Published : 01 Oct 2025, 05:25 PM
সৈয়দ মুজতবা আলী ও মুহম্মদ এনামুল হকের দুটি ঐতিহাসিক লেখারই প্রথম প্রকাশের তথ্য উদ্ধৃতিসহ লিপিবদ্ধ করেছিলাম বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সাময়িকপত্র বিষয়ক বইগুলোতে । পঁচিশ-ত্রিশ বছর পর দুটি লেখার তথ্য যাচাই করতে গিয়ে এবং দুইজন বাঙালি মনস্বী লেখকের দার্শনিক চিন্তার ঐক্য দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। দুটি লেখারই সময়কাল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের দেড়-দুই মাসের মধ্যে। সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখাটি ৯ নভেম্বর ১৯৪৭ তারিখের সিলেটের “কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে’’র ১১ বর্ষের নির্ধারিত তৃতীয় সাহিত্য সভায় প্রদত্ত একটি বক্তৃতা। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত ওই আলোচনা সভার সভাপতি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় লেথক ও বুদ্ধিজীবী মুহম্মদ মুসলিম চৌধুরী । তিনিও “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন।
সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা পড়বার সময়ে উর্দূপন্থিরা হইচই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেন এবং একপর্যায়ে তাকে পড়াটি স্থগিত করতে হয়। তিনি পরে পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধটি মনীষী হুমায়ুন কবির সম্পাদিত কলকাতার ত্রৈমাসিক চতুরঙ্গ পত্রিকার দশম বর্ষ প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় [ দুই কিস্তিতে ১৩৫৫) প্রকাশ করেন । আল্ ইসলাহ্ (সম্পাদক নূরুল হক) পত্রিকার ১১ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যায় প্রথমে সম্পাদক এর সারাংশ প্রকাশ করেন টীকাসহ। ১১বর্ষ সপ্তম-দ্বাদশ (১৩৫৫) সংখ্যায় দীর্ঘাকারে প্রবন্ধটি পুনঃ প্রকাশিত হয়।
কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পুরোধা তাত্ত্বিক-পুরুষ এবং নির্ভীক প্রবক্তা মুহম্মদ এনামুল হকের লেখাটি ঢাকাসংলগ্ন নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে প্রকাশিত “কৃষ্টি” পত্রিকায় ১৯৪৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসেই “পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষার পরিপ্রেক্ষিতে উর্দূ ও বাংলা” নামে প্রকাশিত হয়েছিল । এই পত্রিকার উদ্যোক্তাদের সকলেই ছিলেন কমিউনিস্ট আদর্শের সংস্কৃতিকর্মী। পরিচালকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন– সুধাংশু রায়, প্রভাত সরকার, সাধন চ্যাটার্জী, ফুলদা রায় ও জীবন গোস্বামী প্রমুখ। তাঁদের ছিল ঢাকা শহরের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ। প্রবন্ধটি তাই সাড়া ফেলেছিল। এবং ইতিহাসেও যথারীতি স্থানলাভ করেছে।
কৃষ্টির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে তাঁর [ মু. এ. হক ] যোগাযোগ ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখি-- ড. মুহম্মদ এনামুল হক ১৪.৭.১৯৪৫ থেকে ৯.৪.১৯৪৮ সময়কালে ছিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ঢাকার শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সমাজের কাছে তাঁর পাণ্ডিত্য ও ব্যক্তিত্ব অনবগত ছিল না। তাই পত্রিকার প্রগতিশীল সম্পাদকমন্ডলী জাতীয় জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর মতো নির্ভীক ও শাণিত-যুক্তিঋদ্ধ লেখার জন্য তাঁর কাছে আসবেন-- সেটাই ছিল স্বাভাবিক। লেখাটি পুনর্মুদ্রণের ক্ষেত্রে আমরা লেখকের বানানরীতি অক্ষুণ্ণ রেখেছি।–ইসরাইল খান
মুহম্মদ এনামুল হক এমএ বিটি, পিএইচ ডি
যুদ্ধোত্তর বিশ্বের সাম্প্রতিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম। আয়তন ও লোকসংখ্যায় ইহা পৃথিবীর স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বৃহত্তর। ইহার অভ্যুদয়ও বিশ্বের একান্তই বিস্ময়-স্বরূপ। সুতরাং, ইহার প্রতি শুধু মুসলিম জগতের উৎসুক দৃষ্টি যে নিবদ্ধ তাহা নহে, বরং নিখিল বিশ্বের কৌতুহলোদ্দীপক লক্ষ্যও ইহার প্রতি নিবদ্ধ রহিয়াছে। অধিকন্তু আশা করা যাইতেছে যে, অচিরাৎ পৃথিবীর এই বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিক্ষা-দীক্ষায় ও সভ্যতা-সংস্কৃতিতে বিশ্বের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র গুলির নেতৃত্ব গ্রহণ করিবে। এ হেন অপর্যাপ্ত সম্ভাবনা লইয়া যে রাজ্য বিশ্বের রাষ্ট্রসঙ্ঘে আপন ন্যায্য স্থান অধিকার করিতে চলিয়াছে যাহাতে তাহার সর্ব ক্রিয়াকলাপ সকল বিষয়ে আদর্শ স্থানীয় হইয়া উঠে সে সম্বন্ধে ইহার প্রত্যেক নাগরিক সচেতন ও সচেষ্ট হওয়া আবশ্যক বলিয়া মনে হয়। প্রধনত : এই কারণেই বক্ষ্যমাণ বিষয়ের অবতারণা করা হইতেছে।
পাকিস্তান একটি বিশাল রাষ্ট্র। পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই অঞ্চলে ইহা বিভক্ত। পাঞ্জাবের অধিকাংশ, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ লইয়া ইহার পশ্চিম অঞ্চল গঠিত এবং আসামের কিয়দংশ অর্থাৎ সিলেট বা শ্রীহট্ট ও বাংলার অধিকাংশ লইয়া ইহার পূর্ব-অঞ্চল সৃষ্ট। ভৌগোলিক দিক হইতে এই রাষ্ট্রের দুই অঞ্চলের সংস্থান আদর্শস্থানীয় নহে; কেন না ইহার পূর্বভাগ পশ্চিমভাগ হইতে প্রায় এক হাজার মাইল ব্যবধানে অবস্থিত। ফলে, এই রাষ্ট্রের এক অংশের সাহিত অপর অংশের যোগাযোগ রক্ষা করা একটা জটিল সমস্যায় পরিণত হইয়ছে। জল, স্থল ও বিমান-পথে শান্তির সময় এই যোগাযোগ রক্ষা করা কতকটা সহজ; কিন্তু দেশে অশান্তি দেখা দিলে, সে যোগাযোগ রক্ষা করা একরূপ কঠিন। এই সমস্যার সুচারু সমাধান কখন সম্ভবপর হইবে, তাহা একমাত্র ভবিতব্য বলিতে পারে।
সংস্কৃতির দিক হইতেও পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অবস্থা একরূপ নহে। পশ্চিম-পাকিস্তান অর্থাৎ পাঞ্জাব, সিন্ধু বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ এক ভৌগোলিক প্রভাবে প্রভাবিত একটি বিস্তীর্ণ ভূভাগ। এই ভূখণ্ডের অধিবাসিবৃন্দের মানব-গোষ্ঠীগত-বৈশিষ্ট্য, জীবন-যাপন প্রণালী, শিক্ষা-দীক্ষা, ধ্যান-ধারণা প্রভৃতি অবিকল একরূপ না হইলেও, দুই-তৃতীয়াংশ একরূপ। পক্ষান্তরে, পূর্ব-পাকিস্তান অন্য এক ভৌগোলিক প্রভাবে প্রভাবিত অঞ্চল। ইহার মানবগোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য, জীবন-যাপন-প্রণালী, শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-ব্যবহার প্রভৃতি তিন চতুর্থাংশ একরূপ। প্রকৃতিই এই অঞ্চলের লোককে এমনভাবে সৃষ্টি করিয়াছে যে, ইহাদের মধ্যে উক্ত শ্রেণীর সাংস্কৃতিক দিক্ হইতে কোন প্রকারের সামঞ্জস্য নাই।
তবে, ধর্মীয় দিক্ হইতে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একসূত্রে আবদ্ধ; বলা বাহুল্য, এই অঞ্চলদ্বয়ের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কথা বাদ দিয়াই চিন্তা করা হইতেছে। মনে রাখা উচিত, ধর্ম মানব-সংস্কৃতির একটি প্রধান অংশ বটে, কিন্তু ইহা তাহার সমস্তটুকু নয়। একমাত্র ধর্ম ব্যতীত মানব-সংস্কৃতির অন্যান্য দিক, যেমন, ভৌগোলিক প্রভাব, মানব গোষ্ঠীগত বৈশিষ্ট্য, জীবন-যাপন প্রণালী, শিক্ষা-দীক্ষা, আচার-ব্যবহার প্রভৃতি দিক্ হইতে পাকিস্তানের উভয় অংশে সাদৃশ্যের চেয়ে বৈসাদৃশ্যের ভাগই বেশি।
এখন প্রশ্ন হইতেছে, রাজনীতির ক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ধর্ম-বন্ধনের স্থান কোথায়? ইতিহাস প্রমাণ করিতেছে, রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রক্তের বন্ধন, স্বার্থের বন্ধন, সংস্কৃতির বন্ধন, সম্প্রীতির বন্ধন প্রভৃতির ন্যায় ধর্ম-বন্ধনও অচ্ছেদ্য বন্ধন নহে। যদি তাহা হইত, মিসরীয় মুসলমান ইরানের মুসলমান হইতে, তুরষ্কের মুসলমান আরবের মুসলমান হইতে, আলজিরিয়ার মুসলমান ভারতের বা আফগানিস্তানের মুসলমান হইতে, আমেরিকার খ্রীষ্টান ইংল্যান্ডের খ্রিস্টান হইতে, রাশিয়ার খ্রীষ্টান ফ্রান্স বা জার্ম্মেনীর খ্রীষ্টান হইতে কখনও পৃথক হইত না। অথচ আজ সকলেই ভিন্ন ভিন্ন।
ভাষার বেলায়ও এই মূলনীতির ব্যতিক্রম নাই। সুতরাং ভাষার বন্ধনও অচ্ছেদ্য বন্ধন নহে। ইতিহাস স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়া রাখিয়াছে, কোন দেশ ইহার নিজের ভাষা দিয়া অপর দেশকে বাঁধিয়া রাখিতে পারে নাই। যদি তাহা সম্ভবপর হইত, ইংরেজী ভাষাভাষী মার্কিন জাতি ইংরেজী ভাষাভাষী ইংরেজ জাতি হইতে পৃথক হইত না; আরবী ভাষাভাষী মিসরীয়গণও কি কখন আরবী-ভাষাভাষী আরবীয়দের কাছ হইতে সরিয়া পড়িয়া পৃথক রাজ্য গঠন করিত? ইংরেজী ভাষাভাষী আয়ারল্যান্ডও কি কখনও ইংরেজদের কাছ হইতে সরিয়া পড়িত? প্রকৃত পক্ষে, ধর্মই বলুন আর ভাষাই, কিংবা অন্য যে কোন বন্ধনের কথাই পাড়ুন, কোন কিছুই রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে মানুষকে মানুষের সহিত, তৎসূত্রে দেশকে দেশের সহিত, কখনও অতীতে বাঁধিয়া রাখিতে পারে নাই, বর্ত্তমানেও বাঁধিয়া রাখিতেছে না এবং ভবিষ্যতেও বাঁধিয়া রাখিবার সম্ভাবনা দেখিতেছি না।
এতদসত্ত্বেও এক দেশের মানুষের সহিত অন্য দেশের মানুষের সম্বন্ধ যুগে যুগে গড়িয়া উঠিয়াছে, নূতন নূতন রাষ্ট্র সংগঠিত হইয়াছে। সাম্প্রতিক যুগেও দেশ-দেশান্তরের লোক কত নূতন রাষ্ট্র গঠন করিতেছে কিংবা গঠনের আয়োজন করিতেছে। ইহাও বা কি করিয়া সম্ভবপর হয়? বস্তুত; এক বা একাধিক দেশের মানুষের মধ্যে একই প্রকৃতি বিশিষ্ট প্রেরণার প্রাবল্য ঘটিলে, সেই বা সেই-সেই দেশের মানুষ মিলিয়া একটি নূতন রাষ্ট্র-বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বিশ্বের সাম্প্রতিক সম্মিলিত রাষ্ট্রগুলিই এই নীতির প্রধান ও আধুনিক উদাহরণ।
পাকিস্তানও একটি আধুনিক সম্মিলিত রাষ্ট্র। যে সমস্ত রাজ্য বা দেশ লইয়া এই রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিয়াছে ইহাদের অধিকাংশ শিক্ষিত অধিবাসী মনে করেন পাকিস্তান আধুনিক রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য হইতে মুক্ত নহে। সত্যই আধুনিক রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য লইয়াই পাকিস্তান গঠিত হইয়াছে এবং ভবিষ্যতেও রূপ গ্রহণ করিবে। এখন প্রশ্ন দাঁড়াইতেছে, কোন্ প্রকৃতিবিশিষ্ট প্রেরণার প্রাবল্য ঘটায়, বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত-প্রদেশ প্রভৃতি পাঁচ-পাঁচটি দেশ মিলিয়া এক রাষ্ট্রীয় বন্ধনে আবদ্ধ হইল? ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক প্রেরণাকে যাঁহারা এই নবীন-রাষ্ট্রের অন্তঃসলিলা ফল্গু বলিয়া মনে করেন, কিংবা প্রকৃত রাষ্ট্রীয়-বন্ধন বলিয়া নির্বিচারে স্বীকার করেন, তাঁহাদের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টি স্বচ্ছ ত নহেই, বরং অদূরদর্শিতার ঘোর কুয়াশাজালে সমাচ্ছন্ন। একই সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ কয়েক কোটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতেই এই রাষ্ট্র পরিকল্পিত ও পরিমূর্তিত বলিয়া ইহার গঠনের মূলে শুধু ধর্ম ও সম্প্রদায়ই নিহিত--এমন মনে করা সুস্থবুদ্ধি ও বলিষ্ঠ মননশীলতার পরিচায়ক নহে। নিবিষ্টভাবে চিন্তা করিলে দেখা যাইবে, পাকিস্তান রাষ্ট্র-গঠনে ধর্ম বা সম্প্রদায় বড় নহে, আত্মনিয়ন্ত্রণই বড়। কেন না, আত্মনিয়ন্ত্রণ-নীতির ভিত্তিইে এই রাষ্ট্র পরিকল্পিত ও পরিমূর্তিত। মনে রাখিতে হইবে, আত্মনিয়ন্ত্রণ-নীতি পরার্থপরতার নীতি, নিঃস্বার্থতার নীতি নহে। এই জন্য রাষ্ট্রীয়- ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণের অর্থ আত্মপ্রাধান্য স্থাপন, আত্মবিসর্জন নহে। কারণ, আপন-আপন ধর্ম-কর্ম, শিক্ষা-দীক্ষা, ভাব-অভ্যাস, সভ্যতা-সংস্কৃতি, জীবন-যাপন প্রণালী প্রভৃতির ন্যায় বিষয়গুলি সম্মানজনকভাবে রক্ষা ও পুষ্ট করিয়া স্বাধীনভাবে বাঁচিয়া থাকার নামই আত্মনিয়ন্ত্রণ। যেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, ধরিয়া লইতে হইবে, সেখানে নিজের চিন্তাই প্রবল, অপরের চিন্তা দুর্বল। এই নীতিতে পাকিস্তান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত বলিয়া, এই রাষ্ট্রান্তর্গত দেশগুলি বিশেষ করিয়া পূর্ব-পাকিস্তান যদি নিজের কথাই বেশি করিয়া চিন্তা করে, তাহাতে অস্বাভাবিকতা দেখিবার কোন সঙ্গত কারণ নাই।
প্রকৃতপক্ষে, পূর্ব্ব-পাকিস্তান বর্তমানে নিজের কথাই বেশি করিয়া ভাবিতেছে। ইহার একমাত্র কারণ,--নানা দিক্ হইতে আজ তাহার আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতি আক্রান্ত। অধিকন্তু, ভাষার দিক হইতে এই নীতি আক্রান্ত হইবার যে সম্ভাবনা সম্প্রতি দেখা দিয়াছে, তাহাতে পূর্বপাকিস্তানের পক্ষে বিচলিত হইবারই কথা। পূর্বপাকিস্তানের আপন ভাষা বাংলা। আত্মনিয়ন্ত্রণ নীতি অনুসত হইলে, পাকিস্তানের দিক্ হইতে বাংলা-ভাষার উপর হস্তক্ষেপ করা যায় না। কিন্তু, চতুর্দ্দিকের হাব-ভাব দেখিয়া মনে হইতেছে, রাষ্ট্রীয়-ক্ষেত্রে বাংলা উর্দূর দ্বারা স্থানান্তরিত হইবে। এই সম্ভাবনাই পূর্বপাকিস্তানের জীবনী-শক্তির মূলে আঘাত করিয়াছে। সুতরাং, পূর্বপাকিস্তান বিচলিত না হইয়া পারে না।
সম্প্রতি অনেকেই উর্দূকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে চালাইবার কথা চিন্তা করিতেছেন। আমাদের কোন কোন রাষ্ট্রনায়ক ইতোমধ্যেই উর্দূর পক্ষে কিছুটা প্রচারণাও চালাইয়াছেন। আবার কেহ কেহ পূর্ব-পাকিস্তানে উর্দূর প্রচুর সম্ভাবনা সম্বন্ধে দিবাস্বপ্নও দেখিতে আরম্ভ করিয়াছেন। উর্দূ ভাষার প্রতি কাহারও যে অশ্রদ্ধা আছে, তাহা নহে। উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করিলে পূর্বপাকিস্তানবাসীর লাভ-লোকসান কতখানি, তাহার খতিয়ান করিয়া না দেখিয়া, ইহাকে গ্রহণ করা নিতান্তই নির্বুদ্ধিতার কাজ হইবে। বিশেষ করিয়া যে নবীন রাষ্ট্রের মঙ্গল চিন্তায়---কেননা আমরা অমঙ্গলের কথা ভাবিতেই পারি না। উর্দূকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষারূপে প্রবর্তিত করিবার কথা উঠিয়াছে, ইহার প্রচলনে সেই রাষ্ট্রের মঙ্গলামঙ্গল কতখানি সাধিত হইবে, সে বিষয়ে বিচার করিয়া না দেখা একান্তই অদূরদর্শিতার পরিচায়ক।
উর্দূকে পূর্ব পাকিস্তানবাসী রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করিবে কিনা, জানি না। হয়ত বা তাঁহারা তাহা করিবেন না। তবে, একথা একান্তই সত্য যে, যদি তাঁহারা উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করেন, তাঁহাদের মাতৃভাষা বাংলাকে উদ্বন্ধনে মারিবার ব্যবস্থা পূর্বাহ্নেই করিয়া রাখিতে হইবে। কেননা, রাষ্ট্র-ভাষার পশ্চাতে থাকিবে এক বিরাট রাষ্ট্রশক্তি। এই ভাষার সহিত সংগ্রাম করিয়া বাঁচিয়া থাকার শক্তি যে বাংলা-ভাষার নাই, সে কথা মনে করি না। কিন্তু, তাহা জীবন্মৃত অবস্থায় বাঁচা,--আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতিতে বাঁচা নয়। এই জাতীয় বাঁচার চেয়ে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের নীতিতে বাঁচার মূল্য অনেক। আমার দেশে আমি ঘরে-বাহিরে আমার ভাষায় কথা বলিতে পারিব না, আমার ভাষায় লিখিতে পড়িতে পারিব না, ব্যবসা-বাণিজ্য চালাইতে পারিব না, নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার ব্যতীত অন্য কোন ব্যাপারে মনের মত করিয়া সুখ-দুঃখ প্রকাশ করিতে পারিব না,-- ইহার চেয়ে বৃহৎ আত্ম প্রবঞ্চনা ও আত্মহত্যা আছে কি? সত্যই আমরা আত্মপ্রবঞ্চনা ও আত্মহত্যাকে যদি আত্মনিয়ন্ত্রণ বলিয়া স্বীকার করিয়া লই, তবে কে আমাদিগকে বাঁচাইবে?

বর্তমানে ইংরেজি আমাদের রাষ্ট্র-ভাষা। আমাদের শতকরা নব্বই জন শিক্ষিত ব্যক্তি ইংরেজী-ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপন্ন। তাঁহারা ইংরেজী-সাহিত্যে বিশেষ পোক্ত হউন বা না হউন, অন্তত: ইংরেজী-ভাষা বড় একটা ভুল লেখেন না। এই জন্য তাঁহাদিগকে যে পরিমাণ মানসিক শক্তি দীর্ঘদিন ধরিয়া ক্ষয় করিতে হয়, তাহার ফলে তাঁহাদের মধ্য হইতে প্রায় শতকরা নব্বই জন বাংলা-ভাষায় নিতান্তই অজ্ঞ থাকিতে বাধ্য হন। বাংলা লেখা ও পড়ার অনভ্যস্ততার ফলে এবং শিক্ষা করার সুযোগের অভাবে, বিশেষ করিয়া ব্যবহারিক জীবনে বাঙলার কোন মূল্য না থাকায় তৎপ্রতি উপেক্ষা বশত: ইংরেজী শিক্ষিতগণ যখন স্বাভাবিক মানসিক প্রেরণায় বাংলা লিখিতে চাহেন কিংবা অন্য কোন কারণে লিখিতে বাধ্য হন, তখন তাঁহারা এতখানি বেগ পাইতে থাকেন যে বাংলা তাঁহাদের কাছে একটি বিদেশী ভাষার চেয়েও অধিক কঠিন বলিয়া মনে হয়। প্রধানত : এই কারণেই, বাংলা বানান, বাংলা হরফ, বাংলা ব্যাকরণ, বাংলা-ভাষা প্রভৃতি সম্বন্ধে তাঁহাদের মুখ হইতে এমন সব কথা শুনিতে পাওয়া যায়, যাহা শুনিলে হাসি সংবরণ করা কঠিন হইয়া পড়ে। এই সমস্ত কথা তাঁহাদের দাস-সুলভ মানসিকতারই পরিচায়ক।
বাংলার দিক হইতে বিবেচনা করিলে বলিতে হয়, ইহারা পণ্ডিত-মূর্খ। এতসত্ত্বেও মান-সম্মান, চাকরি-বাকরি বা সামাজিক প্রভাব প্রতিপত্তি, এমন কি বৈবাহিক মাহার্ঘ্যও ইহাদেরই একমাত্র প্রাপ্য। আর, সঙ্গে সঙ্গে উপেক্ষা, বিদ্রুপ অবহেলা অসম্মান প্রভৃতিই হইল বাংলা। ভাষাভিজ্ঞ ব্যক্তিদের ললাটলিপি। বাজার-দর বলিতে ত ইহাদের কিছুই নাই; ইহারা যেন বিকাইতেই চাহেন না। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজী জ্ঞানের মাপকাঠিই জীবনের যাবতীয় ক্ষেত্রে এখন যোগ্যতার মান বলিয়া ধরা হইয়া থাকে। ইংরেজী ভাষা আমাদের বর্তমান রাষ্ট্র-ভাষা না হইলে, এমনটি কখনও হইত কি? উর্দূ আমাদের রাষ্ট্র-ভাষা ইহলে, এইরূপ ব্যাপার যে হইবে না, এমন চিন্তা করাও নিছক বাতুলতা নয় কি?
রাষ্ট্র-ভাষায় অনভিজ্ঞতা এক মহা বিড়ম্বনার বিষয়। ইহা একটি ব্যক্তিগত এবং তৎসূত্রে জাতিগত অপমানের বিষয়ও বটে। এইখানে ‘জাতিগত’ শব্দের দ্যোতনা ‘ধর্মীয় জাতির’ দ্যোতনা নহে,--এক ভাষাভাষী মানব গোষ্ঠীগত জাতীয়তার ব্যঞ্জনাই লক্ষ্য। রাষ্ট্র ভাষা না জানিলে মানুষরূপে নিজের দেশেও বাস করা যায় না; একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিকরূপে রাষ্ট্রে বাস করাও কঠিন হইয়া পড়ে। ইহার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ, শতকরা নব্বই জন ভারতবাসী। এহেন ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টি অথবা জাতি শুধু শাসিত ও শোষিতই হইয়া থাকে, কখনও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মালিক হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না থাকিলে ব্যক্তি ও জাতির সম্যক বিকাশ অসম্ভব। সুতরাং, উর্দূকে পূর্বপাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষারূপে স্বীকার করিয়া লইলে, বাংলা ভাষার সমাাধি রচনা করিতে হইবে এবং ইহার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বপাকিস্তানবাসীরও জাতি হিসাবে গোর দেওয়ার আয়োজন করিতে হইবে।
ইংরেজীর ন্যায় উর্দূ ও পূর্ব পাকিস্তানবাসীর পক্ষে, -- অবশ্য সমুদ্রে জলবিন্দুবৎ স্বল্প- সংখ্যক বাংলা-ঘেঁষা উর্দূভাষী মুসলমান এবং শিক্ষিত লোকের কথা বাদ দিয়ে, --একটি অপরিচিত বিদেশীয় ভাষা। বিদেশীয় ভাষার ন্যায় এক মহা অভিশাপ জনসাধারণের জন্য দ্বিতীয়টি নাই। দুইশত বৎসরের চেষ্টার পরেও ইংরেজরা আমাদের দেশে শতকরা ১২ বার জনের বেশি লোককে অক্ষরজ্ঞ করিয়া তুলিতে পারেন নাই। ইংরেজীকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে চালু করিতে গিয়াই সেই দুর্দশা ঘটিয়াছে, --হয়ত সবটি নহে, বেশির ভাগ যে তাহাই, একথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বস্তত: জাতিকে গলা টিপিয়া মারিতে হইলেই, তাহার উপর বিদেশীয় ভাষার ন্যায় একট অভিশাপকে চাপাইয়া দিতে হয়। ইংরেজরা তাঁহাদের ভাষার চাপ দিয়া আমাদিগকে এত দিন জীবন্মৃত করিয়া রাখিয়াছিলেন, --শাসন ও শোষণ করিবার সুবিধার জন্য। এখন আমরা উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করিয়া কোন্ দুঃখে পুনর্মূষিক বনিয়া যাইব? ইহাতে পূর্ব-পাকিস্তান কি পশ্চিম-পাকিস্তানের শাসন ও শোষণের বস্তুরূপে পরিণত হইবে না? ইহার নাম যদি আত্মনিয়ন্ত্রণ হয়, তবে আত্মবিসর্জন আর কাহাকে বলে?
সে যাহা হউক, যতদূর মনে হয়, পাকিস্তান-রাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করিতে গিয়াই, উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে পূর্বপাকিস্তানে চালাইবার কথা উঠিয়াছে। একথা একান্তই সত্য যে, পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রনৈতিক ভাগ্য পশ্চিম পাকিস্তানের সহিত বিজড়িত এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রনৈতিক উত্থান-পতনে পূর্ব পাকিস্তানের উদয়াস্ত, সম্পূর্ণটি না হইলেও বেশির ভাগ নির্ভরশীল। সুতরাং, পাকিস্তানের অভ্যুদয়ে এই রাষ্ট্রের বিষয়াদি সম্বন্ধে লোকের, বিশেষ করিয়া রাজনীতিবিদগণের চিন্তাধারা সামগ্রিকভাবে পরিচালিত হওয়া কিছুই অপ্রত্যাশিত ব্যাপার নহে। অধিকন্তু, বিভিন্ন ভাষাভাষী ভারতীয়গণের রাষ্ট্রভাষা ইংরেজীর পক্ষপুটে দীর্ঘকাল বাস করিয়া পাকিস্তানের ন্যায় একটি নবীন রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্র-ভাষার চিন্তা করা অনেকখানি অস্বাভাবিক ব্যাপার হইয়া পড়িয়াছে। অতএব কতকটা পূর্ব অভ্যাসবশে, কতকটা একত্ববোধের উৎসাহাতিশয্যে এবং কতকটা মুক্তবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টির অভাবে আমরা উর্দূকে সমগ্র পাকিস্তান এবং সেই সূত্রে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষারূপে পাইবার চিন্তা করিতেছি।
এক রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্র ভাষা অচল,--আমাদের এই চিন্তা কি মঙ্গলময় ও সুফলপ্রসূ? ইংরেজদের ন্যায় সাম্রাজ্যবাদীরাই রাষ্ট্রকে এইরূপ সামগ্রিকভাবে চিন্তা করিয়া থাকেন। আসলে কোন রাষ্ট্রকে, বিশেষ করিয়া কোন সংযুক্ত রাষ্ট্রকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করা সাম্রাজ্যবাদদেরই লক্ষণ; ইহা কোন গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য নহে। যে-জাতি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে সে জাতির ভাষা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে চালাইতে পারিলে শাসিত জাতি ও দেশের উপর শাসকজাতির সাংস্কৃতিক প্রাধান্য এবং প্রতিপত্তিও প্রতিষ্ঠিত হইয়া যায়। ইহাতে শারীরিক ও মানসিক উভয় বিজয় পূর্ণ হয় বলিয়া, শাসক জাতির পক্ষে শাসিত জাতির শোষণের পথ পরিষ্কার হয়। পাকিস্তান আর যাহা কিছুই হউক, এই জাতীয় সাম্রাজ্যবাদীর রাষ্ট্র নহে। সুতরাং, পূর্ব পাকিস্তানে উর্দূর ন্যায় একটি বিদেশীয় ভাষা একান্তই অচল, অমঙ্গলময় ও কুফলপ্রসূ।
যাহারা পাকিস্তানকে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করিতে অভ্যস্ত, তাঁহারা মুক্তিবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বলিয়া মনে হয় না। তাঁহারা প্রথমত : ভুলিয়া যান যে, পাকিস্তান পৃথক পৃথক ভৌগোলিক পরিবেশে অবস্থিত বিভিন্ন ভাষাভাষী রাজ্যসমন্বিত একটি রাষ্ট্য। এই রাষ্ট্রের পূর্বাংশে সর্বত্রই বাংলা এবং পশ্চিমাংশের নানা স্থানে নানা ভাষা প্রচলিত। ইহার প্রায় চারি কোটি লোক বাংলা ভাষা বলে এবং অবশিষ্ট তিন কোটি লোক নানা ভাষা বলিয়া থাকে। সিন্ধি, লন্ধী, পাঞ্জাবী, গুরুমুখী, বেলুচী ও পোস্ত প্রভৃতি পশ্চিম পাকিস্তানী ভাষা জনসাধারণের মৌখিক ভাষা--লেখ্য হইলেও সাহিত্য সম্পদে সম্পদশালী নহে, সেই জন্যই রাষ্ট্রীয় ভাষার স্থান দখল করিতে অসমর্থ। প্রকৃতপক্ষে, পাকিস্তানের পশ্চিম অঞ্চলে ভব্য ও ভদ্র সমাজে দেশী ভাষা চলে না, --তৎস্থলে চলে উর্দূ। বলা যায় পাঞ্জাব ও সিন্ধুর অধিকাংশ শিক্ষিত লোকের সাহিত্যের ভাষাও উর্দূ। অতএব, বলিতে পারা যায় যে, পশ্চিম-পাকিস্তানের লোকের পক্ষে উর্দূকে তাহাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ভাষা বিশেষত : রাষ্ট্রীয় ভাষা বলিয়া গ্রহণ না করিয়া উপায়ন্তর নাই। যাঁহারা উপায়ন্তর-বিহীন তাঁহাদের কথা স্বতন্ত্র। আমাদের ন্যায় যাঁহাদের অন্য উপায় রহিয়াছে, তাঁহারা অনন্যগতিদের শরণ লইবেন কেন? এইরূপ করা কি নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ নহে?
দ্বিতীয়ত : বাংলা-ভাষার অবস্থা তাহা নহে। নানা ভাষাভাষী লোকসংখ্যার অনুপাতে বাংলা-ভাষা পৃথিবীর সপ্তম স্থানীয়। ইহার সাহিত্য-সম্পদ পৃথিবীর বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। ভাষা হিসাবে ইহার ন্যায় ভাব-প্রকাশের উপযোগী এবং আপন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতায় শক্তিশালী ভাষা পৃথিবীতে খুব বেশি নাই। এই ভাষার স্বাভাবিক ক্ষমতা, অসাধারণ সৌন্দর্য এবং আধুনিক সাহিত্য সম্পদ সম্বন্ধে অবগত হইয়া ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রুশ দেশের বিখ্যাত বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহার অধ্যাপনা ও চর্চার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। সুতরাং, বাংলার ন্যায় এমন উন্নততর একটি মাতৃভাষাকে ত্যাগ করিয়া বাংলার তুলনায় ভাষা ও সাহিত্য-সম্পদে নিকৃষ্ট উর্দূকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা শুধু অজ্ঞতার পরিচায়ক নহে, বরং স্বভাবের পরিবর্তন অস্বাভাবিক বলিয়া অসম্ভব।
তৃতীয়ত : আধুনিকতম গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মূলনীতির কথা বিস্মৃত হইলে চলিবে না। রাজনৈতিক কারণেই আধুনিক রাষ্ট্র গড়িয়া উঠে। তাহার প্রধান উদাহরণ হইল রুশ-দেশ ও সুইটজারল্যান্ড। এই সমস্ত রাষ্ট্রে একাধিক রাষ্ট্রভাষা প্রচলিত আছে। ইহাতে এই রাষ্ট্রগুলির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা শক্তির কোন লাঘব ঘটে নাই। ফলকথা, রাষ্ট্র এক ব্যাপার, রাষ্ট্র-ভাষার অন্য ব্যাপার। রাষ্ট্র-ভাষার জন্য রাষ্ট্র গড়িয়া উঠে না--রাষ্ট্র গড়িয়া উঠে আত্মরক্ষা আত্মপ্রাধান্য, আত্মশক্তিবৃদ্ধি প্রভৃতি রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা হিসাবে। একটির সহিত অন্যটির যোগাযোগ ঘটিলে হয়ত সোনায় সোহাগা হইয়া থাকে; না ঘটিলেই যে মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া যায়, অর্থাৎ রাষ্ট্রের পতন ঘটে বা রাষ্ট্র শক্তিহীন হইয়া পড়ে,--এমন ধারণা প্রাচীন, উদ্ভট ও অচল।

আমরা দেখিয়াছি, একরাষ্ট্রে একাধিক ভাষা অচল, এই শ্রেণীর ধারণা সাম্রাজ্যবাদের পরিপোষক। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র অর্থাৎ হিন্দুস্তানের কংগ্রেসী কর্ণধারগণও এই শর্ত পোষণ করেন। তাই ত তাঁহারা “হিন্দুস্থানী” নামক এক কৃত্রিম হিন্দী ভাষাকে হিন্দুস্তানের রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করিবার ধূয়া তুলিয়াছেন। কোন প্রকারের ভবিষ্যৎ সাম্রাজ্যবাদের পরিকল্পনা তাঁহাদের মনের নিভৃত গুহায় লুক্কায়িত কিনা, তাহা অন্তর্যামীই জানেন। তবে এ কথা সত্য যে ভারতীয় একত্ববোধের এই উদগ্র ভক্তগণ কতটা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীর অনুকরণে ও শিক্ষার প্রভাবে এবং কতটা মুক্তবুদ্ধি ও সুদূরপ্রসারি দৃষ্টির অভাবে হিন্দুস্তানীর ন্যায় একটি ভাষাকে জাতীয়তার বা জাতীয় একতার দোহাই দিয়া রাষ্ট্র ভাষারূপে সমগ্র ভারতের বুকের উপর জগদ্দল প্রস্তরের ন্যায় চাপাইয়া দিতে প্রস্তুত হইতেছেন। ইহার ফল যাহা হইবে, তাহার সম্বন্ধে এখনই নিরাপদে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় : আগামী আধা শতাব্দীর মধ্যে তথাকথিত হিন্দুস্থানী ভাষা বর্তমান খিচুড়ি প্রকৃতির সহজ মধ্যপথ ছাড়িয়া পূর্ণ বিশুদ্ধ হিন্দীতে পরিণত হইবে। ফলে, উত্তর ভারতীয় হিন্দী ভাষাভাষী দেশগুলি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিক ভাবেই প্রাধান্য লাভ করিবে। শিক্ষা-দীক্ষা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার সাহিত্য সংস্কৃতি প্রভৃতি সমস্ত দিক দিয়াই উত্তর-ভারতীয় হিন্দী ভাষাভাষী দেশসমূহ শনৈ: শনৈ: উন্নতিলাভ করিবে। আবার নতূন কবিয়া উত্তর-ভারতীয় আর্যগণ শুধু দাক্ষিণাত্য নহে, ভারতীয় যুক্ত রাষ্ট্রভুক্ত সকল রাজ্য জয় করিবেন; আবার প্রাচীন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিবে। তখন ভারতের এই যুক্তরাষ্ট্র যুক্ত থাকে না মুক্ত হয়, সে কথা বলা যায় না।
কংগ্রেসের অনুকরণে মুসলিম-লীগও উর্দূকে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করিবার একটি প্রবল বাসনা পোষণ করিতেছেন বলিয়া মনে করিবার কারণ আছে । কেননা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে উভয়ের মধ্যে বহু বিষয়ে সাদৃশ্য আছে। যদি এই কারণে পূর্ব-পাকিস্তানের উর্দূ প্রচলিত হইবার আয়োজন চলিতে থাকে, তবে বুঝিতে হইবে, আমরা এখনও অপরের দাসত্ব বন্ধন ছিন্ন করিবার উপযুক্ত হই নাই। হিন্দুস্থান কি করিতেছে বা কি করিবে, তাহা না দেখিয়া অথবা তাহার অনুকরণ না করিয়া যদি আমাদের কিছুই করিবার সাহস ও ক্ষমতা না থাকে, তবে বর্তমান আজাদীর, এই স্বাধীনতার, এই মুক্তির মূল্য কি? পরাণুকরণ ও পরিবর্তনশীলতা শিশুসুলভ গুণ। রাজনীতির ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ যে বলিষ্ঠ চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীনতার পরিচয় দিয়াছেন রাষ্ট্র-ভাষার বেলায় আসিয়া লীগ কি তাহা ভুলিয়া যাইবেন বা যাইতে পারেন? এমন অসম্ভব ব্যাপারও যদি সম্ভবপর হয়, তবে বলিতে হইবে, আমরা এখনও রাজনীতিতে শিশুপনার উর্দ্ধে উঠিতে পারি নাই। এমন শৈশব অবস্থায় কল্পনার দৃষ্টিতে সমস্তই সম্ভবপর; সুতরাং পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ বাংলায়ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হইয়া উর্দূ হওয়া সম্ভবপর।
কেহ কেহ মনে করেন, কংগ্রেসীদের “হিন্দুস্থানী” তথা হিন্দীর অনুকরণে পাকিস্তানে উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষা করার কথা চলিতেছে না; ইহার অন্য একটি কারণ আছে এবং তাহা এই : হিন্দুস্থান উর্দূর পরিবর্তে “হিন্দুস্থানী” অর্থাৎ হিন্দীকে রাজভাষারূপে গ্রহণ করিয়া উত্তর-ভারতীয় উর্দূভাষী মুসলমানদের মনে দারুণ আঘাত হানিয়াছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনে উর্দূভাষী মুসলমানদের দান অত্যধিক। অতএব পাকিস্তানেও যদি উর্দূকে রাষ্ট্র ভাষা করা না হয়, তবে হিন্দুস্থানের মুসলমানদিগকে সান্ত্বনা দিবার মত আর কিছু থাকে না।
পাকিস্তান-রাষ্ট্র-গঠনে উর্দূভাষী মুসলমানদের দান কতখানি, তাহা এখনও নির্ণীত হয় নাই। আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রীয়-অবস্থা বিশেষভাবে স্থায়িত্ব প্রাপ্ত না হইলে, তাহার পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভবপরও নহে। সুতরাং, পাকিস্তানবাসীর পক্ষে উর্দূভাষীদের ঋণ পরিমিত প্রতিদান কি হইবে এবং কি প্রকৃতির হইবে তাহার সম্যক নির্ণয় এখন কিছুতেই করা যায় না। কালই ইহার সাক্ষী এবং ভাবী ঐতিহাসিক ইহার বিচারক। কালে ইহার পরিমাণ নির্ণীত হইবে; তখন নিশ্চয়ই পাকিস্তান হিন্দুস্থানের মুসলমানদের জন্য কি করিতে পারে কিংবা কি করিবে, তাহা জগৎ দেখিবে। এখন তাহার জন্য মাথা ঘামাইয়া বিশেষ লাভ নাই।
তবে, একথা একান্তই সত্য যে, বর্তমানে হিন্দুস্থানের মুসলমানদিগকে একমাত্র সান্ত্বনা দান ব্যতীত পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে দিবার মত আর বিশেষ কিছু নাই। এই অবস্থায় এই সান্ত্বনা মূল্যও যে যথেষ্ট, তাহা কে অস্বীকার করিবে? সঙ্গে সঙ্গে ইহাও সত্য যে, কোন দেশ তাহার রাষ্ট্রিয় জীবন বিসর্জন দিয়া অপরের সান্ত্বনার সামগ্রী হইতে পারে না। নিজে মরিয়া অপরকে বাঁচাইবার মধ্যে একটা বিরাট মাহাত্ম্য ও আদর্শ নিহিত আছে সত্য, কিন্তু অপরের সান্ত্বনার জন্য নিজের আত্মবিসর্জনের মধ্যে কোন বিশেষ মাহাত্ম্য ও উচ্চ আদর্শ নিহিত নাই। পূর্ব পাকিস্তানবাসী আবশ্যক হইলে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের জন্য প্রাণ দিতেও প্রস্তুত; তবে অনাবশ্যকতায় রাষ্ট্রীয় মৃত্যু আনয়ন করিবে কেন?
ইহাতে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সর্বনাশ ঘটিবে। নিশ্চিতরূপে এই তথাকথিত সান্ত্বনার পথ উর্দূ বাহিয়া আসিবে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মরণ, --রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মৃত্যু। এই রাষ্ট্রীয় ভাষার সূত্র ধরিয়া শাসন, ব্যবসা, বাণিজ্য ইত্যাদি সর্ব বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান হইবে উত্তর ভারতীয় পশ্চিম পাকিস্তানী উর্দূওয়ালাদের শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র, যেমন ভারত ছিল ইংরেজী রাষ্ট্র-ভাষার সূত্রে ইংরেজদের শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র। পূর্ব পাকিস্তানবাসী এই জাতীয় আত্মহত্যা করিতে প্রস্তুত কি? স্বাধীনতার অরুণ উষালোকে জাতি নানা ক্ষুদ্র-বৃহৎ ভুল করিয়া থাকে সত্য, কিন্তু মারাত্মক ভুল কখনও করে না। যে জাতি গোড়াতেই এইরূপ ভুল করে, সে-জাতি জগতে বাঁচিয়া থাকিবার অধিকার হইতে বঞ্চিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানবাসী তাহার বর্তমান রাষ্ট্রীয় সঙ্কট মুহূর্তে এইরূপ ভুল করিবে না বলিয়া মনে করাই স্বাভাবিক।
এতৎসত্ত্বেও উর্দূ ভাষার প্রতি পূর্বপাকিস্তানের কোন কোন রাষ্ট্রনায়ক আসক্ত বলিয়া মনে হইতেছে। ইহারই বা কারণ কি? ইহাদের মধ্যে দুই শ্রেণীর লোক আছেন। প্রথম শ্রেণীর লোকেরা পূর্ব পাকিস্তানবাসী হইলেও উর্দূকে মাতৃভাষারূপে ব্যবহার করেন। সংখ্যায় ইহারা একেবারে নগণ্য হইলেও, বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ইহাদের কেহ কেহ রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী। এই ক্ষমতার বলে ইহারা উর্দূকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে চালাইতে বদ্ধপরিকর কিনা জানা যায় না বটে, তবে উর্দূর প্রতি তাঁহাদের স্বাভাবিক মানসিক প্রবণতা যে থাকিবে, তাহাতে আর আশ্চর্য্য কি। উর্দূভাষী হওয়ায় ইহারা নিজেদেরকে কুলীন বলিয়া এক প্রকারের অহেতুক গর্ব অনুভব করিয়া থাকেন। হয়ত তাঁহারা ভাবিয়া থাকিবেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দূ হইলে তাঁহাদের পোয়া বার হইবে। প্রকৃত উর্দূভাষীরা কিন্তু তাঁহাদের বাংলা ঘেঁষা উর্দূ শুনিয়া হাসি সংবরণ করিতে পারেন না। প্রকৃত পক্ষে ইহাদের কোন ভাষা নাই। ইহারা একটা মিথ্যা অহমিকার মোহে বিমুগ্ধ হইয়া উর্দূর সমর্থন করেন বা করিতে পারেন। অতএব, এই সমর্থন সর্বথা ও সর্বদা পরিত্যজ্য।
দ্বিতীয় শ্রেণীর ভদ্র মহোদয়গণ বাংলা ভাষী হইয়াও উর্দূর সমর্থন করিয়া থাকেন। ইহারা হয়, ময়ূরপুচ্ছে দাঁড়কাক, না হয় হিজ মাষ্টারস ভয়েস বা যো হুজুরের দল, না হয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞাবিহীন ভাগ্যান্বেষী। নতুবা পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম বাংলা ভাষাকে তাগ করিয়া উর্দূর ন্যায় একটি বিদেশী ভাষার আমদানী করার পক্ষে ওকালতী করা তাঁহাদের পক্ষে শোভা পায় না, স্বাভাবিক নয়। রাষ্ট্র-ভাষা করিবার জন্য যদি একটি বিদেশী ভাষারই আমদানী করিতে হয়, তবে ইংরেজীই বা কি দোষ করিল? ইহা ত এখনও রাষ্ট্রভাষারূপে আমাদের মধ্যে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত আছে।
ইংরেজীকে রাষ্ট্রভাষার স্থান হইতে বিচ্যুত করার পক্ষে যুক্তির অভাব নাই। এই ভাষার ধূম্রজালের অন্তরালে থাকিয়া ইংরেজ জাতি আমাদিগকে শাসন ও শোষণ করিয়াছে। এই ভাষাজ্ঞানের মাপ কাঠিতেই এতকাল আমাদের বিদ্যাবত্তা, মান-সম্মান উপযুক্ততা প্রভৃতির মান নির্ণীত হইয়াছে। আমরা এখন ইংরেজ জাতির অধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করিয়া স্বাধীন জাতিতে পরিণত হইয়াছি। আমাদের মধ্যে বোধ জাগিয়াছে। সুতরাং আমাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগিয়াছে। সুতরাং, আমাদের পূর্ব-প্রভুদের শাসনের ন্যায় শোষণের বন্ধনও আমরা আর জিয়াইয়া রাখিতে চাহি না। ভাল হউক, মন্দ হউক, মুক্তি চাই, আলো চাই, স্বাধীনতা চাই। অনুভূতি প্রধান হইলেও এই জাতীয় যৌক্তিকতা বুঝিতে বিশেষ বেগ পাইতে হয় না।
কিন্তু, মাঝখান হইতে উর্দূকে কেন যে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হইবে, সেই যৌক্তিকতা ও সমীচীনতা বুঝিয়া উঠা ভার। পশ্চিম-পাকিস্তানের পক্ষে উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা না করিয়া গত্যন্তর নাই; কেন না এখনও উর্দূই ঐ অঞ্চলের একমাত্র সভ্য ও ভব্য ভাষা এবং সর্বসাধারণের মধ্যে ভাব আদান-প্রদানের ভাষা। সেই অঞ্চলের সুবিধার জন্যই কি পূর্ব-পাকিস্তানের ঘাড়ে উর্দূর ভূত চাপাইবার প্রয়াস চলিতেছে? যদি তাহা হয়, আমাদিগকে পূর্বাহ্নেই সাবধান হইতে হইবে। নতুবা, এই ভূত একবার আমাদের ঘাড়ে চাপিয়া বসিলে, সিন্দাবাদের স্কন্ধারোহী ভূতের ন্যায় ইহাকে আর ঘাড় হইতে খসানো যাইবে না।
উর্দূর রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছু নাই। ইহার পশ্চাতে ইংরেজীর ন্যায় কোন রাজনৈতিক ঐতিহ্যও নাই। সাধারণত : ভারতের মুসলিম আমলের একটি বিখ্যাত অবদান বলিয়া উর্দূকে স্বীকার করা হইয়া থাকে। কিন্তু উর্দূ মুসলমান আমলে কখনও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে নাই। তখন ফারসীই ছিল ভারতের রাষ্ট্রভাষা। আমাদের দেশে জনসাধারণের সহিত ভাবের আদানপ্রদান করিবার জন্য খ্রীষ্টান মিশনারীগণ এবং হিন্দীভাষী পশ্চিমাগুলি যেই জাতীয় ভাঙা-ভাঙা বাংলা বলিতে বাধ্য হয়, সেই জাতীয় ফারসী মিশ্রিত একটি হিন্দী ভাষার নামই উর্দূ। মূল ফারসী বা মূলহিন্দী কোন ভাষারই অন্তর্নিহিত শক্তি উর্দূতে নাই। ইহা একটি কৃত্রিম ভাষা। কালক্রমে উত্তর ভারতীয় এবং দাক্ষিণাত্যের কোন কোন স্থানের মুসলমানের মাতৃভাষায় পরিণত হওয়ায়, ভারতে ইহার একটা ভাষাগত স্থান হইয়া গিয়াছে। এই জাতীয় ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করার চেয়ে ইংরেজীর ন্যায় পৃথিবীর একটি উন্নত ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা সহস্রাংশে শ্রেয়। কিন্তু, কোন আত্মম্বুদ্ধ নবজাগ্রত জাতি তাহা করিতে পারে না।

মুসলিম ধর্ম শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহন বলিয়া উর্দূভাষার একটা বিশেষ খ্যাতি আছে। ইহাকে পশ্চিম পাকিস্তানের এবং তৎসূত্রে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করিবার পক্ষে যে সাম্প্রতিক প্রবণতা ও প্রচারণা দেখা যাইতেছে, তাহার পশ্চাতে উর্দূর এই খ্যাতির দানও খুব অল্প বলিয়া মনে হয় না। এই ক্ষেত্রে সর্বাধিক আশ্চর্য্যের বিষয় এই এমন একটি অমূলক খ্যাতি একমাত্র উর্দূর ব্যতীত পৃথিবীর অন্যকোন ভাষার ভাগ্যে ঘটে নাই। প্রথম কথা হইল উর্দূ কি করিয়া মুসলিম ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহন বলিয়া গণ্য হইতে পারে? তাহা হইলে কি বুঝিতে হইবে আরবী ভাষা ইসলামের ধর্ম, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহন হিসাবে ভারতীয় মুসলমানের কাছে হইতে বিদায় লইয়াছে? ভারতীয় মুসলমানরা তাহা কখনও স্বীকার করিবেন না; অথচ উর্দূকেও আরবীর সমপর্যায়ে এক নিঃশ্বাসে ফেলিয়া দিবেন। এই জাতীয় বিশ্বাস বা তর্কের কোন যুক্তি নাই, উত্তর দেয়াও কঠিন।
দ্বিতীয় : উর্দূ হইল, উত্তর-ভারতীয় মুষ্টিমেয় মুসলমানের মাতৃভাষা। ইহাতে বেশ কতকগুলি ভাল ভাল আরবী ধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদও আছে, তবে তাহার অধিকাংশই অবিশ্বস্ত। “সীরতুন্নবী” জাতীয় মৌলিক গবেষণা ধর্মীয় গ্রন্থের সংখ্যা উর্দূতে বেশি নাই। যাহা আছে, পূর্ণ তাহা “বেহেশতী জেওর” জাতীয় সংহিতা শ্রেণীর সঙ্কলন গ্রন্থ। শুধু রেসালা বা সংহিতাশ্রেণীর পুস্তিকা এবং অনুবাদ-- তাহা বিশ্বস্তই হউক আর অবিশ্বস্ত হউক, লইয়া যদি কোন ভাষা অন্য একটি ভাষার মর্যাদার দাবী করিতে পারে, অর্থাৎ শুধু রেসালা ও অনুবাদ লইয়া যদি উর্দূ আরবী ভাষার মর্যাদা পায় বা পাইবার উপযুক্ত বলিয়া বিবেচিত হয় তবে তাহাতে কাহারও কিছু বলিবার থাকে না। প্রকৃতপক্ষে শুধু অনুবাদক বা তজ্জাতীয় পুস্তক-পুস্তিকা লইয়া পৃথিবীতে কোন ভাষা মূলভাষার মর্যাদা লাভ করে নাই। উর্দূও কিছুতেই ইসলামী ভাষা আরবীর মর্যাদা লাভ করিতে পারে না। উর্দূকে সেই মর্যাদা দিতে গেলে, ইহা একটি পচা ধর্মীয় ভাষা হইয়া দাঁড়ায়। কেননা গল্পের ব্যাঘ্র চর্ম পরিহিত গর্দভের ন্যায় এই ভাষার গায়ে আরবী ও ফারসী ভাষার বর্ণমালা পরিহিত। এই কৃত্রিম পোশাকটি ফেলিয়া দিলেই, এই ভাষার স্বরূপ আপনা হইতেই প্রকাশিত হইয়া পড়িবে।
উর্দূকে রাষ্ট্রভাষারূপে পাকিস্তানে চালু করিবার পক্ষে আর একটি যুক্তি দেখানো হইয়া থাকে। তাহা ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে যোগাযোগ ও ভাব আদান-প্রদানের অজুহাত। ইহার ন্যায় এমন দুর্বল যুক্তি সচরাচর খুব বেশি দেখা যায় না। যদি ধরিয়াও লওয়া যায় যে, ভারতের অন্যান্য মুসলমানদের সহিত (এখানে মনে রাখিতে হইবে, ভারতের অল্প সংখ্যক মুসলমানই উর্দূভাষী) পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানগণকে ভাবের আদান-প্রদান করিতে হইবে তথাপি পূর্ব পাকিস্তানবাসীর পক্ষে উর্দূ শিখার যৌক্তিকতা কোথায়? কোন ভিন্ন ভাষী লোকের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য পরস্পর যে পরস্পরের ভাষা শিখিতে হইবে, এমন আবশ্যকতা আধুনিক জগতে অনুভূত হয় না। যদি হইত, তবে রুশ ভাষী ষ্টেলিন কখনও ইংরেজী ভাষী চার্চিলের সহিত এবং চীনাভাষী চিয়াংকাইশেখ রুশভাষী স্টেলিন ও ইংরেজীভাষী চার্চিলের সহিত ভাবের আদান প্রদান করিতে পারিতেন না।
অদূর ভবিষ্যতে ভারতীয় মুসলমানদের সহিত পাকিস্তানের মুসলমানদের যোগাযোগ ছিন্ন হইবে এবং যোগসূত্রছিন্ন হইবে এবং ধীরে ধীরে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবধান দূর হইতে দূরতর হইতেই থাকিবে। তখন পাকিস্তানের মুসলমানদের ভারতীয় মুসলিম প্রীতি এবং ভারতীয় মুসলমানদের পাকিস্তানী মুসলিম প্রীতি স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাইবে। এখন হইতে চারিদিকে তাহার লক্ষণ দেখা যাইতেছে। তখন পাকিস্তানের মুসলমানদের সহিত ভারতীয় মুসলমানদের যে যোগাযোগ থাকিবে ও ভাবের আদান প্রদান চলিবে, তাহা হইবে তুর্কী, আরব, মিসর, ইরান প্রভৃতি মুসলিম দেশসমূহের সহিত ভারতীয় মুসলমানদের বর্তমান যোগাযোগ ও সম্বন্ধের অনুরূপ একটি ব্যাপার। এখন আমরা তুর্কী, আরব ইরান প্রভৃতি দেশের মুসলমানদের সহিত যোগাযোগ রক্ষা ও ভাবের আদান-প্রদানের জন্য আরবী, ফারসী ও তুর্কী ভাষা না শিখিয়াও কাজ চালাইতেছি। ভারতীয় মুসলমানদের সহিত তখনকার যোগাযোগ রক্ষা ও ভাবের আদান-প্রদানের জন্য উর্দূ না শিখিলেও বিশেষ কিছু আসিয়া যাইবে না। আমরা রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির অভাবেই ভাবী ভারতীয় মুসলিম যোগাযোগ ও ভাবের আদান প্রদানকে বড় করিয়া দেখিতেছি। এই জাতীয় দুর্বলতাকে পরিত্যাগ করিতে হইবে।
আমরা দেখিয়াছি, পশ্চিম-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দূ না হইয়া গত্যন্তর নাই। তাঁহাদের সহিত যোগাযোগ রক্ষার জন্য আমাদিগকে যদি উর্দূর ন্যায় একটি বিদেশী ভাষার জিঞ্জির পরিধান করিতে হয়, তবে পশ্চিম পাকিস্তানেরও পূর্ব পাকিস্তানের সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিতে গিয়া বাংলা শিখা উচিত। কেননা আমাদের ন্যায় তাহাদেরও রাষ্ট্রীয় গরজ রহিয়াছে এবং তাহার ফলেই পূর্ব ও পশ্চিম-পাকিস্তান মিলিয়া পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিয়াছে। সুতরাং, আমাদের গরজে আমরা যদি উর্দূ শিখি, তাঁহাদের গরজেও তাঁহারা বাংলা শিক্ষা করিতে বাধ্য। তাহা হইলেই ন্যায় বিচার হইবে, -- নতুবা রায় একতরফা হইয়া দাঁড়াইবে।
প্রকৃতপক্ষে, ধর্মের নামে যাঁহারা অকারণ উর্দূপ্রীতি পোষণ করিয়া থাকেন, তাঁহারা একান্তই ভ্রান্ত। আমাদের উপর্যুক্ত আলোচনা হইতে এ-কথা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও, নিছক ধর্ম বিধানের দিক হইতে বিবেচনা করিতে গেলে, এ কথা আরও পরিস্ফূট হইয়া উঠে। আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফে বলিতেছেন, কুরআনকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করিবার কারণ, ইহা যেন আরবের সকল লোক বুঝিতে পারে এবং সকল লোকের বোধগম্য যে ভাষা সেই ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ হয়। সত্যই কোন জাতির মধ্যে কোন রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় বা অন্য যে কোন আদর্শের প্রচার ও প্রসার করিতে হইলে, সেই জাতির নিজের ভাষায় তাহার প্রচার ও প্রসারের চেষ্টাই স্বাভাবিক ও ঐশ্বরিক নিয়ম। নূতন রাষ্ট্রের আদর্শের প্রচার ও প্রসার করিতে গিয়া উর্দূর ন্যায় একটি বিদেশী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে চালু করিলে পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৫ পঁচানব্বই জন লোক তাহা বুঝিবে না। ইহা কি ঐশ্বরিক বিধানের পরিপন্থী নহে?
তাহা হইলে, পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে? কোন রাজ্যের রাষ্ট্রভাষা কি হইবে? এই প্রশ্ন যে কেন উঠে, তাহাই ভাবিবার বিষয়। রাষ্ট্রের ভাষা অর্থাৎ রাজ্যের জনসাধারণের ভাষাই রাষ্ট্রভাষা। ইহার জন্য আবার মাথা ঘামাইতে হয়, প্রচার ও প্রচারণার আবশ্যক হয়,-- ইহাই অস্বাভাবিক। খোদার উপর খোদকারী করিতে হইলে, স্বভাবের বিরুদ্ধে কিছু করিতে গেলেই, এই জাতীয় ব্যাপারের আশ্রয় লইতে হয়। এই নীতি (এবং ইহাই ঐশী ও স্বাভাবিক নীতি) অনুসারে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দূ হইতে পারে না। কেননা, এইখানকার একমাত্র ভাষা হইল, বাংলা, --উর্দূ নয়।
বাংলা-ভাষাকে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষারূপে গ্রহণ করার পক্ষে সকলের চেয়ে বড় আপত্তি দুইটি। ইহার একটি হইল, এইরূপ করিতে গেলে পাকিস্তানের ভাষাগত এবং তৎসূত্রে রাষ্ট্রীয় একতা বিনষ্ট হইবে। আমরা দেখিয়াছি, রাষ্ট্রীয় ও ভাষাগত ব্যাপার এক নহে, এবং ভাষাগত ঐক্যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য আনয়ন করে না। রুশ বর্তমান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী রাষ্ট্র হইলেও ইহার অনেক প্রদেশে প্রাদেশিক ভাষা রাষ্ট্র ভাষারূপে প্রচলিত। রুশদেশ রাষ্ট্রীয় ঐক্যের জন্য একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করে নাই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ক্ষুদ্র সুইটজারল্যান্ডেও তিন তিনটি রাষ্ট্র ভাষা রূপে গ্রহণ করিলে সমগ্র পাকিস্তানের একতা বিনষ্ট হইবে, এই যুক্তি একান্তই অচল ও মধ্যযুগীয় মানসিকতার পরিচায়ক।
ইহার বিপক্ষে দ্বিতীয় আপত্তি হইল, বাংলা সংস্কৃত ভাষার প্রভাবে প্রভাবিত বলিয়া হিন্দু সংস্কৃতির বাহন, যেমন উর্দূ ফারসী-ভাষার প্রভাবে প্রভাবিত বলিয়া মুসলিম সংস্কৃতির বাহন। উর্দূ যে প্রকৃতপক্ষে খাঁটি মুসলিম সংস্কৃতির বাহন নয়, তাহা উপরে খুব ভালরূপেই প্রদর্শিত হইয়াছে। বাংলা সংস্কৃত প্রভাবে প্রভাবিত এবং তৎসূত্রে হিন্দু সংস্কৃতির বাহন হইয়া গিয়াছে কিনা, তাহাই বিচার্য। পূর্ব-পাকিস্তানের শতকরা সত্তর জনেরও অধিক অধিবাসী মুসলমান। সুতরাং বাংলা যদি হিন্দু সংস্কৃতির বাহন হইয়া থাকে, তবে ধর্মীয় অনুভূতি প্রধান কারণে বাংলাকে পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষা রূপে প্রচলিত করিতে গিয়া মুসলমানদের আপত্তির কারণ দেখা দিলে, তাহাকে অন্যায় বলা চলে না। সত্যই তাহা অন্যায় নহে।

কিন্তু, এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যাপার অন্যরূপ। বাংলা সংস্কৃত ও সংস্কৃতজ শব্দের প্রভাবে প্রভাবিত একটি ভাষা, যেমন উর্দূ ফারসী ও ফারসীজাত শব্দের প্রভাবে প্রভাবিত আর একটি ভাষা। বাংলা ব্যাকরণের যে অংশ শুধু শব্দ-গঠনের সহিত সংশ্লিষ্ট, সেই অংশ ব্যতীত অন্য কোন বিশেষ সংস্রব নাই। উর্দূ ব্যাকরণের বেলায়ও অনুরূপ ব্যাপার দৃষ্ট হয়। এই জাতীয় প্রভাবের জন্য কোন ভাষাকে কোন বিশিষ্ট জাতির ভাষা বলিয়া উল্লেখ করা নিতান্তই খোশ-খেয়ালের পরিচায়ক; ইহাকে কোন ভাষাবিদের পরিণত চিন্তার বিচার ফল বলিয়া উল্লেখ করা যায় না। সুতরাং এ জাতীয় বিচার একান্তই ভাষা-ভাষা বিচার এবং তাই বলিয়া সর্বথা অগ্রাহ্য।
পক্ষান্তরে কোন বিশিষ্ট জাতির চিন্তাধারা ও বিশ্বাস পরম্পরায় পরিপুষ্ট যে ভাষা (তাহা সেই জাতির নিজের ভাষাই হউক বা অপরের ভাষাই হউক), তাহাকেই সেই জাতির প্রভাবে প্রভাবিত বলিয়া উল্লেখ করিতে হয়। এই জন্যই কুরআন হাদিস ইংরেজী ভাষায় অনূদিত হইলেও মুসলিম প্রভাবে প্রভাবিত ইংরেজদের প্রভাবে প্রভাবিত নহে; কিংবা উপনিষদ আরবী ভাষায় অনূদিত হইলেও হিন্দু-প্রভাবে প্রভাবিত, মুসলিম-প্রভাবে প্রভাবিত নহে। এই দিক হইতে বিচার করিতে গেলে, বাংলা ভাষাকে হিন্দু সংস্কৃতির বাহন বলা যেরূপ অন্যায়, উর্দূকেও মুসলিম সংস্কৃতির বাহন বলিয়া উল্লেখ করা তদ্রুপ অবিচার। হয়ত বাংলা-সাহিত্যের অধিকাংশ সাধক হিন্দু বলিয়া, তুলনামূলক বিচারে ইহাতে হিন্দু-সংস্কৃতির প্রভাব কিঞ্চিদধিক পরিদৃষ্ট হইবে এবং হয়ত উর্দূ সাহিত্যের বেশির ভাগ লেখক মুসলমান বলিয়া তাহাতেও তুলনামূলক বিচারে মুসলিম প্রভাব কতকটা অধিক পরিমাণে দেখা যাইবে; কিন্তু তাই বলিয়া বাংলা হিন্দুর এবং উর্দূ মুসলমানের ভাষা, এই জাতীয় ধারণা ও বিশ্বাস নিতান্তই আজগুবি। [বাংলা সাহিত্যে শক্তিশালী মুসলিম লেখকের আবির্ভাব ঘটিলে, সাহিত্যের বর্তমান মুসলিম ভাবদৈন্য অল্পকালের মধ্যেই বিদূরিত হইবে ও হইতে বাধ্য। মুসলিম রাজনীতির ক্ষেত্রে এতদিন কায়েদে আজম মুহম্মদ আলী জিন্নার আবির্ভাব না ঘটায়, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন যেরূপ সম্ভবপর হইয়া উঠে নাই, সেইরূপ এতদিন বাংলা সাহিত্যে শক্তিশালী মুসলিম লেখকের জন্ম হয় নাই বলিয়া বাংলা ইসলামী প্রভাব হইতে কতকাংশে বঞ্চিত রহিয়াছে। রাজনৈতিক মুক্তির সহিত পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের চিন্তার মুক্তি ঘটিয়াছে; অনতিকাল মধ্যে এই মুক্তি আরও প্রবল আকার ধারণ করিবে। রাজনৈতিক বন্ধনের মধ্যে দীর্ঘদিন বাস করিয়াও যদি পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মুসলমান হিন্দু না হইয়া যান, এখন স্বাধীনতা লাভের পরে বাংলা-ভাষার সাধনা তাঁহাদিগকে হিন্দু-ভাবাপন্ন করিয়া ফেলিবে,--এমন চিন্তা অবচেতন মনের নিভৃত গুহায় পোষণ করাও কি বাতুলতা নহে? জাতি এখন স্বাধীন। সুতরাং, তাহার অধীনে জাতীয়তা ও চিন্তাধারার ছাপ তাহার সাহিত্যের অঙ্গে অঙ্গে ঠিকরিয়া পড়িবে। ইহাকে রোধ করিবার ক্ষমতা কাহারও নাই।
কোন আত্ম-সংবিৎলব্ধ জাতি ধার করা বস্তু লইয়া গৌরব বোধ করিতে পারে না। উর্দূ পূর্বপাকিস্তানবাসীর পক্ষে একটি সম্পূর্ণ বিদেশীয় ভাষা। বর্তমান স্বাধীনতা প্রভাতে আত্ম-সংবিৎলব্ধ পূর্ব পাকিস্তানবাসী কিরূপে উর্দূর ন্যায় একটি বিদেশী ভাষাকে গ্রহণ করিয়া গৌরব বোধ করিবে? ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ আজ আত্মচেতনা প্রবুদ্ধ। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের কংগেসী কর্ণধারগণের সাম্রাজ্যবাদমূলক যুক্তি অগ্রাহ্য করিয়া আজ পশ্চিম-বঙ্গ বাংলা ভাষাকে, আসাম অহমীয়া ভাষাকে এবং যুক্ত প্রদেশ হিন্দী ভাষাকে তাহাদের স্ব-স্ব প্রদেশের রাষ্ট্র-ভাষারূপে গ্রহণ করিতেছে। সমগ্র পাকিস্তানে যাঁহারা আজও একটিমাত্র ভাষাকে অর্থাৎ উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে চালাইবার পক্ষপাতী, তাঁহারা এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির কাছ হইতে নূতন শিক্ষা লাভ না করিলে, গোড়াতেই যে মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল করিবেন, হয়ত কিছুদিন পরে আর তাহার সংশোধন করিবার সময় পাইবেন না, কিংবা উপায় থাকিবে না।
পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাকে শিক্ষার বাহন রাখিয়া উর্দূকে রাষ্ট্র-ভাষারূপে চালাইবার কথাও কোন কোন রাজনৈতিক খেলোয়াড়ের মুখ হইতে শুনা যাইতেছে। জাগ্রত জাতীয় অনুভূতির তুষ্টি সাধনার্থে এই জাতীয় প্রচারণার আবশ্যক আছে সত্য, কিন্তু ইহার ন্যায় এমন ফাঁকা রাজনৈতিক ভাঁওতা দ্বিতীয়টি আছে কিনা, তাহা কাহারও জানা নাই। আর ইহার পশ্চাতে পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ হইতে দূরে সরাইয়া রাখার একটি বিরাট অদৃশ্য অভিসন্ধি লুক্কায়িত। রাষ্ট্রভাষায় জ্ঞানের ব্যাপকত্ব ও গভীরতার দ্বারা পৃথিবীর সর্বত্রই রাষ্ট্রীয়, এমন কি, ব্যক্তি ও সমষ্টিগত জীবনের যোগ্যতা নির্ণীত হইয়া থাকে। যে ভাষার বাহনে জীবনের শিক্ষাদীক্ষা লাভ হইবে, তাহাতে জ্ঞানের ব্যাপকত্ব ও গভীরতা যতটুকু আশা করা যায়, অন্য একটি ভাষায় তাহা হওয়া কি কখনও সম্ভবপর? সুতরাং উর্দূ না জানার অজুহাতে পূর্ব পাকিস্তানবাসীকে রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্র হইতে দূরে সরিয়া পড়িতে হইবে। ফলে, উর্দূওয়ালারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যদিয়া পূর্ব-পাকিস্তানকে লুঠিয়া লইবার ব্যাপক আয়োজন করিবেন। এই জাতীয় প্রচারণার ন্যায় রাজনৈতিক প্রবঞ্চনা আর একটিও নাই। কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এই জাতীয় প্রচারণায় ভুলিতে পারেন না।
-- মোটের উপর, বাংলাকে ছাড়িয়ে উর্দূকে রাষ্ট্রভাষারূপে পূর্ব-পাকিস্তানবাসী গ্রহণ করিলে, তাঁহাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মৃত্যু অনিবার্য্য। ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে বাংলার মুসলমান ইংরেজী ভাষাকে গ্রহণ না করিয়া যে জাতীয় আত্মঘাতী ভুল করিয়াছিলেন, পূর্ব-পাকিস্তানবাসী এইবার উর্দূকে গ্রহণ করিলে অবিকল ঐ জাতীয় আর একটি রাজনৈতিক ভুলের পুনরাবৃত্তি করিবেন। এখনও এই ভুল করা হয় নাই, এখনও সাবধান হইবার সময় আছে। যাহাতে এই জাতীয় আত্মঘাতী এবং জাতিঘাতী ভুল অদূর ভবিষ্যতে না হইতে পারে, এখন হইতে সেই বিষয়ে সকলের সজাগ ও সচেষ্ট হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক।