Published : 15 Mar 2026, 11:22 PM
তাদেউস রোজেভিচ একজন পোলিশ কবি, এক গভীর অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যানের কবি, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধোত্তর কালের এক বিখ্যাত কবি; একজন নগ্ন ও অবিশুদ্ধ কবি, তাঁর নিজের ভাষায়: অবিশুদ্ধ কবিতাকে আমি স্ফটিকায়িত করি। তিনি এমন একজন প্রতিকবি যিনি যত কঠোর আর অসহ্যই হোক না কেন, সত্যকে কবিতায় ধারণ করেছেন অবলীলায় ও উন্মুক্তভাবে। এজন্যই তিনি বলতে পারেন, একজন কবি হলেন একাধারে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের ভয়াবহ দুঃস্মৃতি তাঁর মননে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল যার রূঢ় নিঃসরণই তাঁর কবিতা। এজন্যই তিনি বলেন: আমার কবিতা কিছুকেই ন্যায্যতা দেয় না/কিছুই ব্যাখ্যা করে না/ কিছুকেই অস্বীকার করে না/ সমগ্রকে ধারণ করে না/ কোনো আশাকেই সফল করে না। আরেকটি কবিতার শুরুতেই তিনি বলেন: আমি লিখি জলের ওপর/ কয়েকটি বাক্য থেকে/কয়েকটি পঙক্তি থেকে/ আমি তৈরি করে ফেলি এক নৌকা/ প্লাবন থেকে কিছু একটাকে রক্ষা করতে/ যা হঠাৎ করেই আমাদের ধরে ফেলে। এখানে অনুবাদিত কবিতাগুলো নেওয়া হয়েছে ইয়োনা চেশচাক কর্তৃক পোলিশ থেকে ইংরেজিতে অনূদিত সবিং সুপারপাওয়ার: সিলেক্টেড পোয়েম অব তাদেউস রোজেভিস নামীয় গ্রন্থ থেকে।
উন্দে মালুম?
কোথা থেকে আসে অমঙ্গল?
কোথা থেকে আর,
তা আসে মানুষ থেকে,
সর্বদাই মানুষ থেকে,
আর কেবল মানুষ থেকেই।
মানুষ হলো
প্রকৃতির নিজস্ব কাজের সময়টাতে
ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা
প্রকৃতির এক ভুল
যদি মানবজাতি
নিজেকে জটমুক্ত করতে পারে
উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের মিথোজীবিতা থেকে
পৃথিবী আবার ফিরে পাবে
তার সৌন্দর্য ও দীপ্তি
প্রকৃতি ফিরে পাবে তার
পবিত্রতা আর
সারল্য
মানুষই একমাত্র সত্তা
যে ব্যবহার করে শব্দ
আর সেই শব্দ ব্যবহৃত হতে পারে
অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে।
শব্দ, যে মিথ্যা বলে
সংক্রামিত হয়ে সৃষ্টি করে ক্ষত
অমঙ্গল আসতে পারে না কোনো অনুপস্থিতি
বা শূন্যতা থেকে
অমঙ্গল আসে মানুষের কাছ থেকে
আর কেবল মানুষেরই কাছ থেকে
কান্ট যেমনটা বলেছেন---আমরা প্রত্যেকেই চিন্তায় ভিন্ন ভিন্ন,
আর সে কারণেই আমাদের সত্তা
বিশুদ্ধ প্রকৃতি থেকে হয়ে যায় আলাদা আলাদা।
*উন্দে মালুম: লাতিন শব্দ, যার অর্থ, অমঙ্গল কোথা থেকে আসে’?
দার্শনিকরা
‘সত্যের সার হলো স্বাধীনতা’---
১৯৩০ সালে লিখেছিলেন মার্টিন হাইডেগার
পরে তিনিই যোগ দেন হিটলারের দলে,
‘নাৎসিদের লাফানো পুতুল’, বা
এই নামেই তাঁকে ডাকতেন কার্ল ইয়ার্সপার্স,
যিনি ছিলেন দার্শনিকদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণ ।
কিন্তু তিনিও ঠিক ছিলেন না, যখন তিনি
হিটলারের বিজয়ে আতঙ্কিত হয়ে হান্না আরেন্টকে বলে বসেছিলেন,
`এ সবকিছুই এক প্রহসন-নাটক,
আমি কোনো প্রহসন-নাটকের নায়ক হব না’
হান্না আরেন্ট করলেন দেশত্যাগ...
ইয়ার্সপার্স থেকে গেলেন...
আর তিনি এবং তাঁর ইহুদি স্ত্রী গার্ট্রুড
শীঘ্রই বুঝলেন এটা ছিল না কোনো প্রহসন-নাটক।
ছেয়ে যাওয়া স্ফটিক রজনী
জার্মানি ও ইউরোপজুড়ে
নক্ষত্রখচিত আকাশ হয়ে গেল ম্লান,
দূর হলো নৈতিক বিধান।
কেন আমি লিখি?
কখনো কখনো ‘জীবন’আড়াল করে
সেই জীবনকে
যা জীবনের চেয়েও বড়ো
কখনো কখনো পর্বত আড়াল করে এমনকিছুকে
যা পর্বতকে ছাড়িয়ে থাকে ওপাশে
সুতরাং আমাদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে পর্বত সরানোর
কিন্তু আমাদের তো নেই প্রয়োজনীয় সব প্রযুক্তি,
না আছে শক্তি
না বিশ্বাস
যা দিয়ে পর্বতকে সরাতে পারি আমরা
সুতরাং তুমি কখনো
তাকে দেখতে
পাবে না
আমি তা জানি
সেজন্যই আমি লিখি
প্রেম, ১৯৪৪
নগ্ন, বাধাহীন
ঠোঁটের ’পর ঠোঁট
চোখ ডাগর উন্মুক্ত
কান পেতে শুনছে
সাঁতরে আমরা
পারি দিলাম অশ্রু ও রক্তের সাগর
আমার কবিতা
আমার কবিতা
কিছুই প্রমাণ করে না
কিছুই ব্যাখ্যা করে না
কিছুই ত্যাগ করে না
কোনো পূর্ণতাকে ধারণ করে না
কোনো আশাকে পূরণ করে না
খেলার কোনো নতুন নিয়ম তৈরি করে না
উল্লাসে অংশ নেয় না
তার একটি নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে
যা তাকে দখল করতেই হবে
যদি তা গুপ্য না হয়
যদি তা না হয় মৌলিক
যদি তা বিস্ময় জাগাতে না পারে
তবু বোধহয় সেটাই ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত
এটি মানে তার নিজের আদেশ
নিজস্ব সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতায়
এটি নিজের কাছেই হেরে যায়
এটি নিয়ে নিতে পারে না অন্যদের স্থান
অন্য কিছু দিয়েও প্রতিস্থাপন করা যায় না তাকে
সবার জন্য উন্মুক্ত তা
রহস্যহীন
এর অনেক লক্ষ্য রয়েছে যা
কখনো সে অর্জন করতে পারবে না
বেড়ে ওঠা রহস্য
সন্তানরা তাদের মা-বাবার কাছে
এক রহস্য
ভালোবাসার বাহুতে জন্ম নেওয়া
বা ঘৃণা বা উদাসীনতায় জন্ম নেওয়া
একটি শিশু
এক ধাঁধা
যার সমাধান তারা
জীবনের শেষ পর্যন্তও করতে পারে না
সন্তানরা এক রহস্য
যা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলে
আর তারপর চলে যায়
আলোছায়া
আমার কবিতার ওপর
যখন ছায়া পড়ে
আমি তাতে আলো দেখি
একগুঁয়ে ক্ষীণ
একটি জীবন
ক্ষুদ্র মৃত্যু
তার প্রথম পদক্ষেপ নেয়
দ্রুত পরিণত হয়
বেড়ে ওঠে
রাতে শুয়ে থাকে
আমার হৃদয়ে
আমার ঠোঁটে
কালো পাথরে খোদাই করা
সমুদ্রের মতো
চীৎকার করে উঠেছিলে তুমি রাতে
ভীষণভাবে
ভয়ংকারভাবে
আমার স্ত্রী বলে:
ওটা ছিল মৃত্যু
এক জীবন্ত সত্তা
আমার ভেতরে পথ খুঁড়ছিল
মৃত্যু চীৎকার করেছিল আমার ভেতরে্
একটি পরিত্যক্ত গুহার মতো
হাড়ে ভরতি
যখন আলো পড়ে
আমার কবিতার ওপর
আমি তাতে দেখি মৃত্যু
সোনালি গমের মাথায় জন্মানো
একটি কালো দানা
যা ভেসে চলে যায়
দিগন্তের ওপারে
একজন সাধারণ কবি
কখনো কখনো আমার দুশ্চিন্তা হয় এই ভেবে যে
আমি অতি সাধারণ একজন
কখনো কোথাও এ নিয়ে লিখেছি আমি
আমি চিন্তিত নই, কিন্তু ভাবতে শুরু করেছি যে
একজন ‘‘কবি’’ কোনো ঘটনা নয়
এমন ভাবনাটা হয়তো ঠিক না।
বুনো, কাব্যিক, রঙিনচঙিন,
কিছুটা উন্মাদ কিছুটা প্রেমিক এমন-একজনের মতো
নিজের একখানি ভাবমূর্তি গড়ার এখনই উৎকৃষ্ট সময়।
কিন্তু সমস্যা হলো,
আমি মিশনারি ধাঁচের ভালোবাসা পছন্দ করি,
হাঁটতে ভালোবাসি
সন্ত পলের অনুশাসন অনুযায়ী
আমি এমনই একজন স্ত্রীর স্বামী
সকাল ছয়টায় উঠি
বাথরুমে যাই এবং অন্যবিধ কাজ সারি
আমার দাড়ি নেই
এমনকি ছাগুলে দাড়িও না,
বা কাঁধের ওপর ঝুলে পড়া
কোঁকড়া চুলও নেই।
একটি মুহূর্তের তরে আমি মৃত্যুর কথাটা ভাবি,
একটি কবিতা সংশোধন করে নিই
তারপর জীবনের ভেতর
ডুব দিই।
সন্ধ্যায় আমি ছিড়ে ফেলি
ক্যালেন্ডারের আরেকটি পৃষ্ঠা
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৭
বছরের ২৬৭ তম দিনটি
সূর্যের উদয়: সকাল ৬টা ২৪ মিনিটে
অস্ত সন্ধ্যা: ৬ টা ৩১ মিনিটে
পৃষ্ঠাটির পেছনেই রয়েছে
কাটলেট বানানোর একটি রেসিপি
গরম কড়াইয়ে ভাজো কাটলেট (…)
দু পাশটাই বাদামি বাদামি করে
আগে বেসনে মাখিয়ে নাও
ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমি পড়ে নিই
সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক
নানাধরনের মাসিক, দ্বিমাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকাদি।
আর দেখি ( আশ্চর্য হয়ে)
আমার নারী ও পুরুষ সহকর্মী কবিদের
কবিতাগুলো ধীরে ধীরে
আমার কবিতার মতোই হয়ে উঠছে
আর আমার পুরোনো কবিতাগুলোও
যেন তাদের নতুন কবিতার মতো হয়ে উঠছে