অমিতাভ বচ্চনের দিলীপ কুমার

আন্দালিব রাশদীর অনুবাদে দিলীপ কুমারকে নিয়ে অমিতাভ বচ্চনের স্মৃতিচারণ

আন্দালিব রাশদীআন্দালিব রাশদী
Published : 29 July 2022, 02:05 PM
Updated : 29 July 2022, 02:05 PM

অমিতাভ বচ্চন লিখেছেন ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস লেখা হলে দুটো ভাগ করতে হবে : 'দিলিপ কুমারের আগে এবং দিলীপ কুমারের পরে'। তিনি এমনই অনতিক্রম্য মাইলস্টোন।

৭ জুলাই ২০২২ উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সর্বাধিক উচ্চারিত ও উদ্ধৃত নাম দিলীপ কুমারের মৃত্যুর এক বছর পূর্তি হলো।

২০২০ সালের ১১ ডিসেম্বর ৯৮ বছর পূর্ণ করে দিলীপ কুমার ৯৯ তে পা রাখলেন। বছরটা ভালো যায়নি। হাসপাতালে আসতে হয়েছে একাধিকবার। ২০২১-এর ৭ জুলাই তিনি বিদায় নিলেন।

তার ৫৬ বছরের বিবাহিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য' সঙ্গিণী সায়রা বানু বললেন, আমি যখনই মুখ তুলে চোখ খুলি, দেখতে পাই, তিনি (দিলীপ কুমার) আমার পাশে শুয়ে রয়েছেন। ঘরে যখনই সূর্যের আলো পড়ে , সেই রশ্মিতে তার গোলাপি গালে আলো প্রতিফলিত হয়। কিন্তু আমি বাস্তবটা জানি।’

সায়রা বানু একাধিকবার বলেছেন, আমি আর দিলীপ সাহেব যখন একটি পুত্র সন্তানের কথা ভাবি, আমরা অমিতাভ বচ্চনের কথাই মনে করি।

অমিতাভ বচ্চন দিলীপ কুমারকে নিয়ে ইংরেজিতে লিখেছেন, সেই লেখাটিই অনূদিত হলো।

চলচ্চিত্র শিল্পে কদম বাড়াবার আগে ছুটি কাটাতে বোম্বে আসি, এক বন্ধু আমাকে খাওয়াবে বলে একটি রেস্তোরাঁয় নিয়ে আসে। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল অবিশ্বাস্য এক চমক। বিস্ময় ও আনন্দের সাথে লক্ষ করি দিলীপ সাহেবও তাঁর বন্ধুদের একজনের সাথে এই রেস্তোরাঁয় এসেছেন।

আমি তার অটোগ্রাফ নিতে চাই, সুতরাং একটি যথার্থ অটোগ্রাফ খাতা কেনার জন্য কাছাকাছি একটি স্টেশনারি দোকানে ছুটি। যখন ফিরে আসি দেখি ভক্তরা তাঁকে ঘিরে রেখেছে, তিনি তাদের সাথে কথা বলছেন। আমি বুঝতে পারি এ সময় অনুপ্রবেশ করা এবং তাদের আলোচনায় বাধা সৃষ্টি করা অসমীচীন হবে। অনেকটাই আশাহত হয়ে আমি টেবিলে ফিরে আসি।

এই পেশায় যোগ দেবার পর একটি পুনর্মিলনীতে দিলীপ সাহেবের সাথে আমার খানিকক্ষণের দেখা হয়। সেখানে আমারও নিমন্ত্রণ ছিল। দু’বারই আমি গভীরভাবে প্রত্যাশা করেছি এমন দিন আসুক আমি যেন তার পাশে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবার যোগ্য হয়ে উঠি। কিন্তু আমার স্বপ্নটি মনে হয় অসম্ভব হয়ে উঠেছে কারণ দিলীপ সাহেব কেবল সে ছবিটাই করছেন যেখানে গল্পটা তার ভালো লেগেছে, যে চিত্রপরিচালককে তার পছন্দ হয়েছে। যে ব্যনার তার পছন্দের এবং যে অভিনেতাকে তিনি তার সাথে চলনসই বলে মনে করছেন অনেক যাচাই বাছাই করে কেবল সেসব সিনেমাতে অভিনয়ের সম্মতি জানাচ্ছেন।

আমি আর ভরসা পাচ্ছিনা সেদিন কি কখনো আসবে আমাকে দিলীপ সাহেবের সাথে একই সিনেমায় ডাকা হবে?

