক, সকালেও ফোন করেছি: চুয়েটের নতুন ভিসি
“এমনও শিক্ষক বা শিক্ষার্থী আছেন যিনি আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে, কিন্তু মিছিল মিটিং শেষে আমার সঙ্গেই যোগাযোগ করছেন।”
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উন্নয়নে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে ‘মিলেমিশে কাজ করবেন’ বলে জানিয়েছেন নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম।
এদিন ক্যাম্পাসে আসার আগে সাবেক উপাচার্যকে ফোন করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আন্দোলনের মধ্যেই উপাচার্য হিসেবে প্রথমবার নিজ কার্যালয়ে আসা অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেছেন, তিনি শিক্ষার্থীদের ‘দাবির কথা শুনবেন এবং পূরণেরও চেষ্টা করবেন’।
গেল এক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা তার সঙ্গে যোগযোগ করে বলেও দাবি করেন তিনি। এছাড়া অনেক শিক্ষকও ক্যাম্পাসের অচলাবস্থার নিরসন চান বলেও ভাষ্য উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমের।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ছাত্ররা যে আন্দোলন করছে, তাদের যেটা দাবি আমি শুনব। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা যেভাবে নিতে হয়, যুক্তি সঙ্গতভাবেই নেওয়া হবে।
“গত সাতদিন ধরে হলের কিছু শিক্ষার্থী বিভিন্নভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। কবে ক্লাস শুরু হবে তা নিয়ে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আমি ক্লাস করাতেই চাই। অনেক শিক্ষক, তারা ক্লাসে ফিরতে আগ্রহী। এরকম একটা অবস্থায় চিন্তা করলাম আমার আর বাইরে থাকা ঠিক হবে না। ক্যাম্পাসে অবস্থান করা জরুরি বিধায় আমি ক্যাম্পাসে আজকে সকালে চলে আসি।”
সোমবার ভবনের ফটকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার আগে নিজ কার্যালয়ে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম।
আগের উপাচার্য আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে গেল ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কর্মবিরতি পালন করছে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা চলছে।
এর মধ্যেই ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইনের মাধ্যমে কাজে যোগদান করেন নতুন উপাচার্য। তএ এরমধ্যে তিনি ক্যাম্পাসে আসেননি।
দায়িত্বে যোগদানের ১৭ দিন পর সোমবার সকালে অফিস সময় শুরুর আগে ক্যাম্পাসে আসেন নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। এ সময় উপাচার্য ভবনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেওয়া ‘তালা ভেঙে’ তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন বলে অভিযোগ ছাত্রছাত্রীদের।
এক পর্যায়ে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তাকে ক্যাম্পাস ত্যাগের আল্টিমেটাম দেয়। তখন উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। সেসময় তার সাথে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান নেতারা ছিলেন।
পরে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উপাচার্য ভবনে তালা দেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
‘এখন এখানে আমি না থাকলে সমস্যা’
এর আগে কার্যালয়ে বসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, নিয়মিত ক্লাস কিভাবে শুরু করা যায়। বিভাগীয় প্রধান ও দপ্তর প্রধানদের সাথে আলোচনা করে খুব দ্রুতই আমরা শিডিউলটা জানিয়ে দিব।
“যে তিন সপ্তাহে ১৪-১৫দিন ক্লাস হল না, এটার জন্য একটা একাডেমিক রিকভারি প্ল্যান আমরা তৈরি করব। অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের সাথেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। সকলের সদিচ্ছা থাকলে ইতিবাচকভাবে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিব ইনশাল্লাহ।”
উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম বলেন, “দিন শেষে তারা তো ছাত্রই। আমি যেহেতু একজন শিক্ষক, তো আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব। ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের টিমকে আসতে বলেছি। তারা আসলে ছাত্রদের সাথে বসব। শিক্ষকদের নিয়েই ছাত্রদের দাবি শুনব। ছাত্ররা দাবি দিতেই পারে। সেটা শোনা আমাদের কাজ। শিক্ষক হিসেবে অবশ্যই তাদেরকে বুঝাবো।
আলোচনা করেই সমস্যার সমাধান সম্ভব জানিয়ে উপাচার্য বলেন, “আমি মনে করি যদি শিক্ষার্থীদের যথাযথ আস্থায় নিতে পারি, তাহলে সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পারব।”
শিক্ষার্থীদের চলমান শাটডাউন এবং শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতি চলমান থাকায় কাজ করতে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হবেন কি না জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, “প্রতিবন্ধকতাটা ছিল, আমি যখন আসলাম ২২ তারিখের পরেই হঠাৎ করে যখন এরকম একটা কর্মসূচি আসল। এটা একেবারেই আনসার্টেন। আমি এটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।
“এটা হওয়ার পরে আমি সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, বিভিন্ন জায়গায়, উচ্চ মহলে সব জায়গায় যোগাযোগ করেছি। তাদের সাথে বুদ্ধি পরামর্শ করে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। যোগাযোগের একটা পর্যায়ে মনে হয়েছে যে, হ্যাঁ আমরা মোটামুটি আলোচনার এমন একটা পর্যায়ে যে পর্যায়ে হয়ত ক্যাম্পাসে অবস্থান করা যেতে পারে।”
তিনি বলেন, “এখন আমি চলে আসছি। এখন শিক্ষকদের সাথে কথা বলব। শিক্ষার্থীদের দাবি শুনব। যুক্তিসঙ্গত দাবি যেগুলো সেগুলো আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব। আর আমার আয়ত্ত্বের মধ্যে কিছু থাকলে আমি অবশ্যই করব।”
শিক্ষার্থীরা তাকে ক্যাম্পাস ত্যাগের আল্টিমেটাম দিয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। এতদিন ধরে যে শিক্ষক, কর্মকর্তা- কর্মচারীরাও আন্দোলন করেছে। কিভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন প্রশ্ন ছিল এক সাংবাদিকের।
শেখ শরীফুল আলম বলেন, “এমনও শিক্ষক বা শিক্ষার্থী আছেন যে আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে আছেন। কিন্তু মিছিল মিটিং শেষে আমার সাথেই যোগাযোগ করছে। যে স্যার, আমার রুমমেট বা অনেকে ব্ল্যাকমেইল করছে যে আগে ফ্রন্টলাইনে ছিলাম। এখন না থাকলে সমস্যা। এরকম একটা বিষয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে।
“শিক্ষকদের বেলায়ও একই বিষয়। যে আমার কলিগ বলছে। তাদের রেসপেক্ট করি, যেহেতু এটা একটা কমিউনিটি মুভমেন্ট। তারা কমিউনিটির সাথে থাকবেন। কিন্তু একজন ব্যক্তি হিসেবে তার প্রতিষ্ঠানকে যে সার্ভিস দেওয়ার, তা দেবেন আশা করি। সবাই সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের যে ব্যবহার সেটা করবেন তাহলে কোন সমস্যা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না।”
অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। অধ্যাপক সায়েমের সাথে যোগাযোগ হয়েছে কি না জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে শেখ শরীফুল আলম বলেন, “প্রফেসর সায়েম, আমরা সমসাময়িক ক্যাম্পাসে বিচরণ করেছিলাম। তিনি একজন ভদ্রলোক এবং অবশ্যই তিনি একজন ভালো শিক্ষক। এই ক্যাম্পাসের ছাত্ররা তাকে ভালোবাসবে, এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তিনি একজন রিসোর্সফুল পারসন। ফলে তাকে আমাদের ব্যবহার করতে হবে।
“উনি একজন গবেষক। একটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। সকালবেলাও তাকে একবার ফোন করেছিলাম, ফোনে পাইনি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করেছি। লিখেছি যে সায়েম, তোমার সহযোগিতা আমার দরকার। প্রতিষ্ঠানের দরকার। আমরা মিলেমিশে কাজ করব। আমরা একে অপরের এনিমি না। তার সঙ্গে আমার খুবই চমৎকার সম্পর্ক। সে রিয়েলি একটা জেন্টালম্যান।”
সাংবাদিকদের সাথে এই আলাপচারিতার পর সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উপাচার্য ভবনে তালা দেয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদ থেকে অপসারণ করা হয়। একই দিন অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওই রাতেই প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা।
রোববার ও সোমবার ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) আয়োজিত একটি সভায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল নতুন উপাচার্যের। এই দুদিনের জন্য যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. আরাফাত রহমানকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবে অন্য একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখান করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এর মধ্যে সোমবার সকালে হঠাৎ চুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ছাত্রদলপন্থী বর্তমান ও সাবেক আট থেকে দশজন শিক্ষার্থী সে সময় তার সঙ্গে ছিল।
সে সময় চুয়েটের মূল ফটক খোলা ছিল। তবে প্রশাসনিক ভবনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেওয়া তালা ছিল। ‘শিক্ষার্থীরাই সেই দাবি খুলে ফেলেছে’ বলে নতুন উপাচার্যের দাবি।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, নতুন উপাচার্য তালা ভেঙে তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
চুয়েটে নতুন উপাচার্যকে কার্যালয়ে রেখে ভবনে শিক্ষার্থীদের তালা
