Published : 27 Dec 2025, 12:55 AM
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে আধুনিক জীবনবোধের প্রকাশসামর্থ্য যে কয়জন লেখক দেখাতে পেরেছেন তাঁদের সংখ্যা বেশি নয়। বলা যায়, ১৯৪৭ সালের দ্বিখণ্ডিত ভারতবর্ষ সূত্রে বাংলা অঞ্চল খণ্ডিত হওয়ার আগের যে কয়জন সৃজনশীল লেখক বাংলাদেশে পরিচিতি পান তাঁদের মধ্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবুল ফজল, আবু রুশদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, আবদুল হক, আবু ইসহাকের নাম বিশিষ্ট। এঁদের পরেই একঝাঁক লেখকের নাম মনে আসে আমাদের। শহীদুল্লাহ কায়সার, রাজিয়া মাহবুব, রাজিয়া মজিদ, শামস রশীদ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, রশীদ করীম, সৈয়দ শামসুল হক, রাবেয়া খাতুন, জহির রায়হান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, রাজিয়া খান, বশীর আল হেলাল, রিজিয়া রহমান প্রমুখ পরিচিতি অর্জন করেন। বলা চলে এঁদের কলমেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের আধুনিক কথাসাহিত্যের ভিত্তি!!
রাবেয়া খাতুনকে যেহেতু আধুনিকতার প্রতিনিধি হিসাবে এখানে বিবেচনা করা হচ্ছে সেহেতু আধুনিকতা বলতে কী বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে সে প্রসঙ্গেও সামান্য আলোকপাত করে নেয়া যায়। মোটা দাগে শনাক্ত করতে গেলে বলা যায়, ‘আধুনিকতা’কে এখানে কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডের বা প্রজন্মের চিহ্ন হিসাবে দেখতে চাওয়া হচ্ছে না, বরং একে ভাবা হচ্ছে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি হিসাবে যা সামগ্রিক অর্থে ভাষাবোধ, শিল্পচেতনা ও বাস্তবতাবোধের সমষ্টিগত রূপ। সাহিত্যে আধুনিকতা মূলত গড়ে ওঠে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, ব্যক্তি-চেতনা ও নৈতিক সংশয়ের ভেতর দিয়ে। আধুনিক লেখক বাস্তবকে দেখেন নির্মম, নিরাবরণ ও দ্বন্দ্বমুখর তথা নির্মোহ দৃষ্টিতে। সমাজের শৃঙ্খলাবদ্ধ নীতিকাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে ব্যক্তির ভাঙন, কামনা, ভয় ও সংশয় সেখানে গুরুত্ব পায়। ফলে এই ধারার সাহিত্যের কেন্দ্রঅভিমুখি চরিত্র আর আদর্শ মানুষমাত্র হয়ে থাকে না; সে হয় ভাঙা, দ্বিধাগ্রস্ত, অসংগত এক মানবসত্তা।
এই আধুনিকতায় হাজির হয় নৈতিক নিশ্চিততার বদলে প্রশ্ন ও সংশয়। আধুনিক লেখক উত্তর দিতে আগ্রহী নন; বরং পাঠককে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চান। নৈতিকতা এখানে স্থির কোনো বিধান নয়—তা পরিস্থিতিনির্ভর ও ভঙ্গুর। প্রসঙ্গত মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা স্মরণ করা যায়, ‘সাহিত্য সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার নয়; সমাজের সত্য প্রকাশের ক্ষেত্র।’ ভাষা এবং গঠনেও আধুনিক লেখক বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন। ভাষা হয়ে ওঠে সরল কাহিনি বর্ণনার বদলে চেতনাপ্রবাহ, খণ্ডিত বর্ণনা ও অন্তর্লোকের প্রতিধ্বনি। সুতরাং এই অর্থে আধুনিকতা মানে রাজনীতি, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানসের সংঘর্ষকে নতুন ভাষা ও গঠন কাঠামোয় প্রকাশ করা। সাহিত্যের লক্ষ্য এখানে সমাজের সাজানো গল্প বলে যাওয়া নয়, বরং ব্যক্তির ভেতরের অস্বস্তি ও দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে আসা।
বাংলাদেশের আধুনিকতা সম্পর্কে দু এক কথা একটু যোগ করতে হবে; কারণ, নৈতিক সংশয়ের পাশাপাশি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, সাংস্কৃতিক মানস, রাষ্ট্রীয় ইতিহাস ও ধর্মীয় কাঠামোর চাপ দ্বারা এই আধুনিকতা খানিকটা নির্ধারিত। বাংলাদেশের সেই আধুনিকতা অনুসারী কথাসাহিত্য যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক কারণে সমগ্র বাংলাসাহিত্যের অংশ হয়েও ভিন্নস্বভাবী তার চিহ্নগুলো মোটা দাগে পূর্বোল্লিখিতদের লেখাতেই ফুটে ওঠে! কিন্তু স্মরণীয় যে, যাঁদের কথা বলা হলো তাঁরা ঔপন্যাসিক হিসাবে যতটা স্মৃত ছোটগল্প লেখক হিসেবে ততটা উল্লিখিতও নন! রাবেয়া খাতুনের বেলায়ও এমনটাই ঘটেছে। উপন্যাসের তুলনায় তাঁর ছোটগল্প নিয়ে আলাপ এত কম হয়েছে যে হয়ইনি বলা চলে। কিন্তু ছোটগল্প লেখক হিসাবে তাঁর যে অন্তর-মানস তা এক দিক থেকে দেখলে ঔপন্যাসিক হিসাবে অনুশীলিত সাহিত্যিক সত্তার যেমন সম্প্রসারণ ও পরিপূরক তেমনই শিল্পসামর্থ্যেও তা উল্লেখযোগ্য।
রাবেয়া খাতুনের ছোটগল্প সংকলিতও হয়েছে অনেক পরে। তালিকা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে আশির দশকের আগে তাঁর কোনো গল্প-সংকলন পাওয়া যায় না। অথচ প্রচুর গল্প লিখছেন তিনি পঞ্চাশের দশক থেকেই। তাঁর প্রকাশিত গল্প-সংকলনগুলো হচ্ছে: আমার এগারোটি গল্প (১৯৮৩), নির্বাচিত গল্প (১৯৯০), মধ্যরাতে সাত মাইল (১৯৯৬), মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী (১৯৯৬), মুক্তিযুদ্ধের গল্প (১৯৯৮), লাল চিঠি (২০০৩), প্রেম কিংবা পরশপাথর (২০০৪), তোমার কাছে যাব বলে (২০০৪), সেরা দশ গল্প (২০১৫)। বিষয়ভিত্তিক সংকলনগুলোর কথা উল্লিখিত হলো না সেসব সম্ভার এসব সংকলন থেকে নেয়া গল্প দিয়েই গড়া বলে! রয়েছে ৪ খণ্ডে ধৃত তাঁর গল্পসমগ্রও!
ছোটগল্পকার হিসাবেও তিনি ঔপন্যাসিক সত্তার অনুরূপ বিচিত্র পথেরই যাত্রিক। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছোটগল্প লিখেছেন। ঔপন্যাসিক হিসাবে আগে আত্মপ্রকাশের কারণে ও অতিপ্রজ উপন্যাস লেখক বলে হয়তো তাঁর ছোটগল্পগুলোকে একেবারেই সানুকম্প বিচার করে দেখা হয় নি। যথার্থ নান্দনিক মাত্রা বিচারের মাধ্যমে বাছাই করে গল্পগুলোর সংকলন প্রস্তুত করা হলে এখন যতটা ধারণা করা যায় হয়তো তাঁর মধ্যে তার চেয়েও শক্তিমান একজন গল্পকারকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের সমালোচনা সাহিত্যের দীনতার কারণে রাবেয়া খাতুনদের মতো লেখকদের সৃষ্টিশীলতার গতিপ্রকৃতিকে ঠিকমতো অনুসরণ করে দেখা হয় নি।
ঔপন্যাসিক হিসাবে যেমন তেমনি ছোটগল্প লেখক হিসেবেও তাঁকে বলা যায় সমাজরূপান্তর ছবির কারুকার! তাঁর গল্পের ভূগোল বাংলাদেশের প্রান্তিক গ্রাম থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্য প্রান্তের ভিনদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর জীবনক্ষেত্র ও দৈর্ঘ্য তাঁর অভিজ্ঞতাকে সম্পন্নতর করেছে। ফলে তাঁর গল্পে যেমন উপজীব্য হয়েছে বিশ শতকের প্রথম ভাগের বাংলাদেশের স্থবির ও সীমিত যাপনে অতিক্রান্ত অজ পাড়াগাঁওয়ে বসবাসরত মানুষের জীবনবোধ, তেমনি রয়েছে পুরোনো ঢাকার মানুষের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিকতাসম্পন্ন জীবনের উপলব্ধি। তাঁর ভ্রামণিক সত্তায় উপলব্ধ জীবনদৃষ্টিও
আভাসিত হয়েছে শৈল্পিক অভিঘাতে! গল্প উপন্যাস ভ্রমণ স্মৃতিকথা ও শিশুসাহিত্যে তাঁর অবিরল সৃষ্টি থেকে সহজেই অনুভব করা যায় যে তিনি জাত লেখক।
সকলেরই জানা আছে সংরূপগত দিক থেকে ছোটগল্প অনেকটা কথনে স্বল্প ও দার্শনিকতায় সূক্ষ্ম, স্বল্পরেখায় আঁকা রেখাচিত্রের মতো। যেন স্বল্প আঁচড়ে মূর্ত হয়ে ওঠে এক একটা পুরো মুখের আদল, কোনো চরিত্রের আভাস অভিব্যক্তি কিংবা নিসর্গের অনুভব। চরিত্র বা চকিত ঘটনার মধ্যে দিয়ে ছোটগল্প ছুঁয়ে ফেলে উপলব্ধির প্রেক্ষণবিন্দুকে। অন্যদিকে উপন্যাস উন্মোচিত হয় ক্রমশ পর্বান্তরের মধ্য দিয়ে স্তরের পর স্তর অতিক্রম করতে করতে। সমাজ ও মনের পরম্পরা নানা সাংগীতিক উত্থান পতনের বিস্তার ঘটিয়ে ঔপন্যাসিক তাঁর আখ্যানকে এগিয়ে নিয়ে যান। পক্ষান্তরে ছোটোগল্পের প্রকরণ ইংগিত-নির্ভর। ভাষিক রূপকে খানিকটা একই ধরনের মনে হলেও একই লেখক যখন এই দুই মাধ্যমে কাজ করেন তখন পরিচর্যাগত দিক থেকে ভিন্ন পথে অগ্রসর হন! উপন্যাসে বর্ণনার আশ্রয় বেশি নেয়া হয় বলে যতটা বাস্তবের বাহ্যিকতাকে ধারণ করা যায় ছোটগল্পে তা পারা যায় না। সেজন্য ছোটগল্পের আর উপন্যাসের ভাষারূপেরও সূক্ষ্ম পার্থক্য ঘটতে পারে। উপন্যাসে লেখক অনেক কিছু উন্মোচন করতে চান, ছোটগল্প লেখক চান অনুন্মোচিত ইংগিতের আশ্রয় নিতে। যদিও ঔপন্যাসিক হিসেবেই রাবেয়া খাতুনের প্রথম আত্মপ্রকাশ এবং পরিচিতি তাহলেও ছোটগল্প লেখক হিসেবেও যে তিনি সিদ্ধকাম তা বিশ্লেষণ ও পরীক্ষা করে দেখা হয়নি! গল্পরচনার ক্ষেত্রে তাঁর সংখ্যাপ্রাচুর্যের কথাও মনে রাখা জরুরি। তাই এই রচনা তাঁর ছোটগল্পগুলো সমনোযোগ পাঠেরও প্রত্যাশা রাখে।
২.
রাবেয়া খাতুনের গল্পের ভাষা আপাত সহজবোধ্য ও অনাড়ম্বর; সংযত-আবেগ প্রকাশক পটভূমি-আভাসিত ও ইঙ্গিত-নির্ভর। সমগ্রদৃষ্টিতে দেখলে তাঁর কলাপ্রকৌশলের চেষ্টা প্রকট হয়ে ওঠে না। তাঁর ভাষায় ও আঙ্গিকে বরং রয়েছে পরিমিতির বোধ। অর্থাৎ অদরকারি পাণ্ডিত্যের ভার নেই তাঁর সামগ্রিক ভাষিক পরিচর্যায়। কথা বলার ভঙ্গি নিতান্ত ঘরোয়া, আটপৌড়ে মনে হয়; ফলে দুর্বোধ্যতায় আক্রান্ত হয় না পাঠকমন। কিন্তু আবার অনুভবকে ধারণোপযোগী শব্দের প্রয়োগে সহজেই পৌঁছে যান পাঠকের হদয়-অলিন্দে। নির্মোহতার মধ্যেও অন্তঃশীল একটা দরদি হৃদয় যেন ক্রিয়াশীল থাকে তাঁর ভাষায়! পরিমিত বর্ণনায় সরল কথার আড়ালে থাকা সহৃদয়তার ফল্গুধারা থাকে চলমান। অনেক কথা তিনি বলেন বটে, কিন্তু তার সবই ইংগিতে। আরো গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জীবন সম্পর্কে তাঁর গভীর উপলব্ধি ভাষা পায় আপাত নির্লিপ্তির মধ্যে। নির্মোহ চোখে চরিত্রের অন্তর্দেশকে আলোকিত করেন। চরিত্রের অন্তর্নিহিত শাদা কিংবা কালোকে স্বল্প রেখায় ফুটিয় তোলেন শৈল্পিক তুলির টানে। মোটাদাগে বিবেচনা করলে অনুভব করা যাবে যে, চরিত্রসৃষ্টিতে তাঁর পথচলা অনেকটা টলস্টয়-দস্তইয়েফ্স্কির চিনিয়ে দেয়া ক্ল্যাসিক রাস্তা ধরেই।
রাবেয়া খাতুন অনুভব করেন যে, বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রা স্পন্দনশীল; আর তা তিনি দেখতে পান স্বকালের আয়নায় প্রতিফলিত অবস্থায়। তাঁর লেখালিখির কাল রবীন্দ্রনাথের অব্যবহিত পরের। সে অর্থে এবং স্বভাবগত প্রভাবেও তাঁকে অনেকটা রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের সম্প্রসারিত ধারারই লেখক বলা যাবে। হয়তো সে কারণেই তাঁর লেখাকে নিজের স্বাতন্ত্র্য নিয়েও যেন আশাপূর্ণা দেবী বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পের জ্ঞাতি আত্মীয়ের মতো মনে হতে পারে। এই আত্মীয়তা অনুকারকের নয়, সহযাত্রীর! তাঁর ভাষায় নেই কোনো দৃশ্যমান কারুকার্যের বাহাদুরি–কিন্তু জীবনসত্যের গহ্বরে ঢুকে পড়েন অনায়াসে। গল্পের পটভূমি ঢাকা তথা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রত্যেকটি গল্প যেন লেখকের অতিক্রান্ত জীবন অভিজ্ঞতার এক একটি আন্তরিক দিনলিপি; একেকটা গল্প যেন ফুলের ছড়ানো পাপড়ির মতো; সেই দিনলিপির পাতাগুলো যেন এক এক করে মেলে ধরেছেন পাঠকের সামনে।
৩.
রাবেয়া খাতুনের চার শতাধিক গল্পের মধ্য থেকে দৈব চয়ন প্রায় অসম্ভব; বরং প্রতিনিধিত্বমূলক পাঠই এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তাঁর গল্পকার সত্তার প্রধান প্রবণতা শনাক্ত করতে ‘একটি প্রশ্ন’ গল্পটিকে বেছে নেয়া যায়। সাহিত্যভুবনে খ্যাতির আকাঙ্ক্ষায় আচ্ছন্ন এক মফস্বলি মানুষ এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র শওকত। অল্প কথায়, সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনায় রাবেয়া খাতুন শওকতের সাংস্কৃতিক গঠন ও মানসিক সংকটকে উন্মোচন করেন। সংসারের উন্নতির চাপে সে একসময় নিজের নির্ধারি আদর্শ থেকেই সরে আসে, গ্রহণ করতে থাকে উৎকোচ। মৃত্যুর পরও শওকতের কণ্ঠে ভেসে আসে এই প্রশ্ন যে, নিজের নৈতিক বিচ্যুতি কি আসলে অন্যদের মুক্তির পথ তৈরি করেছে? গল্পটি ন্যায়-অন্যায়, আত্মসমর্পণ ও দায়বদ্ধতার মধ্যকার অনিরসনীয় দ্বন্দ্বকে প্রশ্নরূপে পাঠকের সামনে রেখে দেয়। কিন্তু উত্তর দেয় না। এই না-দেওয়াই গল্পটির আধুনিকতা।
গ্রামীণ নিম্নবর্গের নারীর জীবনসংকট ‘মেহেরজান’ গল্পে আধুনিকতা আরও নির্মমভাবে ধরা পড়ে। ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও সামাজিক সন্দেহের চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে মেহেরজানের আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আত্মহননের দিকে মোড় নেয়। এখানে আত্মহত্যা কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং সামাজিক কাঠামোর নৈতিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। রাবেয়া খাতুন এই গল্পে ভবিষ্যতের এমন আভাস দেন যে, নারীর এই যাত্রা থামবে না, যদিও তার পথ রক্তাক্ত।
মধ্যবিত্ত নারীর সংকটকে ভিন্ন মাত্রায় উন্মোচন করে ‘ভিন্ন রমণীর কিছু প্রশ্ন’। স্বামীর অকালমৃত্যুর পর নারীটির জীবন ধীরে ধীরে সামাজিক অবহেলা, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও আবেগগত শূন্যতার ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়। কর্মজীবী হয়ে ওঠা, প্রেমের সম্ভাবনা, সন্তানদের অনমনীয়তা—সব মিলিয়ে তার জীবন এক ধরনের নীরব আত্মত্যাগে পর্যবসিত হয়। অবসরপ্রাপ্ত জীবনে দাঁড়িয়ে তার প্রশ্ন—এই অস্তিত্বহীনতার দায় কার? গল্পটি কোনো সমাজসংস্কারের ডাক দেয় না, বরং পাঠককে অস্বস্তিকর আয়নার সামনে দাঁড় করায়। এ প্রশ্ন এক আধুনিক মানুষের। নারীজীবনে এর প্রতিফলন দেখা যায় মাত্র!
চলচ্চিত্র জগতের নারীদের মানবিক আকাঙ্ক্ষা ‘নক্ষত্রের গল্প’-এ রাবেয়া খাতুন অনাড়ম্বর ভাষায় তুলে ধরেন। মালাইকার পরিচয় সে সিনেমার একজন নায়িকা। সে শুধু পেশাগত শোষণের শিকার নয়; বিপরীতপ সে সন্তান ও সংসারের স্বপ্নেও আকুল। তার গর্ভধারণের আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যতের প্রতি এক ধরনের নৈতিক প্রত্যাশাও! অবৈধতার চক্র ভেঙে নতুন জীবন শুরু করার ইচ্ছা এখানে ক্রিয়াশীল। লেখক রাবেয়া খাতুনকে এখানে পাওয়া যাচ্ছে সহানুভূতিশীল দ্রষ্টা হিসাবে, কিন্তু তিনি মালাইকার পক্ষ অবলম্বনকারী নন। এটাও আধুনিকতার এক মাত্রা।
অভিবাসী জীবনের বিভ্রম ও সাংস্কৃতিক ভাঙন ‘ভাঙা কনের বিয়ে’ গল্পে স্পষ্ট। লন্ডন-মোহে আবদ্ধ এক বাঙালি পরিবার কন্যার ভবিষ্যৎকে যে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়, কুর্চির প্রত্যাবর্তন সেই মোহভঙ্গের প্রতীক। গল্পটির শক্তি এর পরিণতিতে। যাপিত জীবনের সংকট তার সত্তাকে প্রভাবিত করে। কুর্চি আর তখন ভুক্তভোগী মাত্র থাকে না; সে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই অভিজ্ঞতা আজ বাংলাদেশের সামষ্টিক জীবনের পরিচিত বাস্তবতা, এ-ওতো আধুনিকতারই এক দিক যা সাহিত্যে প্রবেশ করেছে রাবেয়া খাতুনদের হাত ধরে।
৪.
কি উপন্যাস রচনা কি ছোটগল্প দুই ক্ষেত্রেই তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বড় অংশ দখল করে আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা বেশ অনেকগুলো গল্প আছে তাঁর! আলাদা গল্পসংগ্রহও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে। এখানে তাই আলাদা করে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা হলো। বলা যায়, রাবেয়া খাতুনের আধুনিক জীবন বোধে মুক্তিযুদ্ধ অনুষঙ্গ আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
তাঁর ‘মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধ কোনো বীরগাথা নয়; বরং অচরিতার্থ জীবনের পটভূমি। অগ্নিমিতা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই মর্যাদা তার জীবনের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে ক্রমে নিষ্প্রাণ করে তোলে। ত্যাগের গৌরব ও ব্যক্তিগত জীবনের দাবির মধ্যে সে দোদুল্যমান। ইস্রাফিলের সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন জীবনের সম্ভাবনা জাগালেও সমাজ সেই সম্ভাবনাকে নির্মমভাবে নস্যাৎ করে দেয়। গল্পটির পরিণতি দেখায়—মেকি মহিমার বেদিতে ব্যক্তিমানুষের জীবন কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যায়।
এর বিপরীতে ‘পাঁচটা পোড়া সিগারেট’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এক ধরনের আবেশে পরিণত হয়। শামিমা শহীদ স্বামীর স্মৃতির ঘোর থেকে বেরোতে পারে না; নতুন সংসারেও সে অতীতের ভার বহন করে চলে। রেজোয়ানের বঞ্চনা, তার নিঃশব্দ ক্ষোভ—সব মিলিয়ে গল্পটি সম্পর্কের অসম্ভবতাকে তীব্রভাবে উন্মোচন করে। এখানে কোনো নায়ক নেই, কোনো বিজয় নেই—শুধু তিক্ততা, যা শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের ইতি টানে।
৫.
লেখক হিসাবে রাবেয়া খাতুনের শক্তিমত্তা এই যে, জীবনকে তিনি দেখতে পেরেছেন নানা দিক ও তল থেকে; বিচিত্র পরিপার্শ্ব ও পরিপ্রেক্ষিত থেকে। কিন্তু লেখকীয় নির্মোহতা ও আবেগ সংহতির কারণে জড়িয়ে পড়েননি বিশেষ কোনও মতাদর্শের বা কোনো নির্দিষ্ট মূল্যবোধের পক্ষপাতিত্বে! নান্দনিকতার সাধারণ এই বোধের সঙ্গে আমরা পরিচিত যে, শিল্পকর্মের স্রষ্টা মাত্রই দ্রষ্টা; স্রষ্টা নিজেকে স্থাপন করেন না তাঁর সৃষ্টিতে, নিজস্ব মতামত চাপিয়ে দেন না সৃষ্ট-চরিত্রের অভিমুখিনতায়। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ল্যাসিক্যাল সেই দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছেন তিনি। জীবনের অন্যান্য সংকট ও বোধের অভিমুখকে ধারণ করার ক্ষেত্রে যেমন তেমনই মুক্তিযুদ্ধের আবেগঘন বিষয়কে অবলম্বন করতে গিয়েও তিনি খেই হারিয়ে ফেলেন না কখনো! তাই বলে, মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্র অভিপ্রায় এবং নির্যাতিত নারীপুরুষদের প্রতি নৈতিক সমর্থন থেকে সরে আসতে হয়নি তাঁকে।
রাবেয়া খাতুনের গল্পে তাঁর নিজের সময়, পারিপার্শ্ব-পরিস্থিতিকে যেমন তুলে ধরে, তেমনি তুলে ধরে বাংলাদেশের ধর্মীয় বৃত্তাবদ্ধতার চাপ অতিক্রম করে পাশ্চাত্যে জেগে-ওঠা জীবনের রঙকে কী করে নিজের করে নেয় তার পরিচয়কেও। সেদিক থেকে বলা যায়, তাঁর সৃষ্ট ছোটগল্পের আঙ্গিক ও চরিত্রের মনোজগতের উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে রাবেয়া খাতুন যেন একে একে পাঠকের সামনে খুলে দেখিয়েছেন চরিত্রগুলোর মুখ ও মুখোশকে। তাঁর গল্পের নারীত্বে আছে অবদমিত দ্রোহেরও পরিচয়, কিন্তু তা নয় পাশ্চাত্যের নারীবাদী আন্দোলনের অর্থে। নারীর প্রতিবাদের সত্তাকে তিনি উপস্থাপন করেছেন নিজের পারিপার্শ্বিক সাংস্কৃতিকতার সংবেদনায় থাকা মানবসত্তার সামগ্রিক পটভূমির মানুষ হিসেবে। অর্থাৎ তাঁর নারী ভাবনা মনুষ্যত্বের সম্পন্নতার অবস্থান থেকে বিবেচিত। হয়তো সেজন্যেই নিজেকে নারীবাদী আখ্যায় কেউ আখ্যায়িত করুক তা তিনি চাইতেন না। যা কিছু ব্যক্তিমানুষের প্রাপ্য ও অপ্রাপ্যের মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি করে এবং তা যদি মানুষের সংবেদনায় সাড়া দেয় তাহলে তা-ই হয়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টিকর্মের বিষয়। তিনি নিজে নারী বলে, সংকটের ও প্রাপ্তির নারীগত অবস্থাকে বেশি অন্তরঙ্গভাবে উপলব্ধি ও রূপায়ণ করতে পারেন। ভাষার প্রতি তাঁর এতটাই নিয়ন্ত্রণ যে কখনো আবেগ অতি উচ্ছ্বাসের দিকে যায়নি। হয়ে ওঠেনি অতিকথন। নারীর সমস্যাকে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে গল্পকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন পরিণতির দিকে।