তত দিনে রমেশ সিপ্পির সিনেমা ‘শক্তি’ পরিকল্পিত হয়ে গেছে, এতে দিলীপ সাহেব একেবারে সোজা, দৃঢ়চেতা অভঙ্গুর ও দায়িত্ব-সচেতন পুলিশ কমিশনার। কাহিনীর রচয়িতা সেলিম জাভেদ, লেখক আমাকে বললেন, এই সিনেমায় আমাকে পুলিশ কমিশনারের বিদ্রোহী পুত্রের চরিত্রটা দেওয়া হবে, কারণ তারা বললেন, ততদিনে আমি অভিনয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। চলচ্চিত্র শিল্পে সিনেমা প্রেমিকদের জন্য এটি স্মরণীয় একটি কাস্টিং, এনিয়ে অভূতপূর্ব উৎসাহ, আমারও।

দিলীপ সাহেবের মতো অভিনেতার পাশে অভিনয় করার দক্ষতা নিয়ে আমি দু’টি কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। প্রথমত: এতো বছর ধরে আমি যার পুজো করে এসেছি, এমন ব্যক্তিত্বের সামনে আমি আনমনা হয়ে যেতে পারি। দ্বিতীয়ত: যদিও এটা অভিনয়, তবুও আমাকে বাবার বিরুদ্ধে কঠিন অসন্তোষ প্রকাশ করতে হবে এবং বিদ্রোহী হতে হবে- যে মানুষটিকে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, আমি যার গুণমুগ্ধ তা বিরুদ্ধে আমার পক্ষে এটা কেমন করে করা সম্ভব।

আমি পেছন সময়ে ফিরে যাই। ‘গঙ্গা যমুনা’ দেখার আগে থেকেই আমি অভিনেতা দিলীপ সাহেবকে ভীষণ ভক্তি করে আসছি। কিন্তু দিলীপ সাহেবের অভিনয় বৈচিত্র বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের গ্রামের মানুষের ভূমিকায় তার আঞ্চলিক ভাষায় কথোপথন এবং বাক্য প্রক্ষেপণ আমার কাছে এই সিনেমাটিকে বিশেষ প্রিয় করে তুলেছে। আমি নিজে উত্তর প্রদেশের মানুষ, যে প্রদেশের সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই, তার পক্ষে সেখানকার ভাষায় চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিখুঁত অভিনয় করে যাওয়া কতটা অসম্ভব ব্যাপার আমি আঁচ করতে পারি। আমার কাছে সেটাই মনে হয়েছে তার শ্রেষ্ঠ অভিনয়, আমি বরাবর তাই মনে করে যাব।

একই পেশার একজন ভ্রাতৃপ্রতিম ব্যক্তি হিসেবে এখন বুঝতে পারি এই যথার্থতা অর্জন করতে তাকে কত আত্মত্যাগ করতে হয়েছে, কতো নিবেদিত থাকতে হয়েছে। তার নিখুঁত কাজের দু’টি মৌলিক কারণ আমি খুঁজে পেয়েছি: তার কথোপকথনে যথার্থতা এবং শোনার সক্ষমতা। সঠিক বাচনশৈলীই অভিনয়কে প্রভাবিত করে এবং সামনের যে চরিত্র তাকে মনোযোগ দিয়ে শুনলে সিনেমাতেও ঘটনার যথার্থতা তুলে ধরা যায়। এ দুটোই দিলীপ সাহেবের পর্যাপ্ত ছিল বলেই আমি তার মমত্বের প্রশংসা করি।

যতক্ষণ পর্যন্ত না কাজে যথার্থতা আসছে ততক্ষণ নিরন্তর কাজ করে যাবার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আমি শিখেছি তার কাছে। সহশিল্পীকে শ্রদ্ধা করা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ আমি তাও দিলীপ সাহেবের কাছ থেকেই জেনেছি। আমি এক অভিনয় সন্ধ্যার কথা মনে করছি, ‘শক্তি’-র জন্য আমার একটি মৃত্যু-দৃশ্যের শুটিং হচ্ছিল। আমাদের সকল অভিনয় শিল্পীর জন্য মৃত্যুর শুটিং একটি কঠিন কাজ। কারণ আমাদের বিভিন্ন সিনেমার বিভিন্নভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয় এবং পরিচালক যে-ভাবে দৃশ্যটি তার কল্পনায় ধারণ করেছেন আমাদের সেভাবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়। অন্ততঃ একবার যেহেতু দৃশ্যটির রিহার্সেল করতে হবে দিলীপ সাহেব ও আমি শুটিং স্পট জুহুর প্রয়ারস্ট্রিপে রওয়ানা হলাম। ক্রু-র সংখ্যা অনেক। যখন শুটিং চলছে লাইটম্যান ও অন্যান্যদের মধ্যে বেশ জোরেসোরে কথাবার্তা চলছে।

দিলীপ সাহেব দেখলেন আমি আমার অভিনয়ের জন্য মানসিকভাবে এবং পূর্ণ আবেগ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছি, এটাই আমার ধরণ। আমরা রিহার্সেলের জন্য যতোই প্রস্তুতি সম্পন্ন করি না কেনো, ক্রুদের কোনো খেয়ালেই নেই, তারা হইচই করেই যাচ্ছে। তিনি আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলে তাদের সকলকে ডাকলেন। কোমল ভাষায় কিন্তু দৃঢ়ভাবে বললেন, একজন শিল্পী তার সমস্ত সত্তা দিয়ে অভিনয় করার চেষ্টা করেন এবং তারা আশা করেন সে সময় সেটে তার সহকর্মীরা নীরবতা বজায় রাখবেন এবং তাদের কাজটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবেন। ‘শিল্পীদের সম্মান করতে শিখুন’ বলে তাদের আবার কাজে পাঠিয়ে দিলেন। ঘটনাটি আমাকে খুব নাড়া দিল, একইভাবে ক্রুদেরও। এটা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য, বাকী দৃশ্যেও আমিই অভিনয় করব আর তিনি চাচ্ছেন আমি যেন আমার সর্বোত্তমটা দিতে পারি।

অসাধারণ ভালো মানুষ দিলীপ সাহেব। যিনিই তার নির্দেশনা চাইতেন তিনি তার জন্যই বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। ভাইবোনদের কাছেও তিনি ফাদার ফিগার, সম্ভবত পরিবার থেকেই তিনি এভাবে তৈরি হয়েছেন। এক গভীর রাতের কথা মনে পড়ছে, দুই লেখক সেলিম ও জাভেদ কোনো পূর্ব অনুমতি ছাড়াই আমাকে দিলীপ সাহেবের বাসায় নিয়ে যেতে চাইলেন। এভাবে যেতে আমি অনিচ্ছুক ছিলাম এবং বিব্রত বোধ করছিলাম-বিশেষ করে মুরুব্বিজনদের সাথে এ ধরনের কিছু করাটা আমার স্বভাবের বাইরে। দুজনেই বললেন, সমস্যা নেই ঠিকই আছে। গাড়ি চালিয়ে আমরা তার বাংলোতে পৌঁছে গার্ডের কাছে শুনলাম তিনি সেদিনের মতো সব কাজ শেষ করে শোবার ঘরে চলে গেছেন। আমি সেলিম-জাভেদকে বললাম আমাদের চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু তারা গার্ডকে বলল, গিয়ে বল আপনার বন্ধুরা গেটে অপেক্ষা করছে।

এরপর দেখলাম ঘরে আলো জ্বলে উঠল এবং তার ব্যক্তিগত খানসামা এসে আমাদের লিভিং রুমে নিয়ে এল। সাহেব বেডরুম থেকে বেরিয়ে হাসি মুখে এলেন, আমি বুঝতে পারলাম আমাদের দেখে তিনি অত্যন্ত খুশী হয়েছেন।

এমন অসময়ে তিনি অসাধারণ অতিথি-পরায়ন হয়ে উঠলেন। তিনি আমাদের নিয়ে মজা করলেন, অনেক পুরোনো গল্প বললেন। ভোর চারটার দিকে অনেকটা অনিচ্ছায় তার সান্নিধ্য ছেড়ে রাস্তায় নামলাম। তার যত্ন ও উষ্ণতা এমনই। যে প্রভাব সৃষ্টির দিকে ধাবিত করে, তার অবচেতন আত্মীকরণ ছাড়া গোটা বিশ্বে কোনো শিল্পকর্মের অস্তিত্ব থাকতে পারে না, তা বিকশিত হতে পারে না, এমনকি জন্মগ্রহণও করতে পারে না। লেখক কবি চিত্রশিল্পী যে কোনো ধরনের শিল্পী জীবনে যা কিছুর মুখোমুখি হয়েছেন সেখান থেকে তাদের প্রণোদনা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। আপনারা যদি আমাকে বলেন যে আমি দিলীপ কুমার সাহেবের কাছ থেকে তা পেয়েছি, তা হলে এটাই হবে আমার জন্য সর্বোত্তম সম্মান। কারণ আমি জানি তিনিই ছিলেন এবং এখনো তিনি আছেন সবচেয়ে শুদ্ধ, সবচেয়ে সঠিক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ।

তার অনির্বচনীয় উপস্থিতির কারণে আমার কাছে ভারতীয় সিনেমার দুটো ভাগ- দিলীপ সাহেবের আগে এবং দিলীপ সাহেবের পরে। কেউ যখন যাত্রা শুরু করেন কখনো মাইলস্টোন বদলায় না। আমার দিলীপ সাহেব চলচ্চিত্র শিল্পের মাইলস্টোন। এটি স্থায়ী ল্যান্ডমার্ক, আপনি মাইল তার আগে গুণুন বা পরে গুণুন।

যখন আপনারই আদর্শ আপনার সম্পর্কে এতো প্রশংসা করে তখন সর্বশক্তিমানের কাছে তার সহৃদয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে হয়। দিলীপ সাহেব একাধিকবার প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে আমার সম্পর্কে সদয় বিশেষণ ব্যবহার করে কথা বলেছেন। আমার কাছে দিলীপ সাহেব কেবল অতিকায় এক চলচ্চিত্র মেধাই নন, যিনি সর্বোচ্চ ঢেলে দিয়ে সহশিল্পীকে সমর্থন করেন- এমন ব্যক্তিত্বই পান তাৎক্ষণিক শ্রদ্ধা।

আমার ২০০৫ সালের ছবি ‘ব্ল্যাক’-এর প্রিমিয়ার শোতে উপস্থিত থেকে একে মহিমান্বিত করেছেন। ছবি শেষ হবার পর তিনি সিনেমা হলের সামনে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারপর দিলীপ সাহেব আমার দুহাত তার হাতে নিয়ে আমার চোখের দিকে তাকালেন- আমার কাছে তাই অতৃপ্তির মতো মনে হলো। তিনি কিছু বললেন না। কিন্তু আমি বলতে পারি সেই নীরবতাই ছিল তার সবচেয়ে উচ্ছল কথোপকথন- যা আমি কখনো শুনিনি। দিলীপ সাহেব আমার সিনেমাটি দেখার পর আপনি আমাকে যে বিস্ময়কর পত্রটি লিখেছেন, সে জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমি চিঠিটি বাধিয়ে আমার অফিসে স্থাপন করেছি- চিরদিন তা থেকে যাবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক